বাংলাদেশে হিন্দু নির্যাতনের কারণ মাইন্ডসেট ও সত্য গোপন এবং সমাধানের উপায়


ছবি: ইন্টারনেট
ছবি: ইন্টারনেট
বাংলাদেশে হিন্দু নির্যাতনের ঘটনা সারা বছর ধরেই চলে। কিন্তু মিডিয়াতে খবর হয় বিশেষ বিশেষ সময়ে। যেমন, নির্বাচনের সময়। কারণ, হিন্দু নির্যাতন বিষয়টিকে নিয়ে তখন এক ধরনের ঘোলা পানিতে মাছ শিকার করার ঘটনা ঘটে। যারা এই ধরনের ঘটনার বেনিফিশিয়ারি তারা বিষয়টিকে মিডিয়াতে আনতে তৎপর হয়ে উঠেন।

দেশে হিন্দু নির্যাতন যে হয় সেনিয়ে দ্বিমত কেউ করেন না। কিন্তু হিন্দু নির্যাতন বন্ধ হোক সেটা বোধহয় কোন রাজনৈতিক দলই চায় না। তা না হলে স্বাধীনতার ৪৪ বছর পরও দেশের হিন্দু নাগরিকদের কেন নির্যাতিত হতে হবে? হিন্দু নির্যাতন বন্ধ করতে হলে দুই ধাপে মোট ছয়টি কাজ করতে হবে। প্রথম ধাপের কাজগুলো দ্রুত করতে হবে। এটা হবে চলমান প্রক্রিয়া। যখনই ঘটনা তখনই ব্যবস্থা। প্রথম ধাপের তিনটি কাজ:

১. হিন্দু নির্যাতনের সঙ্গে জড়িত প্রত্যেকের রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিচয় প্রকাশ করতে হবে। সরকারি গেজেট আকারে তো বটেই সেসঙ্গে পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি দিয়ে প্রচার করতে হবে।

২. হিন্দু নির্যাতনের প্রতিটি ঘটনার বিচার করতে হবে।

দুই. হিন্দু নির্যাতনের বিচার বিশেষ আদালতে করতে হবে।

দ্বিতীয় ধাপের কাজগুলো হবে দীর্ঘমেয়াদী। সময় নিয়ে নিখুঁতভাবে করতে হবে। দ্বিতীয় ধাপের তিনটি কাজ:

১. নির্যাতিত দেশত্যাগী হিন্দুদের জমিজমা কারা কিনেছে সেটার তালিকা তৈরি করতে হবে। এই তালিকায় নির্যাতনের শিকার দেশ ত্যাগকারী হিন্দুদের জমির ক্রেতাদের নাম ও রাজনৈতিক পরিচয় থাকবে।

২. দেশের পুলিশ বিভাগকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত করতে হবে। কোন হিন্দু পরিবারের সাহায্যে কিংবা যারাই হিন্দু নির্যাতন মোকাবেলায় কিংবা তথ্য দিয়ে সাহায্য করতে এগিয়ে আসবে তাদেরকে পুলিশ প্রটেকশন দিতে হবে।

