২০৪১ সাল পর্যন্ত ক্ষমতায় থাকার উপায়: আওয়ামী লীগ-জামায়াত জোট গঠন


ইদানীং পত্র-পত্রিকায় দেখতে পাচ্ছি আওয়ামী লীগের নেতা কর্মীরা বলছেন যে, ২০৪১ সালে বাংলাদেশ উন্নত দেশে অন্তর্ভুক্ত হবে। তবে শর্ত হলো দেশে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বের ধারাবাহিকতা থাকতে হবে।

আওয়ামী লীগের নেতৃত্বের ধারাবাহিকতা ক্ষুন্ন করার মতো বাংলাদেশে একটিমাত্র দলই আছে সেটা বিএনপি। যদিও মাঝে মাঝে জাতীয় পার্টির এরশাদ হুঙ্কার দেয় যে, তার দল ক্ষমতায় যাবে। কিন্তু সাম্প্রতিক উপজেলা নির্বাচন থেকে সুস্পষ্ট, এটা ক্রমশ বিলীন হতে চলছে। ৮৭ বছর বয়সী এরশাদের মৃত্যুর পর জাতীয় পার্টি বলে কিছু থাকবে কিনা সেটাও প্রশ্ন। এরশাদ জাতীয় পার্টিকে কোন প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো দেননি। এটা অনেকটা ব্যক্তিকেন্দ্রিক দল। মুজিব কিংবা জিয়া মরার পর তাদের দল টিকে গেলেও জাতীয় পার্টি টিকবে না, সম্ভবত। এরশাদ নিজেও অবশ্য বলেন যে, তিনি যা বলেন সেটাই সব। তিনিই জাতীয় পার্টি। জাতীয় পার্টি মানেই এরশাদ। সর্বশেষ সংসদ নির্বাচনে জাতীয় পার্টি যেভাবে নৌকা মার্কার সহায়তা নিয়েছে তাতে এরশাদের মৃত্যুর পর জাতীয় পার্টি আওয়ামী লীগে বিলীন হয়ে গেলে সেটা এক স্বাভাবিক ঘটনা হিসেবে গণ্য হবে।

এবারের উপজেলা নির্বাচনের আগ পর্যন্ত জাতীয় পার্টি দেশের তৃতীয় বৃহত্তম দল ছিল। জামায়াতে ইসলামী ‍উপজেলা নির্বাচনে সেই জায়গা দখলে নিয়েছে। এমনকি জাতীয় পার্টির ঘাটি হিসেবে খ্যাত উত্তরবঙ্গে জামায়াত চেয়ারম্যান কিংবা ভাইস চেয়ারম্যানের পদ বাগিয়ে নিয়েছে। জামায়াতে ইসলামীর এমন উত্থানের কোন সন্তোষজনক ব্যাখ্যা দিতে পারছেন না বাঘা বাঘা রাজনৈতিক বিশ্লেষকগণ। তারা কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে পড়েছেন। মিডিয়াগুলোতে রাজনৈতিক বিশ্লেষকগণ টক শোতে হাজির হয়ে তাদের অপারগতা প্রকাশ করছেন। তারা বলছেন যে, বাংলাদেশের মানুষের আচরণ বোঝা দুঃসাধ্য। নতুবা সরকার বিরোধী আন্দোলনে ঢাকা ছাড়া পুরো দেশে যেভাবে জামায়াতের তান্ডবের চিত্র তারা প্রচার হতে দেখেছে সেখানে সাধারণ জনগণের তো উচিৎ ছিল ঘৃণা ভরে জামায়াতকে বর্জন করা। কিন্তু তারা সেটা না করে বরং জনগণ আওয়ামী লীগকে প্রত্যাখ্যান করছে। এমনকি অনেক উপজেলায় জামায়াতের প্রার্থীর সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা হচ্ছে বিএনপির প্রার্থীর। এরশাদের ঘাটি হিসেবে খ্যাত ‍উত্তরবঙ্গেও জামায়াত তাদের শক্ত অবস্থান দেখিয়েছে। অনেক বিশ্লেষক মনে করছেন যে, বাংলাদেশের রাজনীতিতে চিরপ্রতিদ্বন্দ্বি বিএনপিকে কোনঠাসা করতে হলে আওয়ামী লীগকে জামায়াতের সঙ্গে কৌশলগত জোট তৈরি করতে হবে। তারা এক্ষেত্রে জামায়াত-আওয়ামী লীগের অতীত জোট গঠন করাকে উদাহরণ হিসেবে টেনে আনছেন।

আওয়ামী লীগ ১৯৯১ থেকে ১৯৯৬ সময়কালে বিএনপিকে ধরাশায়ী করতে জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে কৌশলগত জোট তৈরি করেছিল। পরবর্তীতে জামায়াতকে বিএনপি নিজ জোটে টেনে নেয়ায় আওয়ামী লীগ জাতীয় পার্টিকে জোটে নেয়। সেসময়ে জাতীয় রাজনীতিতে জামায়াতের অবস্থান চার নাম্বারে। আর জাতীয় পার্টি ছিল তিন নাম্বারে। এবারের উপজেলা নির্বাচনে জামায়াত তিন নাম্বারে উঠে এসেছে। আর সংসদের বিরোধী দল জাতীয় পার্টির ফলাফল গণনাতেও আনা সম্ভব হচ্ছে না। এই প্রেক্ষাপটে আওয়ামী লীগ আগামী সংসদ নির্বাচনে নিচের দু’টি পথের একটিকে বিবেচনা করতে পারে:

