আওয়ামী লীগের জন্মদিনে আমার উপহার :: রাজনৈতিক সরকারের স্বেচ্ছায় পদত্যাগের উপযুক্ত সময় কোনটা?


আব্রাহাম লিঙ্কন বলেছিলেন, “He has a right to criticize, who has a heart to help.”
কালকে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের জন্মদিন। এই লেখাটি ৬৫ বছর বয়সে পা দেয়া আওয়ামী লীগের জন্য আমার জন্মদিনের উপহার।

বাংলাদেশ সরকারের নেতৃত্ব দিচ্ছে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ। এটি একটি রাজনৈতিক দল। আজ থেকে প্রায় ৬৫ বছর আগে, ১৯৪৯ সালের ২৩ জুন দলটি প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। তখন বাংলাদেশ ছিল পূর্ব পাকিস্তান। আর আওয়ামী লীগের নাম ছিল পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগ। হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী ও আবুল হাশেমের নেতৃত্বে বঙ্গীয় প্রাদেশিক মুসলিম লীগের একাংশের সম্মেলনের মধ্য দিয়ে পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগ গঠিত হয়েছিল। প্রথম সভাপতির দায়িত্ব পান মাওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী এবং সাধারণ সম্পাদক হন মি. শামসুল হক। যুগ্ম সাধারণ সম্পাদকমন্ডলীর দায়িত্ব পান সর্বজনাব শেখ মুজিবুর রহমান, খন্দকার মোশতাক আহমদ ও এ কে রফিকুল হোসেন। ১৯৫৫ সালে মওলানা ভাসানীর উদ্যোগে ধর্মনিরপেক্ষতার চর্চা এবং অসাম্প্রদায়িক চেতনা প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে সংগঠনটির নাম থেকে ‘মুসলিম’ শব্দটি বাদ দেয়া হয়। দলটির নাম হয়: পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগ। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর দলটির নতুন নামকরণ হয়: বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ।

বাংলাদেশের ক্ষমতায় আসীন বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের মূলনীতি হলো: বাঙালি জাতীয়তাবাদ, গণতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতা তথা সকল ধর্মের স্বাধীনতা নিশ্চিতকরণ ও অসাম্প্রদায়িক রাজনীতি এবং সমাজতন্ত্র তথা শোষণমুক্ত সমাজ ও সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা।

আওয়ামী লীগ ২০০৮ সালের নির্বাচনে জয়ী হওয়ার মধ্য দিয়ে দেশ পরিচালনার দায়িত্ব পেয়েছে। ছয় বছরের বেশি সময় ধরে আওয়ামী লীগ বাংলাদেশ সরকারের নেতৃত্ব দিচ্ছে। আওয়ামী লীগের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যের মধ্যে বলা আছে যে, দলটি গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংহত করা এবং রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব ও অখণ্ডতা সমুন্নত রাখবে। আওয়ামী লীগ জনগণকে প্রজাতন্ত্রের মালিক গণ্য করবে এবং জনগণের সাংবিধানিক অধিকার প্রতিষ্ঠা ও সংরক্ষণ করাকে তাদের দায়িত্ব মনে করবে। তারা রাষ্ট্রের সকল নাগরিকের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক মুক্তি এবং কল্যাণ নিশ্চিত করতে অঙ্গীকারাবদ্ধ এবং মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় একটি অসাম্প্রদায়িক, গণতান্ত্রিক সমাজ ও রাষ্ট্রব্যবস্থা গড়ে তোলাও তাদের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য।

আমরা যখন স্বেচ্ছায় পদত্যাগের কথা বলি তখন আত্ম-মূল্যায়নের প্রশ্নটি চলে আসে। নতুবা একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র ব্যবস্থায় ভোটের মাধ্যমে সরকার পরিবর্তন হয়। সেখানে পদত্যাগের প্রশ্ন আসবে কেন? বাংলাদেশের ক্ষেত্রে ১৯৯১ সাল থেকে প্রতি ৫ বছর পর পর জনগণ ভোটের মাধ্যমে নির্বাচন করে কে বা কারা দেশ চালাবে। এই প্রক্রিয়ায় আওয়ামী লীগ এখন দেশের ক্ষমতায়। মাত্র সেদিন, ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচনে ১৫৪টি আসনে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় ও বিনা ভোটে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়া এবং সংসদের ৩০০ আসনের মধ্যে ২৩০টি আসনে জয়ী হওয়ার মধ্য দিয়ে আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করেছে। গণতন্ত্রের রীতি অনুযায়ী ২০১৯ সালে পরবর্তী সংসদ নির্বাচন না হওয়া পর্যন্ত আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকবে। এনিয়ে দ্বিমত করার কোন সুযোগ নেই। কিন্তু সমস্যা দেখা দিয়েছে অন্যখানে।

