‘আওয়ামী লীগকে বিদায় করতে জনগণ মুখিয়ে আছে’


কথাটা প্রথমে ঠিক বুঝতে পারিনি। কারণ কথাটা যিনি বললেন তিনি ঘোরতর আওয়ামী লীগার। তার বলা কথাটা পরিস্কার করলেন দ্বিতীয়জন। দ্বিতীয়জনও আওয়ামী লীগের একনিষ্ঠ ভক্ত। তার চাচা ৭৩ সালের নির্বাচিত এমপি ছিলেন। পরিবারের সবাই আওয়ামী লীগের রাজনীতির সমর্থক। তিনি বললেন, ‘জনগণ আসলে পরিবর্তন দেখতে চায়।’

‘গত ২০ বছর ধরে তো পরিবর্তন দেখল জনগণ। তাতে কি আসলে জনগণের কোন পরিবর্তন হয়েছে?’- আমি জিজ্ঞাসা করলাম।

‘জনগণের সামনে আসলে তো কোন অপশন নেই। তারা এবার ভেবেছিল আওয়ামী লীগ তাদের জন্য রাজনীতি করবে। কিন্তু দেখা গেলো আওয়ামী লীগ ১৯৯৬ সালে যা করেছে এবারও তাই করল। ফলে জনগণ এখন আর আওয়ামী লীগকে ক্ষমতায় দেখতে চায় না।’

‘তারমানে কি জনগণ এখন বিএনপিকে ক্ষমতায় দেখতে চায়?’

‘জনগণ সত্যি বলতে কি বিএনপি-কেও দেখতে চায় না। জনগণ চায় পরিবর্তন। কারণ জনগণ বুঝে গেছে এখন যারা ক্ষমতায় আছে তারা যদি আরো বেশিদিন ক্ষমতায় থাকে তারা একেকজন স্বৈরাচার হবে। পুরো দলটাই স্বৈরাচারী দলে পরিণত হবে।’

‘সেটা তো বিএনপি-র জন্যও সত্যি?’

‘বিএনপি ক্ষমতায় এলে নতুন করে দুর্নীতি শুরু করতে হবে। শুরু করার জন্য প্রথমে আওয়ামী লীগের দুর্নীতিবাজদের দূর করতে হবে। তারপর প্রশাসন সাফ করতে হবে। তারপর নতুন করে নিজেদের লোকদের জায়গা মতো বসাতে হবে। তারপর দুর্নীতি শুরু করতে হবে। ফলে প্রথম বছর দেড়েক চলে যাবে সাফ সুতরো করতে। আর শেষ বছরে দুর্নীতি করার সুযোগ কম থাকায় সবমিলিয়ে আড়াই বছরের মতো দুর্নীতি করার সুযোগ পাবে বিএনপি। অন্যদিকে আওয়ামী লীগ যদি আবারো ক্ষমতায় আসে তাহলে তারা যে দুর্নীতির বিশাল ক্ষেত্র তৈরি করেছে সেটাকে সম্প্রসারণ করবে যা তুলনামূলকভাবে সহজ। কিন্তু সেটা দেশ ও দেশের জনগণের জন্য বেশি ক্ষতিকর। কারণ আওয়ামী লীগ ইতোমধ্যে শেয়ার বাজার ও ব্যাংক ব্যবস্থা ধ্বংস করেছে। বাজার সিন্ডিকেট তৈরি করে জিনিসপত্রের দাম নিয়ন্ত্রণ করার মাধ্যমে জনগণকে কম মূল্যের পণ্য বেশি দামে কিনতে বাধ্য করছে। দলীয় ব্যবসায়ীদের টাকা পয়সা পাইয়ে দিতে যা যা করা দরকার সব কিছু করছে। ভবিষ্যতে তারা দেশটাকে দেউলিয়া করে দিতে পারে।’ লম্বা ব্যাখ্যা দিলেন  প্রথমজন।

‘তাহলে জনগণের কাজটা কি হবে?’ জানতে চাইলাম।

‘বাংলাদেশের জনগণ আসলে স্যান্ডউইচ হয়ে আছে। তাদের তেমন কিছু করার নেই। সেকারণে যাদের সামর্থ্য আছে তারা দেশ ছেড়ে চলে যাচ্ছে।’

