রাজনীতি শেখার পাঠশালা তৈরির বিকল্প নেই


parliament44-620x330এক.

গ্রাম গঞ্জের অনেক খাবার হোটেলে বড় বড় করে লেখা থাকে- রাজনৈতির আলাপ আলোচনা নিষেধ কিংবা রাজনীতি নিয়ে আলোচনা করা নিষেধ। কেন এই নিষেধাজ্ঞা সেনিয়ে নিজে নিজে অনেক ভেবেছি। কিন্তু কখনো হোটেল কর্তৃপক্ষকে জিজ্ঞাসা করা হয়নি। এই লেখা লিখতে বসে নিজের কাছে আশ্চর্য লাগছে- কেন জিজ্ঞাসা করিনি। জিজ্ঞাসা করা থাকলে আজকে অন্তত একটি কর্তৃপক্ষীয় ব্যাখ্যা পাওয়া যেতো।

দুই.

ক্লাস সেভেন থেকে ক্লাস টেন পর্যন্ত যখন খেপুপাড়ায় লেখাপড়া করতাম। বাবা বলে দিয়েছিলেন, কোন কিছু খেতে ইচ্ছে করলে হোটেল থেকে কিনে বাসায় এনে খাবে। হোটেলে বসে খাবে না।

তাঁর কথা মোটামুটিভাবে অক্ষরে অক্ষরে পালন করেছি বলা যায়। শুধুমাত্র বাবুদার পারিবারিক কেন্টিনে বসে চিড়ার নাড়ু খেয়েছি। এর বাইরে কোন হোটেলে বসে ওই সময়টায় খেয়েছি তা মনে পড়ে না। সম্ভবত একবার জগার মিষ্টির দোকানে বসে মিষ্টি খেয়েছিলাম। তবে কেনার সুযোগে সেই ছোটবেলায়ই দেখেছি খেপুপাড়ার হোটেলেও রাজনীতি নিয়ে আলোচনা না করার বিজ্ঞপ্তি আছে।

বাবার কাছে জানতে চাওয়া হয়নি কেন তিনি নিষেধ করেছিলেন। এখন আর জানার কোন সুযোগ নেই। আমার জীবনের আদর্শ আমার বাবা। আমার জীবনে তার ব্যাপক প্রভাব রয়েছে। আমার মাঝে যে সততা কিংবা দেশ ও মানুষ নিয়ে চিন্তাভাবনা তার তিনিই রচনা করে দিয়েছেন। তিনি রাজনীতি থেকে নিজেকে সারাটা জীবন দূরে রেখেছিলেন। আজকে এই লেখা লিখতে বসে মনে হচ্ছে তিনি রাজনীতিকে কি চোখে দেখতেন সেনিয়ে তার সঙ্গে কখনো কথা হয়নি। তবে কখনো কখনো মনে হয়েছে আমি রাজনীতির সঙ্গে জড়িয়ে পড়ি সেটা হয়তো তিনি চাননি। আমার খেলাঘর করা নিয়ে তার আপত্তি ছিলো না কিন্তু আমি ছাত্র রাজনীতিতে তথা ছাত্র ইউনিয়ন ও কমিউনিস্ট পার্টির রাজনীতির সঙ্গে জড়িয়ে পড়তে পারি এমন একটা ভাবনা তাকে কিছুটা অস্বস্তি দিয়ে থাকতে পারে বলে এখন মনে হচ্ছে। আবার একথাও ঠিক যে, খেলাঘরের সম্মেলনে অংশ নেওয়া কিংবা বড় ধরনের অনুদান দিতে তিনি ছিলেন সর্বাগ্রে। প্রশাসনের সঙ্গে বাবার সম্পর্ককে কাজে লাগিয়ে খেলাঘরের জন্য একটি সরকারি জায়গা বরাদ্দ নেওয়া কিংবা তাঁর সহায়তায় একটি ভবন করাও সম্ভব হয়েছিলো। কিংবা আমি তখন ইস্পাত কিংবা দুনিয়া কাঁপানো দশদিন পড়ছি সেটা নিয়ে তার কোন কথা ছিলো না। সকল ধরনের বই পড়াকে তিনি উৎসাহিত করেছেন।

আমার রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত হওয়ার ব্যাপারে তার প্রথম প্রকাশ্য বক্তব্য পাওয়া গেলো আমি যখন ঢাকায় কলেজে ভর্তির প্রস্তুতি নিচ্ছি। আমাকে জানানো হলো ঢাকা কলেজে আমি ভর্তি হতে পারব না। রেসিডেনসিয়াল মডেল কিংবা নটরডেম কলেজ ছাড়া অন্য কোন কলেজ হতে পারবে না।

তিন.

