ফোনালাপ- দুই নেত্রীর পুনর্মিলনের নতুন সম্ভাবনা


আজকের দিনের সবচেয়ে বড় খবরটি হলো প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বিরোধী দলীয় নেত্রী খালেদা জিয়ার সঙ্গে ফোনে কথা বলেছেন। দেশের রাজধানী থেকে শুরু করে প্রত্যন্ত গ্রামে এই বিষয়টি নিয়ে আলাপ হচ্ছে। ফোনে কথা বলার মতো একটা মামুলি বিষয় কতোটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে পরিণত হতে পারে সেটা আজকে প্রমাণিত।

ভাবতে অবাক লাগে, যে দেশের মানুষ দিনে গড়ে প্রায় ১০ কোটি মিনিট ফোনে কথা বলে। সেই দেশের মানুষের প্রধানমন্ত্রী ও বিরোধী দলীয় নেতা গত ৫ বছরে ৫ মিনিটও নিজেদের মধ্যে ফোনালাপ করেননি। দু’জনেই জনগণের নেতা। দু’জনেই জনগণের ভোটে নির্বাচিত প্রতিনিধি। দু’জনের মধ্যে আরো হাজারটা মিল আছে। যেমন, দু’জনেই নারী। দু’জনেই মা। দু’জনেই দেশের প্রধানমন্ত্রী ছিলেন। দু’জনেই দেশের বিরোধী দলীয় নেতা ছিলেন। দু’জনেই রাজপথে একই সঙ্গে এরশাদ বিরোধী আন্দোলন করেছেন। দু’জনেই কারাগারে ছিলেন। দু’জনেই বিধবা। দু’জনের বয়সও খুব কাছাকাছি। দেশে দু’জনের ব্যাপক ভোটার রয়েছে। দু’জনেই দু’টি বড় দলের নেতা। দু’জনের দলেই লাখ লাখ নেতা কর্মী রয়েছে।

এতো মিল থাকার পরও দু’জন ফোনে কথা বলেন না। একই অনুষ্ঠানে গিয়ে নিজেদের মধ্যে চুটিয়ে আড্ডা দেন না। হাসি তামাশা করেন না। দু’জন মিলে বাংলাদেশের ক্রিকেট খেলা দেখেন না। দু’জনে মিলে জুয়েল আইচের জাদু দেখেন না।

জাতীয় ইস্যুতে দু’জনে মিলে শলা পরামর্শ করেছেন এমনটাও দেখা যায় না। দু’জনে মিলে ঘূর্ণিঝড় কিংবা বন্যা পরিস্থিতি মোকাবেলায় কি করতে হবে সেনিয়ে আলাপ আলোচনা করেন না। দেশের অন্যতম বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের উৎস গার্মেন্টস কারখানাগুলোতে শ্রমিক অসন্তোষ নিরসণে কি করা যেতে পারে সেনিয়ে দু’জনে বসে আলাপ আলোচনা করেন না।

পারলে দু’জনে দু’জনের মুখ না দেখার মতো অবস্থা।

প্রশ্ন হলো কেন?

এই দেশের প্রায় ৮০ ভাগ ভোটারের পছন্দের দুই দলের দুই নেতা কেন একে অন্যের কাছ থেকে এতোটা দূরে? কেন তারা বন্ধুর মতো রাজনীতি করতে পারেন না? দেশটা তো তাদের দু’জনেরই। তাহলে কেন তারা একই দেশের নেতা হয়ে দেশকে যৌথভাবে এগিয়ে নিতে যেতে পারছেন না?

