আমরা যখন গরিব ছিলাম


আমরা যখন গরিব ছিলাম আমাদের মধ্যে অনেক ভালোবাসা ছিল। এই বছর শুনছি বাজেটের আকার ২ লাখ কোটি টাকা ছাড়াবে। আমরা অনেক বড় লোক হয়েছি। আমাদের মধ্যে ভালোবাসা কমেছে।

পশ্চিম রাজাবাজারের প্রথম চার তলা দালানটি সম্ভবত কুহু কানন। আশ পাশের বেশিরভাগ দালানই তখন একতলা দেড়তলা। রাজাবাজারে তখন টিনের ঘরও আছে। তারও আগে রাজাবাজারে ছাপড়ার ঘরও ছিল। পশ্চিম রাজাবাজারের মসজিদ তখন সাদামাটা একটা বেড়ার ঘর। সেই মসজিদ দেখার জন্য এখন মাথা উচুঁ করে তাকাতে হয়। কুহু কানন তার শীর্ষ অবস্থান হারিয়েছে আরো অনেক বছর আগে। পশ্চিম রাজাবাজার, পূর্ব রাজাবাজার, ইন্দিরা রোড মিলিয়ে এখন শত শত নয় দশ তলা এপার্টমেন্ট বিল্ডিং। লাখ লাখ মানুষ। হাজার হাজার গাড়ি। ধনী লোকদের বসবাস। তাদের অনেক ব্যস্ততা। সবই বেড়েছে কমেছে শুধু নিজেদের মধ্যে যোগাযোগ আর ভালোবাসা।

রাস্তায় বের হলে ছোটবেলায় সবাই পরিচিত ছিল। বড়দের সালাম দিতাম। তারা কুশল জানতে চাইতেন। বাসার খোঁজ খবর নিতেন। ছোটদের সঙ্গে দেখা হতো। ওরা শ্রদ্ধা ভরে কথা বলত। আমরা যেমন বড়দের সঙ্গে ব্যবহার করতাম। ছোটদের কাছ থেকে সেটাই পাইতাম। বড়রা যেমন আমাদের আদর করতেন আমরাও ছোটদের সেই আদরটা দিয়ে নিজেদের অবস্থান ঠিক রাখতাম! ভেতর থেকেই ব্যাপারগুলো ঘটত। সমবয়সীদের মধ্যে ঝগড়া হতো কিন্তু সেটা বেশিক্ষণ স্থায়ী হতো না। পুরো পাড়াটাই যেন একটা পরিবার ছিল।কারেন্ট চলে যাওয়ার পর চাঁদের আলোয় টিলো এক্সপ্রেস খেলা কিংবা টেনিস বল দিয়ে বোম্বাস্টিং খেলা চলত। মায়েরা রাস্তায় হেঁটে বেড়াতেন। গল্প করতেন। এখন যেমন সবার সন্তানকে ক্লাসে প্রথম হতে হবে বলে বাড়ির ছেলেমেয়েদের রাতদিন পড়ো আর পড়ো বলা হয় তখন সেটা ছিল না। অনেক বেশি স্বাধীনতা ছিল। এটা সেটা আমাকে পেতেই হবে সেই লোভ তখনও মানুষের মনে চেপে বসেনি। মানুষ তখন অনেক বেশি নির্ভার ছিল।

সেই সময়ে জৈষ্ঠ্য মাসে আম খেতে গিয়ে আমাদেরকে ফরমালিন নিয়ে  দুর্ভাবনা করতে হয়নি। এতো হাসপাতাল ছিল না। এতো রোগীও ছিল না। আনন্দ সিনেমা হলের কাছে ইসলামিয়া ফার্মেসি, পূর্ব রাজাবাজারে হক ফার্মেসী কিংবা ইন্দিরা রোডে বিনিময় স্টুডিওর পাশে আরেকটি ফার্মেসি ছিল। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে মানুষ ফার্মেসিতেই ডাক্তার দেখাতো। ডাক্তাররা অনেক সময় নিয়ে আন্তরিকতার সঙ্গে রোগী দেখতেন। ডাক্তারের চেম্বার থেকে বের হওয়ার পর রোগীর মন প্রফুল্ল থাকত। এখন ডাক্তারের চেম্বার থেকে বেশিরভাগ রোগী অসন্তুষ্ট মন নিয়ে বের হন। ডাক্তাররা তখন গরিব ছিল। রোগীরাও গরিব ছিল। কিন্তু তাদের মধ্যে ভালোবাসা ও আন্তরিকতা ছিল। িএখন অনেক বড় বড় হাসপাতাল হয়েছে। সেই সব হাসপাতালের আন্তরিকতা কেমন সেটা টেলিভিশনে বিজ্ঞাপন দিয়ে বলতে হয়। মানুষকে জানাতে হয় যে, তারা আন্তরিক। ডাক্তারের কাছে যাওয়ার আগে ৮০০ টাকা দিয়ে কার্ড বানাতে হয়। কষ্টে উপার্জিত পয়সা দিয়ে কেনা ভেজাল খাদ্য খেয়ে ক্যান্সার আক্রান্ত হওয়ার পর ৩০০০ টাকা ফিস দিয়ে ক্যান্সার বিশেষজ্ঞ ডাক্তারকে দেখাতে হয় এই শহরে। মানুষ যেন সব অমানুষ হয়ে যাচ্ছে।

আমরা যখন গরিব ছিলাম তখন আমাদের মধ্যে মানবিক গুণাবলী অনেক বেশি ছিল। আমরা ধনী হয়েছি আর হারিয়েছি আমাদের মধ্যেকার মানবিক গুণাবলী। মানুষের পাশে দাঁড়ানোটা আমাদের ভেতরের গুণাবলী ছিল। যেসময়ে আমরা গরিব ছিলাম। এখন আমরা টেলিভিশনের ক্যামেরা না দেখলে মানুষের পাশে দাঁড়াতে চাই না। প্রচারসর্বস্ব হয়ে পড়ছি আমরা। আমরা যা যা বিসর্জন দিয়ে ধনী হচ্ছি, তাতে মাঝে মাঝে মনে হয় গরিব থাকাই ভালো ছিল।

Advertisements

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s