কানাডার সমাজে দুর্নীতি, জীবন ও অন্যান্য প্রসঙ্গ


ঘড়ির কাঁটা দশটা ছুঁয়েছে মাত্র। চোখে ঘুম। কিন্তু ঘুমানোর উপায় নেই। কয়েকটা দরকারি ফোন কল করতে হবে। একটা মেইলের জবাব দেওয়া দরকার। এমন সময় ফোনটা বেঁজে উঠল। স্ক্রীণের নাম্বারটা বলে দিচ্ছে ফোনটা এসেছে কানাডা থেকে। আমি জানি ওপাশে কে। পাশের ঘরে বউ ঘুমাচ্ছে। এখানে বসে কথা বলা যাবে না। ফোনটা বেশিক্ষণ বাজলেও বিপদ! আমি ফোনটা ধরে আস্তে বললাম, হ্যালো! ওপাশ থেকে বলল, কি ব্যাপার আপনার গলা এমন শোনাচ্ছে কেন? ঘুমাচ্ছেন নাকি?

‘ঘুমাচ্ছি না। তবে বউ ঘুমাচ্ছে। একটু লাইনে থাকো। আমি অন্য ঘরে যাচ্ছি।’

‘বাজে তো মাত্র দশটা। আপনার মেয়েও ঘুমাচ্ছে।’

‘না। ও অনেক রাত জাগে। আর এখন মহাব্যস্ত পরীক্ষা নিয়ে। নভেম্বরের ১ তারিখে ফাইনাল পরীক্ষা।’

এরপর কিছুক্ষণ মেয়েকে নিয়ে কথা হলো। যার সঙ্গে কথা বলছি ধরা যাক তার নাম ‘নীল’।

নীল- আমি আজকে ছুটি নিয়েছি। সকালে ছেলেকে স্কুলে পৌঁছে দিয়ে বাসায় এসে ঘুমিয়েছি। কিন্তু রাতে আমার সহজে ঘুম হয় না। রাত যতো বাড়ে মনে হয় কাজও বাড়ছে। আপনার কি এমন হয়?

আমি- আল্লাহর ইচ্ছায় আমি এখনো যখন খুশি ঘুমাতে পারি।

নীল- সেতো আমিও পারি। দিনের বেলা পারি। কিন্তু রাতে পারি না।

আমি- তারপর তোমার শরীর এখন কেমন? কি করছো?

নীল- আমি ভালো আছি। আপনার লেখা পড়ি। আপনি বাংলাদেশের ‍দুর্নীতির কথা বলেন। কানাডাতে কতো রকমের দুর্নীতি আছে শুনলে আপনি অবাক হয়ে যাবেন।

নীল কানাডা সমাজের ‍দুর্নীতির কিছু ঘটনা বলল। যেমন, ও যে কোম্পানির ফোন, ইন্টারনেট ব্যবহার করে তারা প্রতিমাসে ওকে ৫ থেকে ৭ ডলার ভুয়া বিল দেয়। দুয়েকবার এনিয়ে প্রতিবাদ জানিয়ে বিল সংশোধন করতে পেরেছে। কিন্তু এটা করার জন্য প্রতিবার তাকে দুই আড়াই ঘণ্টা খরচ করতে হয়েছে। অনেক যুক্তি তর্ক আর ধৈয্যের পরীক্ষা দিতে হয়েছে। ওর ভাষায় কাস্টমার সার্ভিসের মেয়েগুলো খুবই ফাজিল টাইপের। ম্যানেজার পর্যায়ে যেতে অনেক কাঠখড় পোড়াতে হয়। ৫/৭ ডলারের জন্য এটা সহজে কেউ করতে চায় না। বড়জোর কাস্টমার সার্ভিসে ফোন করে অভিযোগ করে। আর কাস্টমার সার্ভিস থেকে কি জবাব দিতে হবে সেটা রেডি থাকে। একটা না একটা কারণ বলে দেয়। সেটা শুনে সন্তুষ্ট থাকে বেশিরভাগ কাস্টমার।

