শেষ বিকেলের গল্প


অকর্মণ্য লোকদের অফিস আওয়ার শেষেও অফিস করতে হয়। তেমনই একটা দিন আজ! সজল ফোন দিল গোপালগঞ্জ থেকে। জানতে চাইল, আমি অফিসে কিনা? অফিসে আছি শুনে বলল, অফিসের নিচে কুরিয়ার সার্ভিস থেকে বই নিয়ে লোক এসেছে। তার কাছ থেকে বই নিয়ে ১১৪০ টাকা দিতে হবে। আমার কাছে সাড়ে এগারোশ টাকা হবে কিনা? সজলের প্রশ্ন। আমি হবে বললাম। আর অফিস অ্যাসিট্যান্ট আকাশকে বললাম নিচের লোকটাকে উপরে পাঠানোর জন্য বলতে। সজল বলল, দরকার নেই ইন্টারকম ব্যবহারের। কারণ সেই কুরিয়ার সার্ভিসের লোককে উপরে আসতে বলে দিচ্ছে।

ছেলেটা উপরে এলো। আমি দরজা খোলার শব্দ শুনলাম। রুমের দরজায় তাকিয়ে আছি। দেখি বই হাতে আকাশ ঢুকছে। বললাম, কুরিয়ারের লোককে ভেতরে পাঠাও। ছেলেটা ঢুকল। কত হবে বয়স? ১৮ নাকি ২০? আকাশের বয়সী। হাতে একটা ব্যাগ। পাঞ্জাবী পায়জামা পরা। মাথায় টুপি। বসতে বললাম। ছেলেটাকে অনেক ক্লান্ত মনে হলো। আকাশকে পানি, চা আর বিস্কুট দিতে বললাম। ছেলেটার তেষ্টা পেয়েছিল। কিংবা এমনিতেই পানিটা খেলো। তারপর বিস্কুট এবং চা। আমি কাগজে স্বাক্ষর করে টাকা বের করে রাখলাম। অপেক্ষা করছি তার চা শেষ হওয়ার।

মনে হলো কথা বলি, জিজ্ঞাসা করলাম কুরিয়ারে কাজ করেন?

‘জি, সোনার তরী।’

মাথায় হঠাৎ করে অনেক প্রশ্ন ভিড় করল। ব্যক্তিগত প্রশ্ন করার অনুমতি চাইলাম। মনে হলো এটা তার জন্য নতুন অভিজ্ঞতা। প্রথমে নাম জানতে চাইলাম। তারপর বাড়ি কোথায়। পরের প্রশ্ন ছিল, েঢাকায় কবে এসেছেন?

‘দেড় বছর হলো।’

‘থাকেন কোথায়?’

‘কমলাপুর।’

‘মেসে?’

‘জ্বি’।

‘মেস ভাড়া কতো?’

‘৭০০ টাকা।’

‘আর খাওয়া?’

‘খাওয়ার খরচ মাসে ১৪০০ থেকে ১৫০০ টাকা হয়। ঠিক নাই। বাজারে জিনিসপত্রের দামের উপর কমে বাড়ে।’

‘তাহলে মাসে খরচ হয় প্রায় ২,৫০০ টাকা।’

‘জ্বি’।

‘আপত্তি না থাকলে বলবেন কি আপনি কতো বেতন পান?’

‘৫,০০০ টাকা।’

‘লেখাপড়া করেছেন কোথায়?’

‘গ্রামের বাড়িতে।’

‘কোন ক্লাস পর্যন্ত পড়েছেন?’

‘ক্লাস ফাইভ পর্যন্ত।’

‘তারপর আর পড়েননি কেন?’

‘অর্থের অভাবে।’

‘আপনারা কয় ভাইবোন?’

‘সাত ভাইবোন।’

‘আপনি সবার বড়?’

‘জ্বি না। দ্বিতীয়।’

‘বড় ভাই কি করেন?’

‘এলাকায় টেইলারের কাজ করেন।’

‘আপনাকে কি বাড়িতে টাকা পয়সা পাঠাতে হয়?’

‘জ্বি।’

‘বাবা আছেন?’

‘জ্বি। আল্লাহর ইচ্ছায় সুস্থ আছেন।’

‘তিনি কি করেন?’

‘গ্রামে কৃষি কাজ করেন।’

‘আমি কি আপনাকে দেরি করিয়ে দিচ্ছি?’

‘জ্বি!’

‘আচ্ছা, িএই যে বই নিয়ে এলেন এজন্য কি অফিস আপনাকে যাতায়াত ভাড়া দেবে?’

‘এটার জন্য ভাড়া পাব না। কারণ আমি এখানে এসেছি এক্সিম ব্যাংক থেকে ডেলিভারি নিতে। এই ফাঁকে বই পৌঁছে দিলাম।’

‘আপনি এখন ব্যাংকে যাবেন?’

‘জ্বি।’

‘তাহলে আপনাকে আর দেরি করাই না। ভালো থাকবেন। আপনার সঙ্গে কথা বলে ভালো লাগল।’

 

রাষ্ট্র এই দেশের আগামী প্রজন্মের জন্য কি করতে পারছে? কি করছে? এই ছেলের লেখাপড়ার দায়িত্ব কার ছিল? এই ছেলে বিয়ে করবে। তার সন্তান হবে। সেই সন্তানের লেখাপড়া করানোর দায়িত্ব কে নেবে? সেও কি তারই মতো অভাবের কারণে স্কুলে যেতে পারবে না। তারপর? চাকা কি এভাবেই ঘুরবে?

Advertisements

2 thoughts on “শেষ বিকেলের গল্প

  1. আমার কাজের অংশ হিসেবে আমি প্রতিদিন যেসব ব্লু কলার/ ছোট খাটো এনজিও কর্মী/গ্রামে গঞ্জে স্কুল/মাদ্রাসায় শিক্ষকতার চাকুরির বিজ্ঞাপন বিভিন্ন সোর্স থেকে সংগ্রহ করে আমাদের ওয়েব সাইটে প্রকাশ করি, তার কোনটিইতেই বেতন দশ হাজার টাকাও উল্লেখ থাকে না। উদাহরণ দিই। আজকেই সাইটে আপলোড হলো।

    দারুল হিকমাহ্ (ইন্টারন্যাশনাল) ক্যাডেট মাদ্রাসা, বগুড়া
    পদ: ভাইস প্রিন্সিপাল
    শিক্ষাগত যোগ্যতা: ২য় শ্রেণীর কামিল/মাস্টার্স (ই.বি) ডিগ্রী।
    বেতন: ৭,০০০/- টাকা।

    লক্ষ্য করুন, এই পদে কেউ না কেউ কাজ করবেন। তিনি কমপক্ষে দ্বিতীয় শ্রেণীর কামিল ডিগ্রী/ ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় হতে মাস্টার্স ডিগ্রী অর্জন করেছেন। এই শিক্ষাগত যোগ্যতা অর্জনের পর তিনি বেতন পাবেন ৭,০০০/- টাকা।

    বর্তমান বাজার মূল্যে এই টাকা দিয়ে তিনি কিভাবে তার সংসারের খরচ বহন করবেন? তিনি বিয়ে করবেন কিভাবে? তার বিবাহিত জীবনের সংসার চলবে কিভাবে? উল্লেখ্য এই সার্কুলারে এটাই ছিল সর্বোচ্চ বেতনের পদ।

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s