হাসিনা-খালেদার কাছে প্রশ্ন: আপনারা খুশী তো?


প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা

বৃহত্তম বিরোধী দল বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া

বৃহত্তম বিরোধী দল বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া

ঈদ মানেই আনন্দ। ঈদের এই আনন্দে বাংলাদেশের দুইজন মানুষের কাছে একটি প্রশ্নের উত্তর জানতে ইচ্ছে করে- আপনারা খুশী তো?

এই দুইজন মানুষ ২৪ বছর ধরে দেশটা শাসন করছেন, যা এই দেশের বয়সের অর্ধেকেরও বেশি। দু’জনেই একাধিকবার ভোটে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি। একজন শেখ হাসিনা, বর্তমান প্রধানমন্ত্রী। অন্যজন খালেদা জিয়া, সাবেক প্রধানমন্ত্রী। তাদের দুজনের ২৪ বছরের যৌথ অর্জন সম্পর্কে জানতে ইচ্ছে করে। তাদের সন্তুষ্টি অসন্তুষ্টি। তাদের তৃপ্তি অতৃপ্তি। সবই জানতে ইচ্ছে করে। বিশেষভাবে জানতে ইচ্ছে করে শিশুদের নিয়ে তারা কি ভাবছেন?

ঈদে তাদের দু’জনকে অত্যন্ত হাসি খুশি দেখা গিয়েছে। তারা দুইজনেই দেশের সিনিয়র সিটিজেন। ঈদের দিন তারা দু’জনেই দেশের মানুষের সঙ্গে ঈদের শুভেচ্ছা বিনিময় করেছেন। টেলিভিশন ক্যামেরায় তাদের দু’জনকেই উৎফুল্ল দেখা গিয়েছে। তাদের উৎফুল্লতা দেখে ভালো লেগেছে। তাদের সুখী সুখী মুখ দেখে জনগণ স্বস্তি পেয়েছে। ভালো লাগাটা এক ধরনের সংক্রামক রোগের মতো যা দ্রুত একজন থেকে অন্যজনে ছড়িয়ে পড়ে। শেখ হাসিনা ও খালেদা জিয়ার হাসি খুশি জনগণের মধ্যে আনন্দের হিল্লোল ছড়িয়ে দিয়েছে।

বাংলাদেশের মানুষ সবসময় আশাবাদী। একটি সুন্দর ভবিষ্যতের জন্য বাংলাদেশের মানুষ সবসময় ত্যাগ স্বীকার করতে রাজি ছিল। বাংলাদেশ যখন স্বাধীন হলো যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশে বাংলাদেশের মানুষ একটি সুন্দর ভবিষ্যতের আশায় অল্পতেই তুষ্ট হতে শিখল। এক মুঠো ভাত, এক টুকরো কাপড়, রাতে মাথা গোজার জন্য একটু জায়গা। ব্যাস। বাঙালীরা খুশি। যেকারণে আমরা দেখি সরকারি হিসেবে (https://www.youtube.com/watch?v=Ux250AfuCCI) ৭৪ এর দুর্ভিক্ষে ২৭ হাজার মানুষের মৃত্যুতেও বাংলাদেশী মানুষ ভেঙ্গে পড়েনি। আশায় বুক বেধেছে। অনেক ঝড় ঝাপটা পার হয়ে ১৯৯১ সালে বাংলাদেশে গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠা পায়। যেখানে শেখ হাসিনা ও খালেদা জিয়ার প্রত্যক্ষ অবদান রয়েছে। বাংলাদেশের মানুষ একজনের পর অন্যজনকে দায়িত্ব দেয়ার মাধ্যমে নিজেদের স্বপ্ন পূরণে তাদের বলিষ্ঠ নেতৃত্ব দেখতে চেয়েছে।

আপনারা জেনে খুশি হবেন যে, এই দেশের মানুষ দুই হাত তুলে আপনাদের জন্য দোয়া করে। আপনাদেরই বা কি দোষ। বাংলাদেশের মানুষ গত ২৪ বছরে অন্তত ৫ কোটি বেড়েছে। ১৯৭১ সালের তুলনায় দেশের লোকসংখ্যা বেড়েছে দ্বিগুণেরও বেশি। চাহিদা বেড়ে চলেছে স্বাভাবিক নিয়মে। দেশের মানুষ পরিশ্রমের কারণে দেশের অর্থনীতির ভিতও মজবুত হয়েছে। মানুষের ক্রয় ক্ষমতা বেড়েছে। যেহেতু এই সময়কালে আপনারা দেশ চালিয়েছেন সেকারণে এর কৃতিত্ব আপনাদের। আপনারা সেকারণে খুশী হতেই পারেন।

