মন্ত্রীর সিগারেট বনাম শেখ মুজিবের টোবাকো পাইপ


Mujib-

১. এক মন্ত্রীর ছবি ফেসবুক ও পত্রিকায় বড় বড় করে ছাপা হচ্ছে। কারণ তিনি মঞ্চে বসে সিগারেট ফুঁকেছেন। তার নানান ভঙ্গিমার সিগারেট খাওয়ার ছবি প্রকাশিত হচ্ছে। ফেসবুকে তার নিন্দার ঝড় বয়ে যাচ্ছে। মন্ত্রীর নাম সৈয়দ মহসিন আলী। তিনি সমাজ কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের পূর্ণ মন্ত্রী। বিরোধী দল বিহীন দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তিনি মৌলভীবাজার ৩ আসন থেকে নৌকা মার্কায় বিজয়ী হয়েছেন। তার জন্ম ১৯৪৮ সালের ১২ ডিসেম্বর। তিনি ধনু রাশির জাতক। তিনি বিবাহিত এবং তিন কন্যা সন্তানের জনক। মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত জীবনী থেকে দেখা যায় যে, তিনি ভারতের কলকাতা থেকে এমবিএ ডিগ্রী প্রাপ্ত। তবে হলফনামায় তিনি নিজেকে এসএসসি পাস দাবী করেছেন। ছাত্রজীবন থেকেই তিনি বাংলাদেশ ছাত্রলীগের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত। ১৯৭১ সালে সক্রিয়ভাবে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছেন। যুদ্ধে আহতও হয়েছেন। তিনি সিলেট বিভাগ সিএনসি স্পেশাল ব্যাচের কমান্ডার ছিলেন। তিনি সেক্টরস কমান্ডার ফোরামের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য। তিনি বাংলা, ইংরেজি, উর্দু ও হিন্দি ভাষা পড়তে, লিখতে ও বলতে পারেন। তার জীবনীতে লেখা আছে যে, তিনি বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলা গড়ার দৃঢ় প্রত্যয় নিয়ে দেশকে শত্রুমুক্ত করেছেন। যেহেতু তিনি ছাত্র জীবন থেকে আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত এবং বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ডাকে সাড়া দিয়ে মুক্তিযুদ্ধ করেছেন আমরা ধরে নিতে পারি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর আদর্শের সৈনিক।

২. পাবলিক প্লেসে ধুমপান করা বাংলাদেশে আইনত দন্ডনীয় অপরাধ। ধূমপান ও তামাকজাত দ্রব্য ব্যবহার (নিয়ন্ত্রণ) আইন বাংলাদেশে প্রথম প্রণীত হয় ২০০৫ সালে। তখন প্রকাশ্যে ধূমপানের শাস্তি হিসেবে ৫০ টাকা জরিমানার বিধান করা হয়। তবে আইনটি প্রয়োগের সমস্যা ও দুর্বলতা থাকায় ২০১৩ সালে আইনটি সংশোধন করা হয়। যেখানে জরিমানার পরিমাণ বাড়িয়ে ৩০০ টাকা করা হয়েছে। “পাবলিক প্লেস” অর্থ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, সরকারি অফিস, আধা-সরকারি অফিস, স্বায়ত্তশাসিত অফিস ও বেসরকারি অফিস, গ্রন্থাগার, লিফট, আচ্ছাদিত কর্মক্ষেত্র (indoor work place), হাসপাতাল ও ক্লিনিক ভবন, আদালত ভবন, বিমানবন্দর ভবন, সমুদ্রবন্দর ভবন, নৌ-বন্দর ভবন, রেলওয়ে স্টেশন ভবন, বাস টার্নিমাল ভবন, প্রেক্ষাগৃহ, প্রদর্শনী কেন্দ্র, থিয়েটার হল, বিপণী ভবন, চতুর্দিকে দেয়াল দ্বারা আবদ্ধ রেস্টুরেন্ট, পাবলিক টয়লেট, শিশুপার্ক, মেলা বা পাবলিক পরিবহনে আরোহণের জন্য যাত্রীদের অপেক্ষার জন্য নির্দিষ্ট সারি, জনসাধারণ কর্তৃক সম্মিলিতভাবে ব্যবহার্য অন্য কোন স্থান অথবা সরকার বা স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান কর্তৃক, সাধারণ বা বিশেষ আদেশ দ্বারা, সময় সময় ঘোষিত অন্য যে কোন বা সকল স্থান; এবং “পাবলিক পরিবহণ” অর্থ মোটর গাড়ী, বাস, রেলগাড়ী, ট্রাম, জাহাজ, লঞ্চ, যান্ত্রিক সকল প্রকার জন-যানবাহন, উড়োজাহাজ এবং সরকার কর্তৃক, সরকারী গেজেটে প্রজ্ঞাপন দ্বারা, নির্দিষ্টকৃত বা ঘোষিত অন্য যে কোন যান।

