বিএনপির রাজনীতি কেন বার বার হোচট খাচ্ছে এবং আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে কার্যকর আন্দোলন গড়ে তুলতে ব্যর্থ হচ্ছে


Flag_of_Bangladesh_Nationalist_Party১. বাংলাদেশের গণতন্ত্রের জন্য রাজনৈতিক দল হিসেবে বিএনপির একটি শক্ত অবস্থান থাকা দরকার আছে। সেটা বিরোধী দল হিসেবে হোক। কিংবা ক্ষমতাসীন দল হিসেবে হোক। বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক রাজনীতিতে আওয়ামী লীগের যেমন দরকার আছে। তেমনি বিএনপিরও দরকার আছে। দেশ ও দেশের মানুষের কল্যাণই আমার মুখ্য চিন্তা। সেই বিবেচনায় আমি সোজা সাপটা বুঝি বাংলাদেশের মানুষের প্রকৃত কল্যাণের জন্য রাজনৈতিক দল হিসেবে বিএনপির একটি শক্ত অবস্থান নিয়ে থাকার দরকার আছে। কেন সেই কথায় আসছি।

২. আবার একথাও ঠিক যে, বাংলাদেশের রাজনীতিতে নিরঙ্কুশ আধিপত্য বিস্তারের জন্য আওয়ামী লীগ রাজনীতির অঙ্গনে বিএনপির বিলুপ্তি চাইবে। কারণ একমাত্র বিএনপি-র পক্ষেই আওয়ামী লীগকে এককভাবে নির্বাচনে হারানো সম্ভব। যেটা জামায়াত কিংবা জাতীয় পার্টির একার পক্ষে সম্ভব নয়। উল্টোভাবে আওয়ামী লীগের পক্ষে এককভাবে বিএনপিকে হারানো সম্ভব। সোজা কথায় বাংলাদেশের রাজনীতিতে এককভাবে নির্বাচন করে এখন পর্যন্ত মাত্র দু’টি দলের পক্ষে সরকার গঠন করা সম্ভব- আওয়ামী লীগ ও বিএনপি।

৩. অন্যদিকে দীর্ঘমেয়াদে বাংলাদেশের ক্ষমতায় থাকার জন্য আওয়ামী লীগের জন্য সুবিধাজনক হলো জামায়াতে ইসলামীকে প্রতিপক্ষ হিসেবে পাওয়া। এবং বিএনপি না থাকা। এর কারণ খুব সোজা। জামায়াতে ইসলামী স্বাধীনতার বিরুদ্ধে অবস্থানগ্রহণকারী দল। এই দলটিকে প্রগতিশীল মানুষ পছন্দ করে না। দেশের চার কোটি তরুণ ভোটারের মধ্যেও জামায়াতের তেমন ভোট নেই। দলটির বিরুদ্ধে রগ কাটার রাজনীতি করার অভিযোগ রয়েছে। যে দলের মধ্যে জ্বালাও পোড়াও সহিংসতার রাজনীতি করার ইতিহাস রয়েছে। বিদেশীদের কাছে দলটির গ্রহণযোগ্যতা নেই বললেই চলে। একমাত্র আমেরিকা ছাড়া। এই ধরনের ইমেজের একটি দলকে বিরোধী দল হিসেবে রাখা গেলে অন্তত আগামী ৩০ বছর আওয়ামী লীগকে ক্ষমতায় থাকা নিয়ে আর ভাবতে হয় না। একটি অর্ধমৃত রাজনৈতিক দল জামায়াতের বিপরীতে আওয়ামী লীগের শক্তিশালী ও প্রো-স্বাধীনতা দলের ইমেজকে সহজে কাজে লাগিয়ে দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকতে পারবে সেটা প্রাথমিক হিসেব থেকে সুস্পষ্ট। কিভাবে আওয়ামী লীগ সেটা করতে চায় পরে আলোচনা করা হচ্ছে।

