এপোলো হাসপাতালে সেদিন যা ঘটেছিল


Apollo Bill_3

ঢাকার বড় বড় হাসপাতালগুলোর কান্ড কারখানা নিয়ে অনেক কথা হয়েছে। আরো কথা হবে। প্রশ্ন হলো এই ধরনের বিষয়গুলো রাষ্ট্রীয়ভাবে দেখভালের দায়িত্ব কার কিংবা কাদের? শোনা যায় বড় বড় বেসরকারি হাসপাতালগুলো একদিকে ডাক্তারদের উচ্চ বেতন দেন এবং অন্যদিকে তাদের উপর নির্দেশ থাকে রোগী পেলেই ল্যাবরেটরি টেস্ট ধরিয়ে দেয়ার। ল্যাব এইড নামের একটি হাসপাতালে একবার এক রোগীকে আড়াই দিনে ২৬ বার ডায়াবেটিকের ব্লাড সুগার টেস্ট করা হয়েছিল। স্কয়ার হাসপাতালে চিকিৎসা করাতে গিয়ে ১৬ দিনে ৮ লাখ টাকার বিল পরিশোধ করতে না পারায় লাশ নিতে সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত বসে থাকতে হয়েছিল এক মৃত রোগীর আত্মীয়স্বজনদের। তারপর টাকা জোগাড় করে লাশ নিতে পেরেছিল। এমন কাহিনী অনেক। কম বেশি সবাই জানেনও। তারপরও মানুষ একটু ভালো চিকিৎসার জন্য বড় বড় বেসরকারি হাসপাতালগুলোতে ভীড় জমায়। অন্যদিকে, দেশনেত্রী, জননেত্রী, হাওরের নেতা, কিংবা গণমানুষের নেতারা হাঁচি কাশি সর্দির ট্রিটমেন্ট করতে ন্যূনতম সিঙ্গাপুর কিংবা ব্যাঙ্কক যান।

এক.
মিটিং তখন প্রায় শেষ। রায়হান (ছন্মনাম) সাহেবের ফোনটা বেজে উঠল। তিনি সাধারণত ফোনের লাইন কেটে দেন। আজকে তিনি ফোন ধরলেন। ফোন নিয়ে দ্রুত মিটিং রুম থেকে বের হয়ে গেলেন। মুহুর্তের মধ্যে ফিরে এসে বললেন, আমাকে এখনই একটু যেতে হচ্ছে। তখনও বুঝতে পারিনি তার কোন বিপদ হয়েছে। কয়েক মিনিটের মধ্যে মিটিং শেষ হলো। সবাই চলে গেল। তখন জানলাম যে, রায়হান সাহেবের সন্তান হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়েছে। তিনি অফিস ম্যানেজারকে এপোলো হাসপাতালের ইমারজেন্সিতে ফোন করার কথা বলে নিজে দ্রুত বাসার পথ ধরেছেন।

দুই.
রায়হান সাহেব ফিরে আসার আগেই তার সঙ্গে ফোনে কথা হলো। তার সন্তান অবজারভেশনে আছে। শঙ্কামুক্ত। মনে হচ্ছে বড় কিছু হয়নি। তিনি তখন হাসপাতালের ক্যাফেটেরিয়াতে স্ত্রী-সহ মধ্যাহ্নভোজ সারছেন। তিনি জানালেন যে, অফিসে একবার ফিরবেন। তিনি বিকেলে অফিসে ফিরলেন। কি ব্যাপার। কি হয়েছে জানতে তার রুমে গেলাম। তিনি যা বললেন তা অনেকটা এমন।

তিন.
তার সন্তান এখন ভালো আছে। বাসায় রেখে তবেই তিনি অফিসে এসেছেন। যদিও হাসপাতালের ডাক্তাররা আরো দু’দিন অবজারভেশনে রাখতে চেয়েছিল কিন্তু তিনি রাখেননি।