আওয়ামী লীগ একটি প্রাচীণ ও ঐতিহ্যবাহী রাজনৈতিক দল। তাদের কাছে যেনতেনভাবে ক্ষমতায় থাকাটাই একমাত্র লক্ষ্য হওয়ার কথা নয়। বিশেষ করে যেখানে দলটির মূল নীতি এবং লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যগুলো প্রায় বিপর্যস্ত। আওয়ামী লীগের চারটি মূল নীতির অন্তত তিনটি মূল নীতি এখন বড় ধরনের প্রশ্নের সম্মুখীন। চারটি লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যের অন্তত তিনটি লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য প্রায় ভঙ্গুর। এই অবস্থায় রাজনৈতিক দল হিসেবে আওয়ামী লীগের আত্ম-মূল্যায়ন হওয়াটা জরুরি বলে মনে করেন কেউ কেউ। যারা মনে করেন আওয়ামী লীগের আয়নায় নিজেকে দেখা দরকার, তাদের সঙ্গে দ্বিমত করেন না কট্টর আওয়ামী লীগ নেতারাও। ব্যক্তিগতভাবে ও চায়ের আড্ডায় এনিয়ে তারা আলোচনাও করেন। কিন্তু আনুষ্ঠানিকভাবে তারা কখনোই এটা প্রকাশ করেন না। একথা ঢাক ঢোল পিটিয়ে বলার কিছু নেইও। তবে আত্মমূল্যায়ন করার কথা বলা যতো সহজ, বাস্তবায়ন তো অতো সহজ নয়। সেখানে সমস্যা আছে।

গত শতকের চল্লিশের দশকে ঢাকার ১৫০ নম্বর মোগলটুলির মি. শওকত আলীর বাসভবনে আওয়ামী লীগের জন্মপূর্ব আলাপ আলোচনায় যে নেতারা সমবেত হয়েছিলেন তাদের মধ্যে আত্মসমালোচনা ও আত্মমূল্যায়ন করার যোগ্যতা ও সাহস থাকলেও সময়ের ব্যবধানে আওয়ামী লীগের নেতৃত্ব যাদের হাতে এসেছে তাদের মধ্যে সেই গুণাবলী প্রায় অনুপস্থিত হতে হতে বিলীনপ্রায়। এখন মাঝে মাঝে দলটির বিভিন্ন পর্যায়ে আত্মসমালোচনার নামে কিছু আলাপচারিতা হয় তবে তাতে আত্মসমালোচনার চেয়ে বন্দনা বেশি থাকে।

প্রকৃত ও চুলচেরা আত্মসমালোচনা ও আত্মমূল্যায়ন থেকে সরে আসার কারণে দলটির নেতৃত্বকে খেসারত দিতে হয়েছে। আমরা লক্ষ্য করি ১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নৃশংস হত্যার পর স্বাধীনতার নেতৃত্বদানকারী আওয়ামী লীগকে ২১ বছর ক্ষমতার বাইরে থাকতে হয়েছিল। স্বৈরাচার এরশাদের উপজেলা নির্বাচনে অংশ নিয়ে ১৯৮৬ সালে রাজনীতিতে কিছুটা ফিরে আসার চেষ্টা করলেও খুব একটা সুবিধা করতে পারেনি বি টিম হওয়া ছাড়া। এরপর এরশাদকে হটানোর পর ১৯৯১ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ জিততে পারেনি তাদের অতি আত্মবিশ্বাসের কারণে। মূলত এই অতি আত্মবিশ্বাস থেকেই দলটির নেতা নেত্রীরা আত্মসমালোচনা ও আত্মমূল্যায়ন থেকে বিরত থাকছে। ১৯৯৬ সালে ক্ষমতায় আসার পরও ধারাবাহিকতা ধরে রাখতে পারেনি। ক্ষমতার পালাবদলে জনগণের প্রত্যাখানের শিকার হতে হয়েছিল ২০০১ সালে এবং নিজেদের প্রবর্তিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার বাতিল করে দলীয় সরকারের অধীনে ৩০ শতাংশের কম ভোটারের উপস্থিতির নির্বাচনের মধ্য দিয়ে এবার সরকার গঠন করার মাধ্যমে বাংলাদেশের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো পর পর দু’বার ক্ষমতায় আসতে পারল আওয়ামী লীগ। আওয়ামী লীগের তৃণমূলের নেতাও এখন উজ্জীবিত। কেউ কেউ অতি মাত্রায়।

