বই মেলা এবং বই পড়ুয়া কিশোর তরুণরা


বইমেলার স্টলের আয়তন মন্ত্রী এমপিদের গাড়িগুলোর আয়তনের চেয়েও কম। এই স্বাধীন দেশে মন্ত্রীরা যে গাড়িতে চড়ে মেলা উদ্বোধন করতে আসবেন তাদের সেই গাড়ির চেয়েও ছোট ছোট স্টলে বই সাজাবে প্রকাশকরা এটা যাতে না দেখতে হয় সেকারণেই কি ৩০ লাখ মানুষ শহীদ হয়েছিল ১৯৭১ সালে?
বইমেলার স্টলের আয়তন মন্ত্রী এমপিদের গাড়িগুলোর আয়তনের চেয়েও কম। এই স্বাধীন দেশে মন্ত্রীরা যে গাড়িতে চড়ে মেলা উদ্বোধন করতে আসবেন তাদের সেই গাড়ির চেয়েও ছোট ছোট স্টলে বই সাজাবে প্রকাশকরা এটা যাতে না দেখতে হয় সেকারণেই কি ৩০ লাখ মানুষ শহীদ হয়েছিল ১৯৭১ সালে?

কিশোর তরুণরা বই পড়ছে না বলে হা-পিত্যেশ যারা করেন কিংবা যারা এক কদম আগ বাড়িয়ে কিশোর-কিশোরীদের বই না পড়ার কারণ হিসেবে টেলিভিশন আর কমপিউটারকে দায়ী করেন তারা কি একবার নিজেকে আয়নায় দেখেছেন? আয়নায় নিজেকে দেখলে তারা বুঝতে পারবেন গোড়ার সমস্যাটি। আর চোখ খুলে চারপাশ দেখলে তারা জানতে পারতেন তাদের জানাটা কতোটা ভুল। বই মেলায় কিশোর-কিশোরী আর তরুণ-তরুণীদের জমায়েত তাদের জানাকে মিথ্যা প্রমাণ করার জন্য যথেষ্ট।

বইমেলা ২০১৪
বইমেলা ২০১৪

১লা ফেব্রুয়ারি ২০১৪ দরজার কড়া নাড়ছে। আর মাত্র কয়েক ঘণ্টা পরই শুরু হবে ফেব্রুয়ারি। ফেব্রুয়ারি মানে অন্য অনেক কিছুর সঙ্গে বইমেলার আহ্বান। প্রতিবছর বইমেলার আয়তন বাড়ছে। এবছর মেলা সোরওয়ার্দি উদ্যান মিলিয়ে হবে। প্রায় ৩০০ প্রতিষ্ঠান মেলায় অংশ নেবে। যারা মধ্যে প্রকাশনা সংস্থা হলো ২৩০টি।

বইকে ভালোবেসে মানুষ বই মেলায় যায়। বই কেনা তাদের একটি উদ্দেশ্য। অনেকেই আছেন যারা সারাবছর ধরে বইমেলার অপেক্ষায় থাকেন বই কিনবেন বলে। প্রতিবছর মেলাতে যে টাকার গল্প, উপন্যাস, কবিতা, প্রবন্ধ ইত্যাদি বই বিক্রি হয় আমাদের দেশে সারাবছরে অতো বই বিক্রি হয় না। বইমেলা প্রকাশক, লেখক ও পাঠকদের মিলনমেলাও বটে। দল বেধে বন্ধুবান্ধব, আত্মীয়স্বজনরা বই কিনতে যায়। এটা এক ধরনের আনন্দ ও ভালোলাগার সময় কাটানোর উপায়। বইকে ভালোবেসে প্রাণের টানে মেলায় গিয়ে মন খারাপ হয় না এমন বোধহয় কেউ নেই। কিন্তু নাই মামার চেয়ে কানা মামা ভালো- এই আপ্ত বাক্যটি মেনে নিয়ে সবাই মন খারাপ জয় করার চেষ্টা করেন। প্রশ্ন হলো বই মেলায় গিয়ে কেন মন খারাপ হয়?

