হাসিনা-খালেদার কাছে প্রশ্ন – শিশুদের জন্য কি করলেন?


বৃহত্তম বিরোধী দল বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া

বৃহত্তম বিরোধী দল বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা

শেখ হাসিনা কিংবা খালেদা জিয়া কি জানেন তারা আর কতোদিন বাঁচবেন? বাংলাদেশীদের গড় আয়ুর হিসেবে তাদের দু’জনেরই আয়ু সামান্য বাকি। তবে উন্নত খাবার দাবার, চিকিৎসা লাভ, দামী জীবনযাপন এবং চিন্তামুক্ত পরিবেশের কারণে তাদের আয়ু সাধারণের চেয়ে কিছুটা বেশি হবে হয়তো। লক্ষণীয় যে, এই দু’জন মানুষ বাংলাদেশের বয়সের অর্ধেকেরও বেশি সময় ধরে পালাক্রমে দেশের নেতৃত্ব দিচ্ছেন। এই দেশের একজন নাগরিক হিসেবে তাদের কাছে আমার প্রশ্ন: আপনারা তো চলে যাবেন, যারা বেচে থাকবে অর্থাৎ এই দেশের শিশুদের জন্য আপনারা কি করেছেন?

তাদের কাছে জানতে চাই- আপনারা তো চলে যাবেন। আপনাদের পর দেশ চালাতে আপনাদের চেয়ে যোগ্যতর কাউকে রেখে যাচ্ছেন কি? না কি আপনাদের অবর্তমানে দেশ যাতে পঙ্গুত্ব বরণ করে সেই ব্যবস্থা করে যাচ্ছেন?

আমরা দেখি যে, প্রাইমারি স্কুলের একজন শিক্ষক তারচেয়ে যোগ্যতর মানুষ তৈরি করে। কলেজের শিক্ষকও তাই। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক একই পথ অনুসরণ করেন। শিক্ষকরা দেশ ও জগৎ সেরা মানুষ তৈরি করেন। এই অবস্থায় দেশ পরিচালক রাজনীতিবিদদের কাছে জানতে চাই- শিক্ষকদের জন্য আপনারা কি করেছেন? শিশুদের জন্য কি সেরা শিক্ষক দিতে পেরেছেন? কিংবা শিক্ষকদের জন্য সেরা জীবন?

একজন শিক্ষক যখন আধাপেট খেয়ে শিক্ষা দেয় তখন রাজনীতিবিদ হিসেবে আপনার সাফল্যকে আপনি কিভাবে দেখেন? কিংবা আপনার একজন কর্মী যখন শিক্ষককে চড় থাপ্পড় মারে আপনার কেমন লাগে? শিশুরা যখন রাজনীতিবিদদের প্রিয় বখাটেদের উৎপাতে স্কুলে যেতে পারে না তখন আপনি নিজেকে কিভাবে নেতা হিসেবে দাবী করেন? দেশের জনগণ যখন হতাশায় নিমজ্জিত হয় তখন আপনার মধ্যে আনন্দ উল্লাস আসে কোথা থেকে? কি করে দাবী করেন দেশ আগাচ্ছে? শিশুদের ভালো না রেখে দেশ ভালো হয় কি করে?