এরকম একটি বাস্তব অবস্থার প্রেক্ষিতে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন রাজনৈতিক সরকারের পদত্যাগের প্রশ্নটি সামনে চলে আসছে। কেন, সেনিয়ে আলোচনা হতে পারে।

একটি বিষয় ‍সুস্পষ্ট যে, বাংলাদেশে এই মুহুর্তে আওয়ামী লীগের বিকল্প কোন রাজনৈতিক দল আছে জনগণ তেমনটা মনে করেন না। বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোও সেটা জানে। আওয়ামী লীগও জানে। ফলে আওয়ামী লীগ দিনে দিনে আরো অহংকারী হয়ে উঠছে। এতে তাদেরকে খুব বেশি দোষ দেয়া যাবে না। কারণ আওয়ামী লীগ যারা করে তারা তো মানুষই। আজ একথা সুস্পষ্ট যে, আত্মসমালোচনাহীন ক্ষমতার সুবিধাভোগী আওয়ামী লীগ নেতৃত্ব তাদের দলের ভবিষ্যৎ নিয়ে মোটেই চিন্তিত নয়। এমনকি দল হিসেবে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের মূলনীতি এবং লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য ব্যত্যয় হওয়া সত্বেও তাদেরকে বিচলিত মনে হয় না, যেন এ আর এমন কি।

আওয়ামী লীগের নেতৃত্ব ক্ষমতার মধুর যে সুমিষ্টতা সেই সুমিষ্টতা পুরোপুরি পেয়ে গেছে। বাঘ যেমন একবার মানুষের রক্তের স্বাদ পেলে নরখাদক হয়ে যায় তেমনি আওয়ামী লীগের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতৃত্ব আর্থিক সুবিধা পাওয়ার মধ্য দিয়ে কিছুটা পরিমাণে অর্থলোভী হয়ে পড়েছে। তাদের কারো কারো জীবনের চালিকাশক্তি অর্থ হওয়ার কারণে যে আদর্শ ও উদ্দেশ্য নিয়ে আজ থেকে ৬৫ বছর আগে আওয়ামী লীগ প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল সেটা তারা ভুলে গেছে। তাদেরকে খুব একটা দোষও দেয়া যায় না। কারণ এখনকার আওয়ামী লীগে ‘প্রকৃত আওয়ামী লীগারের’ সঙ্কট রয়েছে।

