কেন এই ‘ষড়যন্ত্র’


একুশে টিভির এক অনুষ্ঠানে রাজনীতিবিদ জনৈক ধীরেন্দ্র নাথ শম্ভু অন্তত এক কুড়ি বার ষড়যন্ত্র শব্দটি উচ্চারণ করেছেন। আজকের পত্রিকায় পড়লাম আরেক রাজনীতিবিদ আইনমন্ত্রীর সাম্প্রতিক এক বক্তব্যের মধ্যে ‘ষড়যন্ত্র’ খুঁজে পেয়েছেন। স্বাধীনতা যুদ্ধের ডেপুটি চিফ এ কে খন্দকারের বই প্রকাশের পর তার দলের বিভিন্ন পর্যায়ের সহস্রাধিক নেতা ও কর্মী এবং সমর্থক পত্রিকায়, ফেসবুকে এবং টেলিভিশন চ্যানেলে ‘ষড়যন্ত্র’ শব্দটি ব্যবহার করেছেন।

আমার ৪৫ বছরের জীবনে গত ৫ বছরে আমি রেকর্ড পরিমাণ সংখ্যকবার টেলিভিশন ও রেডিও-তে ‘ষড়যন্ত্র’ শব্দটা শুনেছি কিংবা ফেসবুক ও পত্রিকায় ‘ষড়যন্ত্র’ শব্দটা পড়েছি। সমাজের পরিচিত যারা ‘ষড়যন্ত্র’ শব্দটা ব্যবহার করেছেন তাদের বেশিরভাগ কাকতলীয়ভাবে একটি রাজনৈতিক দলের নেতা, কর্মী কিংবা সমর্থক। চট্টগ্রাম নিবাসী এক সাবেক মন্ত্রী এবং একটি টেলিভিশন চ্যানেলের মালিকানা আছে এমন আরেক মন্ত্রীকে দেখি যেকোন ইস্যুতে ষড়যন্ত্র খুঁজে পান। অনেকটা মুখে ফেনা তোলার মতো অবস্থা তাদের।

যারা ষড়যন্ত্র ষড়যন্ত্র করে দেশবাসীর কান ঝালাপালা করে দিচ্ছেন তাদের জন্য বাংলায় একটি কথা চালু আছে। রতনে রতন চেনে।

একটি নির্দিষ্ট দলের বড়, মাঝারি, তৃণমূল, জাতীয় নেতাসহ তাদের অনুসারী কর্মী সমর্থকদের এভাবে ষড়যন্ত্র শব্দটা ব্যবহারের কারণে এটা এখন ‘ব্র্যান্ডিংয়ের পর্যায়ে চলে গেছে। ফলে নামে চেনা যায়ের মতো বন্ধুদের আড্ডা, ফেসবুক ও সামাজিক অনুষ্ঠানগুলোতে চট করে এদের আলাদা করে চেনা যায়। জপ করার অভ্যাস থেকে অনেক নিরীহ বিষয়েও এরা ‘ষড়যন্ত্র’ শব্দটি ব্যবহার করে থাকে।

আপনি হয়তো কল্পনায়ও ভাবতে পারেন না এমন বিষয়ে আপনারই বন্ধু কিংবা পরিচিতজন অনায়াসে বলে দিচ্ছে এখানে ষড়যন্ত্র হচ্ছে। এক দুই তিন করে দশজনের একটি তালিকা তৈরি করুন দেখবেন এরা সবাই একটি দলের অনুসারী। আমি একজন মনোচিকিৎসককে জিজ্ঞাসা করেছিলাম এই ধরনের আচরণের কারণ কি হতে পারে। তিনি বলেছিলেন এটা এক ধরনের মানসিক বিকারগ্রস্ততা। যা প্রথমত সন্দেহপ্রবণতা থেকে সৃষ্টি হয়ে থাকে। এছাড়াও নিজের প্রতি আস্থাহীনতা ও অন্যকে হেয় করার মানসিকতা থেকেও এটি হয়ে থাকে। তবে যথাসময়ে চিকিৎসা হলে এই রোগ সারিয়ে তোলা সম্ভব।

বলা হয় একটি দেশের মোট জনসংখ্যার ১০ শতাংশ কোন না কোন ধরনের মানসিক রোগে আক্রান্ত হয়ে থাকে। অন্য এক পরিসংখ্যান মতে, বাংলাদেশে প্রাপ্তবয়স্ক বা ভোটার এমন প্রায় ১৬ শতাংশ মানুষ মানসিক রোগে ভুগছে। তবে এদের মধ্যে কত শতাংশ ষড়যন্ত্র সিনড্রোমে ভুগছে সেরকম কোন তথ্য জানা যায় না।

রাজনীতিবিদরা হলেন একটি দেশের সবচেয়ে শ্রদ্ধার মানুষ। কারণ রাজনীতিবিদগণ জনগণের প্রতিনিধিত্ব করেন। রাষ্ট্র পরিচালনা করেন। দেশ ও দেশের মানুষের ‍উন্নয়ন তাদের কর্মদক্ষতা ও নেতৃত্বের উপর নির্ভর করে। এই অবস্থায় কোন রাজনীতিবিদ যদি তার সহকর্মী কিংবা দেশের জনগণের মধ্যে কারণে অকারণে যখন তখন ষড়যন্ত্রকারী দেখতে পান সেটা মঙ্গলজনক নয়।

যারা অন্যকে ষড়যন্ত্রকারী মনে করে তাদের বোঝা উচিৎ ১৯৭১ সালে একটি রক্তক্ষয়ী জনযুদ্ধের মধ্য দিয়ে এই দেশ স্বাধীন হয়েছে। এই দেশের মানুষ ষড়যন্ত্রকারী হতে পারে না। একটি গণতান্ত্রিক দেশে স্বাধীনভাবে মত প্রকাশ কোন ষড়যন্ত্র নয়। এর মধ্যে ষড়যন্ত্র খোঁজা বিভক্তিকে উসকে দেয়ার চেষ্টা যা কোন মুক্তিকামী মানুষের কাম্য হতে পারে না।

সুস্থ রাজনীতিবিদদের নেতৃত্বেই শুধুমাত্র সুস্থ জাতি পাওয়া সম্ভব।

Advertisements

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s