যৌনকাতর যোগী এবং কিছু অভিযোগ


যোগীদের কেউ কেউ টাকার কুমির। ফোর্বস ম্যাগাজিনে এদের নাম উঠে না। কিন্তু নাম উঠা অনেকের চেয়েও তাদের কারো কারো ধনসম্পদ বেশি। এমন একজন বিক্রম চৌধুরী। আমেরিকায় বসবাসকারী বিক্রম চৌধুরীর পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে ৬০০ এর বেশি ইয়োগা সেন্টার আছে। ৬৭ বছর বয়সী বিক্রম নিজেকে ধর্মীয় নেতাদের সঙ্গে তুলনা করতে পছন্দ করে। অহংকারী বিক্রম চৌধুরী আদালতের কাগজপত্রে অভিযুক্ত ধর্ষণকারী।

বিক্রম চৌধুরী যোগ ব্যায়াম শেখাচ্ছেন তারই ছাত্রী ২০ এর কোঠার দুই তরুণী পৃথক ঘটনায় বিক্রমের বিরুদ্ধে ধর্ষণের অভিযোগ এনেছে। ওই দুই ছাত্রী বিক্রমের ৯ সপ্তাহব্যাপী শিক্ষক প্রশিক্ষণ কোর্স করেছিল। তখন তারা বিক্রমের লালসার শিকার হন। তবে বিক্রমের অনেক ভক্ত মেয়ে দাবী করেছে যে, বিক্রম তাদের সঙ্গে কখনো এমন কোন আচরণ করেনি যা থেকে বলা যাবে সে ধর্ষণ করতে পারে। আবার তুলনামূলকভাবে বয়স্ক দু’একজন নারী ভক্ত এও দাবী করেছে যে, বরং মেয়েরাই বিক্রমের সঙ্গ পেতে অস্থির থাকে।

বিক্রমের বিরুদ্ধে অভিযোগকারীদের বক্তব্য হলো তারা যখন বিক্রমের ওখানে ক্লাস করতে যেতো তখন গুরু তাদেরকে সেশন শেষে থেকে যেতে বলত। তাদেরকে দিয়ে বিক্রম শরীর ও হাত পা ম্যাসাজ বা মালিশ করাতো। একসঙ্গে ভিডিও দেখত। নির্যাতনের শিকার একজন জানিয়েছে যে, বিক্রম তাকে বলেছিল যে, সে মাদাম তেরেসার চেয়েও মহান হতে পারবে যদি তার কথা মতো চলে। অন্যজনকে বিক্রম সবসময় বকাঝকা করত। তাকে ইডিয়ট বলতো এবং দুইবার তাকে ধর্ষণ করেছে। অভিযোগকারীরা দাবী করেন যে, বিক্রমের শিক্ষার্থীরা তার এই ধরনের কাজ সম্পর্কে জানে কিন্তু তারা কিছু বলে না।

তবে একথাও সত্যি যে, প্রাচীণ ভারতের ইয়োগা উনিশ শতকের শেষভাগে যখন পশ্চিমা সংস্কৃতিতে বেশ ভালোভাবে অবস্থান করে নেয় তখন থেকেই গুরুদের বিরুদ্ধে যৌন কর্মকান্ড পরিচালনার অভিযোগ উঠে আসছে।

পরামাহানসা জ্ঞানেন্দ্রের লেখা অটোবায়োগ্রাফি অব যোগী বইটিকে আমেরিকাতে ইয়োগা নিয়ে লিখিত প্রথম বই হিসেবে গণ্য করা হয়। জ্ঞানেন্দ্রের বিরুদ্ধে বলা হয় যে, গুরু অনেক সন্তানের বাবা হয়েছেন। ১৯৫২ সালে তার মৃত্যুর আগে জানা যায় যে, তিনি তার রুমের পাশেই ডরমিটরি করে তরুণী যুবতীদের জন্য হারেম বানিয়েছিলেন।

১৯৯৪ সালে ক্যালিফোর্নিয়ায় স্বামী ক্রিয়ানন্দের বিরুদ্ধে সাতজন নারী যৌন হয়রানির অভিযোগ করে। একই বছর কৃপালু সেন্টার ফর ইয়োগা এন্ড হেলথ আশ্রমের অমৃত দেশাইয়ের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠে যে সে আশ্রমের বাসিন্দাদের যৌন নির্যাতন করেছে। বিচারে তাকে ২.৫ মিলিয়ন ডলার জরিমানা দিতে হয়েছিল। আরেক গুরু শ্রী স্বামী রামার বিরুদ্ধে ধর্ষণের অভিযোগকারীকে ১.৯ মিলিয়ন ডলার ক্ষতিপূরণ দিতে হয়েছিল। বিচারক এই ঘটনাকে ‘স্পির্চুয়াল অনাচার’ বলেছিলেন। মধ্য নব্বইয়ে আরো দুইজন গুরু অভিযুক্ত হয়েছিল।

মিডিয়ার ব্যাপক প্রসারের সঙ্গে সঙ্গে ইয়োগারও প্রসার ঘটতে শুরু করে। অনেক ইয়োগা গুরু টেলিভিশন ব্যক্তিত্বে পরিণত হন। তাদের আবার কেউ কেউ অন্য গুরুদের চেয়ে যৌন কর্মকান্ডে বেশি তৎপর। আমেরিকান জন ফ্রেন্ড প্রাচীণ ভারতীয় ইয়োগাকে পশ্চিমা জীবনধারার মিশেলে ১৯৯৭ সালে আনুসারা ইয়োগা নামে নতুন ধরনের ইয়োগা চালু করেন যা অল্পদিনেই জনপ্রিয় হয়ে উঠে। সম্প্রতি তার অনেক বিবাহিত নারী শিক্ষার্থীর সঙ্গে তার যেমন খুশি যৌন-চর্চার খবর প্রকাশিত হয়েছে।

