বিএনপি-র রাজনীতির মূল দুর্বলতাগুলো কী


Flag_of_Bangladesh_Nationalist_Party১. এই লেখাটি আমার পূর্ববর্তী লেখা- বিএনপির রাজনীতি কেন বার বার হোচট খাচ্ছে এবং আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে কার্যকর আন্দোলন গড়ে তুলতে ব্যর্থ হচ্ছে এর অংশ। এবারের লেখায় আমি বিএনপি-র রাজনীতির কয়েকটি দুর্বলতা নিয়ে কথা বলব এবং সেগুলো কীভাবে কাটিয়ে উঠা যেতে পারে সে ব্যাপারে আমার মতামতও দেব। তবে এখানে যে সিরিয়ালে আমি লিখছি সেটা গুরুত্ব অনুসারে নয়।

২. মিডিয়া: শুধু বাংলাদেশে নয় সারা বিশ্বে একুশ শতকের রাজনীতিতে মিডিয়ার গুরুত্ব ও অংশগ্রহণ আগের যেকোন সময়ের তুলনায় বেড়েছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের কোন একসময় চার্চিলকে জানানো হলো যে, কোন কোন মিডিয়ায় তার বিরুদ্ধে লেখালেখি হচ্ছে। শুনে তিনি বলেছিলেন, ভালো লিখুক আর খারাপ লিখুক আমার কথা লিখছে কিনা? তিনি মিডিয়ায় তার উপস্থিতিকে গুরুত্ব দিয়েছিলেন। এটা হলো গত শতাব্দীর চল্লিশের দশকের চিত্র। গত ৭০ বছরে মিডিয়ার ভূমিকায় অনেক পরিবর্তন এসেছে। সেটা উন্নত ও উন্নয়নশীল সকল দেশেই। তার উপর এখন প্রিন্টেড অর্থাৎ মুদ্রিত গণমাধ্যম যেমন সংবাদপত্র ও সাময়িকীর পাশাপাশি টেলিভিশন এবং ইন্টারনেটের কল্যাণে নানান ধরনের সামাজিক ও কমিউনিটিভিত্তিক গণমাধ্যমের প্রসার ঘটেছে। আরব বসন্তের স্ফুলিঙ্গ প্রথমে ছড়িয়ে দেয়া হয়েছিল ফেসবুকের মাধ্যমে। বাংলাদেশে কাদের মোল্লার রায় নিয়ে জামায়াতের সঙ্গে আওয়ামী লীগের আতাতের বিরুদ্ধে গড়ে উঠা সফল আন্দোলন গণজাগরণ মঞ্চের সাফল্যের পিছনেও সবচেয়ে বড় শক্তি হিসেবে কাজ করেছিল মিডিয়া। মানুষকে আন্দোলনের সঙ্গে শুধু সম্পৃক্ত করা কিংবা আপডেট দেয়াই নয় শাহবাগে জমায়েত হওয়া গণমানুষকে প্রয়োজনীয় খাবার সরবরাহের দায়িত্বও পালন করেছে কোন কোন মিডিয়ার মালিকরা। গণমাধ্যম আজকে রাজনীতির ঠিক এতোটা গভীরে গিয়ে পৌঁছেছে।

