শ্বশুরের তৃতীয় প্রেম


আজ রংপুরে চতুর্থ দিন। রোববার এসেছি। ঢাকা থেকে সড়ক পথে রংপুর এসেছি। সড়ক মহাসড়কগুলোর বেহাল দশা। বাংলাদেশ ‘জেমসবন্ড’ মন্ত্রী মি. ওবায়দুল কাদেরের ড্যাসিং বক্তৃতা টেলিভিশনে দেখি। শুনলাম ঈদের আগে রাস্তাগুলো যান চলাচলের উপযোগী করা হবে। ভাবখানা এমন শুধুমাত্র ঈদের আগে লোকজন মহাসড়কে যাতায়াত করে বাকি সময়গুলোতে তারা মন্ত্রী ও তার দফতরের মতোই ঘুমায়। বিশ্বকাপ খেলা দেখার কারণে শনিবার রাতটা ঘুমানো হয়নি। তার উপর রোববার আবার রাত জাগা আছে। জার্মানীর জয় দেখতে হবে! তাই গাড়িতে ঘুমানোর চেষ্টা চালিয়ে গেলাম। সেই চেষ্টা চললো। চলতেই থাকল। সাফল্য এলো না।

রংপুরে এসেছি উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা কার্যক্রম দেখার জন্য। বাংলাদেশে সরকার শতভাগ শিশু স্কুলে ভর্তি দাবী করলেও বাস্তবতা ভিন্ন। অন্তত ৩০ লাখ শিশু স্কুলের বাইরে থেকে যায় প্রতিবছর। এদের কারো কারো নাম স্কুলের খাতায় থাকলেও শিশুটি স্কুলে যায় না। তবে খাতায় নাম তোলার কারণে সরকার দাবী করে যে, শিশুটি ভর্তি হয়েছিল। তারপর সে ঝরে পড়েছে। মূলত স্কুল থেকে ঝরে পড়া শিশুদের নিয়ে বাংলাদেশের এনজিওগুলো উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনা করে থাকে। এই স্কুলগুলোতে কখনো স্কুলে ভর্তি হয়নি এমন শিশুরাও ভর্তি হয়। এনজিও পরিচালিত স্কুলগুলোতে শিক্ষকরা নিয়মিত যান। এবং তারা আন্তরিকতার সঙ্গে শিশুদের লেখাপড়া করান। তাছাড়া বেশিরভাগ ক্ষেত্রে এনজিওগুলো শিশুদের বিনামূল্যে শিক্ষা উপকরণ যেমন- খাতা, কাগজ, কলম, পেনসিল, রাবার ইত্যাদি দেয়। তাছাড়া স্কুলগুলো শিক্ষার্থীদের বাড়ির কাছে হওয়া ইত্যাদি কারণে এলাকাবাসী শিশুদের উপানুষ্ঠানিক স্কুলগুলোতে আগ্রহী হয়। এমনও দেখা যায় যে, সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে না পাঠিয়ে অনেকে এনজিও পরিচালিত স্কুলে শিশুদের পাঠাতে আগ্রহী থাকেন। তবে ভালো এনজিওগুলো তাদের স্কুলে সরকারি নিয়ম ভেঙ্গে কখনোই ৮ বছরের কম বয়সী শিশুদের ভর্তি করে না। সরকারি স্কুলের প্রথম শ্রেণীতে ভর্তির বয়স হলো ছয় বছর। ওই বয়সী শিশুকে উপানুষ্ঠানিক বিদ্যালয়ে ভর্তি করা যাবে না। সরকারি স্কুলে ভর্তির বয়স পার হয়ে গেলে কিংবা একবার ভর্তি হওয়ার পর স্কুলে যাওয়া ছেড়ে দিলে তবেই উপানুষ্ঠানিক বিদ্যালয়ে ভর্তি করা যাবে। আশ্চর্যজনক হলেও সত্যি যে, আমাদের দেশের মানুষ সন্তান পয়দা করতে যতোটা আগ্রহী সন্তানের লেখাপড়ার দায়িত্ব পালনে ততোটা আন্তরিক নয়।

উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা কার্যক্রম দেখার জন্য রংপুর থেকে কুড়িগ্রাম, লালমনিরহাট, গাইবান্ধা, নীলফামারিসহ কয়েকটা জেলার কয়েকটি উপজেলায় গিয়েছি। ধরলা ব্রিজ পার হয়ে বুরুঙ্গামারি গিয়েছিলাম। ব্রিজের পরে কয়েক কিলোমিটার পথের দু ধারের দৃশ্য অসাধারণ সুন্দর। অবশ্য পুরো রংপুর বিভাগেই অনেক সবুজের সমারোহ। দিনাজপুর, ঠাকুরগাঁও তো মাইলের পর মাইল সবুজ প্রান্তর। রংপুর শহরে প্রথম যখন এসেছি নব্বই দশকের শেষ ভাগে তখন অনেক নিরিবিলি ছিল। শান্ত ছিল। এই সময়ে ঢাকা যতোটা বদলিয়েছে সেই তুলনায় রংপুরে পরিবর্তন হয়নি। রংপুরে জিনিসপত্রের দামও শস্তা। সোমবার এক হোটেলে গরম গরম দুই পরোটা আর এক বাটি বুটের ডাল খেলাম। বিল হলো মাত্র ১৫ টাকা। পরোটার সাইজ ঢাকার ৬ টাকা দামের পরোটার সাইজের দেড় গুণ ছিল। আইন শৃঙ্খলা পরিস্থিতিও ভালো। তবে স্থানীয়রা বলল যে, ইদানীং এক আধটু ছিনতাই বেড়েছে। চুরি বেড়েছে। আগের মতো নির্বিঘ্নে চলাচল করা যায় না। আমার শ্বশুরও এই কথার সঙ্গে কিছুটা সায় দিলেন। তবে সায় দিতে গিয়ে তার অন্তরটা বোধকরি ফেটে যাচ্ছিল। কারণ রংপুর শহর হলো তার তৃতীয় প্রেম।

আমার শ্বশুর আজ থেকে ৩৩ বছর আগে রংপুরে এসেছিলেন তিস্তা ব্যারেজ প্রকল্পের ঠিকাদারী কাজ করার জন্য। প্রথম দেখায় তিনি এই শহরের প্রেমে পড়ে যান। এখানে থাকতে থাকতে তার সেই প্রেম শুধু বেড়েছে মাত্র। তবে এটা বাংলাদেশের কোন শহরের প্রতি তার প্রথম প্রেম নয়। আগেই বলেছি এটা ছিল তৃতীয় প্রেম। আগেও দুইবার তিনি প্রেমে পড়েছিলেন। তার প্রথম প্রেম রাজশাহী শহর। সেটা তরুণ বয়সে। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক ভবন, আমির আলী হল, মুন্নুজান হলসহ আরো কযেকটি ভবনের ঠিকাদারী কাজ করতে গিয়ে তিনি রাজশাহীর প্রেমে পড়ে গিয়েছিলেন। ওখানেই বসবাস করতে শুরু করেন। আমার স্ত্রীর জন্মও রাজশাহী শহরে। আমার শ্বশুরের দ্বিতীয় শহর প্রেম ছিল- চিটাগাং। সেটাও সেই ঠিকাদারী কাজ করতে গিয়ে। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন অবকাঠামোর কাজ করতে গিয়ে তিনি পাহাড় আর সমুদ্র ঘেরা চট্টগ্রামের প্রেমে পড়ে যান। তবে আমি শ্বশুরের সঙ্গে দীর্ঘ আলাপ করে বুঝেছি যে, তিনি মূলত শহর নয় ওই শহরের বাসিন্দা মানুষের প্রেমে পড়েছেন। সেটা বার বার। অন্তত তিনবার।

আমি আমার শ্বশুরের তৃতীয় প্রেমের শহর রংপুরে গত চারদিন ধরে থাকতে থাকতে ও এখানকার লোকজনের আলাপ আলোচনা করতে করতে মনে হচ্ছে আমিও রংপুরের প্রেমে পড়ে যাব!! তবে সেটা কোনমতেই হতে দেয়া যাবে না। আমাকে যদি কোথাও গিয়ে থাকতেই হয় সেটা খেপুপাড়া। প্রেমে যদি পড়তেই হয় সেটাও খেপুপাড়া। ওটাই আমার প্রথম প্রেম। চিরজীবি হোক প্রথম প্রেম। তবে আমি আমার শ্বশুরের প্রতিটি প্রেমের প্রতিই শ্রদ্ধাশীল!

Advertisements

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s