গার্মেন্টস শিল্প নিয়ে ১১টি প্রশ্ন


নিচের লেখাটি আমি লিখেছিলাম ২০১০ সালের ২৩ জুন। তখন লেখাটি অন্য একটি লেখার অংশ ছিল। প্রাসঙ্গিকতা বিবেচনা করে লেখাটি আবারো প্রকাশ করছি। তখনও তাজরিন পুড়ে মানুষ মরেনি। রানা প্লাজা ধ্বসেনি। কিংবা স্ট্যান্ডার্ড আগুনে পুড়েনি। কিন্তু তখনও শ্রমিকদের বেতন বকেয়া থাকত। শ্রমিকরা আন্দোলন করত। বাকিটুকু নিচে পড়ুন:

‘পোশাক কারখানার সঙ্কট নিরসনে চার সাংসদকে দায়িত্ব’- প্রথম আলো, ২৩ জুন ২০১০
‘সরকারি চাপে বন্ধ গার্মেন্টস আজ খুলছে’- নয়া দিগন্ত, ২৩ জুন ২০১০
আজকে প্রায় সবগুলো জাতীয় দৈনিকের প্রথম পাতার শীর্ষ সংবাদ ছিলো গার্মেন্টস ফ্যাক্টরির শ্রমিক অসন্তোষ ও এ সংক্রান্ত বিষয়াদি। একমাত্র দৈনিক নয়া দিগন্ত এই সংবাদটি কম গুরুত্ব দিয়ে পেছনের পাতায় ছাপিয়েছে। তাদের লিড নিউজ ছিলো ‘দেবে যাচ্ছে ঢাকা’।

বেতন বৃদ্ধির দাবীতে গার্মেন্টস ফ্যাক্টরিগুলোর উত্তাল হয়ে উঠার বিষয়টি বেশি করে শুরু হয়েছে ২০০৭ সালের শেষ ভাগে। এটি কেন এনিয়ে নানা মুনির নানান মত রয়েছে। সেনাবাহিনী সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময়ে অনেককে বলতে শুনেছি বিদেশী মদদে এমনটা হচ্ছে। কিন্তু সেই বিদেশী কারা তা আজতক উদঘাটিত হলো না। এদিকে গার্মেন্টস ফ্যাক্টরির শ্রমিক অসন্তোষও বজায় আছে। অনেকভাবেই শ্রমিক অসন্তোষের ব্যাখ্যা দেয়া যায়। আমি শুধু কয়েকটি প্রশ্ন তুলে ধরতে চাই:

১. গত তিন বছরের গার্মেন্টস ফ্যাক্টরির আন্দোলন থেকে কতজন শ্রমিক উপকৃত হয়েছেন আর কতোজন শ্রমিক নেতা উপকৃত হয়েছেন? শ্রমিক নেতাদের পেছনে কারা কাজ করছেন?

২. বেতন প্রসঙ্গটি নিয়ে এতো কথা বলা হচ্ছে অথচ প্রতিদিন গার্মেন্টস ফ্যাক্টরিতে যে মানবতা ভূলুণ্ঠিত হচ্ছে যেমন: যৌন নিপীড়ন, যৌন হয়রানি, বাধ্যতামূলক ওভারটাইমসহ নানান ধরনের নির্যাতনের ঘটনা ঘটছে সেগুলো নিয়ে কেন সারাবছর ধরে শ্রমিক নেতারা সোচ্চার নন? গার্মেন্টস ফ্যাক্টরির বেশিরভাগ শ্রমিকের যে নিয়োগপত্র নেই, তাদেরকে যে যখন তখন ছাটাই করা হচ্ছে সেটি কেন আলোচনায় আসে না? আবার আগুনে পুড়ে, ভবন ধ্বসে, বিপদের সময় হুড়োহুড়ি করতে গিয়ে পদদলিত হয়ে শ্রমিকরা মারা যায়; এই বিষয়গুলো কেন সামনে আসছে না?

৩. শ্রম ও জনশক্তি মন্ত্রণালয়ের পরিসংখ্যান অনুযায়ী দেশের ৪৭০০ গার্মেন্টস কারখানার মধ্যে ১৫০০ বন্ধ এবং আরো ১৫০০ মানহীন, যেখানে শ্রমিকরা ঝুঁকিপূর্ণ পরিবেশে কাজ করে। কিভাবে ও কাদের স্বার্থে এই ধরনের মানহীন কারখানাগুলো চালু আছে?

৪. মালিকপক্ষের সঙ্গে দরকষাকষির পরিবর্তে কাদের স্বার্থে শ্রমিক নেতারা ভাঙ্গচুর ও জ্বালাও পোড়াও আন্দোলন করে থাকে? ২০০৭ সালের শেষভাগের সহিংসতায় প্রায় ২০ কোটি টাকার সম্পদের ক্ষতি হয়েছে যা ন্যূনতম মজুরির ভিত্তিতে প্রায় ২ লাখ ১৫ হাজার গার্মেন্টস কর্মীর একমাসের বেতনের সমান।

৫. বেতন বৃদ্ধি সবাই চায়। কিন্তু গার্মেন্টস বন্ধ করে নয়। সাধারণ গামেন্টস শ্রমিকদের কারা জিম্মি করে, কেন রাখতে চায়?

৬. আমাদের দেশের বর্তমান চাহিদা হলো বছরে প্রায় ৩০০ কোটি গজ কাপড়, যার প্রায় পুরোটাই বিদেশ থেকে আমদানী করতে হয়। কেন?

