দুর্নীতির বেড়াজাল থেকে উদ্ধার পাওয়ার ‘স্পেসটা কোথায়?’


এক.

প্রশ্নটা আমার জন্য সহজ ছিলো না। গতকালের কথা। দেশ নিয়ে আলোচনা হচ্ছে। নির্বাচন নিয়ে কথা হচ্ছে। আমার কাছে একজন জানতে চাইলেন, ‘স্পেসটা কোথায়?’ প্রশ্নটা করার আগে অবশ্য তিনি একজন নির্বাচিত নেতার কাহিনী বললেন।

কাহিনীটি সংক্ষেপে এমন- ওই নির্বাচিত জন প্রতিনিধি এলাকার জনগণের কাছে খুবই প্রিয়। কারণ তিনি আওয়ামী লীগ, বিএনপি, জাতীয় পার্টি, জামায়াত নির্বিশেষে তার এলাকার মানুষের পাশে দাঁড়ান। অর্থ দিয়ে, চাকরির সুপারিশ করে এমনকি চাকরির জন্য ঘুষের টাকা জোগান দিয়ে, চিকিৎসার বন্দোবস্ত করে, পড়ালেখার খরচ চালিয়ে তিনি এলাকার মানুষের মন জয় করেছেন। তার কাছে গিয়ে সাহায্য না পেয়ে ফিরে গেছে এমন কাউকে পাওয়া যাবে না। দলমত নির্বিশেষে তার জয় জয়কার। তিনি যে মানুষদের সেবা করেন তাদের কাছে তিনি মহান ব্যক্তি। তবে ওই এলাকার কিছু মানুষের কাছে তিনি দুর্নীতির ডিপো হিসেবে পরিচিত। বিশেষ করে আর্থিক দুর্নীতিতে তার পারদর্শিতার খবরগুলোতে তারা ক্ষুব্ধ। তাতে অবশ্য জনপ্রতিনিধির কিছুই আসে যায় না। এলাকার বেশিরভাগ মানুষও তার দুর্নীতি নিয়ে মোটেই চিন্তিত নন। তারা তাদের প্রয়োজনের সময় সাহায্য পান সেটাই তাদের কাছে বড় কথা। নেতার কথাও হলো আমি তো আর নিজের জন্য কামাই করছি না। জনগণের জন্যই তো করছি। আর কামাই করার জন্যই তার ক্ষমতায় থাকা দরকার। যেহেতু জনগণ তার কাছ থেকে উপকৃত হয়। ফলে, প্রতিবার জনগণ তাকে ভোটও দেয়। বেশ কয়েকবারই তিনি নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি হয়েছেন।

প্রশ্নটি হলো স্পেস কোথায়? যেখান থেকে এইরকম একটা লোকের বিরুদ্ধে একজন সৎ ও সাহসী মানুষ ভোটে জিততে পারবে? প্রশ্নকারী মনে করেন সারা দেশে যেভাবে দুর্নীতি বিস্তার লাভ করেছে তাতে ভালো কিছু করার স্পেস হারিয়ে গেছে। অন্তত তিনি দেখতে পাচ্ছেন না।

আমি তার প্রশ্নের জবাবে কি বলেছি সে প্রসঙ্গে পরে আসছি। তার আগে আরো কিছু পরিস্থিতি জানা যাক।

দুই.

কয়েকদিন আগের কথা। এক ব্যবসায়ীর অফিসে বসে কথা হচ্ছিল। সেখানে আমি ছাড়াও আরেকজন ব্যবসায়ী ছিল। প্রথম ব্যবসায়ী জানাল যে গত প্রায় ২০ বছরের ব্যবসার অভিজ্ঞতা থেকে তিনি দেখেছেন যে, বড় বড় অফিসাররা কখনো চেয়ে ঘুষ নেয় না। তাদেরকে বিবেচনামতো অর্থকড়ি দিয়ে এলেই হলো। এমনকি তারা খাম খুলেও দেখেন না। কিন্তু ইদানীং কালে তিনি এমন এক উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাকে পেয়েছেন যে কিনা কতো ঘুষ দিতে হবে নিজেই বলে দেয়।