৩. হিন্দু নির্যাতন মামলাগুলোর খরচ সরকার বহন করবে।

বাংলাদেশ কতোগুলো মাইন্ডসেট দিয়ে চলে। হিন্দু নির্যাতনের ক্ষেত্রে একটা মাইন্ডসেট হলো আওয়ামী লীগ কিংবা আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা কখনোই হিন্দু নির্যাতন করে না। ২০০১ সালে নির্বাচনের পর দেখা গেলো যে, যেখানে আওয়ামী লীগ জিতেছে এমন জায়গাগুলোতে হিন্দুরা নির্যাতিত হচ্ছে। সুশীল সমাজের সবসময়ের মত হলো হিন্দুদের সবসময় নির্যাতন করে বিএনপি। ২০০১ সালেও সুশীল সমাজ বলে দিল যে, বিএনপির নেতা কর্মীরা হিন্দুদের নির্যাতন করেছে। সুশীল সমাজের এই ধরনের অভিযোগ যে মাইন্ডসেট থেকে উৎসারিত সেটা বোঝা গেলো ২০১৪ সালের জানুয়ারি মাসের নির্বাচনের পর। প্রায় ভোটারবিহীন ও বিএনপি বর্জিত নির্বাচনে যশোরের অভয়নগরে হিন্দুরা নির্যাতিত হওয়ার পরপরই মাইন্ডসেট থেকে সুশীল সমাজ বলে দিলো বিএনপি হিন্দুদের নির্যাতন করেছে নৌকা মার্কায় ভোট দেওয়ায়। এদিকে জাতীয়, আঞ্চলিক ও স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতৃবৃন্দ এই ঘটনাকে হিন্দু বিদ্বেষ ও সাম্প্রদায়িকতা বলতে লাগল। অথচ এটা ছিল পুরোই দলীয় কোন্দল। আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থী ও আওয়ামী লীগের নেতা মি. ওহাব হিন্দুদের নির্যাতন করিয়েছেন।
a href=”https://mgnabi.files.wordpress.com/2014/01/plough-is-boat.jpg”>লাঙ্গলই নৌকা ২০১৪ সালের একদলীয় নির্বাচনের রূপটা কেমন ছিল সেটা জাতীয় পার্টির কাজী ফিরোজ রশীদের ব্যানার ‘লাঙ্গলই নৌকা নৌকাই লাঙ্গল’ থেকেই সুস্পষ্ট। আসন ভাগাভাগির নির্বাচন করেছে মহাজোট এবং মহাজোটের শরিক দল এবং আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থীরা। ঘুরে ফিরে সেই আওয়ামী লীগ। ফলে নির্বাচনোত্তর সহিংসতা যা কিছু সেটার দায়ভারও আওয়ামী লীগ এবং বিদ্রোহী আওয়ামী লীগারদের। দেশের জেলা উপজেলায় লাখ লাখ আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর উপস্থিতিতে সরকারি দলের ক্ষমতাধররা ছাড়া সহিংসতা করার সামর্থ্য কারো থাকার কথা নয়।

সত্য গোপন করার এই প্রবণতা বাংলাদেশে হিন্দু নির্যাতন বাড়িয়েছে। কারণ আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা যখন হিন্দুদের নিযাতন করছে তখন তারা জনগণকে দেওয়া পারসেপশনের কারণেই অপরাধী হিসেবে চিহ্নিত হচ্ছে না। মিডিয়া এবং তথাকথিত সুশীল সমাজ তাদেরকে প্রটেকশন দিচ্ছে। আর স্থানীয়ভাবে আওয়ামী লীগের এমপি, পুলিশ প্রশাসন কিংবা সরকারি প্রশাসন তাদেরকে প্রটেকশন দিচ্ছে। একারণে এক শ্রেণীর আওয়ামী লীগার কোন ধরনের ঝুঁকি ছাড়াই ৪৪ বছর ধরে হিন্দুদের নিযাতন করতে পারছে।

আসলে বাংলাদেশে হিন্দু নির্যাতনের মূল কারণ হিন্দুদের সম্পত্তি দখলের লোভ। লোভীদের দলে আওয়ামী লীগ যেমন আছে তেমনি বিএনপি, জামায়াত, জাতীয় পার্টি সবাই আছে। যে অঞ্চলে যার শক্তি বেশি সেখানে সেই দলের নেতাকর্মী দ্বারা হিন্দুরা নির্যাতিত হচ্ছে। যেহেতু বাংলাদেশে আওয়ামী লীগের ক্ষমতা অন্যদের চেয়ে একটু বেশি সেকারণে হিন্দু নির্যাতনে তাদের ভূমিকা অন্যদের চেয়ে বেশি। যদিও তাদেরকে দোষ দেয়া হয় কম। মূলত প্রশাসন, মিডিয়া ও সুশীল সমাজের মাইন্ডসেট এক্ষেত্রে আওয়ামী লীগকে সহায়তা করে থাকে। মিডিয়া ও সুশীল সমাজের প্রটেকশনে থেকে আওয়ামী লীগাররা বিদেশেও এটিকে প্রতিপক্ষ রাজনৈতিক দলের কাজ বলে প্রচার করে। এভাবেই তারা এক ঢিলে দুই পাখি মারে- ১. হিন্দুদের জমি জমা দখল করে বা কম দামে বেচতে বাধ্য করে এবং ২. দোষটা প্রতিপক্ষের উপর চাপিয়ে তাদের ইমেজ ধ্বংস করে।

