হেফাজতের ঢাকা অভিযান এবং মোটিভেশন সমগ্র ২য় পর্ব


সকল কাজেই মোটিভেশনের দরকার হয়। ৫ মে হেফাজতের ঢাকা অভিযানকে ঘিরে যা কিছু ঘটে গেলো, প্রতিটি ক্ষেত্রেই মোটিভেশন কাজ করেছে। সেদিন অনেকগুলো পক্ষ ছিল। ফলে মোটিভেশনও ছিল অনেক। এবং অবশ্যই ভিন্ন ভিন্ন ছিল। হেফাজতের ঢাকা অভিযান এবং মোটিভেশন সমগ্র লেখার দ্বিতীয় পর্বে ২০১৩ সালের ৫ মে ঢাকার শাপলা চত্বরে ঘটে যাওয়া বাংলাদেশের ইতিহাসের নজিরবিহীন ঘটনাবলীর মোটিভেশনগুলো বিশ্লেষণের চেষ্টা করা হয়েছে।

প্রথমেই আমরা দেখার চেষ্টা করব হেফাজতের ঢাকা অভিযান কেন? কোন মোটিভেশন থেকে হেফাজতে ইসলাম ঢাকা অভিযান পরিচালনা করেছে?

অনেকে বলাবলি করছে, আওয়ামী লীগ সরকারকে উৎখাতের লক্ষ্যে হেফাজতে ইসলাম ঢাকা অভিযান পরিচালনা করেছে। কিছুদিন ধরে হেফাজত ইসলাম বলে আসছিল তাদের ১৩ দফা দাবী মানা না হলে তারাই দেশের ক্ষমতা নিয়ে নেবে। যারা বলছেন যে, নির্বাচিত সরকার উৎখাতের লক্ষ্যে হেফাজত ঢাকা অভিযান পরিচালনা করেছিল। তারা হেফাজতের পূর্বেকার বক্তব্যগুলো সত্যি বলে ধরে নিয়েছেন। ঘটনার দিন সম্পর্কে তাদের বক্তব্য হলো, ৫ মে হেফাজত প্রথমে ঢাকা প্রবেশের সবগুলো পথ বন্ধ করে দেয়। তারপর তারা ঢাকার বাণিজ্যের কেন্দ্রবিন্দু মতিঝিলের দখল নেওয়ার মাধ্যমে নির্বাচিত সরকার উৎখাতের ষড়যন্ত্র করেছিল। মূলত সরকারি দলের এমপি মন্ত্রীরা এমন কথা বলেছেন। সরকারি প্রশাসন থেকেও তাদের দাবীর সপক্ষে বক্তব্য পাওয়া যায়। সরকারের পুলিশ ও জনপ্রশাসন থেকে দাবী করা হচ্ছে যে, হেফাজতের লক্ষ্য ছিল ৬ মে বাংলাদেশ ব্যাংক লুট করা এবং সচিবালয়ের দখল নেওয়া। সরকারি প্রশাসনের এমন বক্তব্য দু’টি প্রশ্ন সামনে নিয়ে আসে। এক. এমনটি জানার পরও কেন হেফাজতে ইসলামীকে মতিঝিলের শাপলা চত্বরে সমাবেশ করার অনুমতি দেওয়া হলো? দুই. অনুমতি দেওয়ার পর তারা যাতে সমাবেশ স্থল থেকে বাইরে বেরোতে না পারে সেলক্ষ্যে কেন প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হলো না? পাশাপাশি হেফাজতে ইসলামীকে শাপলা চত্বরে সমাবেশ করার অনুমতি দেওয়ার ক্ষেত্রে সরকারের মোটিভেশন কি ছিল?

সংবাদ মাধ্যমে প্রচার করা হয়েছিল যে, আইন শৃঙ্খলা বজায় রাখতে ঢাকায় ৩০ প্লাটুন বিজিবি ডেপ্লয় বা নিয়োজিত করা হয়েছিল। এক প্লাটুনে ২৬ থেকে ৫৫ জন সেনা থাকে। লেফটেন্যান্ট পদমর্যাদার তাদের একজন কমান্ডার থাকে। তার আবার একজন সহকারী থাকেন। যিনি প্লাটুন সাজেন্ট। নন কমিশন্ড অফিসার। ঘটনার দিন প্রায় ১০ হাজার আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য ছিল হেফাজতের কর্মসূচিতে কোন ধরনের বিশৃঙ্খলা হলে ঠেকানোর জন্য। সেদিন রাতে যৌথ অভিযানে ১৮ প্লাটুন বিজিবি হেফাজতীদের ছত্রভঙ্গ করতে অংশ নিয়েছিল। সংখ্যাটি কিন্তু বিশাল। কতোটা বিশাল সেটা বোঝার জন্য বলা যেতে পারে ২০০১ সালে বিজিবির সেনারা এর চেয়ে অনেক কম সৈন্য নিয়ে ভারতীয় সীমান্ত রক্ষীদের ভারী অস্ত্রশস্ত্রের হামলা প্রতিহত করে তাদেরকে হটিয়ে দিয়েছিল। ঐতিহাসিক বড়াইবাড়ির যুদ্ধে ভারতীয় বাহিনীর হাতে ভারী মেশিনগান থেকে শুরু করে এলএমজি, এসএমজি ও আধুনিক অস্ত্রপাতি ছিল। অন্যদিকে, হেফাজতে ইসলামীর লোকদের কাছে ছিল লাঠি। আর ইটের টুকরো। লাঠি আর ইটের বিপক্ষে ১০ হাজার সশস্ত্র প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত যোদ্ধার অভিযান নিঃসন্দেহে বড় কিছু।