উপস্থিত অন্য ব্যবসায়ী বলল, তার অভিজ্ঞতা ভিন্ন। সে যাদেরকে ঘুষ দেয় তারা সবাই বলে কয়েই নেয়। সে আরো জানাল যে, শুধু সরকারি কর্মকর্তারা নয় বেসরকারি কর্মকর্তা এমনকি বিদেশী বায়িং হাউজের বিদেশীরা পর্যন্ত ডলার ইউরোতে ঘুষ নেয়। এবং সেটা বলে কয়ে নেয়।

ঘুষ কি শুধু নগদ অর্থেই দিতে হয়? আমার এই প্রশ্নের উত্তরে সেদিন অনেক কিছু ওই দুই ব্যবসায়ী বলেছিল। যার কিছু কিছু আমার কাছে নতুন তথ্য। যেমন, একজন ব্যবসায়ী বলল যে তিনি প্রতিমাসে দেশের কয়েকজন উচ্চ পদস্থ কর্মকর্তার সন্তানদের স্কুল, েকলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিস পরিশোধ করেন। অর্থাৎ ওই কর্মকর্তাদের ছেলেমেয়েদের লেখাপড়ার খরচ তিনিই চালান।

জানা গেল, উচ্চ পদস্থ কর্মকর্তাদের স্ত্রীদের বিদেশ ভ্রমণ এবং শপিংয়ের খরচ দিতে হয়। সেখানেই শেষ নয়। অনেক কর্মকর্তা অবসরে যাওয়ার পরও অন্তত বছর খানেক তাদের সেই সব খরচ চালাতে হয়। আলোচনার এই পর্যায়ে একটি ফোন এলো। ফোনে কথা বলা শেষে ব্যবসায়ী বললেন, এই যে দেখেন এইমাত্র যে ফোন দিল সে একজন অবসরপ্রাপ্ত উচ্চ পদস্থ সরকারি কর্মকর্তা। দু’দিন আগে অফিসে এসে একটি গাড়ি দেওয়ার জন্য বলল। কারণ এখন চাকরিতে নেই। সরকারি গাড়ির সুবিধাও নেই। এদিকে বৌ বাচ্চা নিয়ে ময়মনসিংহ যেতে হবে। যাই হোক রেন্ট এ কার থেকে গাড়ি দিলাম। আজকে ফিরে আসার কথা কিন্তু এখন ফোন করে বলল আজকে ফিরতে পারবে না। কালকে ফিরবে। সেও জানে কালকে হরতাল ফলে কালকে ফিরতে পারবে না। এই তো চলছে।

আমি ভদ্রলোকের পরিচয় জানলাম। তিনি যদি প্রশাসনে চাকরি করতেন তাহলে অতিরিক্ত সচিব পর্যায়ে থাকতেন। শুনে আমার একটু খারাপই লাগল। বললাম, এই ভদ্রলোক তো বাসে কিংবা ট্রেনেও যেতে পারতেন। তাতে তো তার মানসম্মানও রক্ষা পেতো।

মানসম্মানের কথাটা দুই ব্যবসায়ীকে বোধহয় আমোদিত করেছিল!

তিন.

অনেক বছর আগের কথা। পিডিবির এক্সিকিউটিভ ইঞ্জিনিয়ার পদে থাকাকালীন চাকরি ছেড়ে দিয়ে বের হয়ে আসা এক ব্যবসায়ীর সঙ্গী হয়েছিলাম। ঢাকা থেকে টাঙ্গাইল সখিপুরে যাতায়াতের পথে তার সঙ্গে নানান বিষয়ে কথা হয়েছিল। সেই কথার মধ্যে দুর্নীতি বিষয়ক কথাবার্তাও ছিল। যতোদূর মনে পড়ে তার সঙ্গে কথা হচ্ছিল ১৯৯৩ সালের দিকে। ২০ বছর আগে। দুর্নীতি গত ২০ বছরে অনেক মাত্রা লাভ করেছে। বিস্তারের দিক থেকেও সর্বগ্রাসী হয়েছে। বলা যায় আমাদের গণতন্ত্রের উপহার হিসেবে দুর্নীতিও গণতান্ত্রিক হয়েছে। যাই হোক। ২০ বছর আগের সেই ব্যবসায়িক ভদ্রলোকের প্রসঙ্গ আনছি কারণ তিনি বলেছিলেন, মানুষ মাত্রই দুর্নীতিপ্রবণ। কিন্তু সেটা সবসময় প্রকাশ পায় না। কেউ কেউ ‍দুর্নীতি প্রবণতাকে ঢেকে রাখে। কেউ আবার উপযুক্ত মূল্য না পাওয়া পর্যন্ত দুর্নীতিতে জড়ায় না।

