ফেসবুকের মাধ্যমে প্রতারণা


(সত্য ঘটনার ছায়া অবলম্বনে লিখিত। তথ্য দিয়ে সহায়তা করেছেন যারা তাদেরকে কৃতজ্ঞতা জানাই।)
download
প্রতারণা-১
২২ বছর বয়সী কমলার বাবার নাম ফায়াজ। ফায়াজ সাহেবের বয়স ৪৮ বছর। তিনি একদিন ফেসবুক একাউন্টে তাহসিনা নামের এক মেয়ের ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট পেলেন। তাহসিনার বয়স সবে একুশ হয়েছে। প্রোফাইল পিকচারটা আকর্ষণীয় বললে ভুল বলা হবে। পোশাকও বেশ খোলামেলা। সবমিলিয়ে ঘোর লাগা সুন্দরী। এই বয়সেও ফায়াজ সাহেবের মনে ঘোর লাগল। তিনি তাহসিনার ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট একসেপ্ট করলেন। ইনবক্সে শুভ সকাল আর শুভ রাত্রি দিয়ে শুরু হওয়া আলাপ অল্পদিনেই সিমেন্টের মতো জমে গেলো। তাতে ফিনিশিং টাচ দিতেই যেন একুশ বছর বয়সী তাহসিনা ৪৮ বছর বয়সীয় ফায়াজকে প্রেম নিবেদন করল। ফায়াজ যেন এই অপেক্ষাতেই ছিল। শুরু হলো তাদের অসম প্রেম। খোলামেলা ছবি লেনদেন। শরীর নিয়ে আলাপচারিতা চলতে লাগল রাত বিরাতে। এদিকে ফায়াজ সাহেবের আর তর সইছে না। আর না পেরে তাহসিনাকে নির্জন কোথাও দেখা করার কথা বললেন। আপত্তি করল না তাহসিনা। দেখতে দেখতে সেই বহু কাঙ্খিত দিনটি এলো। ফায়াজ সাহেব তাহসিনার সঙ্গে দেখা করার জন্য সেজেগুজে রওয়ানা হওয়ার মুহুর্তে তার ফোন বেঁজে উঠল। ওপাশ থেকে এক পুরুষ কণ্ঠ তাকে বলল- তাহসিনার সঙ্গে আর দেখা করতে আসতে হবে না। বরং সে একটা মোবাইল নাম্বার দিচ্ছে সেখানে বিকাশ করে ৫ হাজার টাকা যেন পাঠায়।

ফায়াজ সাহবের মনে হলো কে এই লোক আর কেনই বা তাকে ৫ হাজার টাকা পাঠাবে? প্রশ্ন করতেই ফোনের ওপাশ থেকে অট্টহাসির শব্দ ভেসে এলো আর সেই পুুরুষ কণ্ঠটি বলল, সেই তাসকিনা। মানে তাসকিনা সেজে তার সঙ্গে এতোদিন প্রেমের অভিনয় করেছে। আরো বলল, এটা নিয়ে বেশি বাড়াবাড়ি করলে ফেসবুকে তার সঙ্গে তাসকিনার কথাবার্তাগুলো প্রকাশ করে দেবে। এমনকি ছবিও। ফায়াজ সাহেবের তখন উদভ্রান্ত অবস্থা। এই ঘটনা জানাজানি হলে তার কতোখানি সম্মানহানি হবে ভাবতেই তার মনে ভয় ধরে গেলো। ওই অবস্থাতেই ঘর থেকে বের হয়ে বিকাশ করে টাকা পাঠালো। তারপর আরো কয়েকবার টাকা পাঠাতে হয়েছে তাকে। প্রশ্ন হলো টাকাটা রিসিভ করেছে কে? টাকাটা রিসিভ করেছে জলিল। যার পরিচয় হলো কমলার প্রেমিক। প্রশ্ন হলো কমলার প্রেমিক তার হবু শ্বশুড়কে ব্ল্যাকমেইল করল কেন?