কলেজে ভর্তি হওয়ার পর আমার বই আর পত্রিকা পড়ার ক্ষুধা যেন বেড়ে গেলো। যা পাই তাই-ই পড়ি। এব্যাপারে বিশেষ সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিলো তোফাজ্জেল বুক হাউজের পত্রিকার স্টলটি। কলেজ থেকে ফেরার পথে ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে দেশি বিদেশী এই ম্যাগাজিন সেই ম্যাগাজিন পড়তে লাগলাম। ছোটবেলা থেকে পড়া মাসুদ রানা তো আছেই। তার সঙ্গে যুক্ত হলো মুক্তিযুদ্ধের বইপত্র। সাপ্তাহিক একতা তো আছেই। কমিকস। কি নয়। যা পাচ্ছি তাই গোগ্রাসে গিলছি। নিজের মধ্যে লেখালেখি করার আগ্রহ বাড়তে লাগল। সেবা প্রকাশনীতে যাতায়াত যেন সেই আগ্রহ আরো উসকে দিলো। প্রথম গিয়েছিলাম মি. কাজী সরোয়ার হোসেনের দেখা করতে। সেই দেখা হওয়া থেকে যাতায়াতের শুরু। তারপর রহস্য পত্রিকাতে লেখালেখির শুরু। আস্তে আস্তে লেখালেখির তালিকায় যুক্ত হতে লাগল আরো অনেক সাপ্তাহিক আর মাসিক পত্রিকা। সেসঙ্গে চলতে থাকল পড়া। একসময় আমি লক্ষ্য করলাম রাজনীতি আমাকে টানছে। কিন্তু দেশের রাজনীতি খুবই জটিল আর দুর্বোধ্য মনে হতে লাগল। বিশেষ করে এই রাজনীতি বুঝে সেনিয়ে লেখালেখি করার বিষয়টি বেশ কঠিন মনে হলো। অন্যদিকে, আন্তর্জাতিক বিষয় নিয়ে লেখা তুলনামূলকভাবে সহজ মনে হলো। আর তথ্যও পাওয়া যায় সহজে। ততোদিনে আমেরিকান সেন্টারেও আমার যাতায়াত বেড়েছে। সবমিলিয়ে আন্তর্জাতিক বিষয়াদি নিয়ে লিখতে শুরু করলাম। আজকে মনে হয়, ছোটবেলায় রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত না হই এমন একটা পারিবারিক সতর্কতার সঙ্গে তথ্য সহজলভ্য না হওয়াটা বোধহয় আমার দেশীয় রাজনীতির প্রতি আগ্রহী না হয়ে উঠার কারণ। তবে রাজনীতি বিষয়ক পড়ালেখা এবং রাজনীতি সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে নিয়মিত উঠাবসা করার কারণে রাজনীতি কখনোই আমার থেকে দূরে থাকেনি।

চার.

