কোটা পদ্ধতি: শেখ মুজিব থেকে হাসিনা


৩০ লাখ মুক্তিযোদ্ধার রক্তের বিনিময়ে ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছে। অন্তত ২ লাখ মা বোনের ইজ্জত হরণের ঘটনা ঘটেছিল মুক্তিযুদ্ধে। আর আহত হয়েছিল আরো কয়েক লাখ মুক্তিযোদ্ধা। একটি স্বাধীন দেশের জন্য যারা রক্ত দিয়েছেন তাদের দাবী সর্বাগ্রে। সেই দাবীর প্রতি শ্রদ্ধা জানাতেই ১৯৭২ সালে এক নির্বাহী আদেশে সরকারি চাকরিতে কোটা পদ্ধতি চালু করা হয়। সরকারি চাকরির শতকরা ৮০ ভাগ পদ পূরণ করার ব্যবস্থা করা হয় কোটার ভিত্তিতে। জাতির পিতা শেখ মুজিবুর রহমান তখন ক্ষমতায়।

জাতির পিতাকে নৃশংসভাবে হত্যা করার পর ১৯৭৬ সালে সরকারি চাকরিতে মেধাভিত্তিক নিয়োগের কোটা ২০ শতাংশ থেকে ৪০ শতাংশে উন্নীত করা হয়। সামরিক উর্দী ছেড়ে ক্ষমতায় তখন স্বাধীনতার ঘোষক জিয়াউর রহমান।

১৯৮৫ সালে মেধাভিত্তিক কোটার পরিমাণ বাড়িয়ে ৪৫ শতাংশ করা হলো। স্বৈরাচার হিসেবে খ্যাত এরশাদ তখন ক্ষমতায়। সেই ৪৫ শতাংশের কোটাই এখনো চলছে।

শুরুতে মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য সরকারি চাকরির যে কোটা ছিল পরবর্তীতে ১৯৯৭ সালে সেই কোটাতে মুক্তিযোদ্ধাদের সন্তানদের অন্তর্ভুক্ত করা হয়। তার পরিমাণ হলো ৩০ শতাংশ। বাকি কোটার মধ্যে আছে নারী ১০ শতাংশ ও ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী ৫ শতাংশ এবং জেলা কোটায় ১০ শতাংশ।

অনেকে দাবী করেন কোটা পদ্ধতি আমাদের সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। তারা সংবিধানের ধারা উল্লেখপূর্বক বলে থাকেন যে, সংবিধানে সকল নাগরিকের জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিত করার কথা বলা হয়েছে। তাদেরকে মনে করিয়ে দিতে চাই, সংবিধান যে বছর প্রবর্তন করা হয়েছিল কোটা পদ্ধতিও সেই বছর চালু করা হয়েছিল। ১৯৭২ সালে। বিষয়টি মনে রাখা ভালো।

যারা সংবিধান প্রণয়ন করেছিলেন এবং অনুমোদন দিয়েছিলেন তারাই কোটা পদ্ধতি চালু করেছিলেন। তারমানে, এর পেছনে যুক্তি আছে। সেই যুক্তিটা কি? যুক্তিটা হলো, রাষ্ট্রের দায়িত্ব হলো সরকারি চাকরিতে পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করা। সেটাও সংবিধানেই বলা হয়েছে। কোটার মাধ্যমে রাষ্ট্র সেই দায়িত্ব পালনই করছে।

অতএব একথা বলা যাবে না যে, শুধুমাত্র আবেগের বশবর্তী হয়ে কোটা ব্যবস্থা চালু করা হয়েছিল। কিংবা একথাও বলা যাবে না যে, কোটা ব্যবস্থা কাউকে বিশেষ সুবিধা পাইয়ে দেওয়ার জন্য। তবে সেসঙ্গে এই প্রশ্নও তোলা যেতে পারে, স্বাধীনতার ৪২ বছর পরেও কেন ৫৬ হাজার বর্গমাইলের একটি রাষ্ট্রে সরকারি চাকরিতে ৫৫ ভাগ নাগরিককে কোটা পদ্ধতির মাধ্যমে সুরক্ষা দিতে হবে? তাহলে গত ৪২ বছরে রাষ্ট্র যারা পরিচালনা করল তাদের অর্জনটা কি? তারা করলোটা কি? এক্ষেত্রে তাদেরকে জবাবদিহিতার মুখোমুখি করা যেতেই পারে। সেটি ভিন্ন লেখা। কিংবা এই লেখার পরবর্তী কিস্তিগুলোতে আলোচনা হতে পারে।

