প্রবাসীদের যারা কষ্ট দেয় তারা বাংলাদেশের শত্রু, নতুন বছরে তাদেরকে চিহ্নিত করুন প্রতিহত করুন


5996467738_d10246389d

১. গত বছর বিশ্বের ৭৪টি দেশে অবস্থানকারী বাংলা ভাষাভাষি পাঠক আমার ব্লগ পড়েছেন। আমি ধরে নিতে পারি তারা প্রবাসী বাংলাদেশী। এক তথ্য মতে, বিশ্বের প্রায় ১৫৯টি দেশে প্রায় ১ কোটি প্রবাসী বাংলাদেশী কর্মরত রয়েছেন। যাদের পাঠানো টাকায় বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ সমৃদ্ধ হচ্ছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রকাশিত নভেম্বর ২০১৪ সালের তথ্য থেকে দেখা যায় যে, বাংলাদেশের মোট বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ৬৬ শতাংশ প্রবাসীদের পাঠানো টাকা। যার পরিমাণ ১ লাখ কোটি টাকার চেয়ে বেশি। এর সঙ্গে যদি হুন্ডির মাধ্যমে প্রবাসীদের পাঠানো টাকার অঙ্ক যোগ করা হয় তাহলে মোট বিদেশী অর্থের পরিমাণ দ্বিগুণেরও বেশি হবে।

২. বাংলাদেশে সবচেয়ে বেশি টাকা পাঠান মধ্যপ্রাচ্যের প্রবাসী বাংলাদেশীরা। গত বছর প্রবাসীরা ১,৪৪৬ কোটি ডলারের সমপরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা দেশে পাঠান। এর মধ্যে ৮৪০ কোটি ডলার এসেছে মধ্যপ্রাচ্য থেকে। অর্থাৎ মোট বৈদেশিক মুদ্রার প্রায় ৫৮ শতাংশ পাঠিয়েছেন মধ্যপ্রাচ্যে বসবাসরত প্রবাসী বাংলাদেশীরা। যাদের বেশিরভাগ আবার সৌদি আরবে কাজ করেন।

৩. সৌদি আরবে ২০০৯ সালের পর থেকে বাংলাদেশীদের যাওয়া কমতে থাকে। আর ভারত ও নেপাল থেকে যাওয়া বাড়তে থাকে। কম বেশি একই অবস্থা মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য দেশ ও মালয়েশিয়ায়। বাংলাদেশ অর্থনৈতিক সমীক্ষায় (২০১২) প্রকাশিত তথ্য মতে, ওই বছরের প্রথম তিনমাসে সৌদি আরবে ৩,১৮২ জন এবং মালয়েশিয়ায় ১৭৮ জন বাংলাদেশীকে পাঠানো সম্ভব হয়েছিল। আর কুয়েতে একজন শ্রমিকও পাঠানো সম্ভব হয়নি। অথচ ২০০৫ সালে ৪৭,০১২ জন বাংলাদেশী কুয়েতে কাজ করতে গিয়েছিলেন। বলা যায়, সৌদি আরব মালয়েশিয়ার পর কুয়েতের শ্রম বাজার কার্যত বন্ধ হয়ে গেছে। সর্বশেষ ২০১১ সালে মাত্র ২৯ জন বাংলাদেশীকে কুয়েতে পাঠানো সম্ভব হয়েছিল। এর পূর্বে ২০১০ সনে ৪৮ জনকে কুয়েতে প্রেরণ করা হয়। যদিও সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে যে, সামগ্রিকভাবে জনশক্তি রপ্তানীর পরিমাণ বেড়েছে। পুরাতন শ্রম বাজারের পাশাপাশি নতুন শ্রম বাজারও খোঁজা হচ্ছে। নতুন শ্রম বাজার খোঁজার কথাটা মিথ্যা নয় কিছু দেশে আমরা নারী গৃহকর্মী পাঠাতে পেরেছি। মধ্যপ্রাচ্যেও নারী গৃহকর্মী পাঠানোর সুযোগ তৈরি হয়েছে। অনেকে অবশ্য প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা ছাড়াই বাংলাদেশী নারীদের গৃহকর্মী হিসেবে বিদেশে পাঠানোর ফলে যে অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি তৈরি হচ্ছে তার তীব্র সমালোচনা করছেন। তাতে অবশ্য ক্ষতিগ্রস্ত নারীর তেমন কোন উপকার হচ্ছে না। নারী গৃহকর্মীরা বাড়ির কর্তা ও তার সন্তানদের দ্বারা যৌন নিযাতনসহ যতোরকমের নিপীড়নের শিকার হচ্ছে তার সামান্যই পত্রিকায় প্রকাশিত হচ্ছে। তাছাড়া বিদেশে গৃহকর্মে নিয়োজিত বাংলাদেশী নারীরা দীর্ঘমেয়াদে মানসিক ক্ষতির শিকার হচ্ছেন। এক্ষেত্রে বিদেশে অবস্থিত বাংলাদেশী দূতাবাস ও এর কর্মকর্তারা নারীদের জন্য খুব সামান্যই ভূমিকা রাখছেন।

