ইউনাইটেড হাসপাতালের কান্ড কীর্তি, আমার বাবা এবং অন্যান্য হাসপাতাল


হালুয়াঘাটে জয়রামকুড়া মিশন হাসপাতালে চিকিৎসা নেয়ার পর রোগী তার সাধ্যমতো টাকা জমা দেয়। বাকি টাকার হিসেব নিয়ে বাড়ি ফিরে যায়। আর মাসে মাসে কিংবা তার সুবিধামতো সপ্তাহে সপ্তাহে এসে বাকি টাকা ফেরত দিয়ে যায়। ওখানকার সরকারি হাসপাতাল থেকেও রোগীদের জয়রামকুড়া মিশন হাসপাতালে রেফার করা হয়। আমি এটা ২০০১ সালের কথা বলছি।

Untitledসময়টা ২০০৭ সাল। আগস্ট মাস। ১০ তারিখ। ঢাকার পান্থপথের একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় আমার বাবা শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করলেন। তখন ফজরের আজান হয়ে গেছে মাত্র। আইসিইউ-তে বাবার পাশে পরিবারের পক্ষে আমি একা। কিছুক্ষণ আগে ডিউটি ডাক্তার আমাকে রুমে ডেকেছেন। আমার চোখের সামনে এক এক করে যন্ত্রপাতিগুলোতে শেষ সময় দেখাচ্ছে। আমি বাবার ঠোট শেষ সময়ে ভেজানো তুলা দিয়ে মুছে দিলাম। কানের কাছে কলেমা পাঠ করলাম। তিনি সপ্তাহধিককাল ধরেই অজ্ঞান অবস্থায় আছেন। তার সঙ্গে আমার কোন কথাই হলো না। তিনি চলে গেলেন। আমি রুম থেকে বের হয়ে এলাম। প্রথমেই মনে হলো আমাকে যতো দ্রুত খেপুপাড়া পৌঁছাতে হবে। প্রথম ফোনটা আমার শিক্ষককে করলাম, যার কাছে আমার লেখাপড়ায় হাতেখড়ি। তিনি তখন সরকারের একজন সচিব। আমি জানি তিনি ফজরের নামাজ পড়তে উঠেছেন। তিনি আমাকে একটা এম্বুলেন্সের ফোন নাম্বার দিলেন। ওদেরকে ফোন দিলাম। তারপর একে একে আরো অনেককে। কিছুক্ষণের মধ্যেই আমার শিক্ষকসহ অনেকেই হাজির হয়েছেন। আমি ব্যস্ত হয়ে পড়লাম কতো তাড়াতাড়ি গোসল করিয়ে খেপুপাড়ার পথে রওয়ানা হওয়া যায়। সবাই কান্নাকাটি করছে শুধু কাঁদছি না আমি। অথচ আমি যে আজকের আমি; দেশ ও দেশের মানুষকে ভালোবাসার যে যোগ্যতা ও অনুপ্রেরণা সবই আমি বাবার কাছ থেকে পেয়েছি। তার আদর্শ ধারণ করার চেষ্টা করেই আমি চলছি অথচ সেই আমি কাঁদতে পারছি না। এটা যে কতোটা কষ্টের সেটা কাউকে বলে বোঝানো যাবে না। এম্বুলেন্স রেডি, কোথায় গোসল করানো হবে সব রেডি। কিন্তু হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ বাবাকে নিতে দেবে না কারণ বিল বাকি। আমি নিয়ম করে দুয়েকদিন পর পর কিছু কিছু টাকা জমা দিয়েছি। প্রতিদিন ৩০ হাজার টাকা প্রায়। শেষ দুয়েকদিনের বিল বাকি। এখন ঠিক মনে করতে পারছি না কতো বাকি ছিল। কিন্তু পুরোটা শোধ না করা পর্যন্ত তারা ছাড়বে না। আমি তাদেরকে বললাম এখানে আমি আছি। সরকারের একজন পূর্ণ সচিব আছেন। বাকি যারা আছেন তাদের মধ্যে সরকারি ব্যাংকের ম্যানেজারও আছেন। তারা কেউ যাবেন না। শুধু ছোটভাই যাবে কাজটা এগিয়ে নিতে। আর বিল আমি শোধ করার ব্যবস্থা নিচ্ছি। সচিব সাহেবও বললেন। কিন্তু হাসপাতালের লোকদের রোবটের মতো একই কথা বিল আগে শোধ করতে হবে। আমার ধৈয্যের বাধ ভেঙ্গে গেল। আমি অনেক রেগে গেলাম। ওই সকালেই হাসপাতালের এমডিকে ফোন করলাম। কাজ হলো। গোসলের জন্য ছেড়ে দেয়া হলো। আমি এবার বসুন্ধরা থেকে এটিএম কার্ড দিয়ে ২০ হাজার টাকা তুলে এনে দিলাম। বাকি টাকাটা জোগাড় করে দিয়ে দিলাম।

