প্রিয় মুচি শ্রী বিশ্বনাথ


বিশ্বনাথ বাবুর সঙ্গে আমার পরিচয় কখন কিভাবে সেটা এখন আর মনে পড়ে না। তবে এটা নিশ্চিত যে, কোন এক শুক্রবারে বিশ্বনাথ বাবু এসেছিলেন বাসায়। পেশায় মুচি, বিশ্বনাথ বাবুর তারপর থেকে শুধুই আসার গল্প। কাজ থাকুক না আর থাকুক বিশ্বনাথ বাবু একবার উকিঁ দিয়ে যাবেন। শুক্রবার মানেই বাসায় থাকলে বিশ্বনাথ বাবুর সঙ্গে একবার দেখা হওয়া। আর কুশল বিনিময়। বিনিময় কথাটা লিখে মনে হচ্ছে আচ্ছা, বিশ্বনাথ বাবু তো কখনো আমার কাছে জানতে চাননি, আমি কেমন আছি? কি আশ্চর্য!

যাই হোক, বছর পাঁচেক আগে বিশ্বনাথ বাবুর সঙ্গে কয়েক সপ্তাহ দেখা হচ্ছিল না। এদিকে, আমার ঘরে পরার স্পঞ্জ স্যান্ডেলটা ঠিক করা দরকার। স্যান্ডেলের আঙ্গুল আটকে রাখে যে অংশটা সেটা ছিড়ে গেছে। আগেও দুয়েকবার এটা সেলাই করে দিয়েছিল বিশ্বনাথ বাবু। দুই সপ্তাহ পার হয়ে যাওয়ার পরও যখন বিশ্বনাথ বাবু এলেন না আমি আরেক জোড়া স্যান্ডেল কিনে আনলাম। বিশ্বনাথ বাবু এলেন আরো কয়েক সপ্তাহ পর। জানলাম, গাবতলীর রাস্তায় এক্সিডেন্ট করেছিলেন। সেকারণে আসতে পারেননি গত কয়েক সপ্তাহ। চিকিৎসায় তার অনেক টাকা পয়সা খরচ হয়ে গেছে। আরো অনেক টাকা লাগবে। ডাক্তার বলেছে থেরাপি দিতে হবে। কিন্তু সামর্থ্য নেই তার। তার বাড়ির কাছে সিআরপি। কিন্তু সিআরপি সম্পর্কে সে জানেই না। আমি তাকে জানালাম আর সেসঙ্গে সিআরপি-তে নিজের যোগাযোগটুকু কাজে লাগালাম। আর এই প্রথমবারের মতো কাজ করানো ছাড়াই তাকে অর্থকড়ি দিলাম। যেটা আমি কখনো করতে চাইনা। আমার সবসময় মনে হয়, মানুষকে কাজ করা ছাড়া টাকাকড়ি দিলে তার আত্মসম্মান ও মর্যাদাবোধে আঘাত করা হয়। যে কারণে আমি বিশ্বনাথ বাবুকে টাকা পয়সা দেওয়ার জন্য আমার ঘরে পরা সেন্ডেল মেরামত করি, জুতার জিহ্বা গাম দিয়ে লাগাই। আরো অনেক অদরকারি কাজ করাই। যেহেতু কাজ করানোর আগে কখনোই দাম দস্তুর করা হয় না। ফলে, আমি এই সুযোগে আমি তাকে আমার ইচ্ছেমতো টাকা পয়সা দেই। শুরুতে তিনি একবার বলেছিলেন, ‘এতো টাকা কেন, ভাংতি দেন।’ আমি শুধু বলেছিলাম, রেখে দেন। আপনার কাজ আমার পছন্দ হয়েছে। ভালো কাজের জন্য ভালো দাম দিতে হয়, তাই না!

ষাটর্ধ্বো বিশ্বনাথ বাবুর মুখে এক চিলতে হাসি দেখা গিয়েছিল। শুকনো শরীরের লম্বা মানুষটির সেই সুন্দর হাসিটা আমি আরো অনেকবার দেখার সুযোগ পেয়েছি। দুর্ঘটনার পর থেকে বিশ্বনাথ বাবুর সঙ্গে আমার যোগাযোগটা যেন বেড়ে গেল। তার স্ত্রীর অসুস্থতা কিংবা ঈদে পুজোয় তার জন্য সামান্য কিছু টাকা বরাদ্দ থাকতো। উৎসব পার্বন উপলক্ষ্যে সেটা তাকে দিতাম।

প্রথম যেবার তাকে উপহার দিলাম, সেদিন বিশ্বনাথ বাবু আমাকে তার একসময়কার ধনসম্পদ থাকা এবং বিদেশে গিয়ে কাজ করে টাকা পয়সা কামানোর কথা বলেছিলেন। আমি বুঝতে পেরেছিলাম, তিনি আমার দেয়া ভালোবাসার সামান্য উপহারটুকু গ্রহণ করতে কতোটা দ্বিধান্বিত। আমি তাকে আশ্বস্ত করেছিলাম, আমি তাকে পছন্দ করি যেমনটা তিনি আমাকে পছন্দ করেন। আর যেকারণে কাজ থাকুক না থাকুক আমার সঙ্গে দেখা করতে আসেন। তিনি কি বুঝেছিলেন জানি না। তবে আমার উপহার নিয়েছিলেন।