আমাদের সম্মানিত নেতা হাসিনা ও খালেদা এই দুই পরিবারের মধ্যে আত্মীয়তার সম্পর্ক না থাকলেও হাসিনা ও খালেদার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ ও বিএনপির উচ্চ পর্যায়ের একাধিক নেতার পরিবারে ছেলে মেয়ে কিংবা ভাইবোনের বিবাহ সূত্রে আত্মীয়তা রয়েছে। এমনকি রক্তের সম্পর্কও রয়েছে। জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে এই ধরনের সম্পর্কের পরিমাণ আরো বেশি।

আজকে খালেদা পুত্র তারেক কোকো কিংবা হাসিনা পুত্র কন্যা জয় সায়মা, প্রায় কাছাকাছি বয়সের হয়েও পরস্পরের বন্ধু নয়। কিন্তু হাসিনা খালেদা যদি পরস্পর যোগাযোগ রাখতেন। রাজনীতিকে তারা যদি তাদের কর্মস্থল ভাবতেন। তাহলে তাদের পুত্র কন্যারাও নিজেদের মধ্যে যোগাযোগ রাখত। তাতে করে এই দুই পরিবার জনগণের কাছ থেকে আরো বেশি শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা পেতেন বলেই মনে করি। যদি কোনদিন সায়মা, জয়, তারেক, কোকোদের সন্তানেরা আত্মীয়তার বন্ধনে আবদ্ধ হয় তাতে আমি কিংবা দেশের মানুষ বিষ্মিত হবে না।

দেশ ও দেশের মানুষের জন্য দায়িত্ব পালন করতে হলে বিরোধী রাজনীতিকদের শত্রু বানিয়ে রাখতে হবে, এমন কোন নিয়ম নেই। তাহলে কেন বাংলাদেশে আমরা এই ধরনের একটা চর্চা দেখতে পাই? গৃহবধু থেকে রাজনীতিতে আসা এই দুই শক্তিশালী নেতাকে কারা বিচ্ছিন্ন করে রেখেছে? আশির দশকে তো তারা পরস্পর কাছাকাছিই ছিলেন? তারা তো হাতে হাত মিলিয়ে এরশাদ বিরোধী রাজনীতি করেছেন। তাহলে, তারা কেন পরস্পর থেকে দূরে সরে গেলেন?

এই প্রশ্নের জবাব খুঁজে পাওয়া কঠিন কিছু নয়।

বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটি সুবিধাবাদী গোষ্ঠী আছে। যারা গাছের উপরেরটা খায় এবং তলারটাও কুড়োয়। এই সুবিধাবাদী গোষ্ঠীর কোন দল নেই। আবার তারা আওয়ামী লীগ ও বিএনপির মধ্যে পদ ও পদবী নিয়ে আছে। এরাই চায় না দুই নেত্রী সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রেখে রাজনীতি করুক। এরাই চায় না, জয় তারেক সায়মা কোকো একে অন্যের বাড়িতে যাক। ঈদে কোলাকুলি করুক। ফিরনি জর্দা পায়েস খাক। তাদের ছেলেমেয়েরা একসঙ্গে ঘুরে বেড়াক। হাসিনা ও খালেদাকে সামনে রেখে এরাই দেশটাকে বিভক্ত করছে। জনগণকে বিভক্ত ও বিভ্রান্ত করছে। এরা তলে তলে দুই নেত্রীকে উস্কানি দিচ্ছে। কুমন্ত্রণা দিচ্ছে। ভুল বোঝাচ্ছে।

বন্ধুত্ব যতো গভীর হয়। ঝগড়া আর মান অভিমানও ততো বেশি হয়। কিন্তু বন্ধুত্বের কারণেই সেটা খুব বেশিক্ষণ স্থায়ী হয় না। হাসিনা ও খালেদা এখন যে বয়সে দাঁড়িয়ে আছেন সেই বয়স থেকে মৃত্যু খুব বেশি দূরে নয়। জন্ম আর মৃত্যুর মাঝে যে জীবন তারা পেয়েছেন সেই জীবনে তারা সুযোগ পেয়েছেন ১৬ কোটি মানুষের নেতৃত্ব দেওয়ার। বিশ্বের মোট জনসংখ্যা ৭০০ কোটি। সেই অর্থে বিশ্বের মোট জনসংখ্যার ৪৩ ভাগের এক ভাগের নেতা তারা দুইজন।