৪. মধ্যপ্রাচ্যের দেশ সৌদি আরবে ১৯৯৭ সন থেকে ২০০৮ সাল পর্যন্ত প্রতি বছর গড়ে দেড় লাখ থেকে দুই লাখ লোক গিয়েছেন। কিন্তু বর্তমান সরকারের প্রথম মেয়াদের তিন বছরে মাত্র ৩৪ হাজার লোক সৌদি আরবে গিয়েছে এবং এসময়ে প্রতি বছর দেশে ফিরে এসেছেন গড়ে ৫০ হাজার জন।

৫. আশ্চযজনক হলেও সত্যি যে, গত চার দশকে সবচেয়ে বেশি বাংলাদেশী বিশ্ব শ্রম বাজারে গিয়েছে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময়কালে। ২০০৭ সালে ৮ লাখ ৩২ হাজার ৬০৯ জন এবং ২০০৮ সালে ৮ লাখ ৭৫ হাজার ৫৫ জন কর্মী বিদেশে যেতে পেরেছিলেন। আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর ২০০৯ সালে ৪ লাখ ৭৫ হাজার ২৭৮ জন শ্রমিক বিদেশে যায়। ২০১০ সালে এ সংখ্যা আরো কমে যায়। ওই বছর ৩ লাখ ৯০ হাজার ৭০২ জন বিদেশে কাজ করতে গিয়েছিল।

৬. প্রবাসী বাংলাদেশীদের সুবিধা অসুবিধা দেখার দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট দেশে অবস্থিত বাংলাদেশী দূতাবাসের কর্মকর্তাদের। কিন্তু আশ্চর্যজনক হলেও সত্যি যে, বেশিরভাগ বাংলাদেশী দূতাবাস প্রবাসীদের কল্যাণে ন্যূনতম দায়িত্ব পালন করে না। তারা সেখানে নিজেদের ভোগ বিলাস নিয়ে ব্যস্ত। এমনকি তারা মদের পারমিট পর্যন্ত বিক্রি করেন। শুধু তাই নয়, প্রবাসীদের দুঃখ দুর্দশাকে পুঁজি করে তাদের কেউ কেউ টু পাইস কামাতেও লজ্জাবোধ করেন না। বরং এটাকে তারা সুযোগ হিসেবে দেখেন। যাদের প্রবাসী আত্মীয়-স্বজন আছে তারা বিষয়টি সম্পর্কে জানতে আলাপ করে দেখতে পারেন। তাছাড়া মাঝে মাঝে পত্র-পত্রিকায় এনিয়ে লেখালেখিও হয়। সংবাদ ছাপা হয়। কখনো কখনো ভুক্তভোগীর বক্তব্যের সঙ্গে সঙ্গে দূতাবাসের কর্মকর্তাদের বক্তব্যও ছাপানো হয়। তখন দেখা যায় যে, দূতাবাসের কর্মকর্তারা তাদের বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগ অস্বীকার করেন। অভিযোগ আছে যে, পত্র-পত্রিকা থেকে খোঁজ খবর নেওয়ার পর দুই ধরনের ঘটনা ঘটে। এক. দূতাবাসের কর্মকর্তারা দালাল চক্রের মাধ্যমে গোপনে ব্যবসা বাড়িয়ে দেন। এবং যারা পত্রিকায় খবর দিয়েছে তাদের খুঁজে বের করতে পারলে নাজেহাল ও শায়েস্তা করেন। দুই. প্রবাসীরা বিশেষ করে শ্রমিকরা আরো বেশি অত্যাচারিত হন। মূলত, অপরাধীদের শাস্তি না হওয়ার এমনটা হয়ে থাকে। আমি মনে করি, কারো বিরুদ্ধে কোন অভিযোগ পাওয়া গেলে সেটা তদন্ত করে দেখা এবং দোষী প্রমাণিত হলে কঠোর শাস্তি দেয়া দরকার। বাংলাদেশী দূতাবাসের অসৎ কর্মকর্তাদের বদলি করা কিংবা দেশে ফিরিয়ে আনা ছাড়া তেমন কোন শাস্তি দেয়া হয় না। বরং তারা দ্রুত পদোন্নতি পেয়ে থাকে, তাদের অপরাধের পুরস্কার স্বরূপ! যা অন্যকে একই ধরনের অপরাধে লিপ্ত হতে উৎসাহিত করে।

