তাপসের বাবার মৃত্যু এবং ভারতীয় দূতাবাসের দাদাগিরি


সৈয়দ তাপসের একটি ফেসবুক স্ট্যাটাস আমার এই লেখার উৎস। তিনি একসময় আমার সহকর্মী ছিলেন। এখন আমার ফেসবুক বন্ধু। স্ট্যাটাসে তিনি তার বাবার মৃত্যু সংবাদ দিয়েছেন। স্ট্যাটাসের একটি স্ক্রিণ শট আমি এখানে দিচ্ছি। আর মূল বক্তব্যটা নিচে বলছি।

ফেসবুকে তাপসের স্ট্যাটাসের স্ক্রীণশট

ফেসবুকে তাপসের স্ট্যাটাসের স্ক্রীণশট

তাপস লিখেছেন যে, তার বাবার বাইপাস সার্জারির জন্য নভেম্বরের ১ তারিখে ভারতে যাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু তিনি গত ২৫ অক্টোবর মারা গিয়েছেন। তাপস তার বাবার মৃত্যুর জন্য ভারতীয় দূতাবাসের কর্মকর্তাদের আচরণকে কিছুটা হলেও দায়ী করেছেন। কারণ, তার বাবাকে ভিসা পেতে চারবার ভারতীয় দূতাবাসে যেতে হয়েছিল দূতাবাস কর্মকর্তাদের নতুন নতুন চাহিদা মোতাবেক বিভিন্ন ধরনের কাগজপত্র সরবরাহ করতে। তারপরও তিনি ভিসা পাননি। এবং যেভাবে তার ভিসা প্রত্যাখান করা হয়েছিল সেটা তিনি মেনে নিতে পারেননি।

তাপস জানাচ্ছেন যে, ২২ অক্টোবর বিকেল ৫ ঘটিকায় তার বাবার ভিসা আনতে যাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু বিকেল ৩টার সময় দূতাবাস থেকে তাকে ফোনে জানানো হয় যে, তিনি যেন ভিসা নিতে যাওয়ার সময় বাংলাদেশী ডাক্তারের কাছ থেকে একটি রেফারেল লেটার নিয়ে আসেন। তার বাবা সেই কাগজ সংগ্রহ করে যখন ভিসা নিতে দূতাবাসে যান তখন দূতাবাস কর্তৃপক্ষ তাকে ভিসা দেওয়ার পরিবর্তে জানায় যে, তার ভিসা সংক্রান্ত সকল কাগজপত্র হারিয়ে গেছে। তাকে আবার নতুন করে সব কাগজপত্র জমা দিতে হবে।

এরপর তাপস ফেসবুক স্ট্যাটাসে বলেছেন যে, ভারতীয় দূতাবাসের মতো একটি প্রতিষ্ঠান থেকে এভাবে কাগজপত্র হারিয়ে যাওয়ার ঘটনায় আমি হতাশ হয়ে পড়লেও পুনরায় কাগজপত্র জমা দেওয়ার জন্য মানসিক প্রস্তুতি নেই। কিন্তু আমার বাবা বিষয়টি মেনে নিতে পারেননি। তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েন এবং পরদিন আমাদের ছেড়ে চলে যান অজানার দেশে।

তাপস তার স্ট্যাটাসে প্রশ্ন করেছেন- ভারতীয় দূতাবাস বাংলাদেশীদের সঙ্গে কী ধরনের আচরণ করে?

তাপসের এই প্রশ্নের উত্তর কে দেবে আমার জানা নেই। তাপস হয়তো এই প্রশ্নের উত্তর আশাও করছেন না। হয়তো এমনিই প্রশ্নটি করেছেন। তিনি নিজেও লিখেছেন, প্রিয় বন্ধুরা আমি মনে করি এই লেখা বাংলাদেশস্থ ভারতীয় দূতাবাস সম্পর্কে আপনাদের সর্তক করবে।

তাপস হয়তো জানেন না, তার বাবা একা নন বাংলাদেশীরা হরহামেশা ভারতীয় দূতাবাসের নানান ধরনের হয়রানি ও অপমানের শিকার হয়ে থাকেন। কোন কারণ ছাড়াই। কয়েকবছর আগের ঘটনা। সম্ভবত ২০০৭ কিংবা ২০০৮ সালের কথা। আমার পরিচিত একজন ভারতীয় ভিসা না পেয়ে অত্যন্ত ক্ষোভের সঙ্গে বলেছিলেন, ওরা ভাবছেটা কি আমি ওখানে গিয়ে ওদের লোকদের চাকরির বাজারে হানা দেব!