বাংলাদেশের মানুষ অত্যন্ত পরিশ্রমী ও বুদ্ধিমান। বিদেশে বাংলাদেশীরা বুদ্ধি ও পরিশ্রম দিয়ে সুনামের সঙ্গে কাজ করে দেশের জন্য বৈদেশিক মুদ্রা আয় করছেন। দেশের মধ্যেও তারা নানান উদ্যোগ নিয়ে দেশকে সামনে এগিয়ে নিতে কাজ করছেন। তবে অনেকক্ষেত্রে দেখা যায় যে, দলীয় রাজনীতির কারণে পরিশ্রমী ও বুদ্ধিমান বাংলাদেশীরা ঠিকমতো এগোতে পারছেন না। প্রশাসন তাদেরকে নানানভাবে বাধা দিচ্ছে। দলীয় এমপিরা পলিসি লেভেলে কাজ করার পরিবর্তে স্থানীয় রাজনীতিতে অনাহুতের মতো নাক গলাচ্ছে। সবমিলিয়ে একটি জগাখিচুড়ি অবস্থা তৈরি করে রাখা হয়েছে। এই কাজগুলোই করছে সুবিধাবাদীরা। তারা এজন্য সব দোষ চাপিয়ে দিচ্ছে দুই দলের নেত্রী হাসিনা ও খালেদার উপর। তাদের বৈরিতাকে ব্যবহার করছে সর্বত্র। যেকারণে সুবিধাবাদীরা চায় না এই দুই নেত্রী নিজেদের মধ্যে যোগাযোগ করুক।

আজকে যখন মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ফোন করে বিরোধী দলীয় নেত্রী খালেদা জিয়ার সঙ্গে কথা বললেন সেটা সরকার দলীয় অনেক মন্ত্রী যে পছন্দ করতে পারেননি সেটা তাদের চেহারা ও বিভিন্ন ধরনের বক্তব্যে বের হয়ে এসেছে।

আজকে সময় এসেছে এই দুই গুরুত্বপূর্ণ মহিয়সী নারীর একসঙ্গে বসার। এক টেবিলে বসার। একে অন্যের বাসায় যাওয়ার। নিজেদের পরিবারের সন্তানদের মধ্যে যোগাযোগ বাড়ানোর। নিজেদের নাতি নাতনীদের মধ্যে খেলার পরিবেশ তৈরি করার। দায়িত্ব পালনকে প্রফেশনাল দৃষ্টিকোণ থেকে দেখার। দেশ ও দেশের জনগণকে আশ্বস্ত করার যে, দেশ ও দেশের জনগণকে তারা কখনো বিভক্ত হতে দেবেন না। এই দেশ তাদের দু’জনের। তারা আওয়ামী লীগ ও বিএনপি করবেন। নিজ নিজ দলের নেতৃত্ব দেবেন। দলের নীতি ও আদর্শ নিয়ে আগাবেন। কিন্তু জাতীয় ইস্যুতে তারা ঐক্যবদ্ধ থাকবেন। যেমন, স্কুল কলেজের শিক্ষার্থীদের পরীক্ষা, গার্মেন্টস শিল্প, বন্যা মোকাবেলা, সীমান্তে হত্যা ইত্যাদি।

এসব নিয়ে তারা সরাসরি কথা বলতে পারেন। দলের সুবিধাবাদীদের এড়িয়েই তারা কাজটি করতে পারেন। সুবিধাবাদীদের রাজনীতি থেকে নির্বাসনে যতো তাড়াতাড়ি পাঠানো যাবে দেশ ততো দ্রুত আগাবে। আর এই কাজে তারা ফোনের ব্যবহার বাড়াতে পারেন।

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

Connecting to %s