বড় হয়ে প্রধানমন্ত্রী হতে চায় বলতে শুনি না


আমাদের দেশে ছোটবেলা থেকে একটি কমন প্রশ্ন শুনতে শুনতে বড় হতে হয়- তুমি বড় হয়ে কি হতে চাও? এসএসসি এবং এইচএসসি পরীক্ষার ফলাফলে যারা মেধা তালিকায় থাকেন তাদেরকে গণমাধ্যমের সাংবাদিকরা একই প্রশ্ন করেন। উত্তরে কেউ ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, শিক্ষক কিংবা অন্য কোন পেশায় নিজেকে সফল দেখতে চান। তাদের হাসি হাসি মুখের বড় ছবিসহ সেসব কথা প্রচার করা হয়।

মেধাবীদের আমরা বলতে শুনি না ‘স্বাস্থ্যমন্ত্রী হতে চাই’, কিংবা ‘পূর্তমন্ত্রী হতে চাই’ কিংবা শিক্ষামন্ত্রী। কিংবা কেউ বলেন না ‘রাষ্ট্রপতি হতে চাই’ বা প্রধানমন্ত্রী হতে চাই। নিদেনপক্ষে এমপি হতে চাই কথাটাও কেউ বলেন না। এমনকি রাজনীতিবিদ হতে চাই কথাটাও তারা বলেন না? আমি আরো লক্ষ্য করেছি উপজেলা পর্যায়ে ভালো ফলাফল করেছেন এমন ছাত্র-ছাত্রীর উত্তরও বোর্ডের সবচেয়ে মেধাবী শিক্ষার্থীর মতোই হয়।

আমার মনে প্রশ্ন জাগে, জাতীয়ভাবে সেরা শিক্ষার্থী কেন প্রধানমন্ত্রী হতে চান না? কিংবা স্থানীয়ভাবে সেরারা কেন বলেন না, আমি ইউনিয়ন পরিষদের মেম্বার হতে চাই, চেয়ারম্যান হতে চাই, পৌরসভার মেয়র হতে চাই, সিটি করপোরেশনের কাউন্সিলর হতে চাই, সংসদ সদস্য হতে চাই, মন্ত্রী হতে চাই? কিংবা রাজনীতিবিদ হতে চাই।

আমার প্রশ্নের জবাব আমিই খুঁজি।

যারা ডাক্তার হতে চান তারা কেন ডাক্তার হতে চান? আমি লক্ষ্য করেছি যারা ডাক্তার হতে চান তারা দেশের মানুষের সেবা করার কথা বলেন। যারা শিক্ষক হতে চান তারা যুক্তি দেন যে, যেহেতু শিক্ষাই মানুষের জীবনের ভিত্তি গড়ে দেয় তাই তারা মানুষ গড়ার কারিগর হতে চান। খুবই ভালো কথা। একইভাবে আজকাল অনেকে বিজ্ঞানী হতে চান, নতুন কিছু আবিষ্কারের মাধ্যমে মানুষের জীবনে স্বস্তি ও বিশ্বের অগ্রগতি সাধনের নিমিত্তে। কেউ কেউ পাইলট হওয়ার ইচ্ছা পোষন করেন দেশ ঘুরে বেড়ানোর নেশায়। কমপিউটার কেন্দ্রিক ক্যারিয়ার গড়ার কথাও বলেন অনেকে। বড় ধরনের আমলা হতে চান কেউ কেউ। কিন্তু কাউকে বলতে শুনি না, সংসদ সদস্য হয়ে দেশের মানুষের কল্যাণে তারা আইন প্রণয়ন করতে চেয়েছেন। কেন এতোবড় দেশ সেবার সুযোগের প্রতি তাদের অনীহা?

