গরিবী হটানো হাসিনা কিংবা ইউনূসের পক্ষে সম্ভব নয়


প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং ড. ইউনূস দু’জনেই দেশ থেকে দারিদ্র দূর করতে বদ্ধ পরিকর। কিন্তু বিশ্বের সম্পদ বিষয়ক ‘গ্লোবাল ওয়েলথ ২০১২’ প্রতিবেদনসহ বিভিন্ন ধরনের আর্থিক প্রতিবেদন ও গবেষণা থেকে একথা সুস্পষ্ট যে, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কিংবা ড. ইউনূস দু’জনের কারো পক্ষেই দেশ থেকে গরিবী হটানো প্রায় অসম্ভব একটা বিষয়। বিষয়টি তাদের নাগালের অনেক বাইরে। তদুপরি, তারা নিজেরা যে ধরনের জীবনযাপন করেন সেটাও গরিবের দুঃখ কষ্ট উপলব্ধির জায়গা থেকে অনেক দূরে হওয়ায় সাফল্য পাওয়ার সম্ভাবনা কমে গেছে। আরো কিছু বিষয় এখানে প্রণিধানযোগ্য।

মানুষ দীর্ঘদিন ধরে যে পরিবেশে বাস করে সেই পরিবেশের বাইরের জগতটাকে উপলব্ধি করার ক্ষমতা তারা সাধারণত হারিয়ে ফেলে। তখন তাদেরকে ধার করা উপলব্ধি দিয়ে বিষয়গুলো বুঝতে হয়। যা কখনোই পারফেক্ট হয় না। শেখ হাসিনা অন্তত ২২ বছর ধরে এক ধরনের সুরক্ষিত জীবন যাপন করছেন। সেটা কখনো প্রধানমন্ত্রী হিসেব কখনো বিরোধী দলীয় নেত্রী হিসেবে। সাধারণ মানুষের মতো তাকে এসময়ে দীর্ঘ যানজটে বসে থাকতে হয়নি। দুঃসহ গরমে বিদ্যুৎবিহীন থাকতে হয়নি। গ্যাসের অভাবে একদিনও তার চুলা বন্ধ করতে হয়নি। ওয়াসার পানি পেতে কখনো সমস্যা হয়নি। ভাতের কষ্ট পেতে হয়নি। কাপড়ের অভাব হয়নি। বাসস্থানের ক্ষেত্রে কখনো চিন্তা করতে হয়নি। সবমিলিয়ে জীবনের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ সময় তিনি সুরক্ষিত অবস্থায় আছেন। তারও আগে যে তাকে কষ্ট করতে হয়েছে তা নয়। অন্যদিকে, ড. ইউনূস মন্ত্রী না হলেও মন্ত্রীদের মতোই জীবন যাপন করেছেন গত দুই দশক ধরে। অন্তত সাধারণ মানুষের জীবনের দুঃখ কষ্ট তাকে ছুঁতে পারেনি। তাকেও বিদ্যুতের কষ্ট করতে হয়নি গত দুই দশকে। গ্যাসের অভাবে না খেয়ে থাকতে হয়নি। সকালে ঘুম থেকে উঠে বালতিতে গোসলের পানি ধরে রাখতে হয়নি। কিংবা রাস্তার ধারে অন্যদের সঙ্গে চাপকলের পানি শেয়ার করতে হয়নি।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং ড. ইউনূস দুজনেই সমাজের সুবিধাভোগী মানুষের অংশ। একথাও মানতে হবে যে, তাদের নিজ নিজ যোগ্যতায় তারা এই সুবিধা ভোগ করছেন। ফলে, তারা গরিবের দুঃখ কষ্ট যা বোঝার সেটা বই পড়ে, পত্রিকায় খবর পড়ে কিংবা অন্যের কাছ থেকে শুনে বুঝেছেন। এই বোঝাটা সঙ্গতকারণেই পুরোপুরি হয়নি। হওয়া সম্ভবও নয়। তবে অন্যদের চেয়ে তারা উন্নত মানুষ বলে, তাদের উপলব্ধি করার ক্ষমতাও অন্য অনেকের চেয়ে ভালো। তারা তাদের হৃদয়ের কোমল অংশ দিয়ে মানুষের দুঃখ কষ্টকে উপলব্ধিতে নিতে পেরেছেন বলেই তাদের দুঃখ কষ্ট দূর করার উপায় নিয়ে ভেবেছেন। ভাবছেন। তাদের হাতে যদি গরিব মানুষের দুঃখ কষ্ট দূর করার ক্ষমতা থাকতো তাহলে তারা নিশ্চয়ই সেটা রাতারাতি করে দিতেন। কিন্তু সমস্যা হলো এটা তাদের হাতে নেই।