৩. মিডিয়ার মালিকানা: বাংলাদেশের মিডিয়ার মালিকরা সুস্পষ্টভাবে বিএনপি ও আওয়ামী লীগের মধ্যে বিভক্ত। একথা আজ সর্বজনস্বীকৃত যে, বাংলাদেশের রাজনীতির নিয়ন্ত্রণ যতোটা না রাজনীতিবিদদের হাতে তারচেয়ে বেশি ব্যবসায়ীদের হাতে। সর্বশেষ একতরফা নির্বাচনে বাংলাদেশের ইতিহাসের সর্বাধিক সংখ্যক ব্যবসায়ী সংসদ সদস্য হওয়ার মধ্য দিয়ে আইন প্রণয়নে ব্যবসায়ীদের অংশগ্রহণ বেড়েছে। মিডিয়ার মালিকানাও ব্যবসায়ীদের হাতে। দেশের মোট সংবাদপত্র ও টেলিভিশন চ্যানেলের ২ শতাংশের মালিকানাও বিএনপির হাতে নেই। বিএনপির চেয়ে বিএনপি জোটের শরিক দল জামায়াতের মিডিয়াতে মালিকানা বেশি। যে জামায়াত আবার না বিএনপিকে নিজের মনে করে না আওয়ামী লীগকে। তাদের রাজনীতি হলো আওয়ামী লীগ ও বিএনপিকে ব্যবহার করে শক্তিশালী হওয়া। যেমন, ১৯৯১ থেকে ১৯৯৬ সাল পর্যন্ত জামায়াত ইসলামী নিজেদের শক্তিশালী করার জন্য আওয়ামী লীগের সঙ্গে সখ্যতা গড়ে তুলেছিল। ওই সময়ে জামায়াতকে নিষিদ্ধ করার জন্য সংসদে বিএনপির দুয়েকজন এমপি বিচ্ছিন্নভাবে কথাও বলেছেন। কিন্তু তাতে না আগ্রহ দেখিয়েছে আওয়ামী লীগ না বিএনপির মূল নেতারা। বরং ১৯৯০ সালে এরশাদকে হটানোর পর বাংলাদেশের ইতিহাসের সবচেয়ে ফেয়ার ইলেকশন ১৯৯১ সালের নির্বাচনে তীব্রভাবে কনফিডেন্ট আওয়ামী লীগ হেরে যাওয়ার পর জামায়াত ইসলামীকে সঙ্গে নিয়ে বিএনপির বিরুদ্ধে আন্দোলন গড়ে তুলেছিল। তত্ত্বাবধায়ক অন্যদিকে, নির্বাচনে জেতার পর বিএনপির মধ্যে অতি আত্মবিশ্বাস ভর করেছিল। নির্বাচনের আগে যেখানে বিএনপির জাতীয় ও স্থানীয় নেতাকর্মীরা নিয়মিত সংবাদপত্র ও সাময়িকী পড়তেন তাদের বড় একটা অংশ নির্বাচনে জেতার পর পড়া একদমই ছেড়ে দিলেন। এবং মিডিয়ার মালিকানায় তাদের যে স্টেক বাড়াতে হবে সেই বিষয়টি অনুধাবনে ব্যর্থ হলেন।

৩. মিডিয়া কর্মী ও সাংবাদিক: মিডিয়া কর্মী ও সাংবাদিকদের সঙ্গে সখ্যতা গড়ে তোলার ক্ষেত্রে বিএনপির দুর্বলতা চোখে পড়ার মতো। একে তো মিডিয়াতে বিএনপির ব্যবসায়ীদের উপস্থিতি প্রায় অদৃশ্যমান তার উপর মিডিয়া কর্মী ও সাংবাদিকদের সঙ্গে বিএনপি নেতাদের সখ্যতাও প্রায় শূণ্যের কোঠায়। উল্টোদিকে বিএনপির প্রতিদ্বন্দ্বী রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগের সঙ্গে সংবাদকর্মী ও সাংবাদিকদের রয়েছে নিবিড় যোগাযোগ। সেটা তৃণমুল নেতাকর্মী থেকে শুরু করে দলের শীর্ষ পর্যায় পর্যন্ত। প্রতিটি সংবাদপত্র ও টেলিভিশন চ্যানেলে বিএনপি ও আওয়ামী লীগের খবরাখবর সংগ্রহের জন্য নির্দিষ্ট এক বা একাধিক সাংবাদিক ও সংবাদকর্মী ও চিত্র সাংবাদিক দায়িত্বপ্রাপ্ত থাকেন। যারা মাঠে ঘাটে গিয়ে বিএনপি ও আওয়ামী লীগের সংবাদ সংগ্রহ করেন। খালেদা জিয়া ও শেখ হাসিনা সহ দলের প্রেস কনফারেন্সে যান। তাদের সফরে সফরসঙ্গী হয়ে ঢাকা ও দেশের বাইরে যান। সংবাদপত্রের ভাষায় বলা হয় বিএনপি কিংবা আওয়ামী লীগের বিটের দায়িত্বপ্রাপ্ত সংবাদকর্মী। এটা প্রত্যাশিত যে, এই ধরনের সংবাদকর্মীকে বিএনপি ও আওয়ামী লীগের প্রেস বিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্তরা খুব ভালোভাবে চিনবেন। তাদের নাম জানবেন। যখনই দেখা হবে নাম ধরে ডেকে হাসিমুখে কথা বলবেন। আশ্চর্য লাগলেও সত্যি যে, বিএনপির চেয়ারপারসন কিংবা তার প্রেস সচিব প্রত্যাশিত কাজগুলো করেন না। অন্যদিকে আওয়ামী লীগের সভানেত্রী স্বয়ং অনেক জুনিয়ার সাংবাদিকের নাম মনে রাখেন, তাদের সঙ্গে দেখা হলে হাসিমুখে তাকান এবং কখনো কখনো তাদের সঙ্গে কথা বলেন, যাদের সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে দেখা হয় তাদের নাম ধরে কুশলাদি জানতে চান ও পরিবারের খোঁজ নেন।