এদিকে, আরেকটি বিষয় লক্ষণীয় যে, প্রতিবছর বুয়েটসহ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাস করা মেধাবীরা দেশেই থাকেন না। তারা মনে করেন যে, তাদের মতো মেধাবীদের উপযুক্ত মূল্যায়ন করার ক্ষমতা বাংলাদেশের নেই। ফলে তারা ভিনদেশে গিয়ে নিজের মেধা ও যোগ্যতা দিয়ে ওই দেশের মানুষদের সেবা করে যাচ্ছেন।

কথা হলো, যারা মনে করেন বাংলাদেশ তাদের কাজের জন্য উপযুক্ত নয় কিংবা তাদের মেধার মূল্যায়নের জন্য উপযুক্ত নয় তাদের কাছে প্রশ্ন করি- উপযুক্ত পরিবেশ গড়ার কাজটি তাদের হয়ে কে করে দেবে?

অনেকেই বলেন, রাষ্ট্রের কাজ হলো নাগরিকের জন্য উপযুক্ত কর্ম পরিবেশ তৈরি করা। রাষ্ট্র তো নিজে থেকে কিছু করতে পারে না। রাষ্ট্র কি করবে সেটা নির্ভর করে রাষ্ট্র কারা পরিচালনা করছেন। আমরা দেখি যে, বাংলাদেশের রাষ্ট্র পরিচালনায় মেধাবী, সৎ এবং দক্ষ মানুষের অংশগ্রহণ নেই। এই অবস্থায় রাষ্ট্র কেন ও কিভাবে মেধার মূল্যায়ন করতে শিখবে? স্বার্থপর, দাম্ভিক, নীচু মানসিকতায় আক্রান্ত নেতৃত্বের কাছ থেকে তো আর উচুঁমানের নেতৃত্ব আশা করা যায় না।

আমেরিকা, কানাডা, অস্ট্রেলিয়াসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশেই মেধাবী বাংলাদেশীদের দেখা মেলে। এমনকি অনেক সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকগণও পিএইচডি করার জন্য বিদেশে গিয়ে আর ফিরে আসেন না। এই সকল মেধাবী সন্তানেরা দেশে থাকা (যদি থাকে) আত্মীয় স্বজনদের জন্য ডলার পাউন্ড পাঠান। অনেকে আবার বন্ধু প্রতিবেশী কিংবা ডিপার্টমেন্টের ছোট ভাইদের তাদের কাছে নিয়ে যান। এভাবে তারা দেশের সেবা করার দাবী করেন। এটাকে তারা এক ধরনের দেশপ্রেম বলতেও কুণ্ঠিত হন না। মনবসু স্কলারশিপের অধীনে জাপানে পিএইচডি করেছেন এমন ৩৫ জনের কথা জানি যারা পরবর্তীকালে কানাডাতে পাড়ি জমিয়েছেন এবং সেখানে রোজগারের জন্য বিভিন্ন ধরনের অড জব করেন। এভাবেই তারা দেশের গরিব মানুষের রক্তঘামে উপার্জিত অর্থে পরিচালিত সরকারি কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ালেখা করে ঋণ শোধ না করেই বিদেশের মাটিতে আরাম আয়েশ করার সুযোগ সন্ধান করে চলেছেন।

দেশে থাকা মেধাবীরাও রাজনীতি এড়িয়ে চলেন। তাদের কাছে রাজনীতিকে কায়দা করে দুষ্ট লোকদের কারবার হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। ফলে মেধাবী ও সত্যিকারের দেশপ্রেমিকদের কোনঠাসা করে লম্পট, বদ, স্বার্থবাদী মানুষেরা রাজনীতিকে নিজেদের কুক্ষিগত করতে পেরেছে। যেকারণে তারা অনায়াসে চেয়ারম্যান, মেম্বার, মেয়র, এমপি, মন্ত্রী হওয়ার ইচ্ছে পোষণ করেন। এবং তাদের বেশিরভাগ নির্বাচিতও হন। দীর্ঘ কয়েক দশকের ভুল চর্চার মধ্য দিয়ে এখন ভুলটাই রাজনীতির সংস্কৃতি হয়ে গিয়েছে। এখন রাজনীতির ভুল সংস্কৃতি যে ভাঙ্গা সম্ভব সেটাই অনেকে বিশ্বাস করে না। এই রকম একটা পরিস্থিতিতে, মেধাবীরা যখন পলায়নপর মানসিকতা নিয়ে নিজেদের রাজনীতি থেকে দূরে রাখছেন তখন রাজনীতি সহজেই সুযোগসন্ধানীদের দখলে চলে যাচ্ছে।