৭. গার্মেন্টস শিল্পে প্রত্যক্ষভাবে কাজ করছে ২২ লাখ কর্মী আর পরোক্ষভাবে এই শিল্পের উপর নির্ভরশীল প্রায় ২ কোটি মানুষ। এই বিষয়টিকে কেন গুরুত্ব দেয়া হয় না?

৮. গার্মেন্টসগুলো সুনির্দিষ্ট নিয়মনীতিতে না চলে কেন, মালিকদের ইচ্ছে অনুযায়ী পরিচালিত হয় কেন?

৯. আমেরিকান ক্যাজুয়াল ওয়ার ব্র্যান্ড টেসকো ইংল্যান্ডের বাজার দখলের জন্য মাত্র ৩ পাউন্ডে ভ্যালু জিনস যখন বিক্রি করতে শুরু করলো তখন সেই জিনস প্যান্টগুলো তারা বাংলাদেশের নন-কমপ্লায়েন্স ফ্যাক্টরিগুলোতে তৈরি করিয়ে নিতে শুরু করে। ২০০৭ সালে তারা বাংলাদেশ থেকে ৫৪ মিলিয়ন পাউন্ডের ভ্যালু জিনস তৈরি করিয়েছে। এই যে বায়ররা একদিকে কমপ্লায়েন্সের কথা বলে আবার তারাই নন-কমপ্লায়েন্স ফ্যাক্টরিতে কাজ করায় (প্রায় ২০০০ নন-কমপ্লায়েন্স ফ্যাক্টরি রয়েছে) এ নিয়ে কেন সরকার ও রাজনৈতিক দলগুলো কথা বলে না?

১০. পশ্চিমাদের ও বহুজাতিক কোম্পানিগুলোর ডাবল স্ট্যান্ডার্ডের বিরুদ্ধে কথা কে বলবে?

১১. জোট সরকারের সময় প্রথমবারের মতো ঢাকাসহ গার্মেন্টস ফ্যাক্টরি অধ্যুষিত এলাকাগুলো যখন উত্তপ্ত হয়ে উঠেছিল তখন আওয়ামী লীগসহ বিরোধীদলগুলো নিম্নতম মজুরি বাস্তবায়নে সরকারের আন্তরিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিল। আমি নিশ্চিতভাবে বলতে পারি বিএনপি এবারকার আন্দোলনকে সরকারের ব্যর্থতা বলবে। আমার প্রশ্ন হলো- গার্মেন্টস ফ্যাক্টরিগুলো কেন রাজনৈতিক উদ্দেশ্য হাসিলের অস্ত্র হিসেবে ব্যবহৃত হয়?

এই লেখাটি শেষ করবো একটি ছোট পরিসংখ্যান দিয়ে। গত সোমবার বাজারে গিয়ে এক পোয়া কাচ্চি মাছ কিনেছি ৬০ টাকায়। পটলের কেজি ১০ টাকা। কচুর লতি ৩০ টাকা কেজি। এক কেজি রুই মাছ ১৮০ টাকা। লাল শাকের মুঠি ৬ টাকা। ডিমের ডজন ৭০ টাকা। ইলিশের জোড়া (৭০০ গ্রাম ওজনের) ৬০০ টাকা (কেনা হয়নি, জাতীয় মাছ আমি না খাওয়ার পক্ষপাতি!)। কিনতে পারিনি বাইলা মাছ। কেজি ৪০০ টাকা বলে। কচু কিনেছি ৩০ টাকা দরে। একবেলা ভাত, ডাল আর ডিমের তরকারি রাস্তার ধারের চট ঘেরা হোটেলেও ৩০ টাকা। আর আমাদের গার্মেন্টস শ্রমিকদের একদিনের বেতন ৫৫ টাকা থেকে শুরু। এই টাকায় খাবে, ঘর ভাড়া দেবে, সাবান কিনবে, গোসল করবে আমরা কি করে আশা করি। সবচেয়ে বড় কথা ২০ লাখ নারী শ্রমিকের মাসিক চলাকালীন যে স্যানিটেশন প্রয়োজন সেটি কি করে সম্ভব দিনে মাত্র ৫৫ টাকা আয় করে? প্রজনন স্বাস্থ্যের যত্নবিহীন এই নারীরা যে সন্তান জন্ম দেবে, সেই সন্তান এই দেশের আগামী প্রজন্ম মনে রাখুন। অপুষ্টিতে আক্রান্ত দুর্বল মায়ের কাছ থেকে আমরা কি আশা করতে পারি??????

আমরা সবাই মিলে গলা টিপে মারছি আমাদের আগামী প্রজন্মকে। আর রাতের ঢাকার আনন্দ উপভোগ করছি, ফাস্ট ফুড খাচ্ছি, বিলাসী গাড়িতে চড়ছি। ছিঃ আমাদের লজ্জা হওয়া উচিত।

ভালো কথা, আইন প্রণেতা সংসদ সদস্যগণ কি পারেন না আগামী অধিবেশনে গার্মেন্টস শিল্পের এই বিষয়গুলো নিয়ে একটি পুরো অধিবেশন কাজ করে সকল সমস্যার সমাধানে উপযুক্ত আইন প্রণয়ন করতে? তাদের কাজ পুলিশের কাজ নয়, কিংবা তাদের কাজ ফ্যাক্টরির শ্রমিক নেতার কাজ নয় যে তারা গার্মেন্টস ফ্যাক্টরি এলাকাগুলোতে ঘুরে বেড়াবেন। তাদের কাজ লেখাপড়া করে, বুদ্ধি খরচ করে জনস্বার্থে আইন প্রণয়ন করা যাতে করে আগামী প্রজন্ম সুস্থ হয়ে বড় হতে পারবে।

Advertisements

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s