আওয়ামী লীগারদের বেশিরভাগ এখন অর্থ কেন্দ্রিক চিন্তাভাবনা থেকে ক্ষমতাকে মধুর হাড়ি মনে করছেন। তারা আরো মনে করছেন যে, তারা যদি ‘মধুর হাড়ি’ ছেড়ে দেন তাহলে যারা এই হাড়িতে মুখ দেবে তারা কোনমতেই তাদের চেয়ে ভালো হবে না। বরং হাড়ির মধূ খেতে গিয়ে হাড়িটাকেই হয়তো ভেঙ্গে দেবে। ফলে, মধুর হাড়ি রক্ষা করাটাও আওয়ামী লীগের নেতৃত্বের একটি অংশ জরুরি কাজ বলে মনে করেন। একে আপনি ইচ্ছে করলে সংরক্ষণবাদ বলতে পারেন। তবে যেনামেই ডাকুন না কেন; অতি লোভ ও অতি সংরক্ষণবাদের কারণে পত্র-পত্রিকার খবরে মাঝে মাঝেই আওয়ামী লীগের মধ্যে অন্তঃকলহের কথা প্রকাশিত হয়। হাড়ির মধু ভাগাভাগি নিয়ে নিজ দলের মধ্যে কোন্দলে জড়িয়ে পড়ার ঘটনা দ্বিতীয় মেয়াদের নির্বাচনের পর বেড়েছে। আওয়ামী লীগের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতৃবৃন্দ এসবের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ছেন। সম্প্রতি পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে একটি অবৈধ বিশ্ববিদ্যালয়ের একাংশের পক্ষে সুপারিশ করেছেন একাধিক মন্ত্রীসহ ছয়জন এমপি। অন্য অংশের জন্য সুপারিশ করেছেন একজন মন্ত্রীর স্ত্রী। মন্ত্রী স্বামী ও তার স্ত্রীর এই যে বিভক্তি সম্পদ আর ক্ষমতার জন্য সেটাই আওয়ামী লীগের জন্য এখন অশনিসংকেত। দলীয় কোন্দলে দেশের কোথাও না কোথাও প্রতিদিনই আওয়ামী লীগের বিবদমান পক্ষগুলোর মধ্যে খুনোখুনি পর্যন্ত ঘটছে। তবে বিষ্মিত হতে হচ্ছে এটা দেখে যে, এই ধরনের বিবাদকে বিবাদকারী দুই পক্ষই ক্ষমতার সুফল ভোগের স্বাভাবিক প্রক্রিয়া বলে মেনে নিচ্ছেন।

সকল খারাপের মধ্যেও কিছু ভালো থাকে। আবার আপাতদৃষ্টিতে যা ভালো প্রকৃত বিচারে সেটা ভালো নাও হতে পারে। মোটা দাগে নিচে কিছু বিষয় নিয়ে আলোচনা করা হলো।

একথা অস্বীকার করার জো নেই যে, বাংলাদেশে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বেড়ে ২১ বিলিয়ন ডলার হয়েছে। শিল্প উদ্যোক্তাদের নতুন নতুন শিল্প কারখানা তৈরিতে অনীহা থেকে মূলধনী যন্ত্রপাতি ও কাচামাল আমদানী না হওয়া এবং ভোগ্যপণ্য আমদানীতে এক ধরনের শঙ্কা থেকেও আমদানী কমে যাওয়ায় ব্যাংকে বৈদেশিক মুদ্রা জমছে। ব্যাংকগুলোতে অলস টাকার পরিমাণও দিনে দিনে বাড়ছে। অন্যদিকে, শেয়ার বাজারে ১৯৯৬ সালের পর ২০০৯/১০ সালে পুনরায় ব্যাপক লুটপাট হয়েছে। বছর চারেক আগের সেই ধকল কাটিয়ে উঠতে পারেনি ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীরা। পরিসংখ্যানের কাগজপত্রে এমডিজি-র লক্ষ্যমাত্রাগুলো খুব ভালোভাবে অর্জিত হওয়ায় বিদেশে বাংলাদেশের সুনাম বাড়লেও স্বাধীনতা যুদ্ধে সহায়তাকারী বিদেশী বন্ধুদের সোনার মেডেলে নামে মাত্র সোনা দেয়ায় দুর্নীতির কারণে বিদেশে বাংলাদেশের সুনাম প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে। মৌলিক চাহিদাগুলো পূরণ হচ্ছে না ঠিক মতো। বরং ভেজাল ঢুকে পড়েছে সেখানেও। শিক্ষার ক্ষেত্রে পাসের হার সকল কালের রেকর্ড ছাড়িয়েছে তবে প্রশ্ন উঠছে লেখাপড়ার মান নিয়ে। স্বাস্থ্য খাতে চরম দুর্নীতির পাশাপাশি রোগী ডাক্তার সম্পর্ক সকল কালের মধ্যে নিম্ন পর্যায়ে। বাসস্থানের সমস্যা সমাধান হচ্ছে না। আর এদিকে, ক্ষমতাবানরা নদ-নদী পর্যন্ত দখল করে নিচ্ছে। খাস জমির লিজ আগে নিতো এখন জমি নিজের নামেই লিখিয়ে নিচ্ছে। আমার নির্বাচনী এলাকার সাবেক প্রতিমন্ত্রী আওয়ামী লীগের উপজেলা সভাপতি ও বর্তমানের সংসদ সদস্য মি. মাহবুবুর রহমান একাই ২৮০০ একর জমির মালিক হয়েছেন মাত্র ৫ বছরে এমনটা পত্র-পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে, যা সকলে পড়েছেন। কিংবা আমার পার্শ্ববর্তী উপজেলা গলাচিপার নদীর খানিকটা দখল করে ঘর তোলার মতো কাজ করেছিলেন আওয়ামী লীগ দলীয় সাবেক সংসদ সদস্য মি. রনি। এভাবে উন্নয়নের সকল খাতে দুর্নীতির প্রসার ঘটেছে। এসব কারণে আওয়ামী লীগ সরকারের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়েছে কেউ কেউ বলেন- দুর্নীতি। তবে তাদের সঙ্গে একমত নই।