নীল কৌতুহলী মানুষ। তার সন্তুষ্টি অতো অল্পতে হয় না। তাই সে খুঁজে বের করেছে ইংরেজি ভাষাভাষি নয় এমন লোকদের সঙ্গেই কোম্পানিগুলো এই ধরনের দুই নাম্বারি বেশি করে। কারণ ভাষার সীমাবদ্ধতাকে তারা কাজে লাগায়। দুর্নীতির কাজে। তারপর যদি কেউ তার মতো ত্যাড়া হয় তখন বিল সংশোধন করে দেয়। এভাবেই জেনেশুনে ওরা কাস্টমারদের সঙ্গে প্রতারণা করে। কাস্টমারও মেনে নেয়। নীলের ব্যাখ্যা হলো কানাডার সরকার কখনো করপোরেটদের বিরুদ্ধে কিছু করে না। বলে না। মিডিয়াগুলোও এ ব্যাপারে না পারলে টু শব্দটি করে না।

নীল কাজ করে একটা ব্যাঙ্কে। মানব সম্পদ বিভাগে। তো একবার এক মিটিংয়ে কর্মী ছাটাইয়ের আলোচনা হচ্ছে। এই ছাটাই কতোটা নিরূপায় হয়ে করতে হচ্ছে সেটা বলা হলো। এতে কতো টাকা সেভ হবে সেটাও জানানো হলো। মিটিংয়ে নীল বলল, এতো ডলার সেভ করার জন্য এতোগুলো কর্মী ছাটাই করার দরকার কি? উপরের লেভেল থেকে একজনকে ছাটাই করলেই তো হলো। নীলের বক্তব্য অনুযায়ী, মিটিং রুমে বোমা বিস্ফোরণ হলেও মানুষ বোধহয় এতোটা চমকাতো না। যতোটা চমকিয়েছে তার কথা শুনে।

আমি- কেন?

নীল ব্যাখ্যা করল। কানাডার সমাজে উচ্চবিত্তদের স্বার্থ রক্ষা করাটাই নিয়ম। করপোরেট সোসাইটি বড় বড় পদধারীদের ম্যালা সুযোগ সুবিধা দিয়ে রেখেছে। কানাডার সমাজে যে পরিমাণ বৈষম্য আছে সেটা নাকি চিন্তাও করা যাবে না। সে তার ব্যাঙ্কের উদাহরণ দিয়ে বলল। ওখানে কর্মীদের বেতনের বারোটি ধাপ বা স্কেল আছে। ১২ নম্বর ধাপের বেতন হলো ঘণ্টায় ১০ ডলার ২৫ সেন্ট। অন্যদিকে, ১ নাম্বারে যিনি আছেন তার বেতন হলো বছরে এক কোটি ২০ লাখ ডলার। যার মধ্যে ১৫ লাখ ডলার হলো মূল বেতন। বোনাস বাকিটা। অন্যান্য সুযোগ সুবিধা তো আছেই।

আমি একটু আগের প্রসঙ্গে ফিরে গেলাম। ফোন ইন্টারনেট কোম্পানির দুই নাম্বারিতে। নীল বলল, আসলে বাংলাদেশীরা ৫/৭ ডলার অতিরিক্ত বিল নিয়ে খুব একটা মাথা ঘামায় না। কারণ কানাডাতে বাংলাদেশীদের আয় ভালো। যারা ট্যাক্সি চালায় তারা কম আয় দেখিয়ে থাকে। ট্যাক্স দেয় কম। সরকার এদের কিছু বলে না। কারণ বাংলাদেশের ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, আর্মি অফিসাররা কানাডাতে এসে ট্যাক্সি চালায়। ইংরেজি জানা ট্যাক্সি চালক পাওয়াটাই করপোরেট চাহিদা। আর করপোরেট চাহিদা মানেই সরকারের চাহিদা। কানাডা সরকার জানে ১০ ডলার ২৫ সেন্ট কিংবা ১৫ ডলারে যে মানের লোক তারা বাংলাদেশ থেকে পাচ্ছে যে কাজের জন্য ওই কাজের জন্য কানাডাতে ইমিগ্র্যান্ট না এলে লোক পাওয়া যাবে না। এই ধরনের একটা উইন উইন সিচুয়েশনের মধ্যেই কানাডাতে বাংলাদেশীরা তাদের পরের প্রজন্মের ভবিষ্যৎ নির্মাণ করছে।

নীলের সঙ্গে গল্প চলে। রাত বাড়ছে। গল্পের শাখা প্রশাখাও বিস্তার লাভ করছে।

(ইচ্ছে করলে বাকিটুকু লিখব। পড়ার জন্য ধন্যবাদ।)

Advertisements

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s