গণমাধ্যম, গণমাধ্যমের কর্মী ও সাংবাদিকদের সঙ্গে যোগাযোগের ক্ষেত্রে বিএনপি ও আওয়ামী লীগের মধ্যে এই যে বিশাল পার্থক্য তার প্রভাব অবশ্যাম্ভাবীভাবে দলের মিডিয়া কাভারেজের উপর পড়ে। এখানে উল্লেখ করা বোধহয় অপ্রাসঙ্গিক হবে না যে, ড. ইউনূসের সঙ্গেও মিডিয়ার সম্পর্ক ভালো না থাকায় আওয়ামী লীগের মন্ত্রী ও এমপি এবং বুদ্ধিজীবীদের সাড়াশি আক্রমণে তিনি অল্পতেই কুপোকাত হয়ে পড়েন। ওই সময়ে মিডিয়া নিরপেক্ষ ভূমিকা পালন করলেও ড. ইউনূসকে এভাবে গো-হারা হারতে হতো না। কথাটা বিএনপির রাজনীতির ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। বিএনপি মিডিয়াতে তাদের যোগ্য প্রচারণাটুকুও পাচ্ছে না গত ছয় বছর ধরে শুধুমাত্র মিডিয়া কর্মীদের সঙ্গে তাদের ঘনিষ্ঠতা না থাকায়।

৪. সংস্কৃতি ও সাংস্কৃতিক কর্মকান্ড : সাংস্কৃতিক কর্মকান্ডের প্রায় সকল শাখাতে বিএনপির উপস্থিতি আওয়ামী লীগের তুলনায় অনুজ্জ্বল। বিএনপি কখনোই এই দিকটায় প্রয়োজনীয় গুরুত্ব দেয়নি। জাসাস নামে বিএনপির একটি সাংস্কৃতিক সংগঠন আছে। কিন্তু একথা সবাই মানবেন যে, সংগঠন তৈরি করা আর সক্রিয়ভাবে সংস্কৃতি চর্চা করা এক নয়। জাতীয় পর্যায় থেকে শুরু করে তৃণমূল পর্যন্ত বিএনপির রাজনীতিতে সংস্কৃতি ও সাংস্কৃতিক চর্চা তেমনভাবে দৃষ্টিগোচর হয় না। যা তাদের প্রতিপক্ষ আওয়ামী লীগে বড় আকারে দেখা যায়। বিএনপি একদিকে সাংস্কৃতিক কর্মকান্ডে পিছিয়ে আছে অন্যদিকে তারা আওয়ামী লীগের সংস্কৃতি চর্চাকে সমালোচনা করে বিজাতীয় বলে থাকে। তাদের এই সমালোচনা যদি সত্যিও হয় জনগণ উপযুক্ত বিকল্প না পাওয়া পর্যন্ত যা হাতের কাছে পাবে সেটাকেই গ্রহণ করবে।