৭. বিদেশে কর্মরত বাংলাদেশী শ্রমিকের অবদান বাংলাদেশের জিডিপি-তে ১৩ শতাংশেরও বেশি। বিশ্ব ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী বাংলাদেশ রেমিট্যান্স পাওয়ার দিক থেকে বিশ্বের প্রথম ১০টি দেশের একটি। এবং এই আয় আরো বাড়ানোর সুযোগ আছে। এখন কথা হলো সেই সুযোগ আমরা কেন নিচ্ছি না। কিংবা এই সুযোগ নিতে হলে সেই দায়িত্ব কে পালন করবে? যদিও এই ধরনের দায়িত্বগুলো মূলত বেসরকারি জনশক্তি রপ্তানীকারকরা পালন করে আসছেন, কিন্তু তাদেরকে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা করার দায়িত্ব সরকারের। কিন্তু বাস্তবে সরকারের পক্ষ থেকে উপযুক্ত ব্যবস্থা নিতে দেখা যায় না। সাম্প্রতিককালে বরং সরকারের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও বেসরকারি রপ্তানিকারকগণ মুখোমুখি হয়ে পড়েছেন সরকারের দিক থেকে নেওয়া বিভিন্ন পদক্ষেপের কারণে।

৮. বিদেশে বাংলাদেশী দূতাবাসগুলোতে প্রয়োজনীয় লোকবলের সঙ্কট একটি নিত্য সমস্যায় পরিণত হয়েছে। আগেই বলেছি যে, দূতাবাসের কর্মকর্তারা অবৈধ আয়ের লোভে আদম ব্যবসায়ী ও তাদের বিদেশী এজেন্টদের বেশি গুরুত্ব দেন এবং প্রবাসী শ্রমিকদের অবহেলা করেন। আরো লক্ষ্য করা যায় যে, দূতাবাসের কর্মকর্তাগণ তাদের দায়িত্ব সম্পর্কে সঠিকভাবে অবগত নন।

৯. পত্র পত্রিকার সংবাদ থেকে একটি বিষয় আমার মনে হয় যে, বিদেশে বাংলাদেশী দূতাবাসগুলোতে সাহায্য সহযোগিতা পাওয়ার ক্ষেত্রে প্রবাসী বাংলাদেশীদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি অবহেলিত হলেন বাংলাদেশী শ্রমিকরা। এর একটি কারণ হতে পারে যে, বাংলাদেশের ফরেন সার্ভিসে তথাকথিত বনেদী পরিবার থেকে নিয়োগ দেওয়া হয় যাদের কাছে বাংলাদেশের শ্রমিকগণ মানুষ নয়। শুধুই শ্রমিক। এমনকি তাদের কেউ কেউ বাংলাদেশী গরিব মানুষ ও তাদের সন্তানদের সমাজের বোঝা হিসেবে দেখে থাকেন। এই মানুষগুলো যখন বিদেশে রাষ্ট্রদূত কিংবা কোন গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগ পান তখনও কিন্তু তাদের মূল মানসিকতার কোন পরিবর্তন হয় না। আগেই বলেছি তাদের কাছে বিদেশে কর্মরত শ্রমিকরা মানুষ নন। শ্রমিক। ফলে, একজন শ্রমিকের সমস্যা সমাধান করার কোন চিন্তা তাদের মাথায় আসে না।

