জামায়াতে ইসলামী-কে নিষিদ্ধ করতে দেরি হচ্ছে কেন?


Jamat ১.
গত একমাসে গোয়েন্দা রিপোর্টের উল্লেখ করে আওয়ামী লীগের শীর্ষস্থানীয় নেতাদের কয়েকজন বলেছেন, জামায়াত-শিবির দেশে জঙ্গি তৎপরতা চালাচ্ছে। পেট্রোল বোমা মেরে মানুষ হত্যা করছে। এদিকে টেলিভিশনের টক শো’গুলোতেও সুশীল সমাজের নেতারা সুস্পষ্টভাবে স্বাধীনতার বিরোধীতাকারী জামায়াত শিবিরকে পেট্রোল বোমা ও ককটেল দিয়ে মানুষ হত্যার জন্য দায়ী করে সরকারকে কঠোর হওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন। অন্যদিকে আওয়ামী লীগের উচ্চ ও মধ্যসারির নেতারা বক্তৃতা বিবৃতিতে জামায়াতে ইসলামীকে সন্ত্রাসী দল আখ্যা দিয়ে থাকেন প্রায়শ।

২.
উল্লেখিত পরিস্থিতিতে, আওয়ামী লীগের নেতাদের বক্তব্য হলো, বিএনপি-র সঙ্গে আলোচনা করে লাভ নেই কারণ পেট্রোল বোমা মারছে যে জামায়াতীরা তাদের উপর বিএনপি-র কোন নিয়ন্ত্রণ নেই। ফলে বিএনপির সঙ্গে আলোচনা হলে অবরোধ হরতাল বন্ধ হবে কিন্তু জামায়াতে ইসলামী তাদের সন্ত্রাসী কর্মকান্ড চালিয়ে যাবে। যেকারণে বিএনপি চলমান সহিংসতাকে রাজনৈতিক সমস্যা হিসেবে দেখলেও আওয়ামী লীগ পুরো বিষয়টাকে আইন শৃঙ্খলা সংক্রান্ত সমস্যা হিসেবে দেখছে। তারা আইন শৃঙ্খলা বাহিনী ব্যবহার করেই এই সমস্যার সমাধান খুঁজছে। তবে সহিংসতা বন্ধ হচ্ছে না। প্রতিদিন মানুষ মরছে। রাস্তাঘাটে গাড়ি বিশেষ করে বাস চলাচল কমেছে। রাত ৯টার পর মহাসড়কে বাস না চালোনোর পরামর্শ দেয়া হয়েছে পুলিশের পক্ষ থেকে। যদিও টেলিভিশনে ও বিদেশীদের সঙ্গে আলোচনায় সরকারের দিক থেকে দাবী করা হচ্ছে যে, দেশের আইন শৃঙ্খলা পরিস্থিতি ভালো। যা ঘটছে সেটা বিচ্ছিন্ন ঘটনা মাত্র।

৩.
দেশের মালিক জনগণ। সেই জনগণ পড়েছে মাইন্যাকার চিপায়। বিএনপি বারবার দাবী করলেও আওয়ামী লীগ দেশের পরিস্থিতিকে রাজনৈতিক সমস্যা হিসেবে মানতে নারাজ। বিএনপির সঙ্গে তারা কোন ধরনের আলোচনায় বসতেও নারাজ। আওয়ামী লীগের মধ্য থেকে শীর্ষ পর্যায়ের নেতারা বলছেন যে, বিএনপির দাবী মেনে নেওয়া মানে সন্ত্রাসী কার্যক্রমকে উৎসাহিত করা। তাদের বক্তব্য হলো একবার আলোচনায় বসলে বিএনপিসহ সরকার বিরোধী দলগুলো মনে করতে পারে যে, চাপ দিয়ে দাবী আদায় করা যায়। ফলে, বিএনপির নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোটের শরিক দল জামায়াতে ইসলামী আরো বড় আকারে সন্ত্রাসী কার্যক্রম চালাবে। আওয়ামী লীগের নেতারা তাদের বক্তৃতা ও বিবৃতিতে বলে যাচ্ছেন যে, আইন শৃঙ্খলা বাহিনী দিয়ে আরো কঠোরভাবে সব কিছু মোকাবেলা করবে আওয়ামী লীগ।

