পরকীয়া প্যাচাল


এক.
আমি পরকীয়া শব্দটি শোনার আগে পরকীয়ার ঘটনা জেনেছি। তখন বয়স হবে ৮/৯ বছর। শুনলাম আমার এক বন্ধুর বাবা তার বড় ভাইয়ের বউকে নিয়ে বাড়ি ছেড়ে চলে গিয়েছেন। বিষয়টি আমার চারপাশের রক্ষণশীল সমাজে গুঞ্জন তুলেছিল। ওটাকে যে পরকীয়া বলে তখন জানতাম না। তখন সেটা ছিল আমার কাছে বন্ধুর বাবার বাড়ি ছেড়ে চলে যাওয়া। বুঝতে পেরেছিলাম, এই ঘটনাটি লজ্জার। মানুষ ভালো বলছে না।

দুই.
উপরের ঘটনাটি সত্তর দশকের শেষ ভাগের। ফলে, এমনটা ভাবার দরকার নেই যে পরকীয়া বাংলাদেশের সমাজে ফেসবুক আমলে আমদানী হওয়া জিনিস।

বাংলা একাডেমীর বাংলা টু ইংরেজি ডিকশনারিতে বলা হয়েছে পরকীয়া- 1. Another’s wife; woman dependent on others. 2. Lady-love who is unmarried or married to somebody elese; mistress

বাংলা একাডেমির ইংরেজি টু বাংলা ডিকশনারিতে বলা হয়েছে mistress – ১. গৃহকর্ত্রী। ২. (বিদ্যালয়ের) শিক্ষিকা; শিক্ষয়িত্রী; ৩. কোন বিষয়ে ভালো জ্ঞান বা নিয়ন্ত্রণের অধিকারিনী নারী; নিপুণা। ৪. (১৮ শতকের পূর্ববর্তী সময়ের পটভূমিকায় রচিত গল্প, নাটক প্রভৃতিতে এবং স্কটল্যান্ডে এখনো কিছু কিছু লোকের মুখে) মিসেস বা মিস-এর তুল্য শব্দ। (৫) (কাব্যিক) প্রণয়পাত্রী; দয়িতা; হৃদয়েশ্বরী। ৬. কোনো পুরুষের সঙ্গে যে নারী (ঐ পুরুষকে বিবাহ না করে) প্রতিনিয়ত যৌন সঙ্গমে লিপ্ত হয়; উপপত্নী; উপস্ত্রী, রক্ষিতা

এই দুই ডিকশনারি থেকে বোঝা যাচ্ছে যে, পরকীয়ার সঙ্গে বিবাহ বহির্ভূত সম্পর্ক বিষয়টি জড়িত। যার ইংরেজি হলো – Extramarital affairs.
গুগল বলছে, ইংরেজি ডিকশনারীতে Extramarital শব্দটি যুক্ত হয়েছে ১৯২৫ সালে।

তিন.
পরকীয়া মানেই গোপনে প্রেম, কথাটা এখন আর সত্যি নয়। বাংলাদেশেও এখন এমন পরিবার আছে যেখানে স্বামী ও স্ত্রী দু’জনেই পরকীয়া করছে। দু’জনেই সেটা জানছে। কিন্তু দেখেও না দেখার ভান করছে। ভারতীয় টেলিভিশন চ্যানেলগুলো বাংলাদেশের চ্যানেল পরিচালকদের উপর পরকীয়া নিয়ে নাটক নির্মাণে তীব্র চাপ তৈরি করায় এই দেশের নাট্যকাররাও পরকীয়া নিয়ে পরীক্ষা নিরীক্ষা করার সুযোগ পায়। ফলে বাংলাদেশের রক্ষণশীল সমাজে পরকীয়াকে নতুন মাত্রা লাভ করেছে।
যদিও পরকীয়া বিষয়টি নতুন কিছু নয়। খুব সম্ভবত বিয়ে নামের প্রতিষ্ঠানটির উদ্ভবকাল থেকেই পরকীয়া নামের বিষবৃক্ষটি সমাজে নিজের জায়গা করে নিয়েছিল। পরকীয়াকে অনেকে হেলথি বা স্বাস্থ্যকর বলে থাকেন। তাদের মতে পরকীয়া মূল সম্পর্ককে জোরদার করতে সহায়তা করে। যদিও পরকীয়ায় লিপ্ত পক্ষগুলো একসময় ক্লান্ত হয়ে পড়ে এবং তারা পরকীয়াকে একটি বাজে কাজ বলে আখ্যায়িত করতে দেরি করে না। পরকীয়ায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় শিশুরা। সন্তানেরা। ফলে দায়িত্ববোধসম্পন্ন বাবা মা সন্তানদের কথা ভেবে হলেও পরকীয়া থেকে নিজেদের বিরত রাখেন।