কিন্তু সাদিয়া ইসলাম আমার মতো সৌভাগ্যবান নন। তিনি তার বাবার মরদেহ নিয়ে যেতে পারেননি। ইউনাইটেড হাসপাতাল তার বাবার মরদেহ টাকার জন্য আটকে রেখেছিল। যা পত্রিকার পাতায় খবর হওয়ার পর তবেই সেই মরদেহ সাদিয়া ইসলাম ফেরত পেয়েছেন। আমি নিশ্চিত যে, এই দেশে প্রতিদিন হাজার হাজার সাদিয়া ইসলাম কিংবা গোলাম নবীর দেখা মিলবে আপনি যদি হাসপাতালগুলোতে যান।

আমার বাবা যখন হাসপাতালে তখন আমি আর আমার ছোট ভাই পালা করে রাতে হাসপাতালে থাকতাম। থাকা মানে আইসিইউ ইউনিটের বাইরে সোফায় বসে বসে ঝিমানো আর দোয়া দরুদ পড়া। রাত বিরাতেও ওখানে আসত। পুরনো রোগীদের আত্মীয়স্বজনরা ফিস ফিস করে কথা বলত। প্রায় দিনই কেউ না কেউ মারা যেতো। আর সবারই চিন্তা ছিল টাকা জোগাড় করা নিয়ে। একদিন বিকেলে এক রোগীর কয়েকজন স্বজন মিলে শলাপরামর্শ করতে লাগল লাইফ সাপোর্টে রোগীকে রাখবে না কি বাড়ি নিয়ে যাবে। দিনে প্রায় ৩০ হাজার টাকা দেয়ার ব্যাপারে বেশিরভাগ স্বজনেরই আপত্তি। কারণ ইতোমধ্যে জমি বিক্রি করা হয়েছে। এরপর পথে বসতে হবে। তাহলে উপায় কি? লাইফ সাপোর্ট খুলে দেয়ার কথা বলল স্বজনেরা। এম্বুলেন্স আনা হলো স্যালাইন ও অক্সিজেন সিলিন্ডার দিয়ে সদরঘাট পাঠানোর প্রক্রিয়া চলতে থাকল। আমি ঠিক বুঝতে পারছিলাম না ঠিক কি হচ্ছে। এভাবে আইসিইউ-র রোগীকে নিয়ে যাওয়া যায় কি না? দেখতে দেখতে রোগী মারা গেল। কি নিষ্ঠুর বাস্তবতা!!

মিজ সাদিয়া ইসলামও তার বাবার চিকিৎসা করতে চেয়েছেন। ১২ লাখ টাকা পর্যন্ত বিল পরিশোধও করেছেন। কিন্তু হাসপাতালের বিল হয়েছে ৩১ লাখ টাকা। এই দেশের একজন মন্ত্রী যে বেতন পান সেই বেতন দিয়ে সংসার চালানোর পর ৩১ লাখ টাকা জমাতে তার কতো বছর লাগতে পারে কেউ জানেন কি? একজন মানুষ যদি মাসে ৫০ হাজার টাকা জমা করে তাহলে তার দরকার হবে ৫ বছর ২ মাস। আর কারো বেতন যদি মাসে ৫০ হাজার টাকা হয় আর তিনি যদি কোনমতে মাসে ৫ হাজার টাকা জমা করেন তাহলে ৩১ লাখ টাকা জমাতে সময় লাগবে ৫১ বছর ৮ মাস। যা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের বয়সের প্রায় সমান। আর জিয়াউর রহমানের বয়সের চেয়ে ৬ বছর বেশি। তো এতো টাকা সাদিয়া ইসলাম পাবেন কোথায়? যদি না তার বাবা দুর্নীতিগ্রস্ত মন্ত্রী এমপি না হয়ে থাকেন।