জলিল ভালোবাসে কমলাকে। কমলাও জলিলকে ভালোবাসে। তাদের প্রেমের জীবন সুখেই কাটছিল। কিন্তু বিষয়টি জানাজানি হওয়ার পর কমলার বাবা ফায়াজ সাহবে মেয়ের উপর নজরদারি বাড়িয়ে দেন। ঘটনার এক পর্যায়ে জলিলকে কমলার বাবা অকথ্য ভাষায় বকা ঝকা করেন। তরুণ বয়সী জলিলের মনে প্রতিশোধের আগুন জ্বলে উঠল। জলিল ঠিক করল কমলার বাবা ফায়াজ সাহেবকে এক হাত দেখে নেবে। এই হলো সেই দেখে নেয়া।

তবে এটা ভাববেন না জলিলের মতো সবাই দেখে নিতে এভাবে সুন্দরী মেয়েদের প্রোফাইল বানিয়ে ছেলেদের প্রতারণার ফাঁদে ফেলে। কারো কারো এটা আয়ের উৎসও বটে।

প্রতারণা-২
ধরা যাক মেয়েটির নাম মর্জিনা। তার অনেকগুলো ফেইক একাউন্ট আছে। প্রতিটি একাউন্টে অনেক ছেলে বন্ধু আছে। তাদের কারো কারো সঙ্গে তার নিয়মিত দেখা সাক্ষাত হয়। এদের সঙ্গে মর্জিনা চুটিয়ে প্রেম করে। ফোনে কথা বলে। রেস্টুরেন্টে একসঙ্গে হ্যাং আউট করে। ছেলেরা তাকে ফোনে রিচার্জ পাঠায়। রেস্টুরেন্টে খাওয়ার বিল দেয়। দামী গিফটও দেয়। শুরুতে মর্জিনা বাড়ি থেকে টাকা পয়সা আনলেও এখন আর বাড়ি থেকে টাকা পয়সা আনতে হয় না। তার ফেসবন্ধুরাই তার সব ধরনের চাহিদা মেটানোর মতো টাকা পয়সার যোগান দেয়। ঢাকা শহরে মর্জিনা একা নয়।

প্রতারণা-৩
ছেলেটার নাম অয়ন। থাকে মিরপুরে। অনেকের কাছে ফেসবুকের মাধ্যমে আয়ের কথা শুনে তারও ইচ্ছে হলো এমন একটা কিছু করার। নিজের একটা ফেইক একাউন্ট খুলল। নাম দিল মৌসুমী। সেখানে নিজের বয়স লিখল ২৮। রিলেশনশপ স্ট্যাটাসে লিখল ডিভোর্সড। সুন্দরী মেয়েদের চারপাশে যতো পুরুষ থাকে ডিভোর্সড মেয়েদের চারপাশে ঘুর ঘুর করা পুরুষের সংখ্যা তারচেয়ে দশ গুণ বেশি হয়। ফলে অয়নের ফেসবুকে হামলে পড়া নানান বয়সী পুরুষের দেখা মিলতে সময় লাগল না। তার মধ্যে সমাজের নামী দামী লোকেরাও রয়েছে। শুরু হয়ে গেলো অয়নের ফেসবুকে মাধ্যমে আয়। তবে কারো সঙ্গেই অয়ন বেশিদিন থাকতে পারছে না। কারণ ফেসবুকে যোগাযোগের কয়েকদিনের মধ্যে পুরুষগুলো স্কাইপে কথা বলতে চায়, ওয়েবক্যামে শরীরের ছবি দেখতে চায় এবং সামনাসামনি দেখা করতে চায়। মৌসুমী ওরফে অয়ন তখন তাকে বাদ দিয়ে দেয়।

প্রতারণা-৪
পাপড়ি টার্গেট করে মাঝ বয়সী পুরুষদের। এমনই এক পুরুষ ছিল বাউফল থানার এক রাজনৈতিক নেতা। পাপড়ি যখন তাকে ফ্রেন্ড রিকোয়েস্টে পাঠায় তখন ভাবেনি এতো সহজে জালে ধরা দেবে। মাত্র দুই দিনের আলাপচারিতায় রাজনৈতিক নেতা পাপড়িকে প্রেমের প্রস্তাব দেয়। পাপড়ি তাকে কয়েকটি গোপন ছবি পাঠাতে বলে। ছবিগুলো হাতে আসার পর পাপড়ি তার সঙ্গে কথা চালিয়ে যায়। তার পরিবার ও আত্মীয়স্বজন সম্পর্কে খোঁজ খবর নেয়। তারপর তাদের কারো কারো সঙ্গে ফেসবুক ফ্রেন্ড হয়। একসময় রাজনৈতিক নেতাও সেসব জানতে পারে। একদিন পাপড়ি সেই রাজনৈতিক নেতাকে জানায় যে, তার গোপন ছবিগুলো তার আত্মীয়স্বজনেকে পাঠিয়ে দেবে যদি না তাকে কিছু টাকা পাঠানো হয়। ২০ হাজার টাকা দিয়ে রক্ষা পেয়েছিল সেই রাজনৈতিক নেতা। তিনি এখন সকলকে বলেন আর যাই হোক নিজের গোপন ছবি কখনো ফেসবুকের কারো সঙ্গে শেয়ার করা ঠিক নয়।