৫. বুদ্ধিজীবি ও সাংস্কৃতিক কর্মী: বিএনপির মতাদর্শে বিশ্বাসী বুদ্ধিজীবীর সংখ্যা আঙ্গুলের কর গুণে ‍বলে দেয়া যায়। অন্যদিকে, আওয়ামীপন্থী কট্টর ও মডারেট বুদ্ধিজীবীর সংখ্যা আঙ্গুলের কড় গুণে শেষ করতে হলে দিন সপ্তাহ লেগে যেতে পারে। এরা ঢাকাসহ বড় বড় শহরেই সীমিত নয়, উপজেলায় পর্যন্ত তারা ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। গণমাধ্যমের পাশাপাশি নাট্যদল কিংবা ক্লাব ইত্যাদির মাধ্যমে তারা তাদের মতাদর্শ দেশের তরুণ সমাজের মধ্যে ছড়িয়ে দিচ্ছে। বামপন্থীরা আওয়ামী লীগের সঙ্গে জোট বাধায় সাংস্কৃতিক কর্মকান্ডে বিএনপির পিছিয়ে থাকাটা আরো প্রকট হয়েছে গত কয়েক বছরে।

৬. তরুণদের পালস বুঝতে না পারা: বাংলাদেশের জনসংখ্যায় তরুণদের সংখ্যাটি এখন ৪ কোটি ছাড়িয়েছে যারা শুধুমাত্র তাদের নিজস্ব গন্ডিতে নয়, বৃহত্তর জনগোষ্ঠীতেও মতামত দেয় এবং মতামত গড়ে তোলায় ভূমিকা রাখে। তরুণদের পছন্দ অপছন্দ শিশু কিংবা বুড়োদের চেয়ে ভিন্ন। এখনকার তরুণরা লেখাপড়াতেই নিজেদের সীমিত রাখতে চায় না। তারা আয়মুখী কর্মকান্ডেও জড়াতে চায়। তাদের জন্য সত্যিকারের কিছু করতে না পারলেও অনেক কিছু করা হচ্ছে এমন একটা ধারণা ছড়িয়ে দিতে পেরেছে আওয়ামী লীগ। যেখানে বিএনপির অবস্থান অদৃশ্যমান। যেমন ধরুন ইন্টারনেটে ফ্রিল্যা্ন্সিংয়ের মাধ্যমে আয়ের বিষয়টিকে নিয়ে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা সভা সেমিনারে এমনভাবে তুলে ধরতে পেরেছে যে এই কাজটি অনেক বড় এবং সেটি সম্ভব হয়েছে আওয়ামী লীগের মাধ্যমে। যদিও বাস্তবতা হলো অন্তত ২ কোটি শিক্ষিত বেকার তরুণের মধ্যে মাত্র ২৫ হাজার ফ্রিল্যান্সিংয়ের কাজ করে, যা সম্ভব হয়েছে তরুণদের নিজেদের উদ্যোগের কারণেই। এমনকি সরকার তাদের উপার্জিত আয় সহজে দেশে আনার সুযোগটুকুও করে দিতে অনেক সময় নিয়েছে। তরুণদের সঙ্গে রাখার জন্য তাদের ভালো লাগার বিষয়গুলো বার বার তাদের সামনে তুলে ধরা এবং তাদের উদ্যোগগুলোর সমস্যাগুলো চিহ্নিত করে সেগুলো সমাধানে কাজ করার মাধ্যমে ৪ কোটি ভোটারের কাছাকাছি যাওয়ার সুযোগটুকু বিএনপি নিতে পারেনি।

(আগামী সংখ্যায় আরো কয়েকটি দুর্বলতা ও সেসঙ্গে উত্তরণের উপায় নিয়ে আলোচনা করব।)
চলবে………

Advertisements

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s