আজকে এই বয়সে এসে মনে হচ্ছে আমাদের দেশে রাজনীতি শেখার সুন্দর কোন ব্যবস্থা গড়ে উঠেনি। আমার স্কুলজীবনের সহপাঠী যখন জাহাঙ্গীর নগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিপি হলো আমি কিছুটা অবাক হয়েছিলাম এই ভেবে যে, কী করে হলো? ততোদিনে অন্যদের মতো আমি বুঝে গেছি যে, আমাদের দেশের রাজনীতি থেকে সুশাসন ক্রমাগত দূরে সরে যাচ্ছে। তবে, এখন মনে হয় রাজনীতি থেকে সুশাসন দূরে সরে যাওয়ার বিষয়টি ঘটেছিল আরো আগেই। স্বাধীনতার জন্মলগ্ন থেকেই। কেউ কেউ দাবী করেন মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন সময়েই ক্ষমতা দখলের যে নোংরা রাজনীতি শুরু হয়েছিল সেটাই পরবর্তীতে ডালপালা নিয়ে বিস্তার লাভ করেছে। আর যেকারণে দেশ স্বাধীন হওয়ার পরপরই স্বাধীনতা যুদ্ধে নেতৃত্বদানকারী আওয়ামী লীগ ও পার্টি নেতা শেখ মুজিবুর রহমান জাসদের রাজনীতি দ্বারা আক্রান্ত হয়েছিলেন। তিনিও শক্ত হাতে জাসদের রাজনীতিকে মোকাবেলা করেছেন। রাজনীতিতে যে দুই দলের মারামারি ও সহিংসতা তার বীজ তখনই রোপিত হয়েছিল। জাসদ ও আওয়ামী লীগের চালু করা ৭২ থেকে ৭৫ এর সেই সহিংস রাজনৈতিক সংস্কৃতি ধীরে ধীরে বিস্তৃত হয়েছে মাত্র। আজকে দেশে যে বিভক্তির রাজনীতি তারও সূতিকাগার তখনকার রাজনৈতিক সংস্কৃতি যেখানে প্রতিপক্ষকে হত্যা করা, শারীরিকভাবে ঘায়েল করা কিংবা নিশ্চিহ্ন করে দেওয়ার ভয়াল রাজনৈতিক সংস্কৃতির গোড়াপত্তন হয়েছিল। কিন্তু তারপরও বলতে হবে যে তখন রাজনীতি নিয়ে লেখাপড়া ছিলো। ছিল খেলাঘর, চাঁদের হাঁট কিংবা কচি কাঁচার আসরের মতো শিশু সংগঠন যেখানে নিয়মিত বই পাঠের আসর হতো। বই নিয়ে আলোচনা হতো। থানা ও উপজেলাগুলোতে পাবলিক লাইব্রেরি ছিলো। বিভিন্ন ধরনের সাংস্কৃতিক সংগঠন ছিলো। অন্যদিকে, ভিডিও ও স্যাটেলাইট টেলিভিশন ছিলো না। ছিলো না ইন্টারনেট। ফলে, এক ধরনের কন্ট্রোল ম্যাকানিজম ছিলো। যেকারণে একদিকে মারামারি কাটাকাটির দখলের রাজনীতি চললেও মানুষ হওয়ার পাঠদানের বিভিন্ন উপায়গুলোর অস্তিত্ব ও সক্রিয়তা থাকায় সমাজ এখনকার মতো ভারসাম্যহীন হয়ে পড়েনি।

পাঁচ.

রাজনীতির মাধ্যমে সুশাসন প্রতিষ্ঠার আকাঙ্ক্ষা ধীরে ধীরে অপসৃত হয়ে নতুন প্রজন্মের কাছে রাজনীতি হয়ে উঠেছে অর্থ কামাইয়ের উপায়। ফলে, কেউ যখন সুশাসন প্রতিষ্ঠার ইচ্ছে নিয়ে রাজনীতিতে যায় তাকে প্রতিহত করতে উঠেপড়ে লেগে যায় অন্যরা। রাজনীতির প্রকৃত পাঠ না থাকায় এমনটা হচ্ছে। এই অবস্থায় রাজনীতির পাঠশালা দেশব্যাপী ছড়িয়ে দেওয়া জরুরি।

ইন্টারনেট ও তথ্য প্রযুক্তি কোন কিছুকে একদম গ্রাম পর্যন্ত নিয়ে যাওয়ার অবারিত সুযোগ তৈরি করে দিয়েছে। তবে রাজনীতির পাঠশালা শুধুমাত্র ইন্টারনেটকেন্দ্রিক হলে হবে না। দীর্ঘ চার দশকে ক্রমান্বয়ে রাজনীতিতে যে পচন তৈরি হয়েছে সেটা দূর করতে হলে রাজনীতিতে মানুষের সঙ্গে মানুষের ইতিবাচক বন্ধন গড়ে তোলার কঠিন কাজটি করতে হবে। আর সেটা শুধুমাত্র ইন্টারনেটে কোনভাবেই সম্ভব নয়। সমাজে সাংস্কৃতিক কর্মকান্ড বাড়াতে হবে। ব্যক্তির সঙ্গে ব্যক্তির মোলাকাত হতে হবে।

Advertisements

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s