আমার মতে, ৬৫ বছর বয়সী আওয়ামী লীগের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো- দলীয় নেতাকর্মীদের মিথ্যা বলা বন্ধ করা। দ্বিতীয় সর্বোচ্চ চ্যালেঞ্জের কথা বললেও সেই গানের মতো বলতে হবে- মিথ্যা বলা বন্ধ করা। আওয়ামী লীগের তৃতীয় সর্বোচ্চ চ্যালেঞ্জটি যদি বলি তাহলে বলতে হবে- সত্যকে মেনে নিতে না পারার অক্ষমতা কাটিয়ে উঠা। আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের মধ্যে আজকে মিথ্যা বলা ও সত্যকে মেনে নিতে না পারার এক তীব্র প্রতিযোগিতা সংসদ থেকে গ্রাম পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়েছে। ফলে, আওয়ামী লীগের মূল নীতিগুলো হোচট খাচ্ছে। লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য ব্যাহত হচ্ছে পদে পদে। দুর্নীতির বিস্তারও সেই কারণেই অপ্রতিরোধ্য হয়ে উঠছে। তার উপর আওয়ামী লীগ মানুষের উপর প্রভাববিস্তাকারী বিশ্বের সবচেয়ে বড় প্রভাবক শক্তি মিডিয়ার মাধ্যমে মিথ্যা আরো বেশি ছড়িয়ে দিচ্ছে। দিনে দিনে মিথ্যা ড্রাগনের চেহারা পাচ্ছে। মিথ্যাকে প্রতিহত করা না গেলে এই মিথ্যাই অজগর হয়ে আ-তে আওয়ামী লীগকে গিলে খেতে পারে। একদিকে এরকম বড় বড় সমস্যার পাশাপাশি আওয়ামী লীগের রাষ্ট্র পরিচালনায় সাদা চোখে এমন কিছু সমস্যা প্রতিনিয়ত এই দেশের নাগরিকগণ দেখতে পান যে, তারা উঠতে বসতে সরকারকে গালাগালি করেন। অভিশাপ দেন। মানুষ কখন একটা রাজনৈতিক দল ও তার নেতানেত্রীদের অভিশাপ দেয়? যখন মানুষ তাদের আচার আচরণে অসন্তুষ্ট হওয়া সত্বেও কিছুই করতে পারে না। এটা অসহায়ত্ব থেকে ঘটে।

মানুষ তার বেঁচে থাকার জন্য প্রতিনিয়ত যে বিষয়গুলোর ‍উপর নির্ভরশীল সবখানে গত ৫ বছরে অনিয়ম আর দুর্নীতির বটগাছ তৈরি হয়েছে। বিশুদ্ধ পানির অভাব, খাদ্যে বিষ, হাসপাতালে চিকিৎসক নেই, ওষুধে ভেজাল, আর সবকিছুতেই সরকারি দলের লোকজনের উপস্থিতি। মানুষের মন থেকেই অভিশাপ আপনাআপনি বের হয়ে আসে। খুব সাধারণ বিষয় রাস্তাঘাটের কথাই ধরুন। বর্ষাকাল শুরু হতে না হতেই বড় বড় শহরগুলোর রাস্তাঘাট পানিতে তলিয়ে থাকছে। ঘর থেকে বের হয়ে একজন মানুষ যখন দেখে যে, রাস্তার পানিতে মানুষের পায়খানা ভাসছে তখন তার মন কিভাবে বিষিয়ে উঠতে পারে সেকথা নিশ্চয়ই বলার অপেক্ষা রাখে না। উন্নয়ন খাতে লক্ষ কোটি টাকা ব্যয় হচ্ছে কিন্তু মানুষ উপকৃত হচ্ছে না। এদিকে, ব্যাংক থেকে অর্থ লুটপাট হচ্ছে। খুন, গুম বাড়ছে। ঈভ টিজিং ও নারী নির্যাতন বাড়ছে।