‘কেন?’ জিজ্ঞাসা করায় বললেন। তিনি ডাক্তারদের কথায় সন্তুষ্ট হতে পারেননি। তিনি জানতে চেয়েছিলেন, আরো দু’দিন কেন অবজারভেশনে রাখতে হবে তারা কি সাসপেক্ট করছেন? জবাবে ডাক্তাররা বলেছিল যে, একটা রুটিন চেকআপ করতে হবে। সেসময়ে তার জিজ্ঞাসার জবাবে তারা রুটিন চেকআপের মধ্যে সিটি স্ক্যান করার কথাও যখন বলল তখন তার মধ্যে সন্দেহ তৈরি হয়। তিনি তখন বলেছিলেন, ও (পেশেন্ট) তো পড়ে গিয়ে মাথায় ব্যথা পায়নি কিংবা এমন কিছু ঘটেনি যে সিটি স্ক্যান করতে হবে। তখন তাকে জানানো হয়, এটা মেডিকেল প্রটোকল। আর এপোলো হাসপাতাল যেহেতু ইন্টারন্যাশনাল স্ট্যান্ডার্ড মেইনটেইন করে ফলে তাদেরকে মেডিকেল প্রটোকল মেনে আরো দু’দিন ধরে রুটিন চেক আপগুলো সব করতে হবে। এই ধরনের উত্তর রায়হান সাহেবের সঙ্গত কারণেই পছন্দ হয়নি। তিনি সেকথা তাদেরকে বললেন। তিনি পেশেন্টের সঙ্গে কথা বলে বুঝলেন যে, সে সুস্থ বোধ করছে। তাছাড়া সে বাসায় ফিরেও যেতে চাচ্ছে। তিনি ডাক্তারদের জানালেন যে, তিনি তার সন্তানকে বাসায় নিয়ে যাবেন। তখন তারা তাকে জানিয়ে দিল যে, তারা স্ট্রংলি রিকমেন্ড করে যে রোগী আরো দু’দিন হাসপাতালে থাকবে। তারপরও যদি রোগী হাসপাতাল ছেড়ে যেতে চায় তবে সেটা তার দায়দায়িত্ব হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ নেবে না। সেজন্য লিখিত দিতে হবে। রায়হান সাহেব হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের দেয়া ফর্ম পূরণ করে লিখে দিলেন যে, তাদের সেবার সামগ্রিক মান মনোপুতঃ না হওয়ায় এবং অপ্রয়োজনীয় টেস্ট করার কথা বলায় তিনি সেবার মান নিয়ে আরো বেশি সন্দিহান হয়ে পড়েছেন। তদুপরি রোগী সুস্থ বোধ করায় তিনি বাসায় ফিরে যেতে চান। তিনি রোগীকে নিজ দায়িত্বে বাসায় ফিরিয়ে নিচ্ছেন।

এরপর জানা গেল আসল কাহিনী!

চার.
বিল পরিশোধ করতে গিয়ে তিনি জানলেন যে, তার বিল হয়েছে ৩৫ হাজার ৩৬০ টাকা। অস্বাভাবিক বিল দেখে তিনি বিস্তারিত জানতে চান। তখন দেখা গেল রোগীকে ম্যালেরিয়া, ডেঙ্গু থেকে শুরু করে হেন টেস্ট নেই যা করা হয়নি। (বিস্তারিত উপরে স্ক্যান করা কপিতে দেখুন) রায়হান সাহেব তখন নিজের সিদ্ধান্তের জন্য নিজেকে ধন্যবাদ দিলেন। কারণ ‍তিনি বুঝতে পারলেন আরো দুইদিন এপোলো হাসপাতাল তার সন্তানকে এখানে রেখে আরো অন্তত ২ লাখ টাকার বিল তাকে ধরিয়ে দিত। তখন সেই টাকা দিয়েই তাকে এখন থেকে ছাড়া পেত হতো।

পাঁচ.
বিল থেকে দেখা যায় যে, এম্বুলেন্সের জন্য চার্জ করা হয়েছে ৩,২০০ টাকা। এর মধ্যে এম্বুলেন্সের ইকুইপমেন্টের চার্জ ১,২০০ টাকা। গাড়ি ভাড়া ২,০০০ টাকা। সেটা ১০ কিলোমিটারের মধ্যে হওয়ার কারণে। ইমার্জেন্সির ওয়ার্ড চার্জ হলো ২,০০০ টাকা। ডাক্তারের ফি হলো ৭০০ টাকা। ল্যাবরেটরি চার্জ করা হয়েছে ২৬,৬৪২ টাকা। যার মধ্যে DA Health Screening profile ১০,৫৭১ টাকা। Dengue NS1 Antigen 1815 taka; ICT for Malarial Parasie (P. Vivax & P. Falciparum) 2,079 taka; Liver Function test 1,925 taka; Malaria Parasite in Blood Film (Thick and Thin) 1,100 taka ইত্যাদি রয়েছে।

ছয়.
প্রশ্ন হলো কি কমপ্লেন নিয়ে রোগী গিয়েছিল?