শিশুদের প্রসঙ্গে ফিরে যাই।

আজ পর্যন্ত কেউ শিশুরাই আগামীর ভবিষ্যৎ এই কথার সঙ্গে দ্বিমত করেননি। আজকে যে শেখ হাসিনা ও খালেদা জিয়া তারাও একদিন শিশু ছিলেন। পরবর্তীতে তারাই বাংলাদেশের নেতৃত্ব দিচ্ছেন। তারা যে একদিন বাংলাদেশের হাল ধরবেন সেটি কি তাদের পিতা মাতা কিংবা পরিবার পরিজন কেউ ভাবতে পেরেছিল? কিন্তু তারা সবাই একথা নিশ্চিত ভাবে জানত যে, একদিন এই দুই শিশু অন্যান্য শিশুদের মতোই আগামীর ভবিষ্যৎ হবে। তারা সেটা হয়েছেনও। একটু বেশিই হয়েছেন। তাদের সঙ্গে বড় হয়ে উঠা অন্যদের ছাড়িয়ে তারা দেশের চিফ এক্সিকিউটিভ হয়েছেন। আজকে যারা মন্ত্রীসভায় আছেন তাদের মধ্যে যেমন তরুণ বয়সীরা আছেন তেমনি বৃদ্ধরাও আছেন। তারাও একদিন আজকের শিশুদের মতোই শিশু ছিলেন। তাদের নিজেদেরও শিশু সন্তান আছে। যারাই একদিন এই দেশের হাল ধরবেন। জয় কিংবা তারেক যখন ছোট ছিল তখন হাসিনা কিংবা খালেদা কি ভেবেছিলেন যে তাদের সন্তানেরা একদিন প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা কিংবা দলের সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান হবেন? কিন্তু তারা সেটা হয়েছেন। বাংলাদেশের বর্তমান প্রেসিডেন্ট মি. আবদুল হামিদের মা-বাবা কি ছোট বেলায় ভেবেছিলেন তার সন্তান দেশের প্রেসিডেন্ট হবেন? হাওর এলাকার সেই ছেলে আবদুল হামিদ দেশের প্রেসিডেন্ট হয়েছেন। ছাগল পালনকারী মি. আতিউর রহমান এখন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্ণর। এটাই সত্যি। সত্যিটা হলো শিশু কি হবে আমরা জানি না। সেকারণেই আমাদের কাজ হলো শিশুদের মেধা বিকাশে এবং তাদের সুষ্ঠুভাবে বড় হয়ে উঠতে সহায়ক পরিবেশ তৈরি করে দেয়া।

দেশ যেহেতু পরিচালনা করেন রাজনীতিবিদগণ সেকারণে তাদের কাজ হলো শিশুদের ভবিষ্যৎ গড়ে তোলার সব ধরনের সহায়তা করা। তাদের ভুলে গেলে চলবে না তারাও একদিন শিশু ছিলেন। একারণেই তাদেরকে প্রতিদিন নিজেকে জিজ্ঞাসা করতে হবে শিশুদের জন্য কি করলেন?

আমি তো বলব শেখ হাসিনা এবং খালেদা জিয়ার দলীয় হাই কমান্ডের প্রতিটি মিটিংয়ের একটি কমন এজেন্ডা হওয়া দরকার- শিশুদের জন্য আমরা কি করেছি এই প্রশ্নের উত্তর খোঁজা।

প্রতিটি মন্ত্রণালয়ের প্রতিটি মিটিংয়ে শিশুদের জন্য কি করা হয়েছে আগের মিটিং থেকে এই মিটিং পর্যন্ত সেটি খতিয়ে দেখা দরকার। জেলা ও উপজেলার মাসিক মিটিংগুলোতেও গুরুত্ব পাওয়া উচিৎ- শিশুদের এজেন্ডাগুলো। মজার ব্যাপার হলো শিশুদের জন্য আলাদা কোন এজেন্ডা কিন্তু নেই। সমাজ উন্নয়নের সকল এজেন্ডাই শিশু এজেন্ডা। অন্য কথায় শিশুদের এজেন্ডা পূরণ করা হলে আপনাআপনি সমাজের উন্নয়ন হবে।

হাসিনা খালেদা শিশুদের জন্য কি করবেন তার একটি ছোট্ট তালিকা নিচে দিচ্ছি। ৪৩ বছর বয়সী বাংলাদেশে ২৩ বছর ধরে ক্ষমতায় থাকা এই দুই ক্ষমতাধর নেতার কাছাকাছি থাকা উপদেষ্টারা আমার মনে হয় একেকজন স্বার্থের বলি। তারা নিজ নিজ স্বার্থ পূরণে সবসময় ব্যস্ত। বলা যায় তারা স্বার্থের বাইরে কোন কিছু দেখতে পান না। কিংবা তারা ভীতু টাইপের মানুষ যেকারণে শিশুদের নিয়ে কথা বলতে ভয় পান। শেখ হাসিনা কিংবা খালেদা জিয়ার কাছে আমার কোন স্বার্থ নেই। আমার স্বার্থ দেশ ও দেশের মানুষ। আমি তো শেখ হাসিনা ও খালেদা জিয়াকে শিশুদের জন্য করণীয় কি হতে পারে সে বিষয়ে আমার মতামত জানাতেই পারি। তারা সেটি শুনবেন কি না সেটি তাদের বিষয়। আমি তাদেরকে স্মরণ করিয়ে দিতে চাই ষোল কোটি মানুষের এই দেশের মালিকপক্ষের আমিও একজন। আমার পুরো অধিকার আছে যা কিছু দেশ ও দেশের মানুষের জন্য ভালো সেনিয়ে নেতাদের পরামর্শ দেয়ার। প্রজাতন্ত্রের মালিক জনগণ। জনগণের একজন হিসেবে আমি মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং বৃহত্তম বিরোধী দল বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার কাছে আমার পরামর্শগুলো নিম্নরূপ: (এখানে শিশু বলতে ১৮ বছর বোঝানো হয়েছে।)

