নৈতিকতার অধঃপতনে সঙ্গী মুক্তিযোদ্ধা সার্টিফিকেট


বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে অংশ নিয়েছেন কিন্তু মুক্তিযোদ্ধার সার্টিফিকেট সংগ্রহ করেননি, করার কথা ভাবেননি, ভাবছেনও না এমন অনেকেই আছেন। তাদের দুয়েকজনের সঙ্গে আমার কথা বলার সুযোগ হয়েছে। সার্টিফিকেট বিষয়ে তাদের বক্তব্য হলো যুদ্ধ করেছি নাড়ির টানে সার্টিফিকেটের জন্য নয়। এর বিপরীতে লোভ থেকে মুক্তিযোদ্ধার সার্টিফিকেট নিয়েছেন অনেকে যারা যুদ্ধ করেননি। শুধুমাত্র সরকারি সুযোগ সুবিধা পেতে তারা বিভিন্ন সময়ে সার্টিফিকেট সংগ্রহ করেছেন।

পত্রিকায় প্রকাশিত সংবাদ থেকে দেখা যায় যে, মুক্তিযুদ্ধের সার্টিফিকেট দেখিয়ে আরো একবছর চাকরি করার লোভে সরকারের অন্তত ৪ জন সচিব স্বাধীনতার চার দশক পর মুক্তিযোদ্ধা সার্টিফিকেট নিযেছেন। পত্রিকার তথ্য থেকে দেখা যায় যে, স্বাধীনতার নেতৃত্বদানকারী আওয়ামী লীগের শাসনামলে চাকরির মেয়াদ বৃদ্ধিসহ সরকারি বিভিন্ন ধরনের সুযোগ সুবিধা পেতে গত ৫ বছরে ১১ হাজার ১৫০ জন নতুন করে মুক্তিযোদ্ধার সার্টিফিকেট নিয়েছেন।

আমার একটি লেখার শিরোণাম হলো – মুক্তিযোদ্ধার তালিকা তৈরি: একটি ঐতিহাসিক ভুল (http://tinyurl.com/cxzjl8b)। লেখাটিতে ২০১১ সালের ১৮ এপ্রিল আমি লিখেছিলাম, ‘বাংলাদেশের মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকা তৈরির কাজটি একটি ঐতিহাসিক ভুল পদক্ষেপ ছিল বলে আমি মনে করি৷ সে সঙ্গে আমি এও মনে করি যে, এই ভুল থেকে যতো তাড়াতাড়ি সম্ভব বেরিয়ে আসা আমাদের উচিৎ।’ ওই লেখাতে আমি যে প্রসঙ্গটি আনতে পারিনি উদাহরণ না থাকার জন্য। সেই উদাহরণই তৈরি হয়েছে গত ৫ বছরে, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে।

সরকারের একটি ঘোষণায় স্পষ্টত উল্লেখ আছে যে, কেউ মুক্তিযোদ্ধা হলে চাকরিতে যোগদানকালেই তাকে সেই ঘোষণা দিতে হবে। পরে কেউ বললে তাকে মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে গণ্য করা হবে না।

মুক্তিযোদ্ধা গেজেটে প্রকাশিত তথ্য অনুসারে নতুন করে মুক্তিযোদ্ধার সার্টিফিকেটধারীর তালিকায় থাকা নামগুলোর মধ্যে আছেন- স্বাস্থ্যসচিব নিয়াজ উদ্দিন মিঞা, মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক সচিব কে এইচ মাসুদ সিদ্দিকী, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি সচিব একেএম আমির হোসেন, প্রধানমন্ত্রীর সাবেক সচিব মোল্লা ওয়াহিদুজ্জামান, গৃহায়ণ ও গণপূর্ত সচিব খোন্দকার শওকত হোসেন, মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের যুগ্মসচিব আবুল কাসেম তালুকদার।

১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে ১১টি সেক্টরে থাকা প্রায় দুই লাখ যোদ্ধা ভারত থেকে ভাতা ও রেশন পেতো। তথ্য অনুযায়ী ১১টি সেক্টরের ৬১টি সাব সেক্টরের সৈন্য ও গেরিলা ছিল। যার মধ্যে সৈন্য হলো ২৯,২৬৫ জন, নৌ কমান্ডো ৫১৫ জন এবং গেরিলা হলো ১,৫৭,৫০০ জন৷ এছাড়াও মুজিব বাহিনীর সদস্য ছিল ১০ হাজার জন৷ সবমিলিয়ে হলো: ১,৯৭,২৮০ জন৷ অর্থাৎ প্রায় দুই লক্ষ৷ বর্তমানে তালিকাভুক্ত মুক্তিযোদ্ধার সংখ্যা ২ লাখ ৪৮০০। (এখানে একটি তালিকা পেতে পারেন: http://bdn24x7.com/?p=73346) এছাড়াও শেখ মুজিবের দেয়া তথ্যানুযায়ী মুক্তিযুদ্ধে শহীদ হয়েছেন ৩০ লাখ। তারা যদিও সবাই সশস্ত্র যুদ্ধ করেননি কিন্তু তারাই তো সর্বোচ্চ আত্মত্যাগ করেছেন। সেই তালিকাটা শেখ মুজিব তৈরি করেননি। এমনকি আমরা আজো সেই তালিকা তৈরি করছি না। আমরা দুই লাখ সশস্ত্র যোদ্ধার তালিকাও তৈরি করিনি। আমরা দুই লাখ নারী যারা নির্যাতিত হয়েছিল তাদের খোঁজও রাখিনি। সবমিলিয়ে আমরা মুক্তিযুদ্ধকে একটি অস্পষ্টতার মধ্যে রেখে দিয়েছি যেন এটিকে রাজনৈতিক ইস্যু হিসেবে ব্যবহার করা যায়। তবে একে অপব্যবহার করে সরকারি কর্মকর্তারা তাদের চাকরির মেয়াদকাল বাড়াতে পারেন তেমনটি আমরা বোধহয় অতীতে ভাবিনি। আরো কতো কি সামনে দেখতে হবে মুক্তিযোদ্ধা সার্টিফিকেট নিয়ে সে খোদাই মালুম।