আজকে সংসদ সদস্য পদে নির্বাচন করার কথা যোগ্য ও সৎ রাজনীতিকরা ভাবতে পারেন না। এলাকাভেদে সংসদ সদস্য নির্বাচনে নির্বাচনী ব্যয় ১ থেকে ২০ কোটি টাকা পর্যন্ত। সংসদ নির্বাচন এখন সবচেয়ে বড় বিনিয়োগের স্থান। এখানে জয়ী হওয়া মানে বিনিয়োগের নিশ্চিত রির্টান। আর সরকারি দলের এমপি হলে তো কথাই নেই। মোটামুটিভাবে চৌদ্দ পুরুষের বসে খাওয়ার বন্দোবস্ত আর কি! অথচ সংসদ সদস্যদের ভাবতে পারা উচিৎ তারা জনগণের ভোটে নির্বাচিত আইন প্রণেতা। তাদের জন্য বার্ষিক বেতন ভাতা মিলিয়ে প্রায় ১৫ লাখ ৮১ হাজার টাকা দেয়া হচ্ছে। এর সঙ্গে থাকছে বাড়ি এবং প্রতিদিন সংসদে উপস্থিত হওয়ার জন্য এক হাজার টাকা। এর বিনিময়ে তাদের কাজ হলো জনগণের চাকরি করা। কিন্তু তারা সেটা না করে জনগণের পকেট কাটায় ব্যস্ত।

এই অবস্থার পরিবর্তন এখন সময়ের দাবী। এটা কিভাবে সম্ভব সেনিয়ে আমাদের ভাবতে হবে। আমাদেরকে এমন একটি পরিবেশ পরিস্থিতি তৈরি করতে হবে যেখানে সন্ত্রাসীদের লালন না করেও এমপি মন্ত্রী হওয়ার সুযোগ থাকবে। ভোট মানেই টাকার ছড়াছড়ি হবে না। মানুষ বুঝতে পারবে একজন এমপি আর মন্ত্রীর সঙ্গে তার পার্থক্য মূলত দায়িত্ব পালনের যোগ্যতা এবং দায়িত্বের ভিন্নতা।

রাজনীতিকে গণমানুষের আর মেধাবী, সৎ ও পরিশ্রমী মানুষের দেশ ও মানুষের উন্নয়নে অংশগ্রহণের হাতিয়ারে পরিণত করতে পারাটাই এখন চ্যালেঞ্জ। যে চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করার মাধ্যমে আমরা আগামী প্রজন্মের মুখে তুলে দিতে পারব- বড় হয়ে আমি প্রধানমন্ত্রী হতে চাই।

Advertisements

2 thoughts on “বড় হয়ে প্রধানমন্ত্রী হতে চায় বলতে শুনি না

  1. স্যার আমি মাঝে মাঝে চিন্তা করি যে নিজের এলাকায় থেকে কিছু করা যায় কিনা। কিন্তু রাজনৈতিক সমর্থন ছাড়া চেয়ারম্যান,মেম্বার সম্ভব না। এর সংসদ সদস্য সে তো অনেক দুরের কথা। আর রাজনীতির যে অবস্থা। সে কথা না বলায় ভাল।

    • সবাইকে যে চেয়ারম্যান মেম্বার হতে হবে তা কিন্তু নয়। এলাকার তথা দেশের উন্নয়নের জন্য সবচেয়ে বেশি দরকার নিজ এলাকার সম্পদের সর্বোচ্চ ব্যবহারের মাধ্যমে নিজের জন্য এবং অন্যের জন্য কর্মসংস্থান তৈরি করা। আপনি সেটা করার কথা ভাবতে পারেন। যদি কিছু মনে না করেন, আপনার গ্রামের বাড়ি কোন উপজেলা ও জেলায়?

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s