– গ্রামে গঞ্জে এবং শহরের প্রতিটি শিশুর খেলার জন্য খেলার মাঠ থাকা বাধ্যতামূলক হতে হবে।
– প্রতিটি ইউনিয়নে লাইব্রেরি গড়ে তুলতে হবে।
– প্রতিটি প্রাথমিক ও মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে লাইব্রেরি থাকতে হবে। সপ্তাহে একদিন লাইব্রেরি পিরিয়ড থাকতে হবে।
– স্থানীয় ও জাতীয় পর্যায়ে শিশু সংগঠন করাকে রাষ্ট্রীয়ভাবে উৎসাহিত করতে হবে।
– ইউনিয়ন, উপজেলা, জেলা ও জাতীয় পর্যায়ে শিশুদের জন্য নিয়মিত ক্রীড়া ও সাংস্কৃতিক কর্মকান্ড করার জন্য রাষ্ট্রীয়ভাবে ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।
– শিশুদের জন্য পৃথক মন্ত্রণালয় গঠন করতে হবে। শুরুতে কয়েকবছর এই মন্ত্রণালয় প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্বে রাখতে হবে।
– শিশুদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশে যারা অর্থ দেবে সেই অর্থ করমুক্ত ঘোষণা করতে হবে।
– শিশু স্বার্থ বিরোধী যেকোন ধরনের কর্মকান্ডে প্রচলিত আইন মোতাবেক দ্রুত বিচার করতে হবে।
– শিশু স্বার্থকে রাষ্ট্রের অগ্রাধিকার তালিকায় এক নাম্বারে স্থান দিতে হবে।
– শিশুদের জন্য যারাই বই লিখবে, সিনেমা বানাবে, অনুষ্ঠানের আয়োজন করবে তাদেরকে রাষ্ট্রীয়ভাবে পৃষ্ঠপোষকতা দিতে হবে।
– প্রতিবছর কমপক্ষে ১০০ শিশু চলচ্চিত্র বানাতে হবে। এবং সেগুলো স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসা ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে বিনামূল্যে দেখানোর ব্যবস্থা নিতে হবে। সেগুলো টেলিভিশনসহ সিনেমা হলগুলোতে দেখাতে হবে।
– দেশের ইউনিয়ন পরিষদ, উপজেলা পরিষদ ও সংসদে শিশু বিষয়ক কর্মকান্ড দেখার জন্য পৃথক কমিটি গঠন করতে হবে।
– দেশের সকল হাসপাতালে শিশুদের অগ্রাধিকার ভিত্তিতে চিকিৎসা দিতে হবে।
– যানবাহনে শিশুদের ও বৃদ্ধদের যাতায়াতে বিশেষ ব্যবস্থা নিতে হবে।
– প্রতিভাবান শিশুদের প্রতিভা বিকাশে রাষ্ট্রের সকল স্তরে বিশেষ সহায়তা দিতে হবে।
– আগ্রহী শিশুদের বাংলা ছাড়াও ইংরেজি, স্প্যানিশ, চাইনিজ, ফরাসি, জার্মান ও আরবী ইত্যাদি ভাষা শেখার সুযোগ করে দিতে হবে। তাদেরকে বিশ্ব রাজনীতিতে অবদান রাখার উপযোগী করে গড়ে তুলতে হবে।
– শিশুরা যাতে তাদের আগ্রহের বিষয়ে লেখাপড়া ও কাজের দক্ষতা অর্জন করতে পারে সেবিষয়ে রাষ্ট্রকে আন্তরিক হতে হবে।

আপাতত এই টুকু। পাঠকদের বলব, আসুন দেশ জুড়ে শিশু আন্দোলন গড়ে তুলি। দেশ ও দেশের মানুষের জন্য কাজ করি।

Advertisements

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s