মানুষের কল্যাণের যে কথা আওয়ামী লীগের লক্ষ্য ‍ও উদ্দেশ্যে বলা আছে তার বাস্তবায়ন তাহলে কোথায়? নাগরিক অধিকার পদে পদে বিঘ্নিত হচ্ছে। ভেজাল খাদ্যে দেশ যখন সয়লাব তখন নাম কা ওয়াস্তে ঢাকাবাসীকে ফরমালিন মুক্ত খাবার খাওয়ানোর যে প্রচেষ্টা সেটা সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার যে মূলনীতি তার সঙ্গে সাংঘর্ষিক। একদিকে ঢাকার বনানীতে চলন্ত সিড়ি লাগানো এবং অন্যদিকে সিড়ির অদূরে বনানীতেই ফুটপাথে পলিথিনের মধ্যে মানুষের বসবাস শোষণমুক্ত সমাজের যে মূলনীতি তাকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখাচ্ছে। রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব ও অখন্ডতা সমুন্নত রাখার যে লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য তাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে তারকাটায় ঝুলে থাকা বিএসএফ এর গুলিবিদ্ধ ফেলানির লাশ। ধর্মনিরপেক্ষতা তথা সকল ধর্মের স্বাধীনতা নিশ্চিতকরণ ও অসাম্প্রদায়িক রাজনীতির যে নীতি সেটা ভঙ্গুর হয়ে পড়ে যখন দেখা যায় বিভিন্ন ধর্মের মানুষ নির্যাতিত হলেও ‍নির্যাতনকারীদের শাস্তির পরিবর্তে তারা সমাজে বুক ফুলিয়ে ঘুরে বেড়ায়।

অজানা ভয়ে মানুষ যখন মুখে কুলুপ আটে তখন জনগণের সাংবিধানিক অধিকার প্রতিষ্ঠিত হলো কিনা সেটা প্রশ্নসাপেক্ষ হয়ে দাড়ায়। সবচেয়ে বড় প্রশ্নটি আজ উচ্চারিত হচ্ছে আওয়ামী লীগের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যে বলা আছে- আওয়ামী লীগ জনগণকে প্রজাতন্ত্রের মালিক গণ্য করে। সেটা কোন জনগণ? এমন নানান প্রশ্নে আজকে খাঁটি আওয়ামী লীগাররা বিব্রত। অনেকে রসিকতা করে বলেন, আওয়ামী লীগে ভেজাল ঢুকে পড়েছে।

যেকোন বিবেকবান আওয়ামী লীগ নেতা মনে করেন যেহেতু বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ দেশ পরিচালনা করতে গিয়ে দলের মূল নীতি এবং লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য থেকে অনেকটাই সরে এসেছে ফলে প্রাচীণ ও ঐতিহ্যবাহী এই দলটির জন্য স্বেচ্ছায় পদত্যাগের এটিই উপযুক্ত সময়। তারা আরো মনে করেন, আওয়ামী লীগের মধ্যে আত্মশুদ্ধি দরকার। দলের মূল নীতি এবং লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য বিচ্যুৎ যারা তাদের শাস্তি হওয়া দরকার। অন্যদিকে, যারা দলের মূলনীতি ও লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যের প্রতি বিশ্বস্ত তাদেরকে পুরস্কৃত করা দরকার।

আমরা আশা করতে পারি আওয়ামী লীগ তাদের ৬৫তম জন্মবার্ষিকীতে সরকারের দায়িত্ব থেকে পদত্যাগ করার মধ্য দিয়ে আত্মশুদ্ধি ও আত্মসমালোচনার পথ সুগম করবে এবং সেসঙ্গে জনগণের সামনে অরিজিনাল আওয়ামী লীগকে উপহার দেয়ার জন্য তারা পরিশ্রম করবে।

শুভ জন্মদিন!

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

Connecting to %s