লক্ষ্য করলে দেখা যায় যে, নিপীড়ন নির্যাতনের শিকার হিন্দুরা মূলত দুর্বল প্রকৃতির হিন্দু। আজ পর্যন্ত আপনি নিশ্চয়ই শোনেননি একজন হিন্দু সচিব, কিংবা কোন হিন্দু মন্ত্রী কিংবা হিন্দু কোন মেজর বা মেজর জেনারেল নির্যাতিত হয়েছেন? ধর্মের কারণে যদি নির্যাতনের ঘটনা ঘটত তাহলে ক্ষমতাধর হিন্দুরাও বাদ যেতেন না। কারণ সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার রূপটা তেমনই হয়ে থাকে। এটাও প্রমাণ করে যে বাংলাদেশে হিন্দু নিযাতনের বিষয়টি মোটেই সাম্প্রদায়িকতা নয়। বাংলাদেশে হিন্দু নির্যাতন মূলত দুর্বলদের উপর সবলদের অত্যাচার। এই রকম একটি পরিস্থিতিতে পুলিশ আর বিচার বিভাগ বড় ধরনের ভূমিকা নিয়ে এগিয়ে আসতে পারে। যেহেতু হিন্দু নির্যাতন একটি ফৌজদারি অপরাধ।

হিন্দু নির্যাতনের ক্ষেত্রে আমাদের প্রশাসনের কতিপয় দুর্নীতিগ্রস্ত অফিসার ততোধিক দুর্নীতিগ্রস্ত এমপিদের দ্বারা ব্যবহৃত হয়ে থাকে। তাদের চাওয়া মতোই হিন্দু নির্যাতনের বিষয়গুলো মিডিয়াতে প্রচার পায়, সভা সেমিনার হয়, সুশীলদের বিদেশ ট্যুর হয় আর দিন শেষে নির্যাতিত হিন্দু পরিবারগুলো তাদের জমিজমা এলাকার প্রভাবশালীদের কাছে বিক্রি করে ভিনদেশে পাড়ি জমায়। আর সেই জমি কিনে নেওয়ার জন্যই অনেক সময় বস্তিতে আগুন লাগানোর মতো করে হিন্দু নির্যাতনের মতো ঘটনা ঘটানো হয় ক্ষমতাধরদের পক্ষ থেকে।

আমরা সংবাদ মাধ্যমে দেখেছি ২০০৮ সালের নির্বাচনে জয়ী আওয়ামী লীগের প্রায় প্রতিটি মন্ত্রী এমপির কয়েক গুণ থেকে কয়েক শ গুণ সম্পত্তি বেড়েছে। জায়গা জমি বেড়েছে। আমি মনে করি যে, এমপি মন্ত্রী যাদের জায়গা জমি বেড়েছে তার মধ্যে হিন্দুদের জমির পরিমাণ পৃথক তালিকা প্রকাশ করা উচিৎ।

আমি প্রস্তাব করতে চাই ক্ষমতাধররা যখন তাদের সম্পদের বিবরণ দেবেন সেখানে স্থাবর সম্পত্তির বিবরণে তাদের ক্রয়কৃত জমি জমার হিসেবের মধ্যে হিন্দুদের সম্পত্তি কেনার হিসেব পৃথকভাবে দেবেন। এ ব্যাপারে দেশী ও প্রবাসী তথাকথিত প্রগতিশীলদের সমর্থন আশা করছি। আশা করছি তারা তাদের মাইন্ডসেট থেকে বের হবেন এবং আমার দাবীর প্রতি সমর্থন দেবেন।

মাইন্ডসেট বাণিজ্য চলছে দেশে। সেসঙ্গে সত্য গোপন যা বন্ধ না হলে বাংলাদেশে হিন্দু নির্যাতন বন্ধ হবে না।

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

Connecting to %s