চার.
একদা শো বিজে নারীর শরীর ভোগ করার জন্য প্রেমের অভিনয় কিংবা প্রেম করার কায়দা কানুনের কথা শোনা যেতো। সেটা সংবাদপত্র পর্যন্ত নেমে এসেছে।

কয়েকবছর আগে এক পত্রিকা অফিসে গিয়েছিলাম আমার এক সাংবাদিক বন্ধুর সঙ্গে। বন্ধুটি সেখানে তার এক বন্ধুর সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছিল। আমাকে বিখ্যাত সেই সাংবাদিকের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিল। যিনি কুশল বিনিময়ের পাঠ চুকিয়ে পরকীয়ার গল্প নিয়ে মেতে উঠেছিলেন। হঠাৎ করে পরকীয়ার গল্প শুরু হওয়ার কারণটি অস্বস্তিকর। আমরা থাকা অবস্থায় তার এক নারী সহকর্মী তার রুমে এসেছিল লেখা নিয়ে আলাপ করতে। সেই সহকর্মীকে নিয়েই পরকীয়ার প্রসঙ্গটি শুরু করেছিলেন সেই সাংবাদিক। যার কাছে পরকীয়া হলো বাসার বারান্দায় সিগারেট টানতে যাওয়া। কথায় কথায় বললেন, ‘এই জীবনের সবচেয়ে আনন্দের কাজ হলো পর নারীর পায়জামার ফিতা খোলা।’ তারপর তার আকর্ণবিস্তৃত হাসি আমার কাছে মনে হয়েছিল ধূর্ত শেয়াল হাসছে।

এই ধরনের সাংবাদিক কতোটা সাংবাদিকতার মান ধরে রাখতে পারেন সেনিয়ে আমার যথেষ্ট সংশয় আছে।

পাঁচ.
পরকীয়ার একটা বড় উদ্দেশ্য হলো ভোগ। ভোগ যে শুধু পুরুষ নারীকে করে তা কিন্তু নয়। নারীও ভোগ করতে পছন্দ করে। সেকারণেই পরকীয়া শুধুমাত্র পুরুষের একচেটিয়া দখলে নেই। তবে যেহেতু পরকীয়া বিষয়টি গোপন ধরনের সেকারণে এনিয়ে এখনো আলাপ আলোচনা কম হয়। কিন্তু তাই বলে পরকীয়া তো বসে নেই! পরকীয়ার কারণে খুনের ঘটনা ইদানীংকালে বেড়েছে। কিংবা আগে পত্রিকায় এই ধরনের খবর ছাপা হতো না। এখন হয়।

ছয়.
গোপন প্রেমিক-প্রেমিকা থাকার মধ্যে এক ধরনের রোমাঞ্চ বা থ্রিল কাজ করে। মানুষ স্বভাবগতভাবে অপরাধপ্রবণ। যারা অপরাধ করে না তাদের যে কখনো অপরাধ করার ইচ্ছে হয়নি তা কিন্তু নয়। তারা সেই ইচ্ছেকে দমন করেছে। যারা দমন করতে পারে না কিংবা চায় না তাদের একটা অংশ পরকীয়া নামের রোমাঞ্চে নিজেদের জড়ায়। এদের একটা অংশ একসময় হতাশাগ্রস্ত হয়। জীবনকে বরবাদ করে দেয়।

সাত.
আমেরিকা অনেক কিছুতে যেমন এগিয়ে। পরকীয়াতেও এগিয়ে। এক পরিসংখ্যান মতে, আমেরিকার ৭০ ভাগ বিবাহিত পুরুষ ও ৫০ ভাগ বিবাহিত মহিলা তাদের বিবাহিত জীবনের কোন একটা সময়ে পরকীয়ায় লিপ্ত হয়। তাদের অনেকের সম্পর্ক এক রাতের হয়। বাকিদেরটা স্বল্প কিংবা দীর্ঘমেয়াদী হয়।