স্বাধীনতার ৪৩ বছর পর চাকরির মেয়াদ এক বছর বৃদ্ধির জন্য কিংবা অন্য কোন সরকারি সুবিধা পেতে যে বা যারা ‍মুক্তিযোদ্ধার সার্টিফিকেট নিলেন তারা নৈতিকতার অধঃপতনের অনন্য নজির স্থাপন করলেন। তারা দেশের মানুষকে দেখিয়ে দিলেন বাংলাদেশ সব সম্ভবের দেশ। তারা তরুণ প্রজন্মকে মেসেজ দিলেন তোমাদের জন্য আমরা রাস্তা খুলে রেখে গেলাম। যারা মনে করেন এটি একটি সাধারণ ঘটনা তারা ভুল। এক অসাধারণ ঘটনার জন্ম হলো এই ঘটনার মধ্য দিয়ে। দেশে নৈতিকতার যে অধঃপতন কতোটা ঘটেছে এই ঘটনা তার একটি ছোট নমুনা মাত্র।

যারা বাংলাদেশ নিয়ে স্বপ্ন দেখেন। আমি তাদেরই একজন। তাদের মতো আমিও জানি বাংলাদেশ নানা ক্ষেত্রে এগিয়ে যাচ্ছে। সেসঙ্গে আমি এও জানি যে, একটি নীতি নৈতিকতাহীন নেতৃত্বের কবলে আক্রান্ত দেশ। যাদের কারণে একসময় সকল ধরনের সাফল্য বড় ধরনের হোচট খাবে। একজন অপরাধীর বড় বড় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ডিগ্রী থাকতে পারে ব্যাংক ব্যালেন্স থাকতে পারে আলিশান বাড়ি থাকতে পারে থাকতে পারে আরো অনেক কিছু কিন্তু অপরাধীকে সমাজ গ্রহণ করে না। অপরাধী সবসময় পরিত্যাজ্য। গল্প সিনেমা উপন্যাসে তেমনটাই দেখা যায়। ব্যতিক্রম যেন বাংলাদেশে। এই ব্যতিক্রম ভালো কিছু নয়।

প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধাদের পক্ষ থেকে মুক্তিযোদ্ধার ভুয়া সার্টিফিকেটধারী সকলের প্রতি রইল ঘৃণা এবং করুণা।

পল্লবী। ঢাকা।।
২৬ জানুয়ারি, ২০১৪

(আমি গত তিন বছরে দেখেছি এই জাতীয় লেখাগুলোর পাঠক আমার ব্লগে তুলনামূলকভাবে কম। পাঠক কম হলেও আমি মনে করি এই জাতীয় লেখার প্রয়োজন রয়েছে। সেই চিন্তা থেকেই আমি এই লেখার মাধ্যমে একটি ‘অজনপ্রিয় সিরিজ’ শুরু করলাম। পড়ার আমন্ত্রণ রইল।)

Advertisements

4 thoughts on “নৈতিকতার অধঃপতনে সঙ্গী মুক্তিযোদ্ধা সার্টিফিকেট

    • রণ: লিখতে পারলে আমার ভালো লাগে। আর তো কিছু শিখিনি। রাগ ক্ষোভ প্রকাশের জন্য আর তো কিছু শিখিনি। তবে অস্বস্তি আরো বেড়েছে। সেসঙ্গে অস্থিরতা। সেটা হলো নেতৃত্ব না দিতে পারার অস্থিরতা। তবে আমি তোমার আশাবাদের সঙ্গে বাস্তব কারণেই একমত নই। পাঠক পড়বে। তবে সংখ্যায় তারা খুব বেশি হবে না!:পি

  1. Bhai, read your posts in regular intervals. This is not an exception but wondering if it has any merit in terms of countless unethical and immoral practices that we have been doing as a nation! We use counterfeit certificate for grabbing land and property, public board examination grades and so on; so somebody who “manages” a freedom fighters’ certificate for some benefits is way too within accepted threshold, right?
    🙂

  2. Who are the fake freedom fighters? Are all of them fake? who make them fake freedom fighters?Among those fake freedom fighters many are real freedom fighters. They have involvment in Liberation War 1971 more or less? But some people mention them as fake freedom fighters. Not only carring arm and taking training are the evidents of being a freedom fighter. In the war 1971 many people had to suffer unbearable torture of pakistan army, razakar, nokshal etc. Many people had helped the freedom fighters with shelter, foods, water, information, money. Are those people fake freedom fighters? Are their certificates counterfeit? You people are not the angels, if you get scope , you surly manage FF certificate for getting govt. benefits like govt. officials. Acc said that the no. of freeedom fighters is only 1 lac , is that true? This commission is also a oiling dept. of Govt. It itseif a corrupted dept. It want to take chance to harrasse real freedom fighters on this issue.I think all of the so called fake freedom fighters are innocent because their certificates have come through the signatures of the minister and the secretary of MOLWA. These two persons are mostly liable for giving them counterfeit certificates.They can not avoid their responsibilities.

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s