৩. ২০০৯ সালের ২৯ এপ্রিল তৎকালীন স্বাস্থ্যমন্ত্রী আ ফ ম রুহুল হক সংসদে ধূমপান ও তামাকজাত দ্রব্য ব্যবহার (নিয়ন্ত্রণ) (সংশোধন) বিল-২০১৩ উত্থাপন করেন। এই সেই মন্ত্রী যার অবৈধ সম্পদের ব্যাপারে দুদক তদন্ত শুরু করা পর তিনি দাবী করেছেন যে, তার হলফনামায় সম্পদের ভুল তথ্য দেয়া হয়েছে। এই মন্ত্রীর নৈতিকতা ঠিক কোথায় সেটা কি ব্যাখ্যার দরকার আছে? তারপরও তিনিই জাতীয় সংসদে এমন একটি আইন উত্থাপন করেছেন যে আইনটি জনস্বাস্থ্য তো বটেই সেসঙ্গে সমাজের প্রতি দায়িত্ববোধ ও নৈতিকতার সঙ্গেও যুক্ত। অনেকে মনে করেন যে, ২০০৫ সালে এই আইন প্রণয়নের ফলে ধুমপায়ীদের মধ্যে এক ধরনের অস্বস্তি তৈরি হয়েছে প্রকাশ্যে ধুমপান করা নিয়ে। যা এই আইনের একটি বড় সাফল্য।

৪. এই আইন কি মানুষকে ধূমপান করা থেকে বিরত করতে পেরেছে? পরিসংখ্যান বলে না। ২০০৫ সালের পর বাংলাদেশে সিগারেট বিক্রি বরং বেড়েছে। সেটা বেড়েছে কারণ মানুষের সংখ্যাও বেড়েছে। সেকারণে ধূমপায়ীর সংখ্যা বেড়েছে। দেশে মাদকের ব্যবহারও বেড়েছে। আমাকে গুলশানের ৯১ নাম্বার রোডে প্রায়ই যেতে হয়। সেটা সকাল বেলা। গত দুই বছরে গুলশানের ৯১ নাম্বার রোডের প্রবেশমুখে সকালবেলা সারবেধে ছোট ছোট কাভার্ড স্কুটারে যেভাবে নানান ব্র্যান্ডের সিগারেট ভর্তি করে বিভিন্ন স্থানে পাঠানো হয় তা দেখতে দেখতে আমার অনেকদিনই মনে হয়েছে ‘মৃত্যুর মিছিল’।

৫. এই মৃত্যুর মিছিল বন্ধ করতে হলে সিগারেট বিড়ি তৈরির উপাদান তামাক চাষ বন্ধ করতে হবে। আমাদের দেশে তামাক চাষ শাস্তিযোগ্য অপরাধ নয়। বিড়ি সিগারেট প্রকাশ্যে পান করাটা শাস্তিযোগ্য হলেও বিক্রি করাটা নয়। অর্থকড়ি তামাক চাষের কারণে বাংলাদেশের খাদ্য নিরাপত্তা যে হুমকির মধ্যে পড়তে পারে সেনিয়ে খুব একটা মাথাব্যথা আছে বলে মনে হয় না। এমন বিড়ি সিগারেট উৎপাদনের সাথে যুক্ত নারীদের স্বাস্থ্য ক্ষতির মতো বিষয়টিও যথাযথ গুরুত্ব পাচ্ছে না। অবশ্য গোড়ার হাত না দিয়ে আগা কাটার সংস্কৃতি অবশ্য আমাদের দেশে নতুন কিছু নয়।