দেখুন, মেলায় যারা যায় তারা একটা খোলামেলা পরিবেশ খোঁজে। বইয়ের স্টলগুলোতে কিছুটা সময় নিজের মতো করে বই নেড়ে চেড়ে দেখার সুযোগ খোঁজে। মেলায় হাজার হাজার বই বের হয় সব তো আর কেনা সম্ভব হয় না। কিন্তু দেখার সুযোগ তো পাওয়া যেতে পারে। বই মেলায় গিয়ে সেই সুযোগই পেতে চায় পাঠকরা। কিন্তু আমাদের বই মেলায় সেটা পাওয়া যায় না। আর একারণে সবার মনও খারাপ হয়।

বইমেলায় বই প্রদর্শনের জন্য প্রকাশনা সংস্থাগুলোকে যে জায়গা দেওয়া হয় সেটা নিতান্তই কম। মেলার একটি ইউনিটের আয়তন হলো ৪৮ বর্গফুট, যা বাসাবাড়ির বাথরুমের আকারের চেয়ে কম কিংবা বলতে পারেন মন্ত্রী এমপিদের গাড়িগুলোর আয়তনও এরচেয়ে বেশি। তো এই রকম একটি ছোট জায়গায় প্রকাশরা কিভাবে বই রাখবেন আর পাঠকরাই কিভাবে পছন্দের বই বাছাই করবে?

বইমেলার স্টল তো কোন দোকানঘর হতে পারে না। আমরা নিশ্চয়ই আশা করি না যে, বইমেলায় একটি বইয়ের লিস্ট নিয়ে পাঠক যাবেন আর নিউমার্কেট, নীলক্ষেত কিংবা আজিজ সুপার মার্কেটের মতো করে স্টল ঘুরে ঘুরে লিস্টের বই কিনবেন। আমি মনে করি, মেলায় পাঠক যায় তার প্রিয় লেখকদের বই দেখা ও কেনার পাশাপাশি আরো সব বই নেড়েচেড়ে দেখতে। ইচ্ছে হলে বইয়ের দুয়েক পাতা পড়তে। সঙ্গে যাওয়া বন্ধুদের সঙ্গে সেনিয়ে আলাপ করতে। প্রশ্ন হলো, আমাদের বই মেলা কি সেই সুযোগ দিতে পারছে? আমরা সেই সুযোগ করে দিতে পারছি না কিন্তু আমরা আশা করছি যে, ছেলেমেয়েরা বই পড়ায় আগ্রহী হবে। তারা বই পড়বে। বই কিনবে এবং বই উপহার দেবে। এসব করতে হলে তো বইকে ভালোবাসতে হবে। সেজন্য তো আগে বইয়ের সান্নিধ্য পেতে হবে। আর বইয়ের সান্নিধ্য পেতে হলে তো সেই ব্যবস্থা করে দিতে হবে। তাই না?

আমি নিশ্চিত যে, বইমেলায় প্রিয় লেখকদের সঙ্গে দেখা হবে এমন প্রত্যাশা থাকে অনেকের। তারা বইয়ে অটোগ্রাফ নিতে চায়। সেই ধরনের সুযোগ যে একেবারে থাকে না তা নয়। কিন্তু যেভাবে সেই সুযোগ নিতে হয় সেটা কাঙ্ক্ষিত হতে পারে না। তারমধ্যে লোকজন একটু বেশি হলে যেভাবে ধমকাধমকি চলে কিংবা ধুলোবালিতে একাকার হতে হয় সেটা আর যাই হোক বইমেলা হতে পারে না।

এবছর বইমেলায় চার ইউনিটের স্টল বরাদ্দ পেয়েছে ১১টি প্রকাশনা সংস্থা। চার ইউনিট মানে ১৯২ বর্গফুট, যা বাসাবাড়ির ড্রয়িংরুম কিংবা মাস্টার বেডরুমের চেয়ে ছোট। তিন ইউনিটের স্টল বরাদ্দ পেয়েছে ৪১টি প্রকাশনা সংস্থা। এরা ডাইনিং রুম কিংবা গেস্ট রুমের আয়তনের জায়গা পেয়েছে। আর দুই ইউনিটের স্টল হবে ৮৩টি।

তারপরও বইপ্রেমী মানুষেরা বই মেলায় যাবেন। বই কিনবেন। এই দেশের অন্য দশটা ক্ষেত্রে যেমন মানুষ বাধ্য হয়ে মেনে নিচ্ছে এভাবেই মেনে নেবেন। প্রশ্ন হলো, না্ই মামার চেয়ে কানা মামা ভালো ভেবেই কি আমরা দিন কাটাব? এই স্বাধীন দেশে মন্ত্রীরা যে গাড়িতে চড়ে মেলা উদ্বোধন করতে আসবেন তাদের সেই গাড়ির চেয়েও ছোট ছোট স্টলে বই সাজাবে প্রকাশকরা এটা যাতে না দেখতে হয় সেকারণেই কি ৩০ লাখ মানুষ শহীদ হয়েছিল ১৯৭১ সালে?

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

Connecting to %s