পতিতাপল্লী এবং যৌনকর্মী : এক চিমটি কথা


এটি বাণী শান্তা পতিতালয়ের একটি ছবি।  ছবি ক্রেডিট: Giulio Di Sturco

এটি বাণী শান্তা পতিতালয়ের একটি ছবি।
ছবি ক্রেডিট: Giulio Di Sturco

আমি তখন মোহাম্মদপুর ইকবাল রোডে থাকি। মোহাম্মদপুর থাকার কারণ বউ তখন শিক্ষকতা করেন গ্রীণ হেরাল্ড স্কুলে। বাসার দরজায় দাড়ালে গ্রীণ হেরাল্ডের গেট দেখা যায়। আর আমি কাজ করি ভলান্টারি হেলথ সার্ভিসেস সোসাইটি (ভিএইচএসএস)-তে। ভিএইচএসএস-এর অফিস আদাবর বায়তুল আমান হাউজিং সোসাইটিতে। সম্ভবত রাস্তা নং ছিল ২ আর বাড়িগুলোর নাম্বার ছিল ২৭১,২৭২ ও ২৭৩ (ভিএইচএসএস কোন কলিগ লেখাটা পড়লে ভুল হলে ঠিক করে দেবেন অনুগ্রহ করে।); ভিএইচএসএস ছিল স্বাস্থ্য নিয়ে কর্মরত এনজিওদের সমন্বয়কারী সংস্থা। ১৯৭৮ সালে যখন ভিএইচএসএস এর যখন জন্ম হয়েছিল তখন কুকুর কামড়ালে জলাতংক রোগের ইনজেকশন পাওয়াটাও কষ্টসাধ্য একটি বিষয় ছিল। প্রাথমিক স্বাস্থ্য সেবা ও জনস্বাস্থ্য নিয়ে কাজ করতে গিয়ে এনজিওরা নানান ধরনের সমস্যায় পড়তো তখন। সেই সব সমস্যাকে সমন্বিতভাবে মোকাবেলা করতেই এবং সকলের কাজকে ফ্যাসিলিটেট করতে ভিএইচএসএস তৈরি হয়েছিল। পরবর্তীতে স্বাস্থ্য বিষয়ক বড় বড় সব নেটওয়ার্কের জন্ম হয়েছে ভিএইচএসএস-এ এবং একসময় তারা পৃথক নেটওয়ার্ক হিসেবে ভিএইচএসএস থেকে পৃথক হয়ে তাদের কার্যক্রম পরিচালনা করতে শুরু করে। যেমন, পানি ও পয়ঃনিষ্কাশন নিয়ে কর্মরত নেটওয়ার্ক এনজিও ফোরাম ফর ড্রিকিং ওয়াটার, প্রতিবন্ধীদের নিয়ে কর্মরতের সংগঠন এনএফওডব্লিউডি, কিশোরীদের নিয়ে কর্মরত এএফএলই ফোরাম, এইচআইভি এইডস বিষয় নিয়ে কর্মরত এইচআইভি এইডস নেটওয়ার্ক, ইত্যাদি। এইচআইভি এইডস নিয়ে কাজের সুবাদে আমাদের সদস্য সংস্থাগুলোর পতিতালয়ে কাজ ছিল। দেশের ছোট বড় প্রায় সকল পতিতালয়ে আমাদের সদস্য এনজিওরা সক্রিয় ছিল।