অনেকেই বলছেন, শাপলা চত্বরের মূল তিনটি প্রবেশ পথের মুখ শুধু নয় ১০ হাজার আইন শৃঙ্খলা বাহিনী সদস্য দিয়ে পুরো এলাকাই কর্ডন করে রাখা যেতো। যা করা হয়নি। অনেকেই প্রশ্ন তুলছেন ঘটনার দিন হেফাজতে ইসলামীর ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা জানার পরও কেন শাপলা চত্বরে সমাবেশ করার অনুমতি দেওয়া হলো এবং নগরে তান্ডব করার সুযোগ করে দেওয়া হলো? আবারো সেই মোটিভেশনের প্রশ্ন।

প্রশ্ন হলো সরকার কোন মোটিভেশন থেকে হেফাজতের ইসলামের জন্য তান্ডব করার সুযোগ করে দিলো? সরকার উৎখাতের ষড়যন্ত্র বাস্তবায়নের পথে তাদেরকে কিছুটা এগিয়ে যেতে দিল? তাহলে কি সরকার কোন বিশেষ উদ্দেশ্য নিয়ে হেফাজতীদের প্রলুদ্ধ করেছিল। আগুন দিয়ে কোরআন শরিফ পোড়ানোর বিষয়টিকে এ প্রসঙ্গে উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করতে চান অনেকে। তাদের যুক্তি হলো বাংলাদেশের বেশিরভাগ টেলিভিশন চ্যানেল কোরআন শরিফ পোড়ানোর বিয়ষটিকে হেফাজতের মূল অনুষ্ঠান প্রচারের চেয়ে বেশিবার প্রচার করেছে। হেফাজতের বিরুদ্ধে উস্কানিমূলক এই প্রচারণাকে অনেকেই সন্দেহের চোখে দেখেন। তারা প্রশ্ন রেখেছেন, হেফাজত কোন মোটিভেশন থেকে কোরআন শরিফ পুড়িয়েছে? এখানে এই লেখার প্রথম পর্বের সেই দোকানীর প্রশ্নটি চলে আসে। তার প্রশ্ন ছিল- ‘মাদ্রাসায় যারা পড়ে তারা তো কোরআন শরীফ পড়ে। সেই কোরআন শরীফ তারা কেন পুড়াইব?’ মোটিভেশনটা কি? সঙ্গত এই প্রশ্নের উত্তর কেউ খুঁজছে না। ভাবখানা এমন হেফাজতীরা পারে না এমন কিছু নেই। যেহেতু তারা গাও গেরাম থেকে আসা পায়জামা পাঞ্জাবী পরা মোল্লা মৌলবী তাদের পক্ষে সব কিছু করা সম্ভব। এমনকি যে কিতাব তাদের একমাত্র অবলম্বন সেটাও তারা নির্বিচারে পুড়িয়ে দিতে পারে। সমাজের শিক্ষিত মানুষের এই দৃষ্টিভঙ্গির অনলে হেফাজতে ইসলামীর বেশিরভাগ অসহায়, দরিদ্র ও অনেক এতিম শিশুকে ভস্মিভূত করতে সবাই যেন ব্যস্ত। যারা শুধু কোরআন হাদিস পড়ে তারা আবার মানুষ নাকি- এমন এক অবজ্ঞা যেন হেফাজতে ইসলামীর প্রতি। প্রশ্নটা সেখানেই। মাদ্রাসায় যারা কোরআন পড়ে তারা কেন কোরআন পোড়াবে?

চলবে……………

Advertisements

One thought on “হেফাজতের ঢাকা অভিযান এবং মোটিভেশন সমগ্র ২য় পর্ব

  1. ক’টা ব্যাপার লক্ষ করে অবাক লাগছে… শহুরে (আরবান) মানুষরা, বিশেষত যারা ইন্টারনেটে বিচরণ করে, তাদের ভেতরে …
    (ক) টুপি পরা, দাড়িসহ এইসব গরীব মানুষগুলোর প্রতি তাচ্ছিল্য (অথবা ঘৃণা),
    (খ) ভীতি (কাতর হয়ে ঢাকা গেল গেল, শহর রক্ষা করো, আমাদের রক্ষা কর, হে মহামান্য গবর্নমেন্ট সুরে কান্না), কিছুটা হীনমন্যতা (যেটি প্রথম পয়েন্টটিকে খানিকটা ব্যাখ্যা করে), এবং
    (গ) সরকারের হেফাজত পেটানোতে ব্যাপক উল্লাস প্রকাশ!
    অসুস্থ ব্যাপার!

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s