রোগীর কমপ্লেন ছিল বমি হওয়া, শ্বাস কষ্ট ও নিস্তেজ হয়ে পড়া। হিস্টিরি ছিল- রোগী আগের রাতে পেইন কিলার ওষুধ খেয়েছে। আবার প্যারাসিটামলও খেয়েছে। সেসঙ্গে ২টা ৫ মিলিগ্রাম ভ্যালিয়াম খেয়েছে ঘুমের জন্য। তার তিন দিন আগে জ্বর হয়েছিল। কিন্তু গত দুই দিন কোন জ্বর ছিল না।

সাত.
ঢাকার বড় বড় হাসপাতালগুলোর কান্ড কারখানা নিয়ে অনেক কথা হয়েছে। আরো কথা হবে। প্রশ্ন হলো এই ধরনের বিষয়গুলো রাষ্ট্রীয়ভাবে দেখভালের দায়িত্ব কার কিংবা কাদের? শোনা যায় বড় বড় বেসরকারি হাসপাতালগুলো একদিকে ডাক্তারদের উচ্চ বেতন দেন এবং অন্যদিকে তাদের উপর নির্দেশ থাকে রোগী পেলেই ল্যাবরেটরি টেস্ট ধরিয়ে দেয়ার। ল্যাব এইড নামের একটি হাসপাতালে একবার এক রোগীকে আড়াই দিনে ২৬ বার ডায়াবেটিকের ব্লাড সুগার টেস্ট করা হয়েছিল। স্কয়ার হাসপাতালে চিকিৎসা করাতে গিয়ে ১৬ দিনে ৮ লাখ টাকার বিল পরিশোধ করতে না পারায় লাশ নিতে সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত বসে থাকতে হয়েছিল এক মৃত রোগীর আত্মীয়স্বজনদের। তারপর টাকা জোগাড় করে লাশ নিতে পেরেছিল। এমন কাহিনী অনেক। কম বেশি সবাই জানেনও। তারপরও মানুষ একটু ভালো চিকিৎসার জন্য বড় বড় বেসরকারি হাসপাতালগুলোতে ভীড় জমায়। অন্যদিকে, দেশনেত্রী, জননেত্রী, হাওরের নেতা, কিংবা গণমানুষের নেতারা হাঁচি কাশি সর্দির ট্রিটমেন্ট করতে ন্যূনতম সিঙ্গাপুর কিংবা ব্যাঙ্কক যান।

আট.
সমাধান কি?

এক পদস্থ সরকারি কর্মকর্তা যার পারিবারিক অবস্থা আবার অনেক ভালো। তিনি তার সন্তান সম্ভাবা স্ত্রীকে নিয়ে গিয়েছিলেন ঢাকা মেডিকেল হাসপাতালে। আত্মীয় স্বজনদের ভৎসনার মুখে তার বক্তব্য ছিল- সরকারি কর্মকর্তা হয়ে তিনি যদি সরকারি সেবা নিতে অনীহা দেখান তাহলে তিনি অন্যকে কিভাবে সরকারি সেবা নিতে বলবেন।

কঠোর হতে হলে ঘর ঠিক করতে হবে আগে।

দেশে এখন রাজনীতিবিদ নেই। আমরা যাদেরকে রাজনীতিবিদ হিসেবে চিনি তারা মূলত রাজনীতিতে বিনিয়োগকারী। যাকে সোজা বাংলায় বলে ব্যবসায়ী। রাজনৈতিক ব্যবসায়ী।

আমরা যাদেরকে সেভাবে চিনি না তাদের মধ্যেই প্রকৃত রাজনীতিবিদরা লুকিয়ে আছেন। তাদেরকে সামনে নিয়ে আসতে হবে। দেশ পরিচালনার ভার তাদের হাতে তুলে দিতে হবে। যারা দেশ ও দেশের মানুষের কল্যাণে কাজ করবেন।