১. পূর্বের মতো জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে কৌশলগত জোট গঠনের মাধ্যমে বিএনপিকে রাজনীতি থেকে মাইনাস করার মতো অবস্থানে ঠেলে দেয়া। এর সুবিধাজনক দিকটি হলো আগের বারের সমস্যাগুলোকে বিবেচনায় রেখে তারা আরো শক্তিশালী অবস্থান তৈরিতে সক্ষম হবে।

২. জামায়াতকে গোপনে সাহায্য সহযোগিতার মাধ্যমে সংসদে বিরোধী দল হিসেবে নিয়ে আসা। আমাদের মনে রাখতে হবে যে, কাদের মোল্লার ফাঁসির দাবীতে গণজাগরণ মঞ্চ তৈরি হয়েছিল জামায়াতের সঙ্গে আওয়ামী লীগের গোপন আতাতের অভিযোগে। তাছাড়া গত আওয়ামী লীগ শাসনামলেই জামায়াতে ইসলামী প্রথমবারের মতো এককভাবে হরতাল করার সাহস দেখিয়েছে স্বাধীন বাংলাদেশে।

আওয়ামী লীগের নীতি নির্ধারকরা নিশ্চয়ই বোঝেন যে, বাংলাদেশে জামায়াত যতো শক্তিশালীই হোক না কেন অতোটা শক্তিশালী কখনোই হবে না যে, তারা রাষ্ট্র ক্ষমতায় যেতে পারবে। ফলে, ২০৪১ সাল পর্যন্ত ক্ষমতায় যদি আওয়ামী লীগ থাকতে চায় তবে তাদের দরকার হবে এমন একটি বিরোধী দল যে বিরোধী দল কখনো এক নাম্বারে যেতে পারবে না। আবার যারা ক্ষমতার স্বাদ পাওয়ার কারণে কখনো বিএনপিমুখী হবে না।

জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে আওয়ামী লীগের জোট গঠনের ক্ষেত্রে কতগুলো চ্যালেঞ্জ আছে। প্রথম চ্যালেঞ্জটি হলো সময়। ১৯৯১ থেকে ১৯৯৬ আর ২০১৪ এক নয়। সময় বদলিয়েছে। ইতোমধ্যে গণজাগরণ মঞ্চের মতো একটি ঘটনা ঘটে গেছে। যার ফলশ্রুতিতে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন সরকার বাধ্য হয়েছিল কাদের মোল্লার বিচারের রায় পুনর্বিবেচনায় আইন সংশোধনের পদক্ষেপ নিতে। তবে রাজনৈতিক সুবিধা পেতে আওয়ামী লীগ যেমন জেনারেল মঞ্জুর হত্যার রায়ের তারিখ বারবার পেছাচ্ছে তেমনিভাবে জামায়াতে ইসলামীকে নিজেদের স্বার্থে ব্যবহারের পথগুলোকেও খোলা রাখছে।

ক্ষমতাকেন্দ্রিক রাজনীতিতে ক্ষমতায় যাওয়াটাই মূল লক্ষ্য। সেখানে পথের কাদা ময়লা কাপড় চোপড় নষ্ট করলেও নেতারা সেটা মেনে নেয় ক্ষমতার খাতিরে। বাংলাদেশের রাজনীতিতে গত দুই দশকে ক্ষমতায় যাওয়ার বিষয়টি প্রাধান্য পেয়েছে ক্রমাগতভাবে। যেকারণে রাজনীতিতে রাজনীতিকদের চেয়ে ব্যবসায়ীদের আধিপত্য বেড়েছে। ব্যবসায়ীর কাছে লাভটাই মুখ্য। এখনকার রাজনীতিতে যেকারণে ব্যক্তি স্বার্থটাই মুখ্য। গুলিস্তানের মেয়র হানিফ ফ্লাইওভারের নির্মাণ ব্যয়সহ সকল ধরনের অবকাঠামোর নির্মাণ ব্যয় প্রাক্কলিত ব্যয়ের চেয়ে কয়েক গুণ বৃদ্ধি ব্যক্তি স্বার্থেরই প্রতিফলন। রাজনীতি এখন ব্যবসা বাণিজ্যের সিড়িমাত্র। ফলে, আওয়ামী লীগ ও বিএনপির রাজনীতিতে মুজিব ও জিয়ার নীতি ও আদর্শ বিলুপ্তির পথে। এটা পুরনো তথ্য। কারণ গত দুই দশকে এনিয়ে অনেক কলামিস্ট কলাম লিখেছেন। রাজনৈতিক বিশ্লেষক তাদের মতামত দিয়েছেন। ক্ষমতার লোভের প্রসারে তাদের সেই সব লেখার বক্তব্য ক্রমশ দুর্বল থেকে দুর্বলতর হয়েছে। আমরা এখন এমন এক সময়ে দাঁড়িয়ে যেখানে দেশ ও দেশের মানুষের উন্নয়ন নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে ‘লোভ’ দ্বারা। যেহেতু লোভ কোন নীতি নৈতিকতা মানে না। ফলে পূর্ব অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে আওয়ামী লীগ ও জামায়াতের জোট গঠন অসম্ভব কিছু নয়।

One comment

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

Connecting to %s