মানুষ খুবই জটিল ধরনের প্রাণী। যেকারণে মানুষের সমস্যাগুলোও জটিল। বহুমাত্রিক। সমাজের কিছু মানুষ আছেন যারা সম্পদশালী হওয়ার পরও তাদের সম্পদে সন্তুষ্ট নন। ফলে তারা আরো সম্পদ অর্জনের জন্য বিভিন্ন ধরনের পন্থা অবলম্বন করেন। সম্পদশালী ব্যক্তিরা সাধারণত সমাজের উপরতলার মানুষ হয়ে থাকেন। তারা একটি গোষ্ঠী হিসেবে সমাজে বাস করেন। সম্পদের জোরে তারা উন্নত মানুষ না হওয়ার পরও ক্ষমতাশালীদের নিকটবর্তী হতে পারেন। রাষ্ট্রীয় আচার অনুষ্ঠানে দাওয়াত পান। এভাবে সম্পদশালীদের সঙ্গে ক্ষমতাশালীদের এক ধরনের জোট তৈরি হয়। অনেকে এটাকে সখ্যতা বলেন। তারা নিজেদের মধ্যে ভাবের আদান প্রদানের মধ্য দিয়ে সম্পদকে বহুগুণে বাড়িয়ে তোলেন। এই প্রক্রিয়ায় তারা সমাজের কম সম্পদশালী এবং ক্ষমতাশীলদের মধ্যে একটি অনুগত শ্রেণী তৈরি করেন। এটা শুধু যে বাংলাদেশের প্রবণতা তা নয়। সবদেশেই এমনটা ঘটে থাকে।

যেকারণে দেখা যায় বিশ্বের সবচেয়ে ধনী ৩০০ ব্যক্তির হাতে যে সম্পদ আছে তার সমপরিমাণ সম্পদ আছে সবচেয়ে গরিব ৩০০ কোটি মানুষের হাতে। সাম্প্রতিককালে প্রকাশিত ক্রেডিট সুসি গ্লোবাল ওয়েলথ রিপোর্টে আরো বলা হয়েছে যে, মনে রাখার সুবিধার জন্য ৩০০ ব্যক্তি ও ৩০০ কোটি বলা হলেও প্রকৃতপক্ষে সংখ্যাটি হবে সাড়ে তিনশ কোটিরও বেশি। কারণ বিশ্বের সবচেয়ে ধনী ২০০ ব্যক্তির হাতে সম্পদ আছে ২.৭ ট্রিলিয়ন ডলার। আর সবচেয়ে গরিব ৩৫০ কোটিরও বেশি মানুষের হাতে সম্পদ আছে ২.২ ট্রিলিয়ন ডলার।

অন্যান্য আরো কিছু প্রতিবেদন থেকে দেখা যায় যে, ধনী দেশের সঙ্গে গরিব দেশের বর্তমানে বৈষম্যের অনুপাত হলো ১:৮০; এই ধরনের অসমতা বাড়ছে। আবার ধনী দেশগুলো উন্নয়নশীল গরিব দেশগুলোকে বছরে সাহায্য দেয় মাত্র ১৩০ বিলিয়ন। অন্যদিকে, তাদের দেশের কোম্পানিগুলো উন্নয়নশীল দেশগুলো থেকে বছরে ৯০০ বিলিয়নেরও বেশি তুলে আনে; যাকে গ্লোবাল ফিনানশিয়াল ইন্ট্রিগ্রিটি প্রতিবেদনে চুরি বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

গরিবের শোষণ এখানেই শেষ নয়। গরিব দেশগুলো বিশ্ব ব্যাংকের ঋণের সুদ বাবদ শোধ করে প্রতিবছর ৬০০ বিলিয়ন ডলার। এই তথ্য বিশ্ব ব্যাংকের ইন্টারন্যাশনাল ডেবট স্ট্যাটিসটিকস ডাটাব্যাঙ্কের।

আরো আছে। উন্নয়নশীল দেশগুলো প্রতিবছর ধনী দেশগুলোর চাপানো বাণিজ্যের নিয়মকানুন মেনে চলতে গিয়ে আরো প্রায় ৫০০ বিলিয়ন ডলার হারায়। এই তথ্য অবশ্য ২০০৩ সালের।

আরো একটা বিষয় হলো বিদেশী করপোরেশনগুলোর উন্নয়নশীল দেশগুলোর জমি দখল করা। এক হিসেব মতে, বিদেশী কোম্পানিগুলো এ পর্যন্ত যে পরিমাণ জমি তাদের দখলে নিয়েছে তার মোট পরিমাণ পশ্চিম ইওরোপের আয়তনের সমান। আর মূল্য হিসেবে ২ ট্রিলিয়ন ডলারের সমান।

গ্লোবালাইজেশনের নামে উন্নত দেশগুলো এমন এক পরিস্থিতি তৈরি করেছে যে, উন্নয়নশীল দেশের রাষ্ট্র ও সরকার প্রধানরা দেশ পরিচালনার জন্য ধনী রাষ্ট্রগুলোর উপর কিংবা তাদের দেশের কোম্পানিগুলোর উপর নির্ভরশীল। এই অবস্থায় গরিব দেশের সরকার প্রধান কিংবা রাষ্ট্র প্রধানরা মেনে নিয়েই যেন দেশ চালান।

বাংলাদেশ এর ব্যতিক্রম নয়। আর সেকারণেই শেখ হাসিনা কিংবা ড. ইউনূসের ইচ্ছে থাকলেও তারা খুব বেশি কি আগাতে পারবেন?

তবে একথাও সত্যি যে, তেমন কেউ যদি এগিয়ে আসেন যিনি গ্লোবাইজেশনের এই চক্রকে কায়দা কানুন করে নিজ দেশের জনগণের শক্তিকে জাগিয়ে তোলার মাধ্যমে গরিবী মোকাবেলা করবেন লোভের ও স্বার্থের ঊর্ধ্বে থেকে তাহলে অবশ্য ভিন্ন কথা।

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

Connecting to %s