‘সেতো মন্ত্রী এমপিরাও দেশ ছেড়ে চলে যাচ্ছে। তাদের বেশিরভাগের পরিবার তো বিদেশেই থাকে। প্রধানমন্ত্রীর সন্তানেরাও তো বিদেশী পাসপোর্টধারী। বিদেশের নাগরিক।’ দ্বিতীয়জন বলতে গেলেন। তাকে থামিয়ে দিয়ে প্রথমজন বললেন, ‘আমার কথাটা তো আগে শেষ করি।’

‘মানুষ কেন একটি রাষ্ট্রে বাস করতে চায়? সে একটি রাষ্ট্রের মধ্যে বাস করতে চায় কারণ রাষ্ট্র তাকে নিরাপত্তা দেবে। তাকে স্বাধীনভাবে কাজ করার সুযোগ দেবে। তার অধিকার রক্ষা করবে রাষ্ট্র। ঠিক এই কারণেই বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছিল। কিন্তু আজকে রাষ্ট্র কি তার জনগণের স্বাধীনভাবে কাজ করার সুযোগ দিতে পারছে? কিংবা তার নিরাপত্তা দিতে পারছে? কিংবা তার অধিকার রক্ষা করতে পারছে? এক কথায় বলতে হয় পারছে না। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে সরকারি দলের ছাত্র নামের ক্যাডাররা যা খুশি তাই করছে। সরকারের উন্নয়নমূলক কর্মকান্ডের টেন্ডার সরকারি দলের নেতাদের দখলে। তারা দুই আনার উন্নয়ন করে চৌদ্দ আনা লুটপাট করে। এমনকি ফুটপাথে ব্যবসা করে যে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী সে পর্যন্ত সরকারি দপ্তরগুলোর নিপীড়ন নির্যাতন থেকে মুক্ত নয়। এদিকে সীমান্তে প্রতিবেশী দেশের সীমান্তরক্ষীদের গুলিতে জীবন দিতে হচ্ছে বাংলাদেশীদের। গভীর সমুদ্রে মাছ ধরতে গিয়ে জেলে ভাইয়েরা জীবন দিচ্ছে জলদস্যু ও ভিনদেশী জেলেদের হাতে। এই অবস্থায় যে যেভাবে পারছে নিজের রাষ্ট্র ছেড়ে চলে যাচ্ছে এমন একটি রাষ্ট্রে যেখানে সে মনে করে তার জীবনের নিরাপত্তা থাকবে। কাজ করার সুযোগ থাকবে। এবং একসময় নাগরিকত্ব পেলে তার অধিকারও রাষ্ট্র দেখবে।’

‘কিন্তু সেটা তো পালিয়ে যাওয়া। জনগণের সামনে কি পালিয়ে যাওয়ার কোন বিকল্প নেই?’ প্রশ্ন করলাম।

‘সত্যি বলতে কি আসলে কোন বিকল্প নেই। অন্তত এখন পর্যন্ত কোন বিকল্প দেখা যাচ্ছে না। ফলে বড় দু’টো দলের কোন একটি দলকে একবারের পর দ্বিতীয়বার ক্ষমতায় যেতে না দেওয়াটাই এখন পর্যন্ত একমাত্র বিকল্প। জনগণ সেই কারণে আওয়ামী লীগকে বিদায় করতে মুখিয়ে আছে।’

‘যথেষ্ট হয়েছে। দেশের রাজনীতি বাদ দিয়ে বরং নিজেদের সমস্যা সমাধান কিভাবে করা যায় সেটা নিয়ে কথা বলি। আমার তো এখন হাতে কোন কাজ নেই। কাজকর্মের খবর কি কিছু আছে?’ দ্বিতীয়জন প্রসঙ্গান্তরে চলে গেলো। আমি শুধু ছোট্ট করে বললাম, ‘দেশ আর মানুষের সমস্যা তো বিচ্ছিন্ন কোন বিষয় নয়।’

প্রথমজন জানিয়ে দিল, চা ঠাণ্ডা হচ্ছে।

তেলে ভাজা ডিম মাখানো রুটির টুকরো নিয়ে খেতে শুরু করলাম। প্রথমজনের ছোট ছেলেটিও এসে আমাদের সঙ্গে খাওয়ায় যোগ দিল।

Advertisements

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s