৬. দুঃখ কষ্ট ভোলার জন্য মাদক সেবনকে (মাদকসেবী ও ব্যবসায়ীরা) উৎসাহিত করা হয়। আর বুদ্ধি খোলার জন্য বিড়ি সিগারেটকে অনেকে পছন্দের তালিকায় রাখেন। যদিও এই দু’টোর কোনটাই গবেষণা দ্বারা স্বীকৃত নয়। কিন্তু বিড়ি সিগারেট শরীরে অনেক রোগের বাসা বানানোর পাশাপাশি ক্ষুধামন্দা তৈরি করে সেটা গবেষণা দ্বারা পরীক্ষিত। কেউ কেউ ফান করে বলেন, বাজারে খাবারের যে দাম তারচেয়ে শস্তায় বিড়ি খাওয়া ভালো!

৭. বড়দের বিড়ি সিগারেট খাওয়া সামজে গ্রহণযোগ্য হলেও ছোটদের নয়। ছোটদের সামনে ধূমপান অনেকে নৈতিকভাবে ঠিক নয় বলে মনে করেন। সভা সমাবেশে যারা মঞ্চে বসেন তারা মঞ্চে বসে ধূমপান করেন না। এই অবস্থায় সমাজকল্যাণ মন্ত্রীর ধূমপান আলোচিত ও সমালোচিত হবে সেটাই স্বাভাবিক। তাছাড়া আমাদের দেশে প্রকাশ্যে ধূমপান শাস্তিযোগ্য অপরাধ এবং ধূমপান ও তামাকজাত দ্রব্য ব্যবহার (নিয়ন্ত্রণ) আইন ২০১৩ পাস হয়েছিল যে সংসদে সেখানে তিনিও একজন সংসদ সদস্য ছিলেন। একজন আইন প্রণেতা হয়ে তিনি যে কাজটি করেছেন সেটা নিন্দনীয়। এবং এই কাজের মাধ্যমে তিনি যে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন সেটা ধিক্কার জানাতেই হবে।

৮. একথাও উল্লেখ করা প্রয়োজন যে, ধূমপান করাকে সাধারণভাবে সমাজে ইতিবাচক হিসেবে গ্রহণ করা না হলেও সকল সময়কালে সকল সমাজে ধূমপান একটি আচরণ বা অভ্যাস হিসেবে দেখা গেছে। আবার অনেক নারীর চোখে পুরুষের ধূমপানের অভ্যাস থাকাটা স্মার্টনেস হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে। উল্টোটাও সত্যি। পুরুষের ধূমপান না করাটা অনেক নারীর পছন্দ। আবার সিনেমায় ধূমপান করা বা কায়দা করে সিগারেট ধরানো স্টাইল হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে। কিশোর বা তরুণ ধুমপায়ীদের উপর সিনেমার নায়ক কিংবা পছন্দের ব্যক্তির ধূমপান বিশেষ প্রভাব রাখে বলে গবেষণায় জানা যায়। আমরা ঠিক জানি না সৈয়দ মহসিন আলী কবে থেকে ধূমপান শুরু করেছেন। কিংবা কার দ্বারা তিনি প্রথম ধূমপানে প্রভাবিত হয়েছিলেন? তবে তিনি যে রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত। সেই রাজনীতির প্রবাদ পুরুষ, যাকে হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি বলা হয়, যিনি বাংলাদেশের স্বাধীনতার ডাক দিয়েছিলেন সেই বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান নিজে একজন একনিষ্ঠ ধুমপায়ী ছিলেন। যে দুই তিনটি ছবি শেখ মুজিবুর রহমানকে সারাবিশ্বে পরিচিত করেছে তার একটি ছবি হলো টোবাকো পাইপ (তামাক খাওয়ার পাইপ) মুখে শেখ মুজিবুর রহমান। ফিদেল ক্যাস্ট্রোর হাভানা চুরুটের মতোই এরিন মোরের তামাক পাতা ভরা পাইপ মুখে শেখ মুজিব অত্যন্ত পরিচিত একটি ছবি। ফলে, বঙ্গবন্ধুর আদর্শের একজন সৈনিক হিসেবে তিনি হয়তো ধূমপান করায় আগ্রহী হয়ে উঠেছেন। এটা হতে পারে আবার নাও পারে।