ভিএইচএসএস অনেক ফ্রেন্ডলি সংস্থা ছিল। কাজের পরিবেশ ছিল একটি বড় পরিবারের মতো। দারোয়ান নুরু মিয়া থেকে চিফ এক্সিকিউটিভ ডাঃ নাসির পর্যন্ত সবাই সেই পরিবারের সদস্য ছিলেন। নব্বই দশকের মাঝামাঝি যে সময়ের গল্প বলছি তখন ভিএইচএসএস-এ সবমিলিয়ে আনুমানিক ৫৬ জন কর্মী ছিলাম আমরা। কমিউনিকেশন টিমে কাজ করার সুবাদে বাকি টিমগুলোর সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ ছিল। এইচআইভি/এইডস টিমে কাজ করতেন রেহান ভাই, ডাঃ গিয়াস ভাই, শামীমা আপা আর নাইমা আপা। আর ছিলেন ভিএসও ভলান্টিয়ার এডউইন আরকো। ডাঃ গিয়াস ভাই আবার অফিসের পর প্রাইভেট প্রাকটিস করতেন। চর্ম ও যৌন রোগের ডাক্তার হিসেবে তার সুনাম ছিল। তিনি প্রচুর স্যাম্পল ওষুধ পেতেন। সেগুলো তিনি ব্যাগ ভরে নিয়ে যেতেন দৌলদিয়া, গোয়ালন্দ কিংবা অন্য কোন পতিতালয়ে। বিনামূল্যে চিকিৎসা করতেন যৌনকর্মীদের। আর ফ্রি স্যাম্পল ওষুধ দিতেন তাদের। পতিতালয়গুলোতে ডাঃ গিয়াস ভাইয়ের গ্রহণযোগ্যতা ছিল দেবতার পর্যায়ে। একবার বিবিসির (অথবা চ্যানেল ফোর, অনেকদিন আগের কথা ঠিক মনে করতে পারছি না।) একটি টিম দৌলদিয়াতে কাজ করতে আসার পর সেখানে ঢুকতে পারছিল না। অবশেষে তারা ভিএইচএসএস-এর শরনাপন্ন হলে ডাঃ গিয়াস ভাই তাদেরকে সেখানে নিয়ে গিয়েছিলেন। পতিতালয়ের বাসিন্দাদের পতিতা না বলে যৌনকর্মী বা সেক্স ওয়ার্কার ডাকার শুরুটাও সেই সময়ে।

ভিএইচএসএস-এ কাজ করার সময় আমার সঙ্গে এক তরুণের পরিচয় হয়েছিল। তিনি মাঝে মাঝে ভিএইচএসএস-এর অফিসে আসতেন। তো সেই তরুণ একদিন আমার ইকবাল রোডের বাসায় এসে হাজির। তার একটা সমস্যা হয়েছে। একজন চর্ম ও যৌন রোগের ডাক্তার দেখানো দরকার। কিন্তু পরিচিত ডাক্তার নেই। ঠিক বুঝতে পারছেন না কাকে দেখাবেন। এই তরুণ যৌনরোগে কিভাবে আক্রান্ত হয়েছিলেন জানেন? পতিতালয়ে গিয়ে। আমার আজো তার কথা কানে বাজে- ‘জুয়েল ভাই, আপনি আমাকে হয়তো খারাপ ভাববেন কিন্তু বিশ্বাস করুন মাসে একবার যেতে না পারলে আমার মাথা খারাপ হয়ে যায়।’ এই তরুণ ঢাকার সদরঘাট ও বংশালের কাছাকাছি পতিতালয়ে যেতো। আমি তাকে গিয়াস ভাইয়ের কাছে পাঠিয়েছিলাম। তিনি উপকার পেয়েছিলেন। পরবর্তীকালে তিনি বিয়ে করে সংসারী হয়েছেন। পতিতালয়ে যাওয়া ছেড়েছেন।

প্রশ্ন হলো পতিতালয়ে কি শুধু অবিবাহিতরাই যায়? মোটেই নয়। আমি এক মাছ বিক্রেতাকে চিনতাম। খেপুপাড়া থেকে হাফ ড্রামে করে ঢাকায় মাছ এনে বিক্রি করত। মাছ বিক্রির টাকা দিয়ে ঢাকায় এক দুই দিন যৌন কর্মীদের নিয়ে সময় কাটাতো। বাড়িতে তার বউ পোলাপান সবই ছিল।

প্রশ্ন হতে পারে পতিতালয়ে কি মাছ বিক্রেতাদের মতো সমাজের খেটে খাওয়া দরিদ্র মানুষেরাই যায়? মোটেই নয়। যশোরের পতিতালয়ে অনেক স্বর্ণ ব্যবসায়ীর নিয়মিত যাতায়াতের কথা আমি জানি। যৌনকর্মীদের নিয়ে যারা কাজ করেন তারা আমার চেয়ে ভালো জানেন, যৌন পল্লী উচ্ছেদের সঙ্গে যারা জড়িত থাকে তাদের অনেকেই ওই পল্লীর নিয়মিত কাস্টমারও বটে। টানবাজার পতিতালয় উচ্ছেদের সময় এবিষয়টি যথেষ্ট আলোচনায় এসেছিল।