ভদ্রলোকের উষ্মার কারণ, আমেরিকা ও ইউরোপে হরহামেশা তিনি যান। ভিসা পেতে সমস্যা হয় না। কিন্তু ভারত তাকে ভিসা দেইনি? এবং ভিসা না দেওয়ার কারণও বলেনি। তিনি ওখানে একটি সেমিনারে অংশ নিতে যেতে ভিসার আবেদন করেছিলেন। সেমিনারের দাওয়াতপত্র ও প্রয়োজনীয় কাগজপত্রও জমা দিয়েছিলেন।

পরিচিত অনেকের কাছেই ভারতীয় ভিসা পাওয়া নিয়ে নানান ধরনের বিড়ম্বনার কথা অনেক শুনি। সব কাগজপত্র ঠিক থাকার পরও হক বানান পাসপোর্টে Hoque আর আবেদনে Haque হওয়ায় কিংবা চৌধুরী বানান ভিন্ন হওয়ায় ভিসা দেওয়া হয়নি। ইলেকট্রিক বিলের কপি না থাকায় ভিসা দেওয়া হয়নি। কিংবা কয়েক ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে থাকার পর যখন আর মাত্র একজন বাকি তখন বলে দিল আজকে সময় শেষ। এমন হাজারো ধরনের কারণ দেখিয়ে ভিসা দিতে গড়িমসি করা। কিংবা ভিসা না দেওয়ার ঘটনা ভারতীয় দূতাবাসে প্রতিদিন ঘটছে। আপনি জানতে আগ্রহী হলে আপনার পরিচিত যারা ভারত গেছে তাদের কয়েকজনের সঙ্গে কথা বললেই বাংলাদেশস্থ ভারতীয় দূতাবাসের বড় ভাই সুলভ আচরণের ঘটনা জানতে পারবেন।

তবুও বাংলাদেশীরা ভারত যায়। সেটাই স্বাভাবিক। পাশের দেশ হওয়ায় এই দেশের অনেকের প্রথম বিদেশ যা্ত্রা শুরু হয় ভারতে যাওয়ার মধ্য দিয়ে। বাংলাদেশস্থ ভারতীয় দূতাবাসের একটি ওয়েবসাইট (http://www.hcidhaka.org/) আছে। সেখানে বিভিন্ন ক্যাটাগরির ভিসার জন্য কি কি ধরনের কাগজপত্র জমা দিতে হবে সেটা বলে দেওয়াও আছে। মেডিকেল ট্রিটমেন্টের জন্য কি কি কাগজ লাগবে সেটাও বলা আছে। কিন্তু অনেকের অভিজ্ঞতা হলো ভারতীয় দূতাবাসের কর্মকর্তারা ঘোষিত কাগজপত্রের বাইরেও তাদের খেয়াল খুশিমতো কাগজপত্র দাবী করেন। এবং হয়রানি করেন। তাপসের ক্ষেত্রেও যেমনটা হয়েছে। তারা কিন্তু একবারেই বলে দিতে পারতো কি কি কাগজপত্র না হলে তারা ভিসা দেবে না। কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে যে, তাপসের বাবাকে চারবার যেতে হয়েছিল। এবং সবশেষে কাগজপত্রই তারা হারিয়ে ফেলেছিল।