৪.
সমস্যায় পড়েছে জনগণ। কারণ দেশের বেশিরভাগ মানুষ শান্তিপ্রিয়। তারা নিরাপত্তায় থাকতে চায়। কিন্তু এটাও সুস্পষ্ট যে, রাজনৈতিক দলগুলো শান্তি চায় না। বরং তারা তাদের সপক্ষে জনমতকে নিয়ে আসতে বিভিন্ন ধরনের কৌশল অবলম্বন করছে। যা জনগণ চালাকির রাজনীতি হিসেবেই দেখছে। জনগণ পরিষ্কার বুঝতে পারছে যে, রাজনৈতিক দলগুলো তাদের ইমোশনকে ব্যবহার করে চালাকির রাজনীতিতে ঢুকে পড়েছে। কে কতো বেশি মিথ্যা বলতে পারে আর কে কাকে বোকা বানাতে পারে সেই প্রতিযোগিতা চলছে যেন। বিএনপি এই প্রতিযোগিতায় আওয়ামী লীগের হাতে ক্রমাগতভাবে মার খাচ্ছে। এদিকে আওয়ামী লীগ কঠোর হওয়ার কারণে বিএনপির নেতা কর্মীরা এখন আর রাস্তায় নেই। বিশেষ করে ঢাকার রাস্তায় তাদের খুঁজে পাওয়া যায় না। জেলা ও উপজেলা শহরগুলোতে বিএনপির কিছুটা উপস্থিতি থাকলেও সেটা ধীরে ধীরে কমছে। বিএনপি আওয়ামী লীগের মতো বুর্জোয়া ভাবধারার দল হওয়ার কারণে উচ্চ পর্যায়ের নেতাকর্মীরা মাঠে নেই। তারা বেঘোরে প্রাণ খোয়াতে চায় না। তারা সেই নীতি মেনে নিয়েছে- সাহস দেখানো মানে জেনে শুনে আগুনে হাত পুড়ানো নয়।

৫. এদিকে, বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক রাজনীতির গত ২৩ বছরে যারাই ক্ষমতায় ছিল তারা অর্থকড়ি কামাই করেছে। বাংলাদেশে ক্ষমতার রাজনীতির যে অপ্রয়োগ সেটা রাজনীতিতে টাকার আধিপত্য বাড়ার কারণেই হয়েছে। যারাই ক্ষমতায় থাকে তারাই বৈধ ও অবৈধভাবে টাকা কড়ি কামাই করে। আওয়ামী লীগ গত ছয়বছর ধরে ক্ষমতায়। অন্যদিকে, বিএনপি ৯ বছর ধরে ক্ষমতায় বাইরে। আওয়ামী লীগের আমলে বাংলাদেশে বড় বড় প্রজেক্ট হয়েছে। আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা সেই সুযোগে টুপাইস কামাই করেছে যা বিএনপি পায় নি। ফলে, রাজনীতিতে বিএনপি টাকার গরম দেখাতে পারছে না। জামায়াতে ইসলামীর সুবিধা হলো ক্ষমতায় না থাকলেও টাকা পয়সার অভাব নেই। কেউ কেউ দাবী করেন যে, আওয়ামী লীগের নেতাদের কেউ কেউ জামায়াতে ইসলামী থেকে নিয়মিত ‘খাম’ পেয়ে থাকেন।

৬.
এদিকে দল হিসেবে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির গঠনতন্ত্রে ঠিক কি আছে কিংবা কি নেই পড়ে দেখা ও পালন করার ব্যাপারে দলের নেতাকর্মীদের মধ্যে আগ্রহ নেই বললেই চলে। তারা অনেকটা মুখস্ত রাজনীতি করে। কারণ দিনের শেষে তাদের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য হলো নিজের কল্যাণসাধন ও অন্যকে দোষারোপ করা। দেশের চলমান রাজনৈতিক অস্থিরতা ও সহিংসতার ব্যাপারে আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতাদের জোরালো মতামত হলো সন্ত্রাসী দল জামায়াতে ইসলামী এসব করছে, যেমনটা তারা ১৯৭১ সালে করেছিল। জামায়াতে ইসলামীকে তারা রাজনৈতিক দলের কাতারে নিয়ে আসতে চান না। তাদের মত হলো- জামায়াতে ইসলামী বড় জোর একটি ইসলামিক দল। যারা ইসলাম প্রচার করে মাত্র। সংবিধানের ৪১(১)(ক) তে বলা হয়েছে- প্রত্যেক নাগরিকের যে কোন ধর্ম অবলম্বন, পালন বা প্রচারের অধিকার রহিয়াছে; তবে বাংলাদেশের ভোটারদের একটি অংশ চায় যে, জামায়াতে ইসলামীকে নিষিদ্ধ করা হোক।