১৯৭৪ সালের পর দেশে আর ক্ষুধার অভাবে ২৭ হাজার মানুষ মারা যাওয়ার মতো দুর্ভিক্ষ হয়নি। দেশের সমস্যা এখন ভিন্নরকম। যেমন, সকল ধরনের খাদ্যে ভেজাল দেয়া হচ্ছে। বিষ মেশানো হচ্ছে। বিশুদ্ধ খাবার আর পাওয়া যাচ্ছে না। মানুষের মধ্যে অসুস্থতা ও রোগ বেড়েছে। কিন্তু চিকিৎসা পাওয়া যাচ্ছে না। মারামারি বেড়েছে। দেশের আইন শৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে। খুন গুম বেড়েছে। আইনের প্রতি মানুষের শ্রদ্ধা কমেছে। কেউ কাউকে মান্য করছে না। টাকাই সব এমন একটা ধারণা শহর থেকে গ্রামে স্থায়ী হতে বসেছে। শিক্ষাক্ষেত্রে পাসের হার আকাশচুম্বি। কিন্তু সেখানেও ভেজাল ঢুকে গেছে। লেখাপড়া না শিখেই সার্টিফিকেট পেয়ে যাচ্ছে দেশের শিশু কিশোর ছাত্র ছাত্রীরা। স্কুলগুলোতে লেখাপড়া হয় না বললেই চলে। শিক্ষকদেরই পাওয়া যায় না স্কুলে। তবে বাড়িতে প্রাইভেট পড়ানো সকল সময়ের মধ্যে সর্বোচ্চ। ছেলেমেয়েদের মধ্যে কোচিং পড়ার অসুস্থ প্রতিযোগিতা চলছে। সার্টিফিকেটই যেন সব। সেটা প্রাইমারি স্কুলে। হাইস্কুলে। এমনকি ভেজাল খাদ্যের ক্ষেত্রেও। মানুষ প্রচুর মিথ্যা কথা বলছে। বিশেষ করে মন্ত্রীরা। যেমন, ঈদে বাড়িতে যেতে গিয়ে রাস্তায় দীর্ঘ যানজটে আটকে থাকা মানুষদের ছবি পত্র পত্রিকায় ও টেলিভিশনে দেখানো হলেও মন্ত্রী দাবী করছেন যানজট নেই। ভাঙ্গাচোরা রাস্তাঘাট ২০০০ দিনেরও বেশি সময় ধরে মেরামতের অপেক্ষায় থাকলেও মন্ত্রী বলছেন রাস্তাঘাট ঠিক আছে। এদিকে রেলমন্ত্রী দোষারোপ করছেন বিরোধী রাজনীতিকদের। এর দোষ তার ঘাড়ে চাপানোর এই সংস্কৃতি বাংলাদেশের রাজনীতিতে নতুন। সবমিলিয়ে মানুষের মনে এক ধরনের অসন্তোষ দানা বাধছে। অনেকেই মনে করছেন যে, স্বৈরাচার এরশাদ ভালো ছিলেন। মানুষের মনে স্বৈরাচার এরশাদ প্রীতি বা অতীতের প্রতি মোহ সেটা যে ভালো নয় সেটা বুদ্ধিমান মাত্রই সবাই জানেন। কেউ কেউ অবশ্য, বিশেষ করে নারীরা মনে করেন দেশ একজন পুরুষের চালানো উচিৎ। আমি জানি নারী হিসেবে এই ধরনের পুরুষতান্ত্রিক কথাবার্তা আপনাদের শুনতে হয়। এটা অনাকাঙ্ক্ষিত।

ব্যক্তিগতভাবে আমি দেশের শিশুদের নিয়ে উদ্বিগ্ন। আমি লক্ষ্য করেছি যে, আপনাদের দুই যুগের শাসনামলে শিশুদের ভবিষ্যৎ নানানভাবে বিপন্ন হয়েছে, সেটা আপনারা মানুন আর নাই মানুন। যেমন, শিশুদের শিক্ষা নিয়ে অনেক কথা বলার আছে। শিশুদের শেখাবেন যে শিক্ষক তাদের বেশিরভাগের যে কি করুণ দশা সেটা বুঝতে হলে আপনাদেরকে সরকারি প্রাইমারি স্কুলগুলোতে যেতে হবে। দেশের সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে এখনো দেশের বেশিরভাগ শিশু লেখাপড়া করে। যেখানে প্রথমত যোগ্য শিক্ষকের অভাব রয়েছে। দ্বিতীয়ত, শিক্ষকরা বেশিরভাগ দিন অনুপস্থিত থাকেন। তৃতীয়ত, অনেক স্কুলে শিক্ষক নিজে না গিয়ে প্রক্সি টিচার পাঠিয়ে থাকেন। চতুর্থত, মনিটরিং ব্যবস্থা খুবই নাজুক।

