প্রতিশোধ আর প্রতিহিংসার আগুনে জ্বলছে বাংলাদেশ


সেইসব মেধাবী তরুণদের দৃষ্টি আকর্ষণ করছি যাদের অন্তরে প্রতিশোধ আর প্রতিহিংসার আগুন নয় কাজ করে দেশ ও দেশের মানুষের প্রতি ভালোবাসা। যারা আইন নিজের হাতে তুলে নেন না ও নিতে চান না, বরং আইনের শাসন প্রতিষ্ঠিত হোক সেটা দেখতে চান এবং নিজেরাও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় দৃঢ় প্রতিজ্ঞ। দৃষ্টি আকর্ষণ করছি সেইসব মেধাবী তরুণদের যারা মনে করেন দেশকে বাঁচাতে হলে তাদেরকেই দায়িত্ব নিতে হবে, জং ধরা নেতৃত্ব দিয়ে কাজ হবে না। যারা বিশ্বাস করেন প্রতিশোধ আর প্রতিহিংসা কোন সমাধান নয়। যারা বিশ্বাস করেন আইনের শাসনই একমাত্র সমাধান। যারা দুর্নীতিমুক্ত ও দুর্নীতিকে ঘৃণা করেন। যারা দেশকে ভালোবেসে দেশের জন্য নিজের সো কলড ক্যারিয়ার বিসর্জন দিয়ে কাজ করতে চান। যারা আয়নার সামনে দাঁড়াতে ভয় পান না। যারা মনে করেন তারা ঐক্যবদ্ধ হলে মাত্র দশ বছরেই দেশটাকে সেরা দেশে পরিণত করা যাবে সেইসব তরুণদের দৃষ্টি আকর্ষণ করছি।

ছবি: ইন্টারনেট

ছবি: ইন্টারনেট

বাংলাদেশ এর জন্মলগ্ন থেকেই প্রতিশোধ আর প্রতিহিংসার আগুনে জ্বলছে। চীনপন্থী ও পাকিস্তানপন্থী এবং নকশালপন্থীরা বাংলাদেশের স্বাধীনতা মেনে নিতে পারেনি। সেই ১৯৭২ সাল থেকেই শুরু হয় প্রতিশোধ আর প্রতিহিংসার রাজনীতি। ৩০ হাজারেরও বেশি জাসদ কর্মী প্রতিশোধ আর প্রতিহিংসার আগুনে মারা পড়েছিল। এরপর ১৯৭৫ সালে শেখ মুজিবুর রহমানের হত্যার মধ্য দিয়ে প্রতিশোধ আর প্রতিহিংসার রাজনীতি নতুন মাত্রা লাভ করে। সেই অনলে মারা পড়েছিল জিয়াউর রহমান। তারপর দীর্ঘ ৯ বছর ধরে ভারত ও সৌদি আরবকে ম্যানেজ করে এরশাদ ক্ষমতায় টিকে ছিল। তাকে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি যৌথভাবে হটিয়ে দিয়ে বাংলাদেশ ফ্রেশ গণতন্ত্র ফিরিয়ে আনলেও ১৯৯১ সালের নির্বাচনের মধ্য দিয়েই প্রতিশোধ ও প্রতিহিংসার রাজনীতির আরেক দিগন্ত উম্মোচিত হয়েছিল।