৪. যদি আলোচনার সুবিধার্থে উল্লেখিত বক্তব্যগুলো মেনে নেই তাহলে বলতে হয় রাজনৈতিক দল হিসেবে বিএনপির বিলুপ্তিই এখন আওয়ামী লীগের রাজনীতির বড় লক্ষ্য। আওয়ামী লীগের নীতি নির্ধারণী পর্যায় থেকে তো বটেই সেসঙ্গে নানা কর্ণার থেকে বিএনপির রাজনীতিকে নিষিদ্ধ করার ক্ষীণ দাবীর কথা শোনা যাচ্ছে। পরিবেশ পরিস্থিতি ও সুযোগ মতো সেই দাবী আরো জোরালো হতে পারে। আওয়ামী লীগ ২০০৮ সাল থেকে যে রাজনৈতিক সক্ষমতা দেখাচ্ছে তাতে তেমন পরিস্থিতি তৈরি করা সম্ভব হলে বিএনপিকে রাজনীতি থেকে নির্বাসনে পাঠানো কঠিন কিছু হবে না। এনিয়ে পরে আরো বিস্তারিত আলোচনা করা হবে।

৫. ১৯৭৫ সালের পর জোহরা তাজউদ্দিনের মতো কয়েকজন নেতা হাল ধরেছিল বলে আওয়ামী লীগ টিকে গিয়েছিল। পরবর্তীতে শেখ হাসিনা দলের ভার গ্রহণ করার পর তার যুগপোযোগী বলিষ্ঠ নেতৃত্বে দলটি সামনে এগিয়ে গিয়েছে। তিনি অত্যন্ত বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে প্রয়োজনানুযায়ী প্রতিপক্ষের ও নিজ দলের কর্মী ও নেতাদের মধ্যে বিরাজমান বাঙালী চরিত্রের সকল দুর্বলতাগুলোকে কাজে লাগিয়ে দল হিসেবে আওয়ামী লীগকে এগিয়ে নিয়ে গেছেন। যারা রাজনীতিকে খুব কাছে থেকে পর্যবেক্ষন করেন তারা লক্ষ্য করে থাকবেন শেখ হাসিনা আওয়ামী লীগের রাজনীতিকে গত ৩৩ বছরে কতোটা বুদ্ধিদীপ্ত করেছেন। ১৯৮১ সালে তার অবর্তমানে সর্বসম্মতিক্রমে তাকে দলের সভানেত্রী করা হয়। সেই তখন থেকে তিনি দলের সভানেত্রীর দায়িত্ব পালন করে আসছেন। দলকে শক্তিশালী করা তথা ক্ষমতায় ধরে রাখার জন্য তিনি সবসময় পুরনো যে কৌশলগুলো কাজ করেনি সেগুলোকে সংশোধন করছেন এবং নতুন নতুন কৌশল এডাপ্ট করছেন। এই ধরনের কাজগুলো করার সময় তিনি বাস্তবতাকে বিবেচনায় রাখছেন। তিনি কখনোই সবগুলো ডিম এক ঝুড়িতে রাখছেন না। প্রয়োজনে তিনি নিজ দলের সমালোচনা করতেও পিছপা হচ্ছেন না। যেমন, তিনি একবার তাকে ছাড়া তার দলের শীর্ষস্থানীয় নেতাদের কেনা যায় সেকথাটি অকপটে বলে দিয়েছেন। যা মিডিয়াতে প্রকাশিত হয়েছে। তিনি রাজনীতির ক্ষেত্রে বিএনপি ও জাতীয় পার্টির ভুলগুলোকে বিচার বিশ্লেষণ করে ওই ধরনের ভুল এড়ানোর জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিচ্ছেন। আবার যা করলে প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করা যাবে নির্দ্বিধায় সেটা করে যাচ্ছেন। তার ভিশন সুস্পষ্ট। ক্ষমতায় যাওয়া এবং ক্ষমতায় টিকে থাকা। এ ব্যাপারে তিনি যথেষ্ট আগ্রাসী ও কৌশলীও বটে। কেউ কেউ আওয়ামী লীগের এই ধরনের রাজনীতিকে চালাকির রাজনীতি বলে থাকে। অনেকে সমালোচনা করেন যে, আওয়ামী লীগ কৌশলের আশ্রয় নিতে গিয়ে প্রচুর মিথ্যা ও অর্ধসত্য বলে থাকে। কিন্তু বাংলাদেশের ক্ষমতামুখী রাজনীতিতে আওয়ামী লীগ যা করছে সেটাই যে সবচেয়ে কার্যকর সেটা মোটামুটি প্রতিষ্ঠিত সত্য। কারণ আওয়ামী লীগ বী রোমান ইন রোম স্টাইলে রাজনীতি করছে। সেখানে বিএনপির রাজনীতি কেমন সেটা নিয়ে পরে বলছি।