এটা গেল একটি দিক। আরেকটি দিক হলো রোগীর জানতে পারা তার কতো খরচ হবে। কিংবা খরচ হচ্ছে। যেমনটা জানতে পেরেছিল বাউফলের সেই রোগীর স্বজনেরা, যারা লাইফ সাপোর্ট খুলে অক্সিজেন সিলিন্ডার আর স্যালাইন দিয়ে রোগীকে বাড়িতে নিতে গিয়ে মরদেহ নিয়ে গিয়েছিলেন। সাদিয়া ইসলাম বলেছেন যে, “আমরাও বুঝতে পারিনি এতটা বিল হবে। কিন্তু এখন পর্যন্ত ১২ লাখ টাকা আমরা শোধ করেছি। বাকিটা তো দেয়া সম্ভব নয়। আর হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ বলছে, টাকা না পেলে তারা আমার বাবার মৃতদেহ দেবে না।” এদিকে হাসপাতালের জনসংযোগ কর্মকতা মুস্তাফিজুর রহমান বিবিসিকে জানান, “আমরা আগেই রোগীর স্বজনদের বলেছিলাম এখানে খরচ অনেক হবে, আপনারা অন্য হাসপাতালে যেতে পারেন। কিন্তু তারা আমাদের চিকিৎসা চালিয়ে যেতে বলেছে।” আমি ওই হাসপাতালে না গিয়েও বলতে পারি জনসংযোগ কর্মকর্তা মিথ্যা বলেছেন। বাংলাদেশের হাসপাতালগুলোতে যাতায়াতের সুবাদে এবং আমার ডাক্তার বন্ধুদের সঙ্গে গল্প করার সুবাদে আমি জানি হাসপাতালগুলো কিভাবে রোগীকে তাগাদা দিয়ে টাকা আদায় করে। এর ব্যতিক্রম হয় শুধুমাত্র ক্ষমতাবানদের বেলায় – সেটা রাজনৈতিক কিংবা আর্থিক। সাদিয়া ইসলাম যে সেই গোত্রের নন সেটা তো বোঝাই যায়। ফলে আমি সাদিয়া ইসলামের কথা যাচাই বাছাই ছাড়াই বিশ্বাস করি যে, খরচের ব্যাপারে সাদিয়া ইসলামকে অন্ধকারে রাখা হয়েছিল।

আমার দুর্ভাগ্য হয়েছে অতীতে স্কয়ার হাসপাতালের ঝকঝকে লবিতে হোল্ডঅল (এখন আর তেমন দেখা যায় না। গুগল করে দেশীয় হোল্ডঅলের কোন ছবি পেলাম না। আমার কাছে কোন ছবি নেই। কারো কাছে থাকলে শেয়ার করার অনুরোধ রইল। এটা হলো একটা সিঙ্গেল সাইজের বিছানা যাকে রোল করে লম্বাটে ব্যাগের আকৃতি/ কোলবালিশের আকৃতি দেয়া যায়। যা ধরার বন্দোবস্ত আছে।) পেতে বসে আছে। গ্রামের জমি জমা বেচে এসেছে শেষ চেষ্টা করতে। স্কয়ার জাতীয় হাসপাতালগুলোতে দিনে লক্ষাধিক টাকার বিল হরহামেশা হয়ে থাকে। আর এরা কিভাবে বিল বানায় সেটা একটা বড় রহস্যের বিষয়! এখানে আমার একটা পুরনো লেখার লিঙ্ক দিচ্ছি বিষয়টি বোঝার জন্য। http://goo.gl/phjdmB।

রাত হয়েছে। গল্প করলে গল্প ফুরাবে না। সমাধান কি?

হালুয়াঘাটে জয়রামকুড়া মিশন হাসপাতালে চিকিৎসা নেয়ার পর রোগী তার সাধ্যমতো টাকা জমা দেয়। বাকি টাকার হিসেব নিয়ে বাড়ি ফিরে যায়। আর মাসে মাসে কিংবা তার সুবিধামতো সপ্তাহে সপ্তাহে এসে বাকি টাকা ফেরত দিয়ে যায়। ওখানকার সরকারি হাসপাতাল থেকেও রোগীদের জয়রামকুড়া মিশন হাসপাতালে রেফার করা হয়। আমি এটা ২০০১ সালের কথা বলছি। যারা বলেন দেশের মানুষ খারাপ। তাদেরকে বলব নিজের চারপাশে ভালো করে দেখুন। বেশিরভাগ মানুষই ভালো। খারাপ হলো হাতে গোনা কয়েকজন যেমন, মন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত যে কি না বলে ৪০০০ কোটি টাকা চুরি কিছু না কিংবা মন্ত্রী শাহজাহান খান যে কি না বলে ড্রাইভাররা গরু ছাগল চিনতে পারলেই হলো। কিংবা খারাপ হলো সেই সব ঋণ খেলাপি কিংবা গার্মেন্টেসে মানুষ পুড়ে মরে যাওয়ার পরও বেতন আটকে রাখে যে গার্মেন্টস মালিকগণ। কিংবা তাদেরকে সমর্থন করে যারা। এদের সংখ্যা কি আসলে বেশি? মোটেই নয়। যাই হোক।

সবাই ভালো থাকবেন। দেশকে ভালোবাসুন। দেশের মানুষকে ভালোবাসুন।

পল্লবী।।
রাত ১:৩৮ মিনিট।।

One thought on “ইউনাইটেড হাসপাতালের কান্ড কীর্তি, আমার বাবা এবং অন্যান্য হাসপাতাল

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

Connecting to %s