কাঞ্চি মঠের শ্রী জয়েন্দ্র স্বরস্বতিকে খুনের ঘটনায় গ্রেফতার করা হয়েছিল হায়দারাবাদ থেকে ২০০৪ সালের নভেম্বরে। খুন ও ধর্ষণের অভিযোগে প্রেমানন্দ আশ্রমের স্বামী প্রেমানন্দকে ২০০৫ সালে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছিল। তার বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিল ১৩ জন শিষ্যকে ধর্ষণ, দু’জনকে যৌন নির্যাতন এবং একজনকে খুন করার। ২০১১ সালে সে কারাগারেই মারা যায়। কেরালার স্বামী অমৃত চৈতন্যকে ২০০৮ সালে গ্রেফতার করা হয় চারটি শিশুকে ধর্ষণ ও একজন প্রবাসী ভারতীয় নারীকে প্রতারণা করার অভিযোগে। ব্যাঙ্গালোরের স্বামী নিত্যানন্দের বিরুদ্ধেও যৌন নির্যাতনের অভিযোগ আনা হয়। তাকে গ্রেফতার করা হয়। অবশ্য ৫৩ দিন পরে সে মুক্তি পায়। আদালতে এখন মামলা চলছে।

আধ্যাত্মিক গুরুদের এমন বেপরোয়া আচরণের কারণ হিসেবে কারো কারো ব্যাখ্যা হলো আধ্যাত্মিক গুরু ‘আধ্যাত্মিক গুরু’ হওয়ার আগে একজন নিতান্তই সাধারণ মানুষ থাকে। তাদের আর্থিক সঙ্গতি কিংবা সামাজিক প্রভাব কোনটাই উল্লেখযোগ্য নয়। কিন্তু যখন তার ভক্তকূল তৈরি হয় তখন থেকে অবস্থা পাল্টাতে থাকে। যারা একটু নাম কামায় তারা অনেকটা বিনা কষ্টে অঢেল অর্থ কামাতে শুরু করে। সেসঙ্গে সমাজের প্রভাবশালীরা তার ভক্ত হওয়ায় তারা সমাজের উচু স্তরে চলাফেরা করার ও প্রভাব বিস্তার করার সক্ষমতা অর্জন করে। অর্থ আর ক্ষমতার প্রভাব ধারণ করার শিক্ষা না থাকায় তাদের মধ্যে পশু শক্তি জেগে উঠে। তারা তখন বিশ্বাস করতে শুরু করে যে, তারা যা চাইবে তাই তাদের হতে হবে।

জানা যায় যে, ইয়োগা গুরুরা এক ধরনের চুক্তিনামাও তৈরি করে নেয়, যা নারী ভক্তকুল মেনে চলতে বাধ্য। নতুবা তাদের কঠিন পরিণতি ভোগ করতে হয়। সব কিছু যে প্রকাশিত হয় তা নয়। ২০০৬ সালে এমনটাই জানা গিয়েছে স্বামী বিকাশানন্দকে গ্রেফতারের মধ্য দিয়ে। জাবলপুর এলাকার প্রভাবশালী গুরু বিকাশানন্দকে গ্রেফতারকালে তার কাছ থেকে ৬০ এর বেশি সিডি উদ্ধার করা হয়েছিল যেখানে নারী ভক্তদের সঙ্গে তার নানান ধরনের যৌন রসাত্মক দৃশ্য পাওয়া গিয়েছে। হোটেল থেকে গ্রেফতারকালে তার সঙ্গে তিনজন নারী ছিল। বিকাশানন্দের বিরুদ্ধে তার অনুসারী নারীদের সাক্ষ্য পাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছিল। অনেক কষ্টে তার বিচার শেষ করা হয়েছে। সে এখন কারাগারে। দিল্লীর স্বামী বিমানন্দকে ছয়জন নারীসহ গ্রেফতার করা হয়েছিল। তার বিরুদ্ধে অভিযোগ হলো সে তার আশ্রমকে পতিতালয় হিসেবে ব্যবহার করে আসছিল।

যেসব নারীদের আশ্রম ও গুরুদের সঙ্গে গ্রেফতার করা হয় তারা যে সব বোকাসোকা ধরনের নারী তা কিন্তু নয়। বেশিরভাগ উচ্চশিক্ষিত। ইঞ্জিনিয়ার, ডাক্তার, এয়ারহোস্টেজ, করপোরেট ম্যানেজার প্রমুখ। প্রশ্ন হলো এরা কেন গুরুদের ফাঁদ পাতা ভুবনে? অন্ধ ভক্তিই এর কারণ।

এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন যে, ইয়োগা গুরুদের বিরুদ্ধে অভিযোগ ও শাস্তি হওয়ার পরও তারা এখনো অনেকের কাছেই আধ্যাত্মিক নেতা এবং ইয়োগা সমাজে শ্রদ্ধাশীল ব্যক্তিত্ব। এ এক অদ্ভুত দুনিয়া।

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

Connecting to %s