আল্লাহ শুকরিয়া


পরিবার পরিজন থেকে বিচ্ছিন্ন মানুষের মন আদ্র থাকে। গত রোববার থেকে রংপুরে। থাকি আরডিআরএস গেস্ট হাউজে। সবুজে শান্ত। রাতে বৃষ্টি হচ্ছে প্রতিদিন। রুমের তাপমাত্রা সবসময় ২৬ ডিগ্রী। সন্ধ্যার ইফতার কিংবা রাতের সেহরিতে বাসাবাড়ির মতোই খাবার। সবমিলিয়ে পরিবেশটা পারিবারিক। কিন্তু যতোই পারিবারিক পরিবেশ হোক না কেন, বউ আর মেয়ে ছাড়া সত্যিকারের পারিবারিক পরিবেশ হওয়ার কোন উপায় নেই। আজকে সন্ধ্যায় ইফতার খেতে গিয়ে দেখি এক টেবিলে চারটা প্লেট। এক টেবিলে দু’টা। আর এক টেবিলে একটা প্লেট। বুঝলাম একটা প্লেটের টেবিলটাই আমার। আজকে কিছুক্ষণ আগে পৌঁছে গিয়েছিলাম। টেবিলে বসার আগে ডাইনিং লাগোয়া বুক শেলফ থেকে একটা বই নিয়ে লিভিং রুমে বসে কিছুক্ষণ পড়লাম। তারপর গিয়ে নিজের জন্য নির্ধারিত টেবিলে বসলাম। হঠাৎ করেই মনটা বেশি আদ্র হয়ে পড়ল।

নিজেকে সুবিধাপ্রাপ্ত মানুষ মনে হলো। আমার জন্য খাওয়া আছে। থাকার জন্য ঘর আছে। এই শহরে অনেক মানুষ আছে যাদের থাকার জন্য ঘর নেই। ইফতারে খাওয়া নেই। মানুষ কতো কষ্টে আছে। সে তুলনায় আমি কতো ভালো আছি। মনটা আরো আদ্র হতে থাকল। মহান আল্লাহতায়ালার প্রতি কৃতজ্ঞতায় মন ভরে উঠল। সেসঙ্গে মনে প্রশ্ন জাগল- সমাজে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করতে আমি কি করছি। এই যে আল্লাহর জন্য ইবাদত করছি। তার সন্তুষ্টি অর্জনের চেষ্টা করছি। তার আদেশ নির্দেশ সব পালন করছি কি?

পাশের টেবিলে চারটা প্লেট থাকলেও উপস্থিত দু’জন। আজান দেয়ার কয়েক সেকেন্ড আগে বাকি দু’জন এসে আসন নিলেন। তাদের দেরি হওয়া এবং কাজের অগ্রগতি জানতে চাইলেন আগে থেকে উপস্থিত বাকি দু’জন। টুকরো টুকরো কথাবার্তায় যা বোঝা গেলো যে, তারা এখানে আরো কয়েক একর জমি কিনছেন। ব্যবসার সম্প্রসারণ হবে। বোঝা গেল ঢাকা, নীলফামারি, রংপুর আরো অনেক শহরেই তারা জমি কিনছেন। তাদের জমানো টাকা থাকলেও তারা ব্যবসা করার জন্য ব্যাংক লোন নেবেন কারণ নিজের টাকায় ব্যবসা করলে ইনকাম ট্যাক্স অফিস খুব ঝামেলা করে। ব্যাংক লোন নিলে সব কিছুই সহজ হয়ে যায়। কতিপয় অসাধু ইনকাম ট্যাক্স কর্মকর্তার জন্য রাষ্ট্র ও জনগণ কিভাবে বঞ্চিত হচ্ছে। মনটা খারাপ হলো। আমি অন্য কিছু ভাবার চেষ্টা করলাম। কিন্তু ভেতরে ভেতরে রাগ ক্ষোভ বাড়তে লাগল। মনে পড়ে গেল সকালেই দি ডেইলি স্টার পত্রিকার একটি লিঙ্ক শেয়ার দিয়েছিলাম আর স্ট্যাটাসে লিখেছিলাম: একটি ন্যায়নিষ্ঠ সমাজ প্রতিষ্ঠায় সমাজের ও রাষ্ট্রের দায়িত্বশীল ও ক্ষমতাবান মানুষদের এই ধরনের আচরণ বাধা হিসেবে কাজ করে। এটি অগ্রহণযোগ্য। যারা এই ধরনের কাজে নিয়োজিত তাদের লজ্জা পাওয়া উচিৎ। এবং নিজেদের কৃত কর্মের জন্য তাদের ক্ষমা চেয়ে নিজেকে শুদ্ধ করা উচিৎ। এমন ধরনের অপরাধে যারা জড়িত হয় তাদের হাতে সমাজ, দেশ ও দেশের মানুষ নিরাপদ থাকতে পারে না। এই ধরনের অন্যায়কারীরা আরো বড় অন্যায়ে যুক্ত হতে উৎসাহিত হতে পারে যদি না আইন ও বিচার ব্যবস্থা উপযুক্ত ব্যবস্থা গ্রহণ না করে।

ডেইলি স্টার পত্রিকার রিপোর্ট থেকে দেখা যায় যে, অর্ধ শতাধিক সরকারি দায়িত্বশীল কর্মকর্তা ও এমপি ও নীতি প্রণেতা অন্যায়ভাবে জনগণের অধিকার হরণ করে বেশি দামে গাড়ি কিনছে আর নিয়ম নীতির প্রতি বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে গাড়িগুলো ব্যবহার করছে। এরা কেউ দরিদ্র নয়। এরা কেউ নিরক্ষর নয়। এরা কেউ নির্বোধ নয়। তবুও এরা অন্যায় করছে। দেশ ও দেশের মানুষের জন্য কাজ করতে এরা অঙ্গীকারাবদ্ধ হওয়া সত্বেও এরা আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল নয়।

আদ্র মনের সঙ্গে নিজের অসহায়ত্ব মিলে মিশে এক জটিল অবস্থা তৈরি হয়ে গেছে ততোক্ষণে।

আল্লাহর কাছে শুকরিয়া জানালাম তিনি আমাকে অন্যায় থেকে দূরে থাকার তৌফিক দিয়েছেন। তিনি সেইসব অকৃতজ্ঞ ও লোভী মানুষের কাতারে চলে যাওয়া থেকে আমাকে দূরে থাকার শক্তি দিয়েছেন। আমার স্থির বিশ্বাস আল্লাহর প্রতি শুকরিয়া জানানো মানুষ এই সমাজে আরো অনেকে আছেন। এখন দরকার তাদের নিজেদের মধ্যে নেটওয়ার্ক গড়ে তোলা। যারা বিশ্বাস করেন আল্লাহ প্রতিটি মানুষকে একটা দায়িত্ব দিয়ে পাঠিয়েছেন। সেই দায়িত্বটা পালন করতে পারাটাই জীবনের লক্ষ্য হোক।

ইফতার সেরে বের হয়ে এলাম। আকাশে সন্ধ্যার এক দুর্লভ মেঘের বিন্যাস। নিচে সবুজের সমারোহ। হিমেল বাতাস বইছে। অপার্থিব এক বোধ আচ্ছন্ন করল মনকে। নিশ্চয়ই এই দেশ ও দেশের মানুষের সামনে সুদিন অপেক্ষা করছে। আপনি প্রস্তুত তো?

Advertisements

One thought on “আল্লাহ শুকরিয়া

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s