এদিকে, কোটা সুবিধায় গত ৪২ বছর ধরে মুক্তিযোদ্ধাদের সুবিধা দেওয়ার কথা বলা হলেও বাস্তবে কিন্তু সেটা হয়নি। কারণ, বাস্তবে বেশিরভাগ মুক্তিযোদ্ধা ও তাদের পরিবারের সদস্যরা সরকারি চাকরিতে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার সুযোগ তো দূরের কথা লেখাপড়া চালিয়ে যাওয়ার মতো সুযোগই পাইনি। এমনকি তিনবেলা ভাত জোগাড় করার মতো সুবিধাও অনেকেই হারিয়েছে সেই শুরুতেই। ১৯৭২ সালে শুরু হওয়া মুক্তিযোদ্ধাদের দুর্দশা দিনে দিনে বেড়েছে মাত্র। চেনাজানা হাতেগোনা মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়ে আমরা স্বাধীনতা ও বিজয় দিবস পালন করি। মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতি অবহেলার এই চিত্রটি দেশ স্বাধীনতার পর থেকেই লক্ষ্য করা যায়। যেকারণে, স্বাধীনতার অব্যবহিতের পর দেশের জন্য জীবন দানকারী ৩০ লাখ শহীদের কোন তালিকা তৈরি করা হয়নি। কিংবা ইজ্জত হারানো দুই লাখ মা বোনের তালিকাও তৈরি করা হয়নি। শহীদ পরিবারগুলোর সামান্য কয়েকটি পরিবারের জন্য বিশেষ সুবিধা দেওয়া হয়েছে মাত্র। শুরু থেকেই দলীয় লোকজনকে সুবিধা দেওয়ার প্রবণতা লক্ষ্য করা গিয়েছে। সাধারণ মানুষেরা সবসময় অবহেলিত থেকেছে। অথচ কে না জানে যে, মুক্তিযুদ্ধ ছিল জনযুদ্ধ। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর স্বাধীনতা যুদ্ধ চলাকালে নির্যাতিত মা-বোনদের জন্যও রাষ্ট্র যথাযথ পদক্ষেপ নেয়নি। নাম কা ওয়াস্তে যা করা হয়েছিল সেটা যে যথেষ্ট ছিলো না তা বলাই বাহুল্য।

দেশ স্বাধীন হওয়ার পর থেকেই প্রতি বছর মার্চ ও ডিসেম্বর মাসে পত্রিকায় মুক্তিযোদ্ধা পরিবারের করুণ চিত্র প্রকাশিত হতে শুরু করেছিল। বছরের বাকি সময় সুবিধাভোগীরা তাদের বিলাসী জীবন নিয়েই সন্তুষ্ট থেকেছে। পত্রিকা ও টেলিভিশনের সংখ্যা বাড়ার ফলে মানুষ এখন মার্চ ও ডিসেম্বরে মুক্তিযোদ্ধাদের করুণ জীবনচিত্র আরো বেশি জানতে পারছে। মুক্তিযোদ্ধা রিকশা চালাচ্ছেন, পার্কে কলম বিক্রি করছেন কিংবা ফেরি করে তরকারি বিক্রি করছেন এমন সচিত্র প্রতিবেদন মার্চ ও ডিসেম্বর মাসে পত্রিকা ও টেলিভিশনে দেখা যায়।

মুক্তিযোদ্ধাদের এই করুণ জীবনের গল্পের বিপরীতে এই দেশের সংসদ সদস্যদের বিলাসী জীবনের গল্পটি দেশের বয়সের সমান পুরনো। তারা নিজেরা ভোগ বিলাস করলেও মুক্তিযোদ্ধাদের আর্থিক ও সামাজিক অবস্থার প্রকৃত উন্নয়নের অর্থবহ চেষ্টা লক্ষ্য করা যায়নি। কেন সেই প্রশ্ন করারও দরকার হয় না। বলতে দ্বিধা নেই যে, মুক্তিযোদ্ধাদের রেশন দিয়ে কোনমতে বাঁচিয়ে রাখার প্রবণতা সবসময় লক্ষ্য করা গিয়েছে। যে জীবন তাদের প্রাপ্য নয় সেটাই তাদেরকে দেওয়া হয়েছে। যেকারণে অনেক মেধাবী মুক্তিযোদ্ধা অভিমান করে সত্তর দশকের শুরুতেই দেশ ছেড়ে চলে গিয়েছেন। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর দেশপ্রেমিক মুক্তিযোদ্ধাদের বাদ দিয়ে বিদেশ থেকে ধরে এনে বিভিন্ন দপ্তরের গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগ দেওয়ার ঘটনা ঘটেছিল ৭২ সালেই। শোনা যায়, তাজউদ্দিন সাহেব তার প্রতিবাদ করেছিলেন। কিন্তু তার সেই প্রতিবাদ ধোপে টিকেনি। কেউ কেউ দাবী করেন যে, তাজউদ্দিন সাহেব চেয়েছিলেন প্রয়োজনে দেশপ্রেমিক মুক্তিযোদ্ধাদের প্রশিক্ষণ দিয়ে যোগ্য করে তুলতে। অন্যদিকে, শেখ মুজিবুর রহমান চেয়েছিলেন মেধাবীদের রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব দিতে। ইতিহাসবিমুখ জাতির কাছে এই ঘটনার সত্যাসত্য বলার কেউ নেই। তবে, শেষ পর্যন্ত পাকিস্তান থেকে প্রত্যাগত কিংবা প্রবাসী বাঙালি মেধাবীরা বিভিন্ন দপ্তরের নেতৃত্বে আসার যে সুযোগ পেয়েছিল সেটা জানা যায়। ফলে, মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেওয়া মানুষেরা তেমনভাবে দেশের উন্নয়নে অংশগ্রহণ করার সুযোগ পাননি। এটি ভিন্ন আলোচনা।