১০. এই অবস্থা আরো নাজুক হয়ে উঠে যখন বিদেশে বাংলাদেশের দূতাবাসগুলোতে রাজনৈতিক নিয়োগ দেয়া হয়। যাদের কমিটমেন্ট থাকে দল ও দলীয় নেতাকর্মীদের প্রতি। দেশের ও দেশের সাধারণ মানুষের প্রতি নয়। ফলে, তারা শ্রমিকদের স্বার্থ না দেখে দলীয় নেতা-কর্মীদের টু-পাইস কামানোর ব্যবস্থা করে দিতেই ব্যস্ত থাকেন। এমনকি ছদ্মনামে কিংবা নিজ নামেই তারা দালাল চক্রের বৈধ অবৈধ বাণিজ্যে যোগ দেন। কেউ কেউ যুক্তি দেন যে, আদম ব্যবসায়ীরা অনেক বেশি শক্তিশালী। তাদেরকে উপেক্ষা করার মতো সাহস না দেখিয়ে বরং তাদের সঙ্গে মিলে চললে দু পয়সা আয় করা ভালো।

১১. বিভিন্ন দেশের কারাগারে প্রায় ১০ হাজার বাংলাদেশী শ্রমিক মানবেতর জীবন যাপন করছেন। আজকে একজন আমেরিকান বিদেশের জেলে থাকলে আমেরিকার প্রেসিডেন্টের ঘুম হারাম হয়ে যায় আর বাংলাদেশীরা বিদেশের জেলে পচে মরলেও একজন রাষ্ট্রদূতের ঘুম হারাম হয় না যদি সে শ্রমিক হয়। যদি না সে তার শ্রেণীভুক্ত কেউ হয়।

১২. এই যখন অবস্থা তখন আমাদের করণীয় কি হতে পারে? বিদেশের মাটিতে বাংলাদেশীদের সমস্যা সমাধানের দায়িত্ব প্রথমত সরকারের। সরকার যে সেই দায়িত্ব পালনে গত কয়েক বছর ধরে ব্যর্থ হচ্ছে সেটা বলার অপেক্ষা রাখে না। কিন্তু সরকারকে ব্যর্থ বললেই তো আর সমস্যার সমাধান হবে না। আবার বিদেশে অবস্থিত বাংলাদেশী দূতাবাসগুলোর কর্মকর্তাদের সীমাহীন ব্যর্থতার জন্য তাদেরকে দায়ী করলেই সমস্যার সমাধান হবে না। এতে শুধুমাত্র সমস্যার কথা বলাই হবে। সমাধান হবে না। সমাধানের জন্য দরকার প্রবাসী বাংলাদেশীদের ঐক্যবদ্ধ হওয়া। দুঃখজনক হলেও সত্যি যে, প্রবাসেও বাংলাদেশীরা আওয়ামী লীগ আর বিএনপি এই দুই ঘরানায় ভাগ হয়ে গেছে। প্রবাসী বাংলাদেশীদের মধ্যেকার এই রাজনৈতিক বিভাজনের সুযোগ নিচ্ছে একদল লোভী মানুষ। যারা দূতাবাসের কর্মকর্তা, কিংবা তাদের দালাল এবং কেউ কেউ আছেন বাংলাদেশে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে।

১৩. আজ ২০১৫ সালের প্রথম দিনে আমি একটিমাত্র আহ্বান জানিয়ে এই লেখা শেষ করতে চাই। সেটি হলো- আসুন বিদেশের মাটিতে আমরা যারা থাকি তারা নিজেদেরকে আওয়ামী লীগ কিংবা বিএনপি বলে পরিচয় দেয়া বন্ধ করি। কোন একজন প্রবাসী ভাই কিংবা বোনের সমস্যায় তার রাজনৈতিক পরিচয় নয়, বাংলাদেশী পরিচয়টাকেই বড় করে দেখি। যারা বিভেদের সুযোগ নিয়ে বছরের পর বছর ধরে প্রবাসী ভাই-বোনদের কষ্ট দিচ্ছে তাদেরকে ঘৃণা করি এবং তাদেরকে চিহ্নিত করে তাদের পরিচয় ফেসবুকে ও ইন্টারনেটের বিভিন্ন সামাজিক মাধ্যমে তুলে ধরি।

১৪. মনে রাখবেন, প্রবাসীদের যারা কষ্ট দেয় তারা বাংলাদেশের শত্রু। তারা মানবতা বিরোধী শক্তি। তাদেরকে চিহ্নিত করুন। সবাই মিলে প্রতিহত করুন।

১৫. নতুন বছরের শুভেচ্ছা সবাইকে।

পল্লবী।। ঢাকা।।
১ জানুয়ারি ২০১৫

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

Connecting to %s