৭.
টেলিভিশনের টক শো, অনলাইন পত্রিকা, ফেসবুকসহ সোশ্যাল মিডিয়াতে জামায়াতে ইসলামীকে নিষিদ্ধ করার দাবী উঠেছে। এমন দাবী ২০১৪ সালের নির্বাচনের আগেও উঠেছিল। তবে তখন জামায়াতে ইসলামীকে সন্ত্রাসী দল বলা হয়নি। সেসময়ে সরকার থেকে বলা হয়েছিল জামায়াতে ইসলামীকে রাজনৈতিক দল হিসেবে নিষিদ্ধ করার বিষয়টি আইনী প্রক্রিয়াধীন আছে। মাননীয় হাইকোর্ট বিভাগ কর্তৃক রিট পিটিশন নং ৬৩০/২০০৯ এর উপর ০১ আগস্ট ২০১৩ তারিখে প্রদত্ত রায়ে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী-এর নিবন্ধন অবৈধ ঘোষিত হয়েছে। কিন্তু যে মুহুর্তে জামায়াতে ইসলামীকে সন্ত্রাসী দল আখ্যা দেয়া হলো তখন জামায়াতের রাজনীতিকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করার জন্য আইনী প্রক্রিয়ার আর দরকার হয় না। সোজাসুজি নিষিদ্ধ করে দিলেই হয়। সরকার কেন এই কাজটি করছে না, সেই প্রশ্নটা বার বার ঘুরে ফিরে আসছে।

৮.
বাংলাদেশের সংবিধানের ৩৮ ধারায় বলা হয়েছে: ‘জনশৃঙ্খলা ও নৈতিকতার স্বার্থে আইনের দ্বারা আরোপিত যুক্তিসঙ্গত বাধা-নিষেধ সাপেক্ষে সমিতি বা সংঘ গঠন করিবার অধিকার প্রত্যেক নাগরিকের থাকিবে। তবে শর্ত থাকে যে, কোন ব্যক্তির উক্তরুপ সমিতি বা সংঘ গঠন করিবার কিংবা উহার সদস্য হইবার অধিকার থাকিবে না, যদি-

(ক) উহা নাগরিকদের মধ্যে ধর্মীয়, সামাজিক এবং সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিনষ্ট করিবার উদ্দেশ্যে গঠিত হয়;

(খ) উহা ধর্ম, গোষ্ঠী, বর্ণ, নারী-পুরুষ, জন্মস্থান বা ভাষার ক্ষেত্রে নাগরিকদের মধ্যে বৈষম্য সৃষ্টি করিবার উদ্দেশ্যে গঠিত হয়;

(গ) উহা রাষ্ট্র বা নাগরিকদের বিরুদ্ধে কিংবা অন্য কোন দেশের বিরুদ্ধে সন্ত্রাসী বা জঙ্গী কার্য পরিচালনার উদ্দেশ্যে গঠিত হয়; বা

(ঘ) উহার গঠন ও উদ্দেশ্য এই সংবিধানের পরিপন্থী হয়।

বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর শেখ ‍মুজিবুর রহমান অন্য কয়েকটি দলের সঙ্গে জামায়াতে ইসলামীকেও নিষিদ্ধ করেছিলেন। তবে সেটা সন্ত্রাসী দল হিসেবে নয়। ইসলামভিত্তিক বা ধর্মীয় রাজনীতি করার কারণে। সেসময়ে সন্ত্রাসী দল হিসেবে আওয়ামী লীগের ঘোরতর শত্রু ছিল জাসদ। জাসদকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করে কঠোর হস্তে দমন করা হয়েছিল ৩০ হাজার নেতাকর্মীকে মারা ও লাখ লাখ নেতাকর্মীকে গ্রেফতারের মাধ্যমে। সেসময়ে দল হিসেবে বিএনপি জন্ম নেয়নি। বিএনপি তখন থাকলে রাজনীতির চিত্রটা হয়তো সরলরেখায় নাও থাকতে পারত। যাই হোক। অতীত নিয়ে আলোচনা না করে বরং বর্তমানের দিকে তাকানো যাক। আওয়ামী লীগের কাছে জামায়াতে ইসলামী এখন সন্ত্রাসী দল। জঙ্গিদের মদদদাতা। সংবিধান বলে এমন দলকে নিষিদ্ধ করা যায়। এখন প্রশ্ন হলো- আওয়ামী লীগ কেন জামায়াত ইসলামীকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করছে না কেন? রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন যে, জনগণের চাপে একান্ত বাধ্য না হলে আওয়ামী লীগ কখনোই জামায়াতে ইসলামীকে নিষিদ্ধ করবে না কারণ জামায়াতকে নিষিদ্ধ করা হলে আওয়ামী লীগের ‘শত্রু শত্রু খেলা’ বন্ধ হয়ে যাবে। একই কারণে আওয়ামী লীগ ‘পাকিস্তান’ প্রসঙ্গটি বারবার আনে। উদ্দেশ্য দলের নেতাকর্মীসহ দেশের প্রায় ৪ কোটি তরুণ-তরুণীর সহানুভূতি আদায় করা।