সংসদ সদস্যদের আলোচনায় ফিরে যাই। সংসদ সদস্যরা এখন ট্যাক্স ফ্রি গাড়ি আনেন যার শুল্কমূল্য প্রায় হাজার কোটি টাকা। যা দিয়ে অনায়াসে কয়েক লাখ মুক্তিযোদ্ধার সন্তানকে লেখাপড়ার সুযোগ করে দেওয়া যায়। কথাটি এজন্য বললাম, মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য সংরক্ষিত সরকারি চাকরির কোটা মেধাবী মুক্তিযোদ্ধার সন্তানদের না পাওয়ার কারণে পূরণ করা সম্ভব হয় না। ফলে ৩০ ভাগ কোটার বেশিরভাগ পদ খালি রাখতে হয়। সত্যিকারের পরিকল্পনার অভাবেই এমনটা করতে হচ্ছে। আমাদের নিলর্জ্জ শাসক গোষ্ঠী মুক্তিযোদ্ধাদের রক্ত মাড়িয়ে ক্ষমতায় থাকলেও তারা শুধু বক্তৃতা বিবৃতিতে মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতি ভালো ভালো শব্দ উচ্চারণ করে থাকেন। প্রকৃত ত্যাগ স্বীকার করার বিষয়টি তাদের মধ্যে তীব্রভাবে অনুপস্থিত। যেকারণে তারা দেশের সম্পদ নিজেদের ভোগ বিলাসে ব্যবহার করলেও মুক্তিযোদ্ধারা আজকে সমাজের অবহেলিত অংশ। অনেকেই বলেন মুক্তিযোদ্ধারা কোন কিছু পাওয়ার জন্য যুদ্ধ করেননি। সত্যি কথা। কিন্তু মুক্তিযুদ্ধের সুফলভোগী যারা তারা কি নিজেদের দায়িত্ব থেকে তাদের জন্য কিছুই করবেন না। বাঙালী জাতি কি এতোটাই অকৃতজ্ঞ। কঠিন সত্য হলো- বাঙালী জাতি অকৃতজ্ঞ। এটাও ভিন্ন আলোচনা পরে করা যাবে।

মাননীয় সংসদ সদস্যরা যখন বিপুল বিক্রমে দুর্নীতি করেন তখন তারা মুক্তিযোদ্ধাদের কথা ভাবেন না। তারা সরকারি সুবিধা নেওয়ার জন্য যখন আইন প্রণয়ন করেন তখন মুক্তিযোদ্ধাদের কথা ভাবেন না। সরকারি প্লট বরাদ্দে সংসদ সদস্যদের ভাগ থাকলেও মুক্তিযোদ্ধাদের ভাগ থাকে না। সবচেয়ে নিলর্জ্জ বিষয় হলো এই দেশের কোন সরকারই ৩০ লাখ শহীদ ও শহীদ পরিবারের তালিকা প্রণয়ন করেননি। তারা কোথায় আছেন, কেমন আছেন, কিভাবে বেঁচে আছেন সেই তথ্য জাতি জানে না। কোনদিন জানতেও পারবে না। তাদের ছেলেমেয়েরা কি বিশ্ববিদ্যালয় পাস করে বিসিএস দেওয়ার মতো অবস্থায় আছে কি নেই সেটা গত ৪২ বছরে আমরা খতিয়ে দেখতে চাইনি। কারণ আমরা সত্যকে ভয় পাই।

(আগামী কিস্তিতে বাকিটা পড়ুন।)

Advertisements

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s