আমি সেদিন তার সঙ্গে একমত হতে পারিনি। আজো একমত নই। কিন্তু গত ২০ বছরে আমাকে দুর্নীতির যে গল্প বিভিন্ন সামাজিক অনুষ্ঠানে, আড্ডাতে, আলোচনা, সভা, সমাবেশে শুনতে হয়েছে তাতে একথা ঠিক যে দুর্নীতি আসলেই সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে ঢুকে গেছে। কিন্তু কেন?

চার.

দুর্নীতির এই সর্বগ্রাসী রূপলাভের একটি কারণ আমি মনে করি ন্যায় বিচারের অভাব। কেউ কেউ বিচার ব্যবস্থার দুর্নীতিগ্রস্ত হওয়ার উদাহরণ দিয়ে থাকেন। তারা শুরুটা করেন ইউনিয়ন পর্যায়ের সালিশ ব্যবস্থা দিয়ে। বিকল্প বিরোধ নিরসন আমাদের দেশের একটি প্রাচীণ ব্যবস্থা। এই দেশের আদালতে বিচার প্রার্থী হতে হলে যে পরিমাণ আর্থিক সামর্থ্য থাকতে হয় সেটা অধিকাংশের এখনো নেই। তার উপর মামলার দীর্ঘসূত্রিতা ও মামলার জট তো আছেই। ফলে, মানুষ তাদের বিরোধ মেটাতে এলাকার গণ্যমান্য ব্যক্তিদের শরনাপন্ন হন। ইউনিয়ন পরিষদের সালিশ ব্যবস্থা আইনসঙ্গতও বটে। তবে, বাস্তবে দেখা যায় এই ধরনের বিরোধ নিষ্পত্তিতে গত দুই দশকে ক্ষমতাসীন দলের নেতাদের আধিপত্য থাকায় প্রকৃত সালিশ কিংবা বিরোধ নিষ্পত্তি আর হয় না। মূলত বাদী ও বিবাদীর কাছ থেকে টাকা পয়সা আদায় করে সালিশকারীরা নিজেদের মধ্যে ভাগ বাটোয়ারা করে থাকেন। আমি কখনো কখনো নিজের আগ্রহের জায়গা থেকে বিষয়টির আর্থিক মূল্য বোঝার চেষ্টা করেছি। যেহেতু আমি দেশের প্রায় ৩০০ ইউনিয়নে কাজের সুযোগ পেয়েছি। সেই সুবাদে আমার একটা অনুমান হলো এই দেশের ইউনিয়নগুলোতে সালিশের মাধ্যমে বছরে গড়ে ৫ কোটি টাকা করে অন্তত ২২ হাজার কোটি টাকা সালিশকারীদের পকেটে যায়। এবং টাকা দিয়ে সালিশের রায় কেনাবেচা হয়। রায় কেনাবেচার রশিটা সম্ভবত অনেক লম্বা।

ফলে, দুর্নীতি থেকে আমাদের নিস্তার ঘটছে না। আমি বিশ্বাস করি দেশের দুর্নীতি ম্যাজিকের মতো দূর করে ফেলা যায়। সেই জাদুর কাঠি কি সেটা পরে বলছি।

চলবে……………

Advertisements

One thought on “দুর্নীতির বেড়াজাল থেকে উদ্ধার পাওয়ার ‘স্পেসটা কোথায়?’

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s