যৌন কর্মীরা যদি রেজিস্টার খাতা চালু করে এবং তাদের খদ্দেরদের নাম ঠিকানা প্রকাশ করে দেয় তাহলে সমাজে নিশ্চিত বিশৃঙ্খলা দেখা দেবে। অনেক বড় বড় নেতা মহারথিদের মুখোশ খুলে যাবে। ভারতীয় লেখক শংকরের বই পড়লে সমাজের উচুঁস্তরের মানুষদের যৌন কর্মীদের সঙ্গে উঠবস করার চিত্রটা পাওয়া যায়। তবে দৌলদিয়া, বানীশান্তা, টানবাজারের মতো পতিতালয়গুলোতে সমাজের উঁচুস্তরের লোকজনের যাতায়াত তেমন একটা হয় না। তাদের জন্য রয়েছে পৃথক ব্যবস্থা। প্রয়াত হুমায়ূন আহমেদের কোথাও কেউ নেই নাটক ও বইয়ে এ ব্যাপারে কিছুটা আলোকপাত করা হয়েছে।

পতিতা পেশা পৃথিবীর আদিমতম পেশা। আমি ব্যক্তিগতভাবে এই পেশার বিলুপ্তি চাই। আমি এমন একটি সমাজ ও রাষ্ট্র কাঠামোর স্বপ্ন দেখি যেখানে ন্যায়বিচার ও সুশাসন থাকবে। যেখানে অন্যায় থাকবে কিন্তু তার বিচার থাকবে। মানুষের স্বাধীনভাবে বেঁচে থাকার ও স্বাধীনভাবে পেশা বাছাই করার ক্ষমতা থাকবে। বাংলাদেশ নিঃসন্দেহে তেমন দেশ নয়। যদিও আমি সেই রকম একটি দেশ গড়ার স্বপ্ন দেখি।

সমাজ ও রাষ্ট্রের কাজ নয় কারো উপর কোন কিছু চাপিয়ে দেয়া। রাষ্ট্র ও সমাজের দায়িত্ব হলো মানুষের উন্নত জীবন যাপনের সকল উপাদান নাগরিকদের হাতের নাগালে এনে দেয়া। নাগরিকগণ সেখান থেকে তার প্রয়োজনীয়টুকু বেছে নেবে। গ্রহণ করবে। কিংবা বর্জন করবে। আমি আগেই বলেছি আমি চাই না সমাজে যৌন কর্মী থাকুক। কারণ আমি একটি পারিবারিক পরিবেশে বড় হয়েছি। আমি নারীকে মর্যাদা দিতে শিখেছি। আমার নিজের মা, বোন, বউ এবং মেয়ে আছে। সমাজের সকল নারীর প্রতি আমি শ্রদ্ধাশীল। আমি নারীর প্রতি শ্রদ্ধাশীল বলেই কোন প্রাপ্তবয়স্ক নারীর পছন্দ ও অপছন্দের প্রতিও আমি শ্রদ্ধাশীল। সেখানে হয়তো আমার মতামত থাকতে পারে। কিন্তু তাকে বাধ্য করার কিংবা চাপিয়ে দেয়াটা আমার কাজ নয়।

আমি অন্তর থেকে বিশ্বাস করি কোন মেয়ে স্বইচ্ছায় যৌনকর্মীর জীবন বেছে নেয় না। পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের ব্যর্থতা এবং চাপই একটি মেয়েকে যৌনকর্মীর জীবন বেছে নিতে বাধ্য করে। এই অবস্থার প্রেক্ষিতে আমি আরো বিশ্বাস করি যে, প্রতিটি যৌনকর্মী আমার মতোই চায় এই পেশা বিলুপ্ত হোক। কিন্তু বাস্তবে সেটা হচ্ছে না। কেন? আমাদেরকে দেখতে হবে একজন যৌনকর্মীর পেশা টিকে আছে কাদের জন্য এবং কিভাবে? সমাজের পুরুষরাই যৌনকর্মীর পেশা টিকিয়ে রেখেছে। কারণ পুরুষরাই হলো কাস্টমার বা খদ্দের। যৌনকর্মীদের যদি বিচার করতে হয় তাহলে আগে বিচার করতে হবে কাস্টমারদের। যৌনকর্মীদের ঘরবাড়ি ভেঙ্গে দেয়ার আগে ভেঙ্গে দিতে হবে কাস্টমারদের ঘরবাড়ি। যে আইন ও রাষ্ট্র তার নাগরিক যৌন কর্মীদের নিরাপত্তা দিতে পারে না সেই একই আইন ও রাষ্ট্র ঠিকই যৌনকর্মীদের খদ্দেরদের নিরাপত্তা দেয়। কি সেলুকাস তাই না?