অফটপিক: বাংলাদেশের প্রায় সবগুলো উপজেলা শহরে এখন তরুণ বয়সীদের আড্ডার অন্যতম বিষয় হলো ফেসবুক। ফেসবুক তারুণ্যকে কতোটুকু গ্রাস করেছে সেনিয়ে এক তরুণ আমাকে এভাবে বলছিল, ‘দেখা যায় আমার বন্ধুই আমার সাথে সরাসরি কথা বলে মজা পাচ্ছে না। সেই একই বন্ধু ফেসবুকে আমার সাথে কথা বলতে খুব আগ্রহী।’

ফেসবুক মফস্বলের মানুষের জীবনকে কতোটা দুর্বিষহ করে তুলছে তার একটা উদাহরণ দিতে গিয়ে আমাকে একজন বলেছিল- ‘আমার এক বন্ধুর বোন এলাকা ছেড়ে ঢাকায় পড়ালেখা করতেছে শুধুমাত্র ফেসবুকের কারণে। ওর এক বন্ধু ওর সাথে ফটো তুলে ফেসবুকে উলটাপালটা কথা বলে ছেড়ে দিয়েছে। শহরে এসব কোন ব্যাপার না হলেও গলাচিপা মতো উপজেলা শহরে এটা অনেক বড় ব্যাপার। বিশেষ করে যেখানে মোটামুটিভাবে সবাই সবার পরিচিত।’

প্রতারণা-৫
মেয়েটির বাড়ি গলাচিপায়। ধরা যাক তার নাম অংশু। ঢাকার একটি মেয়েদের কলেজে পড়ে। একদিন অংশুর ফোনটি কলেজের ক্লাশরুম থেকে চুরি হয়। ফোনটি ফেসবুকে লগড ইন ছিল। চুরি হওয়ার পর ফোনটি বন্ধ ছিল। কয়েকদিন পর অংশু সিম উঠালো। নতুন সেটে সিম লাগানোর পরপরই সে একটি মেসেজ পেলো… “আপনার ফেসবুক একাউন্ট আমার কাছে। আপনি যদি ফিরে পেতে চান,এই নাম্বারে যোগাযোগ করুন।” ফোন করার পর এক ছেলের গলা শুনতে পেল অংশু। লক্ষ্য করুন, ফোনটি চুরি হয়েছিল ক্লাশরুম থেকে। যেখানে শুধু মেয়েরা পড়ে। যে মেয়ে ফোনটি চুরি করেছিল সে হয় ফোনটি বিক্রি করে দিয়েছে কিংবা তার কোন ছেলে বন্ধুকে দিয়েছে। অংশু তার পুরনো ফেসবুক একাউন্টের মায়া ছেড়ে দিয়ে নতুন একাউন্ট করল। কিন্তু সমস্যা তাতে দূর হলো না। সেই ছেলে তার পুরনো একাউন্টে পর্ণো ছবি আপলোড করার ভয় দেখাল। তাকে ব্ল্যাক মেল করে টাকা পয়সা দাবী করতে থাকল। অংশু এসবকে পাত্তা দিলো না। কিন্তু সমস্যা হলো অন্য জায়গায়। অংশু ফেসবুকে অনেকের সঙ্গে চ্যাটিং করত। এসব চ্যাটিংয়ে অংশুর এক ছেলেবন্ধুর সঙ্গে তার কিছু ঘনিষ্ঠ ছবি ছিল যা ওই ছেলে পেয়ে যায়। এই সব ছবি প্রকাশ করার কথা বলার পর অংশু ঘাবড়ে যায়। শেষ পরযন্ত অংশু তার বাবা মাকে সব কথা খুলে বলে। কিন্তু তাতে শেষ রক্ষা হয় না। এখন তাকে বিয়ে দেয়ার জন্য পাত্র খোজা হচ্ছে। তার আর ঢাকায় লেখাপড়া করা হচ্ছে না। অংশু নিজে জানে যে, সে এমন কোন অন্যায় করেনি। কিন্তু সমাজ তো আর সেকথা শুনবে না।

পল্লবী।। ঢাকা।।
২ ফেব্রুয়ারি ২০১৫

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

Connecting to %s