৯.
বাংলাদেশের ৪ কোটি তরুণ বয়সী ভোটারের মধ্যে যারা নারী ভোটার তাদের অন্তত অর্ধেক পাকিস্তানী লন কাপড় দিয়ে ফ্যাশন করে। যারা লন কাপড় পড়া থাকা অবস্থায় পাকিস্তানকে ঘৃণা করার কথা বলে। অন্যদিকে পুরুষ ভোটারের মধ্যে যারা নীল জিন্স পড়ে তাদের পরনে পাকিস্তানী জিন্স কাপড়ও থাকে। ওই জিন্স কাপড় পড়েই তারা মুরগি চিবোতে চিবোতে পাকিদের চৌদ্দগোষ্ঠী উদ্ধার করে। পাকিস্তানের ব্যাট দিয়ে এদেশের তরুণরা ক্রিকেট খেলে জেনে এবং না জেনে। আবার বাণিজ্য মেলায় পাকিস্তানী স্টলে তারা এক চক্কর ঘুরেও আসে কিংবা কিছু কেনাকাটা করে। সেখানে পাকিস্তানকে দু’চোখে দেখতে না পারা তরুণ তরুণীদের ভীড়ও আছে। রাষ্ট্রীয়ভাবে পাকিস্তানের সঙ্গে বাংলাদেশের যোগাযোগও আছে। এমনকি পাকিস্তানীদের সঙ্গে বাংলাদেশীরা ব্যবসা বাণিজ্যও করে। পাকিস্তানীদের সঙ্গে ব্যবসা বাণিজ্যের ক্ষেত্রে আওয়ামী লীগ ও জামায়াতের পরিচয় হয়ে যায় ‘ব্যবসায়ী’। অনেকে বলেন যে, আওয়ামী লীগের এই ডাবল স্ট্যান্ডার্ড আছে বলেই জামায়াতে ইসলামীকে কখনোই নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হবে না। বরং আওয়ামী লীগ সুযোগ পেলে বিএনপিকে নিষিদ্ধ করবে এবং জামায়াতে ইসলামীকে আরো একটু শক্তিশালী হওয়ার সুযোগ করে দেবে। তাদের যুক্তি হলো- আওয়ামী লীগের নীতি নির্ধারকরা মনে করে জামায়াতে ইসলামী পূর্ণ শক্তিতে বিকশিত হলেও কখনোই আওয়ামী লীগের শক্ত প্রতিপক্ষ হতে পারবে না। কারণ জামায়াতে ইসলামীর দু’টি ইমেজ মার্কা মারা। এক. দলটি স্বাধীনতা যুদ্ধের বিরোধীতা করেছিল। দুই. দলটি ইসলামের রাজনীতি করে আর ইসলাম পশ্চিমাদের কাছে জঙ্গি শব্দের প্রতিরূপ। ফলে, একদিকে স্বাধীনতা যুদ্ধের বিরোধীতাকারী হিসেবে দেশের মধ্যে জামায়াত ঘৃণিত অন্যদিকে ইসলামের রাজনীতি করার কারণে জঙ্গি হিসেবে আন্তর্জাতিকভাবে ধিকৃত।

পল্লবী।। ঢাকা।।।
১০ ফেব্রুয়ারি ২০১৫

2 thoughts on “জামায়াতে ইসলামী-কে নিষিদ্ধ করতে দেরি হচ্ছে কেন?

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

Connecting to %s