আপনারা দু’জনেই একসময় চলে যাবেন, যারা বেচে থাকবে অর্থাৎ এই দেশের শিশুদের জন্য আপনারা আসলে কি করছেন? জাতির ভবিষ্যৎ হিসেবে শিশুরাই দেশ চালাবে। আপনাদের কি মনে হয় তারা দেশ চালাতে পারবে তো? ঈদের এই খুশীর দিনে একবার বিষয়টি ভেবে দেখবেন। সুযোগ যখন পেয়েছি শিশুদের জন্য আপনারা কি করতে পারেন তার একটি ছোট তালিকা নিচে দিলাম:

১. প্রতিটি মন্ত্রণালয়ের প্রতিটি মিটিংয়ে শিশুদের জন্য কি করা হয়েছে আগের মিটিং থেকে এই মিটিং পর্যন্ত সেটি খতিয়ে দেখা দরকার।

২. জেলা ও উপজেলার মাসিক মিটিংগুলোতেও গুরুত্ব পাওয়া উচিৎ- শিশুদের এজেন্ডাগুলো।

৩. গ্রামে গঞ্জে এবং শহরের প্রতিটি শিশুর খেলার জন্য খেলার মাঠ থাকা বাধ্যতামূলক করুন।

৪. প্রতিটি ইউনিয়নে লাইব্রেরি গড়ে তুলুন। এছাড়াও প্রতিটি প্রাথমিক ও মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে লাইব্রেরি থাকা বাধ্যতামূলক করুন। সপ্তাহে একদিন লাইব্রেরি পিরিয়ড থাকতে হবে।

৫. স্থানীয় ও জাতীয় পর্যায়ে শিশু সংগঠন করাকে রাষ্ট্রীয়ভাবে উৎসাহিত করুন।

৬. ইউনিয়ন, উপজেলা, জেলা ও জাতীয় পর্যায়ে শিশুদের জন্য নিয়মিত ক্রীড়া ও সাংস্কৃতিক কর্মকান্ড করার জন্য রাষ্ট্রীয়ভাবে ব্যবস্থা গ্রহণ করুন।

৭. শিশুদের জন্য পৃথক মন্ত্রণালয় গঠন করুন।

৮. শিশুদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশে প্রদত্ত অর্থ করমুক্ত ঘোষণা করুন।

৯. শিশু স্বার্থ বিরোধী যেকোন ধরনের কর্মকান্ড প্রচলিত আইন মোতাবেক দ্রুত বিচার করুন।

১০. শিশু স্বার্থকে রাষ্ট্রের অগ্রাধিকার তালিকায় এক নাম্বারে স্থান দিন।

১১. শিশুদের জন্য যারাই বই লিখবে, সিনেমা বানাবে, অনুষ্ঠানের আয়োজন করবে তাদেরকে রাষ্ট্রীয়ভাবে পৃষ্ঠপোষকতা দিন। প্রতিবছর কমপক্ষে ১০০ শিশু চলচ্চিত্র বানানোর ব্যাপারে রাষ্ট্রীয়ভাবে নির্মাণ ও স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসাসহ সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে বিনামূল্যে দেখানোর ব্যবস্থা করুন।

১২. দেশের সকল হাসপাতালে শিশুদের অগ্রাধিকার ভিত্তিতে চিকিৎসার ব্যবস্থা নিন।

১৩. যানবাহনে শিশুদের ও বৃদ্ধদের যাতায়াতে বিশেষ ব্যবস্থা নিতে হবে।

১৪. প্রতিভাবান শিশুদের প্রতিভা বিকাশে রাষ্ট্রের সকল স্তরে বিশেষ সহায়তা দিতে হবে।

১৫. আগ্রহী শিশুদের বাংলা ছাড়াও ইংরেজি, স্প্যানিশ, চাইনিজ, ফরাসি, জার্মান ও আরবী ইত্যাদি ভাষা শেখার সুযোগ করে দিয়ে তাদেরকে বিশ্ব রাজনীতিতে অবদান রাখার উপযোগী করে গড়ে তুলুন। শিশুরা যাতে তাদের আগ্রহের বিষয়ে লেখাপড়া ও কাজের দক্ষতা অর্জন করতে পারে সেবিষয়ে রাষ্ট্রকে আন্তরিক হতে হবে।

আপনারা যদি উপরোক্ত কাজগুলো করেন সেদিন দেশের জনগণও খুশী হবে। ‍দুই হাত তুলে আপনাদের জন্য দোয়া করবে।

Advertisements

2 thoughts on “হাসিনা-খালেদার কাছে প্রশ্ন: আপনারা খুশী তো?

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s