৬. তাহলে কি বিএনপি-র আর ক্ষমতায় যাওয়ার কোন সুযোগ নেই- এমন প্রশ্ন আসতেই পারে। এর উত্তর হ্যা এবং না দু’টোই। বিএনপিকে যদি ক্ষমতায় যেতে হয় তাহলে রাজনীতির ক্ষেত্রে তাকে আওয়ামী লীগের চেয়ে শ্রেষ্ঠত্বের সক্ষমতা দেখাতে হবে। যা তারা গত কয়েকবছরে দেখাতে ব্যর্থ হয়েছে। কিন্তু এই ব্যর্থ হওয়ার মানে যে বিএনপি আর সফল হবে না তা কিন্তু নয়। বিএনপি কেন ব্যর্থ হচ্ছে সেই কারণগুলোতে এনিয়ে আরো বিস্তারিত আলোচনা করা হবে।

৭. বাংলাদেশের প্রধান চারটি রাজনৈতিক দলের মধ্যে দেড়টা রাজনৈতিক দলের অংশগ্রহণের মাধ্যমে অনুষ্ঠিত সর্বশেষ সংসদ নির্বাচনে বিএনপি অংশ না নেওয়ার পরও আওয়ামী লীগ সেফ সাইডে থাকার জন্য ১৫৪টি সীট বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় তাদের প্রার্থীদের জয়ী করে এনেছিল। যা প্রমাণ করে যে, আওয়ামী লীগ তাদের রাজনীতিতে সবসময় সতর্ক। কোথাও ফাঁক রাখে না। যা করতে চায় সেটা যাতে ভুলের কারণে নষ্ট না হয়ে যায় সেটি তারা নিশ্চিত করে নেয়। একই পরিস্থিতিতে বিএনপি নির্ঘাত এই ধরনের বুদ্ধি ব্যবহার করতে পারত না। বিএনপি যে পারত না সেটা বোঝার জন্য ১৯৯৬ সালের নির্বাচনে কি ঘটেছিল কিংবা পরবর্তীতে কি ঘটেছিল সেটা স্মরণ করাই যথেষ্ট। সমালোচকরা বলে থাকেন, গত ৭ বছরে আওয়ামী লীগ বিএনপির হাতে যতোগুলো ইস্যু তুলে দিয়েছে তার ১০ ভাগের এক ইস্যুতে বিএনপি সরকার ক্ষমতায় থাকলে আওয়ামী লীগ সেই সরকারকে কুপোকাত করে ফেলত। প্রশ্ন হলো বিএনপি কেন পারছে না। সেনিয়ে আলোচনা করা হবে।

৮. একথা আজ সকলের কাছে সুস্পষ্ট যে, বিএনপি ২০০৮ সালের নির্বাচনে হেরে যাওয়ার পর থেকে একটি শক্তিশালী বিরোধী দল হিসেবে নিজেদের অবস্থান সুসংহত করার ক্ষেত্রে বারবার ব্যর্থ হয়েছে যদিও তাদের সামনে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোট সরকারকে বেকায়দায় ফেলার মতো যথেষ্ট ইস্যু ছিল। বিদ্যুতের দাম ঘন ঘন বৃদ্ধি কিংবা পরীক্ষায় প্রশ্নপত্র ফাঁস কিংবা এমন আরো হাজারো জনসম্পৃক্ত ইস্যু ছিল যার কোনটিই বিএনপি সরকারের বিরুদ্ধে ব্যবহার করতে পারেনি। কেন পারেনি সেসব পরে বলছি।

