হেফাজতের ঢাকা অভিযান এবং মোটিভেশন সমগ্র শেষ পর্ব


গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় সরকার পরিবর্তনের একটিই ব্যবস্থা। ভোটের মাধ্যমে সরকার পরিবর্তন। ভোট ব্যতীত অন্য যেকোন পদ্ধতিতে সরকার হটানোর চেষ্টা অগ্রহণযোগ্য। এমনকি গণতান্ত্রিক সরকার যদি স্বৈরাচারও হয়, সেক্ষেত্রে সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলন বিক্ষোভ করার মাধ্যমে ভোটের ব্যবস্থা করতে হবে। কারণ গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় সরকার পরিবর্তনের অধিকার শুধুমাত্র জনগণের।

কোন দল বা ব্যক্তি যদি ভোট ছাড়া অন্য কোন উপায়ে সরকার উৎখাত করতে চায় তাহলে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় নির্বাচিত সরকারের দায়িত্ব হলো সরকার উৎখাতের সকল চেষ্টা ব্যর্থ করে দেওয়া। হেফাজতের ঢাকা অভিযানের বিরুদ্ধে যেহেতু অভিযোগ উঠেছে তারা নির্বাচিত আওয়ামী লীগ সরকারকে হটানোর জন্য মতিঝিল শাপলা চত্বরে সমবেত হয়েছিল তাই তাদেরকে হটিয়ে দেওয়ার কাজটি আওয়ামী লীগ সরকার ঠিকই করেছে। আওয়ামী লীগ সরকার হেফাজতের ঢাকা অভিযান সফলভাবে ব্যর্থ করে দিয়েছে। হেফাজতে ইসলাম এর নেতাকর্মীরা ঢাকা ছেড়ে ভেগেছে। এজন্য অবশ্য সরকারকে বল প্রয়োগ করতে হয়েছিল।

বল প্রয়োগের আগে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক হুশিয়ারি উচ্চারণ করেছিলেন। হেফাজতে ইসলাম এর নেতাকর্মীরা সেই হুশিয়ারি অগ্রাহ্য করেছিল। মোটিভেশনের প্রথম প্রশ্নটি আসে এখানেই। হেফাজতে ইসলামীর নেতাকর্মীরা কোন মোটিভেশন থেকে সেদিন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আশরাফুল ইসলামের হুশিয়ারি অগ্রাহ্য করেছিল?

আশরাফুল ইসলাম অত্যন্ত কঠোর ভাষায় বলেছিলেন, হেফাজতে ইসলামীকে ঢাকায় আসতে দেওয়া হয়েছে। েএখন যদি তারা চলে না যায় তাহলে ভবিষ্যতে তাদেরকে ঘর হতে বের হতে দেওয়া হবে না। তাদেরকে চলে যেতে বাধ্য করা হবে।

বিশ্লেষকদের মতে, হেফাজতে ইসলামের নেতাকর্মীরা তিন ধরনের হিসেব নিকেশ থেকে আশরাফুল ইসলামের কথা অগ্রাহ্য করতে মোটিভেটেড হয়েছিল।

১.  তারা ভেবেছিল চলে যেতে বাধ্য করার মতো সাহস আওয়ামী লীগ দেখাতে পারবে না। কারণ বাধ্য করতে হলে তাদের গায়ে হাত দিতে হবে। সেটা আওয়ামী লীগ করবে না। তাতে জনমনে যে তীব্র বিরূপ প্রতিক্রিয়া দেখা দিবে। সেই ঝুঁকি আওয়ামী লীগ নেবে না।

২. তারা অবরোধ চালিয়ে যাওয়ার ব্যাপারে বিএনপির কাছ থেকে সমর্থন পেয়েছিল।

৩. ইতোমধ্যে সিপিবি অফিসে দু’দুফায় হামলা, হাউজ বিল্ডিংয়ে গাড়ি পোড়ানো, আওয়ামী লীগ অফিসে হামলার চেষ্টা এবং বায়তুল মোকাররমের দোকানপাটে হামলাসহ ব্যাপক তান্ডবের  সঙ্গে তারা জড়িয়ে পড়ে। এই অবস্থায় তারা চলে যেতে িচাইলেও তাদেরকে হয়তো ছাড়া হবে না। ব্যাপকভাবে গ্রেফতার করা হতে পারে।

তাদের এই ধরনের হিসেব নিকেশ যে ভুল ছিল সেটা রাত পোহানোর আগেই সকলে জেনে যায়। আওয়ামী লীগ হেফাজতীদের ঢাকা শহর থেকে বের করে দেওয়ার লক্ষ্যে প্রথমে মতিঝিল এলাকা পুরো অন্ধকারে ডুবিয়ে দেয়। অনেকে এই ধরনের পদক্ষেপকে একাত্তর সালের অপারেশন সার্চলাইটের সঙ্গে তুলনা করছেন। তারপর হাটখোলার দিক খোলা রেখে দু’দিক থেকে ১০ হাজার সদস্য নিয়ে সাড়াশি আক্রমণ চালিয়ে তাদেরকে ছত্রভঙ্গ করে দেয়। ওইদিন বিভিন্ন টেলিভিশন চ্যানেলে আরো প্রচার করা হয়ে যে, যৌথ বাহিনীর অভিযান শুরুর মাত্র ১০ মিনিটের মধ্যে পুরো শাপলা চত্বর খালি হয়ে যায়।