Advertisements

3 thoughts on “এপোলো হাসপাতালে সেদিন যা ঘটেছিল

  1. গত ৬ তারিখে আমাদের প্রথম সন্তান হল উত্তরা ক্রিসেন্ট হাসপাতালে। ১০ জুন বাসায় চলে আসবো, সকাল ৯টায় জানালাম। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ গড়িমসি করতে করতে দুপুর ১.৩০ বাজালো (দুপুর ১২টার পর আরেকটা দিন কাউন্ট করে, যদিও কথা বলে আমি মুক্তি পেয়েছিলাম)। বিরক্ত হয়ে চলে আসার ঠিক আগ মুহূর্তে বিল দিল । দেখলাম প্রায় এক হাজার টাকার অতিরিক্ত ঔষুধ বিল (যদিও কম্পিউটার-ওটোমেডেট বিল) এবং অনেক টাকার অনেকগুলো টেস্ট, যেগুলো করাইনি। আমার কাছে ঔষুধ কেনার ইনভয়েস দেখালাম, টেস্টগুলোর ব্যাপারে জিজ্ঞেস করলাম কিন্তু কোন সদ্বউত্তর মিললো না। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ, একটা আরেকটাকে ফোন দেয়, জিজ্ঞেস করে- আকাশ থেকে সদ্যপ্রসূত শিশুর চাহনি দিয়া জানতে চায়-ইহা ক্যামতে ঘটলো? কিছু জিনিস কাটলো/কমালো কিন্তু বেশীর ভাগই থাকলো! সবাই তখন কেবিনে থেকে বাসায় ফিরে আসার অপেক্ষায়, অগত্যা সময়ের দিকে চেয়ে একগাদা বিল দিয়ে ফিরলাম। শুধু তাই নয়, বিলের সাথে অতিরিক্ত ২০ সাভির্স চার্জ রোগিকে বহন করতে হয়। পাশের একজনেরও দেখলাম প্রায় একই ঘটনা…
    বি.দ্র. ডাক্তারদের স্ট্রং রিকমেন্ডেশন উপেক্ষা করে চলে আসার সিদ্ধান্তও আমার। সেটাও এক বড় কাহিনী। তিন দিনের বেবিকে আরও একগাদা টেস্ট এবং আর কিছুদিন হাসপাতালে রাখার চরম আকুতি। ছিলাম ভিআইপি কেবিনে, টাকার সাথে ওটার আর হাসপাতালের বিভিন্ন কর্মকান্ডের মান নিয়েও রচনা লেখা যাবে। যদিও লোকে বলে, এটি উত্তরার সবচেয়ে ভাল হাসপাতাল (www.uchbd.com) । লানিং- ইহা বাংলাদেশ, ইহা মগের মুল্লুক!
    যাই হোক, বেবি আর তার মা ভাল আছে- এটাই বড় চাওয়া এবং পাওয়া …

  2. This is the real reality of our so called high profile hospital, I myself is a doctor , few days back I had a chance to visit Appolo hospital, Basundhora City, Dhaka to see a patient, Same incident happened to my patient, being a doctor I want to see the patient treatment history but they denied to show me the history sheet and treatment sheet. Later I took my patient on the same day from that ruthless business minded non-humanitarian minded appolo hospital. I think govt health authority to look into the matter and take punitive action against this so called high profile hospital. This type of hospital should be banned immediately, They have established hospital for business purpose with all evil motives. The people should boycott this type of hospital incl all of its doctors, staff and officials.

  3. এদের ঠিক করবে কারা? সর্ষের মধ্যেই ভুত! কালকে এক পারিবারিক আড্ডায় এক ডক্তার এর কাছে শুনছিলান, ঢাকা’র বড় বড় সরকারি হাস্পাতালের আউটডোরের ডাক্তার রা ৩-৪ মাসে নতুন গাড়ি কিনতে পারে। কেমন করে? প্রতিদিন শত শত রোগী যারা দেখাতে আসেন, তাদের জন্য গাদা গাদা মেডিকেল টেস্ট এর কাগজ ধরিয়ে দিয়ে। এবং এও বলে দেন, হাস্পাতালের টেস্টের যন্ত্রপাতি ঠিক নেই, বাইরে থেকে করান।
    আরেক ডাক্তার জানালেন, বেশির ভাগ ব্যস্ত ডাক্তার রা মাসে ২০-৩০ লাখ টাকা ডায়াগনিস্টিক সেন্টার গুলো থেকে পান। এই কমিশন বানিজ্যের কারনেই ৫০-১০০ টাকা’র টেস্ট এর খরচ ৮০০-২০০০ টাকা।
    সর্ষের যত ভেতরে যাবেন, তত সমস্যা বের হবে। সবকিছু কেচে গন্ডুশ করতে হবে রে ভাই।

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s