আট.
আমার এক বন্ধু চায়নার সঙ্গে ব্যবসা করে। প্রায়ই তাকে চায়না যেতে হয়। খুব দামী হোটেলের কটেজে থাকে। খোলা জায়গা। সুইমিং পুল। সবুজের ঝোপ ঝাড়। মৃদু আলো। সবমিলিয়ে এক ধরনের মায়াবী পরিবেশ। তার অভিজ্ঞতা হলো ওই পরিবেশে খোলা আকাশের নিচে পাহারায় নিযুক্ত কর্মীরা নিজেদের মধ্যে একরাতের পরকীয়ায় লিপ্ত হয়ে থাকে।

তার কৌতুহল থেকে চাইনিজ সহকর্মীর কাছ থেকে জেনেছে যে, এই ধরনের সেক্সকে সহজভাবে নেওয়া হয়। কেউ বিষয়টি মনেও রাখে না। তার আরো ব্যাখ্যা ছিল, পরিবার ছেড়ে থাকার জন্যও হয়তো এই ধরনের সেক্স হয়ে থাকে।

নয়.
বাংলাদেশে বাসাবাড়িতে দারোয়ান সাপ্লাইয়ের ব্যবসার শুরুতে ঢাকা শহরের গুলশান বনানীর বাড়িতে দারোয়ান দেখা যেতো। এখন অবশ্য সব জায়গায় দেখা যায়। যেখানেই এপার্টমেন্ট সেখানেই দারোয়ান। যাই হোক। শুরুর দিকে, এপার্টমেন্ট ভবনগুলোর সামনে দিয়ে হেটে যাওয়ার সময় পথচারী মেয়েদের উদ্দেশ্যে দারোয়ানদের টিটকারি, কমেন্ট কিংবা শীষ বাজানো অনেক দেখেছি। স্বল্প বেতনের কারণে এরাও পরিবার ছেড়ে ঢাকায় কাজ করতে আসে। এপার্টমেন্ট বিল্ডিংয়ে কাজ করা ছুটা বুয়া, কাজের মেয়ে প্রমুখের সঙ্গে এদের সম্পর্ক হরহামেশা গড়ে উঠে। এনিয়ে বাড়ির মালিকদের আগে অনেক বেশি দুশ্চিন্তাগ্রস্ত মনে হলেও আজকাল আর মনে হয় না। অন্তত আলোচনা কমেছে। এটাও হয়তো টেলিভিশন চ্যানেলগুলোর অবদান। ঘটনা এখন সবার সয়ে গেছে যেন।

দশ.
আবারো আমেরিকা প্রসঙ্গ। আমেরিকার প্রতি দশজনের চারজন মনে করেন যে, পরকীয়া নৈতিকভাবে গ্রহণযোগ্য! যেকারণেই বোধহয় ক্লিনটন মনিকার সঙ্গে পরকীয়ায় লিপ্ত হওয়ার সাহস দেখাতে পেরেছিলেন। আর একারণেই আমেরিকায় ষাটের দশকের তুলনায় পরকীয়া বাড়ছে।

(চলবে)

Advertisements

4 thoughts on “পরকীয়া প্যাচাল

  1. সুনীলের কোন এক গল্পের বই-ই পড়েছিলাম এমন যে, পরকীয়াতে নাকি এই নশ্বর জগতের সবচেয়ে সুখ লুকিয়ে। এই একটা রিলেশোনে সব ধরনের উত্তেজনা থাকে, কি ভালো, কি মন্দ সব।
    ইন্ডিয়ান সিরিয়াল গুলোর মুল উপোজীব্য এখন এই পরকীয়া। এটা আমাদের সমাজে ধীরে ধীরে প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে। ইয়াং জেনারেশনের মধ্যে সিক্রেট ডেটিং প্রেমের একটা অপরিহার্য অংশ। আসলে আমাদের সমাজে একটা ট্রানজিশনাল প্রিয়ড চলছে। আজ যে শিশুটির জন্ম হচ্ছে আগামী ৪০ বছর পর হয়ত সে আমেরিকান স্টালের জীবন যাপন করবে। সমাজে বিবাহটা অনেকটাই গৌন হয়ে যাবে। সন্তান সন্তানাদি হবে বিবাহের আগে (শুরু হয়েছে আলরেডি) কিংবা লেসবিয়ান, গে সৃষ্টি হবে, হবে অন্যন্য “ওপেন রিলেশন/সেক্স” কন্সেপ্টের প্রতিস্থাপন। দেশ যে ভাবে চলতে তাতে হবেই এতে আমি নিশ্চিত যদি না ‘কেউ’ এসে পজ দেয়। ঐতিয্যের কথায় বন্ধন ফিরিয়ে আনে…!

    ব্যাপার না।

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s