৯. আওয়ামী লীগ যখন বী রোমান ইন রোম কৌশল নিয়ে এগিয়েছে বিএনপি তখনও তাদের সনাতনী রাজনীতিই করে গেছে। আওয়ামী লীগের রাজনীতি দেখে বিএনপি রাজনীতির কৌশল ঠিক না করে একটি গতানুগতিক রাজনীতি নিয়ে এগিয়ে গিয়েছে যা আওয়ামী লীগের চালাকির রাজনীতির বিরুদ্ধে কার্যকর আন্দোলন গড়ে তুলতে ব্যর্থ হয়েছে। এই অবস্থায় বিএনপি কি করতে পারে সেটা পরে বলা হয়েছে।

১০. বাংলাদেশের রাজনীতিতে ২০০০ সালের পর থেকে ধীরে ধীরে তরুণ ভোটারদের গুরুত্ব বাড়তে থাকে। এবং ২০০৮ সালের পর থেকে মিডিয়ার গুরুত্ব ও সম্পৃক্ততা বাংলাদেশের রাজনীতিতে এতোটাই বেড়েছে যে কোন কোন ইস্যুতে মিডিয়াই রাজনীতিকে কন্ট্রোল করে থাকে। যেমন, কাদের মোল্লা ইস্যুতে গণজাগরণ মঞ্চ তৈরি হওয়া এবং বিকশিত হওয়ার সঙ্গে মিডিয়ার ভূমিকা ছিল মুখ্য। গণজাগরণ মঞ্চ তৈরি হয়েছিল জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে আওয়ামী লীগের আতাতের অভিযোগে। এটি ছিল বিএনপির রাজনীতিতে ঘুরে দাঁড়ানোর একটি মোক্ষম সুযোগ। কিন্তু বিএনপি সেই সুযোগ নেওয়ার আগেই আওয়ামী লীগ মিডিয়ার সহায়তায় গণজাগরণ মঞ্চকে ব্যবহার করে বাংলাদেশের রাজনীতিতে নিজেদেরকে আরো কিছুটা পোক্ত করে। দলটি যে গণজাগরণ মঞ্চকে ব্যবহার করেছে সেটা গণজাগরণের নেতৃত্ব যখন বুঝতে পেরেছে ততোক্ষণে তাদের মধ্যে ভাঙ্গনও হয়ে গেছে। শুধু এক গণজাগরণ মঞ্চ নয় বিএনপি এমন আরো অনেক কিছুই সময় মতো ব্যবহার করতে পারেনি। হেফাজতে ইসলামকে ব্যবহার করতে যাওয়া ছিল বিএনপির জন্য আরেক ভুল পদক্ষেপ, সেটা তারা যখন বুঝতে পারল ততোক্ষণে দেরি হয়ে গেছে। এই ধরনের পরিস্থিতিগুলোতে বিএনপির রাজনীতি প্রমাণ করে যে, দলটি সময় ও সুযোগ চিনতে ও কাজে লাগাতে ব্যর্থ হয়েছে। এই লেখাতে আমি মূলত বিএনপির রাজনীতি কেন বার বার হোচট খাচ্ছে এবং কেন বিএনপি আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে কার্যকর আন্দোলন গড়ে তুলতে ব্যর্থ হচ্ছে সেনিয়ে আলোচনা করব। এ ব্যাপারে আপনাদের সমালোচনা প্রত্যাশা করছি।

(আগামী সংখ্যায় সমাপ্য)

পল্লবী।। ঢাকা।।
২৫ জানুয়ারি ২০১৫

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

Connecting to %s