অথচ আমরা যখন ভারতের দেশ কিংবা সানন্দার মতো পত্রিকাগুলো কেনা বন্ধ করে দেই তখন সেগুলো স্লিম হয়ে যায়। কলেবর কমে আছে। ২০১১-২০১২ অর্থবছরে আমরা ভারত থেকে বৈধপথে আমদানী করেছি মানে কিনেছি প্রায় ৪০ হাজার কোটি টাকার পণ্য। আর রপ্তানী করেছি মাত্র সাড়ে তিন হাজার কোটি টাকার পণ্য। এখানেই শেষ নয়। ভারতীয় কিছু হাসপাতাল ও কিছু বিদ্যালয় ও কলেজের আয়ের সিংহভাগ আসে বাংলাদেশী রোগী ও শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে। ভারতীয় স্যাটেলাইট চ্যানেলগুলোকে বছরে এক হাজার কোটি টাকার বেশি দিয়ে থাকি আমরা। এই লিস্ট অনেক লম্বা। তারপরও আমাদেরকে ভারতীয় দূতাবাস দাদাগিরি দেখায়। বিএসএফরা আমাদের ফেলানিদের মেরে তারে ঝুলিয়ে রাখে। তারপর বিচারের নামে প্রহসন করে। আমাদেরকে ৫৪টি নদীর পানি দিতে গড়িমসি করে। আমাদেরকে সিডরের পরে খাদ্য হিসেবে পচা চাল পাঠায়।

এই যে ভারত আজকে আমাদের সঙ্গে এতো বিমাতাসুলভ আচরণ করছে সেই ভারত কিন্তু একবার হলেও আমাদের সঙ্গে অত্যন্ত শ্রদ্ধাপূর্ণ আচরণ করেছিল। আমাদের দেশের জনগণ তখন কোলকাতায় বিনে পয়সায় ট্রামে চলাফেরা করতো। বিনে পয়সায় কোলকাতায় থাকতো। আবার মাসিক ভাতাও পেতো। সেটি ১৯৭১ সালে। ওই একবছরই ভারত আমাদেরকে উজাড় করে দিয়েছিল। এমনকি সৈন্য ও গোলাবারুদ দিয়ে সাহায্য সহযোগিতা করেছিল। ভারতীয় জেনারেলদের কাছেই পাকিস্তানী হানাদার বাহিনী আত্মসমর্পণ করেছিল। আমরা পেয়েছিলাম একটি ভূখণ্ড এবং একটি পতাকা। এরপরই শুরু হযেছিল ভারতের দাদাগিরি। যা এখনো চলছে। সেই দাদাগিরির সর্বশেষ শিকার তাপসের বাবা।

আমি আমার লেখা শেষ করব তাপসের স্ট্যাটাসে করা আমার মন্তব্য দিয়ে। যেখানে আমি লিখেছি- তাপস, আপনার বাবার বিদেহী আত্মার শান্তির জন্য প্রার্থনা করছি। আল্লাহ আপনাকে এই শোক সহ্য করার শক্তি দিক সেই প্রার্থনা করছি। সেসঙ্গে আপনার ও আপনার পরিবারের সঙ্গে ভারতীয় দূতাবাস থেকে যে বিমাতাসুলভ আচরণ করা হয়েছে তার তীব্র নিন্দা জানাচ্ছি। আশা করব এমন ধরনের আচরণের বিষয়টি ঊর্ধ্বতনদের নজরে আসবে। এবং তারা বিষয়টিকে গুরুত্ব সহকারে তদন্ত করে দেখে দোষীদের বিষয়ে উপযুক্ত পদক্ষেপ নেবেন।

Advertisements

2 thoughts on “তাপসের বাবার মৃত্যু এবং ভারতীয় দূতাবাসের দাদাগিরি

    • গতকাল আপনার লেখাটা পড়ে আমার ভীষণ মন খারাপ হয়েছিল। রাগ লেগেছিল। তৎক্ষণাৎ লেখাটি লিখেছি। মনকে শক্ত রাখুন। আমিও ২০০৭ সালে আমার বাবাকে হারিয়েছি। আমি জানি বাবা হারানোর ব্যথা। দোয়া করি তার বিদেহী আত্মা শান্তিতে থাকুক। প্রার্থনা করি মহান আল্লাহতায়ালা আপনাকে এই শোক সহ্য করার শক্তি দিন। ভালো থাকবেন।

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s