ভাসমান যৌনকর্মীদের তুলনায় পতিতালয়ে বসবাসকারী যৌনকর্মীদের ধরা সহজ। কিন্তু কাস্টমারদের ধরা কি খুব কঠিন কিছু? বলি কি, সবগুলো পতিতালয়ে সিসি ক্যামেরা বসিয়ে দিন না। কাস্টমারদের শনাক্ত করে ধরে ধরে জেলে পুরে দিন। কিংবা হোটেল ভিত্তিক যে যৌনকর্মী ব্যবসা সেগুলো যাদের জন্য টিকে আছে তাদেরকে ধরে জেলে পুরে দিন। কিন্তু কথা হলো এভাবে কি পৃথিবীর আদিমতম এই পেশা ও মানুষের যৌন আকাঙ্ক্ষাকে রোধ করা যাবে? কিংবা কতোজনকে ধরতে হবে। কতোবড় কারাগার বানাতে হবে? এতে কি সমাজে শৃঙ্খলা ভেঙ্গে পড়ার সম্ভাবনা তৈরি হবে না? তাহলে উপায় কি?

সেই উপায়গুলো আগে খুঁজে বের করতে হবে। আমাদেরকে যৌনকর্মী সংখ্যা কমিয়ে আনার দিকে মনোযোগ দিতে হবে। বিকল্প পেশা তৈরি করতে হবে। যৌনকর্মীদের নিয়ে যে বিশাল বাণিজ্য সেখানে মধ্যস্বত্বভোগী একটি গ্রুপ তৈরি হয়েছে। এটি বিলুপ্ত করা যাবে না। কিন্তু মধ্যস্বত্বভোগীরাই যেন পুরো আয় খেয়ে না ফেলে সেটা দেখতে হবে। মোদ্দা কথা হলো যারা এই পেশায় আছেন তাদের জন্য স্বাস্থ্য, চিকিৎসা, পুষ্টিসহ সকল ধরনের সুবিধাদি নিশ্চিত করতে ব্যবস্থা নিতে হবে। মানুষ হিসেবে তাদেরকে রাষ্ট্র ও সমাজের সকল সুবিধা দিতে হবে।

আমরা গোড়ার কারণ দূর না করে যদি পতিতালয় উচ্ছেদের দিকে এগিয়ে যাই সেটা সমস্যা বাড়াবে বৈ কমাবে না। পত্রিকায় পাতায় পড়লাম ২০০ বছরের পুরনো টাঙ্গাইলের বৃহত্তম পতিতালয় কান্দাপাড়া ভেঙ্গে চুরমার করে দেয়া হয়েছে। প্রশ্ন হলো, এখানে যারা ছিলেন তারা এখন কোথায় যাবেন? কিভাবে তাদের পেশায় টিকে থাকবেন? তারা নিশ্চয়ই রাতারাতি অন্য পেশায় যাবেন না। সবচেয়ে বড় কথা হলো, তাদের যে খদ্দেররা ছিল তারা এখন কি করবে? আমি বিষ্মিত হবো না যদি দেখি যে, কান্দাপাড়ার খদ্দেররা এখন ধর্ষণের মতো বড় কোন অপরাধে লিপ্ত হয়। এখানেই রাষ্ট্র পরিচালকগণ ও সমাজের কাছে আমার প্রশ্ন: কান্দাপাড়া পতিতালয় উচ্ছেদের ফলে সমাজে যে যে বিরূপ প্রতিক্রিয়া পড়তে শুরু করেছে এবং আগামীতে পড়বে সেই দায়ভার কার ও কাদের?

আসুন, একটি ন্যায়নিষ্ঠ সমাজ গড়ে তুলতে সমাজের গোড়ার কারণগুলো দূর করতে সচেষ্ট হই। আগা কেটে পানি ঢেলে কোন লাভ হবে না। প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি ছাড়াই সমাজের যে দুষ্ট ক্ষতরা হঠকারিতা দেখিয়েছে পতিতালয় উচ্ছেদের মাধ্যমে তাদেরকে আইনের আওতায় আনা দরকার। আমাদেরকে মনে রাখতে হবে পতিতারাও মানুষ। এবং ন্যায়বিচার পাওয়ার পূর্ণ অধিকার তাদেরও আছে।

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

Connecting to %s