গতকাল ছিল শুক্রবার। বিশ্বনাথ বাবু এসেছিলেন। আমি দোতলার জানলা দিয়েই তাকে কুশল জিজ্ঞাসা করলাম। আর বললাম, আজকে আমার খুব তাড়া আছে আর নিচে নামলাম না। এমনটা যে আগেও দুয়েকবার হয়নি তা নয়। কিন্তু বিশ্বনাথ বাবু আমাকে নিচে নামতে বললেন। এটা এবারই প্রথম হলো। আমি নিচে গেলাম। তিনি বললেন, তার শরীরটা ভালো যাচ্ছে না। মাঝে মাঝে হাত পায়ের বিভিন্ন অংশ ফুলে উঠে। আমি বললাম ডাক্তার দেখিয়েছেন। বললেন, দেখিয়েছি। ডাক্তার বলেছেন, বয়স হয়েছে এখন এটা হবেই। ৭২ বছর বয়স হলো। আর তো চলবে না।

আমি বললাম, আপনার আরো আগেই অবসরে যাওয়া দরকার ছিল।

‘কাজ না করলে কি খাব?’

‘ছেলেমেয়েদের তো বিয়ে দিয়েছেন। তাদের বাড়িতে গিয়ে থাকবেন।’

‘মেয়েরা তো ভালো আছে। ছেলেটা তো আমার সঙ্গেই থাকে।’

‘তার না একটা জুতার কারখানা আছে?’

‘আছে। কিন্তু অন্য সমস্যা আছে। ঘরের সমস্যা বলতে চাই না।’

‘আচ্ছা সেটা না হয়, না বললেন। কিন্তু এই বয়সে এভাবে যন্ত্রপাতি নিয়ে হাটাহাটি করে কাজ না করে কোথাও বসে না হয় কাজ করলেন। সেটা হয় না?’

‘সেটা আমি ভাবছি। সাভারে একটা জায়গা পেয়েছি। ওখানে বসে কাজ করব।’

‘সেটাই করেন। ইনশাল্লাহ তাতে আপনার শরীর ঠিক হয়ে যাবে। আরেকবার ডাক্তারের কাছে যাবেন নাকি? কিডনিতে কোন সমস্যা আছে কিনা দেখালে হতো।’

‘কিডনি দেখেছে ডাক্তার। বলেছে, ঠিক আছে।’

‘তবুও আরেকবার দেখান না।’

‘দেখাইলাম।’

দোতলা থেকে নামার সময় পকেটে টাকা নিয়ে গিয়েছিলাম। বের করে দিলাম। বললাম, এটা রাখেন। ওই যে, সেদিন জুতার ফিতা দিয়ে গিয়েছিলেন দামটা তো নেননি। (কয়েক সপ্তাহ আগে একবার তাকে বলেছিলাম, আমার একটা জুতার ফিতা ছিড়ে গেছে। নতুন জুতা ফিতার অভাবে জুতাটা অকেজো হয়ে পড়ে আছে। তারপর গত সপ্তাহে আমি যখন বাসায় নেই, এক জোড়া জুতার ফিতা দিয়ে গিযেছিল।)

বিশ্বনাথ বাবু শুকনো হাসি দিয়ে টাকাটা নিলেন। বললেন, আমি সাভারে দোকান দিলেও শুক্রবার শুক্রবার আসব কিন্তু।

আমি বললাম, অবশ্যই আসবেন। সময় করে দেখা করে যাবেন।

মনে মনে ভাবলাম, যে বয়সে এই মানুষটির বিশ্রাম নেওয়ার কথা। সকালে পত্রিকা পড়ে গরম চায়ের কাপে চুমুক দেওয়ার কথা সেই বয়সে জুতা মেরামতের যন্ত্রপাতি নিয়ে তিনি বাড়ি বাড়ি যাচ্ছেন।

আমরা সবাই স্বাধীন বাংলাদেশের নাগরিক! দেশকে বিভক্ত করায় দক্ষ তৃতীয় শ্রেণীর রাজনীতিক ও ‍বুদ্ধিজীবিরা যতোদিন দেশ পরিচালনায় থাকবে দেশে বিশ্বনাথদের এভাবেই বেঁচে থাকতে হবে। এরা বিশ্বনাথদের ভোট নেবে ক্ষমতায় যাওয়ার জন্য। তারপর বিশ্বনাথদের সম্পত্তি দখল করে দেশ ও সমাজ ত্যাগে বাধ্য করবে, আর সেই দায় চাপাবে প্রতিপক্ষের উপর নোংরা রাজনীতির সরল সূত্র ধরে।

Advertisements

One thought on “প্রিয় মুচি শ্রী বিশ্বনাথ

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s