৯. সাধারণভাবে প্রত্যাশা করা হয় যে, গুণী জ্ঞানী মহান মানুষদের আচার আচরণ অন্যরা অনুসরণ করবে। যেমন, মুসলমানদের কাছে আদর্শ ব্যক্তি হলেন হযরত মোহাম্মদ (সাঃ); সবকিছুতেই তাকে অনুসরণ করার কথা বলা হয়। মুসলমান যারা তারা সেটা করার চেষ্টাও করেন।

১০. সৈয়দ মহসিন আলীর যারা ভক্ত গুণগ্রাহী তারা যদি তাকে দেখে সিগারেট খেতে উদ্বুদ্ধ হয়, তাকে অনুসরণ করতে চায় কিংবা করে সেটা বিচিত্র কিছু হবে না। বরং সেটাই স্বাভাবিক। যেকারণে পারিবারিক শিক্ষার কথা বলা হয়। সৈয়দ মহসিন আলীর পরিবারের কোন সদস্য যদি তার ধূমপান করা দেখে ধূমপানে উদ্বুদ্ধ হয়, হতে পারে। যেমন, তার তিন মেয়ে। যেহেতু বাবা ধূমপান করতে পারে। মহসিন আলী সাহেবের মেয়েরা ধূমপান করলে মহসিন আলী সাহেবের আপত্তি করার কোন নৈতিক শক্তি থাকার কথা নয়। যেহেতু তিনি নিজে ধূমপান করেন। কিন্তু বাস্তবে সত্যি সত্যি যদি তার মেয়েরা ধূমপান করেন তিনি কি সেটা মেনে নেবেন? (যদিও একজন অধূমপায়ী ব্যক্তি হিসেবে আমি মনেপ্রাণে চাইব না যে, তার মেয়েরা বাবাকে অনুসরণ করুক।) মহসিন আলী সাহেবের কাছে আমি এই প্রশ্নটি করতে চাই। এখানেই একজন সত্যিকারের নেতার সঙ্গে প্রচলিত নেতার পার্থক্য।

১১. একজন সত্যিকারের নেতা সামগ্রিকভাবে তার আচার আচরণ বিশ্বাস ও চর্চা দ্বারা নিজে শুদ্ধ হওয়ার চেষ্টা করবেন এবং তিনি নিজে যা পালন করেন বিশ্বাস করেন এবং চর্চা করেন সেই বাণী প্রচার করবেন। যা তার চর্চায় নেই, যা তিনি নিজে বিশ্বাস করেন না কিংবা পালন করেন না সেটা তিনি অন্যকে বলতে পারেন না। বলবেন না।

১২. শেষ কথাটি বলব সত্যিকারের নেতা হওয়া অতো সহজ নয়, যতোটা সহজ এখনকার নেতাদের দেখে মনে হয়।

১৩. আমাদের দেশে সেই নেতা বেশি বেশি দরকার যারা তাদের আচরণ, বিশ্বাস ও কর্ম দ্বারা মানুষের কাছে আদর্শ হবেন।

One thought on “মন্ত্রীর সিগারেট বনাম শেখ মুজিবের টোবাকো পাইপ

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

Connecting to %s