আলো নিভিয়ে  রাতের অন্ধকারে দশ হাজার পুলিশ-র‌্যাব-বিজিবি সদস্যের এই অভিযানের মোটিভেশন নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। সরকার থেকে দাবী করা হয়েছে যৌথ অভিযানে প্রাণঘাতি কোন অস্ত্র ব্যবহার করা হয়নি। ব্যবহার করা হয়েছে সাউন্ড গ্রেনেড, রাবার বুলেট, লাঠি, টিয়ার শেল ইত্যাদি। সেদিন যারা টেলিভিশনে রাতের এই অভিযান দেখেছেন তারা রাবার বুলেট ছোড়ার মুহুমুহু শব্দ শুনেছেন। কেউ কেউ বলছেন, ওই রাতে কমপক্ষে ৫০ হাজার গোলাবারুদ ফুটানো হয়েছিল হেফাজতীদের ছত্রভঙ্গ করার জন্য। আজকের যুগান্তর পত্রিকার লিড নিউজে অবশ্য বলা হয়েছে যে, এই অভিযানে ৮০ হাজার টিয়ার শেল এবং ৬০ হাজার রাবার বুলেট ব্যবহার করা হয়েছে। যৌথ বাহিনীর সাড়াশি অভিযানের কৌশল কাজে লেগেছিল। লাঠি সোটা নিয়ে ব্যাংক লুট ও সচিবালয় দখল করতে আসা কয়েক লাখ হেফাজত কর্মী ও নেতারা মাত্র ১০ মিনিটে এলাকা ছেড়ে ভেগেছে।

ওই রাতে মোটামুটি পাঁচটি চ্যানেলে যৌথ বাহিনীর অভিযানের দৃশ্য দেখানো হচ্ছিল। সময় টেলিভিশন, ইন্ডিপেন্ডেন্ট টিভি, চ্যানেল ২৪, দিগন্ত টিভি, ইসলামিক টেলিভিশন কাভার করছিল। এর মধ্যে দিগন্ত ও ইসলামিক টেলিভিশন বরাবরের মতো হেফাজতের কাভারেজ বেশি দিচ্ছিল। বাকি টেলিভিশন চ্যানেলগুলো মূলত স্ক্রল দেখিয়ে তাদের দায়িত্ব সারছিল। কারণ হেফাজতের প্রোগ্রাম কাভারেজে সন্ধ্যা থেকেই শাপলা চত্বরে তাদের উপস্থিতি ছিল ন্যূণতম। অন্যদিকে দিগন্ত ও ইসলামিক টেলিভিশনের প্রস্তুতি ছিল ব্যাপক। বাংলাদেশের বাকি টিভি চ্যানেলগুলো মূলত হেফাজতের কোরআন পুড়ানোর বিষয়টিকেই কাভারেজ দিচ্ছিলো। অনুষ্ঠানের নিচে ব্রেকিং নিউজ হিসেবে স্ক্রল করে তারা যৌথ বাহিনীর অভিযানের সংবাদের পাশাপাশি কোরআন শরিফ পুড়ানোর খবর দেখাচ্ছিল। আমি তখন কক্সবাজারে। হোটেল মিশুকের ২২৫ নাম্বার রুমে বসে বারবার চ্যানেল বদলিয়ে দেখা ও বোঝার চেষ্টা করছিলাম ঢাকায় কি হচ্ছে। পরেরদিন কাজ থাকায় রাত ৪টা ৫ মিনিটে আমি ঘুমিয়ে পড়ি।

পরেরদিন সকালে আমি জানতে পারি যে, দিগন্ত ও ইসলামিক টেলিভিশন সরকার বন্ধ করে দিয়েছে। সরকারের এই পদক্ষেপ জনমনে গুজবের জন্ম দেয়। প্রশ্ন হতে পারে, সরকার কোন মোটিভেশন থেকে গুজব বিস্তারের সুযোগ তৈরি করে দিল?  সরকার কেন তাদের উপর অর্পিত জনগণের জানমালের নিরাপত্তা বিধানের দায়িত্ব সফলভাবে শেষ করার বিষয়টি নিয়ে বিতর্ক করার সুযোগ করে দিল? দু’টি টেলিভিশন চ্যানেল বন্ধ করে দেওয়ায় এবং তাদের যন্ত্রপাতি জব্দ করায় দেশের সাধারণ মানুষ বিভ্রান্ত হয়ে পড়ে। তারা দ্রুতই গুজবে বিশ্বাস করতে শুরু করে। বাংলাদেশের মানুষের একটি সহজাত প্রবণতা হলো সরকারকে অবিশ্বাস করা। এই প্রবণতা আমরা অতীতে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সরকারের শাসনামলে দেখেছি, জিয়াউর রহমান এবং এরশাদের শাসনামলে দেখেছি, পরবর্তীতে খালেদা জিয়া ও শেখ হাসিনার প্রতিটি শাসনামলে দেখেছি।  আমি প্রথম পর্বের লেখায় বলেছি কক্সবাজারের একজন সাধারণ দোকানীও সরকারের বক্তব্য বিশ্বাস করতে পারছে না। কারণ, ছেলেটি যে গ্রামে বড় হয়েছে। যাদের সঙ্গে বড় হয়েছে তাদেরকে সে সরকারের চেয়ে বেশি বিশ্বাস করছে। ফলে সে দৃঢ় গলায় বলতে পেরেছে, ‘আমার গ্রামের মানুষ এই কাজ করতে পারে না।’

এখন সরকারের দায়িত্ব হলো জনমনের সংশয় নিরসন করা। গণতান্ত্রিক সরকার হিসেবে এই দায়িত্ব পালনে যদি আওয়ামী লীগ কার্পন্য করে তবে জনগণ পরবর্তী নির্বাচনে সেটা পুষিয়ে দেবে তাদের সকল সিট কেড়ে নিয়ে।

Advertisements

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s