১৯৯১ সালের নির্বাচনে বাংলাদেশের জনগণ ১৯৭১ সালে রনাঙ্গনে যুদ্ধ করা মুক্তিযোদ্ধাদের দল বিএনপিকে বিপুল ভোটে জিতিয়ে দেয়। এদিকে নিশ্চিত বিজয় ধরে নিয়ে বিজয় উৎসব করার জন্য প্রস্তুত হয়েছিল আওয়ামী লীগ। যেকারণে হেরে গিয়ে আওয়ামী লীগের হাত ধরে পুনরায় বাংলাদেশে প্রতিশোধ ও প্রতিহিংসার রাজনীতির নতুন দিগন্ত উম্মোচিত হয়। ৯ বছর স্বৈরশাসকের বিরুদ্ধে লড়াই করে নূর হোসেনের মতো শত শত জীবনের বিনিময়ে পাওয়া গণতন্ত্রকে ডে ওয়ান থেকে বিপন্ন করে তোলে আওয়ামী লীগ। বাংলাদেশের জনগণ প্রথমবারের মতো দেখতে পেলো ক্ষমতায় যাওয়ার জন্য স্বাধীনতার পক্ষ ও বিপক্ষ দুই দল আওয়ামী লীগ ও জামায়াতে ইসলামী রসুনের কোয়ায় পরিণত হয়েছিল। তারা যৌথভাবে বিএনপির বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়। ১৯৯১ সালের শিশু গণতন্ত্রকে বিকশিত হতে বাধাগ্রস্ত করে প্রতি পদে পদে আওয়ামী লীগ ও জামায়াতে ইসলামী রেকর্ড পরিমাণ দিন হরতাল অবরোধ দিয়ে দেশকে অচল করে দিয়েছিল। স্বাধীনতার সমসাময়িককালে জন্ম নেওয়া তরুণরা দেখতে পেলো কিভাবে জামায়াতে ইসলামীর মতো দেশ বিরোধী শক্তির সঙ্গে আওয়ামী লীগ জোট বেধেছে। তারা দেখতে পেল কীভাবে গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করার বদলে আওয়ামী লীগ জামায়াতের আমীর যুদ্ধাপরাধী গোলাম আযমের প্রেসিক্রিপশন অনুযায়ী তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রতিষ্ঠার জন্য গণতন্ত্রের কবর রচনা করল। নির্বাচন কমিশনকে শক্তিশালী না করে প্রতিশোধ আর প্রতিহিংসার পাশাপাশি অবিশ্বাস ও অসুস্থ রাজনীতির জন্ম দিল জামায়াত ও আওয়ামী লীগ। দেশের রাজনীতিতে ১৯৯৬ সাল থেকে অবিশ্বাস আরো বাড়ল। এদিকে একাত্তরে পাকিস্তানের পক্ষ নেওয়া জামায়াতে ইসলামী আওয়ামী লীগের আসকারা পেয়ে বাংলাদেশের রাজনীতিতে তরুপের তাসে পরিণত হলো। ২০০১ সালে ক্ষমতায় যাওয়ার জন্য বিএনপি জামায়াতে ইসলামীকে সঙ্গে নিল। সেই যে সঙ্গে নিল আর ফেলতে পারল না। ছেড়ে দিলে আওয়ামী লীগ যদি বুকে টেনে নেয় সেই ভয়ে জামায়াতে ইসলামীকে বিএনপি সঙ্গে রেখে দিল। ২০০৪ সালে আওয়ামী লীগের সভানেত্রীকে হত্যার চেষ্টা প্রতিহিংসা আর প্রতিশোধের রাজনীতির সলতে উসকে দিয়েছে আরো। লগি বৈঠা দিয়ে মানুষ মেরে দেশে জরুরি অবস্থা জারির মতো পরিস্থিতি তৈরি করে বিএনপিকে নামানো সম্ভব হলে দেশের রাজনীতি বড় ধরনের হোচট খায় ২০০৬ সালে। সো কলড তত্ত্বাবধায়ক সরকার ক্ষমতায় এসে দেশে বিরাজনীতিকরণের চেষ্টা চালায়। দুই প্রধানদল বিএনপি ও আওয়ামী লীগের প্রধানদের রাজনীতি থেকে বিতাড়নের ষড়যন্ত্র হয়, যা মাইনাস টু থিওরি নামে পরিচিত। বিএনপির চেয়ারপারসনের চেষ্টায় সেই থিওরি আলোর মুখ না দেখলেও ২০০৮ সালের নির্বাচনে জামায়াতকে সঙ্গে নিয়ে বিএনপি ব্যাপকভাবে ধরাশায়ী হয়। ক্ষমতায় এসে আওয়ামী লীগ নিজেদের ক্ষমতাকে দীর্ঘস্থায়ী করার লক্ষ্যে জামায়াতকে চাপে রাখার সিদ্ধান্ত নেয়। শুরু করে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার। সেসঙ্গে প্রতিশোধ আর প্রতিহিংসার যে রাজনীতি শুরু হয়েছিল দেশ স্বাধীনতার পর থেকে তার ধারাবাহিকতা ধরে রাখে। বিএনপির চেয়ারপারসনকে তার কয়েক দশকের বেশি সময় ধরে থাকা বাড়ি থেকে বিতাড়িত করা হয়। যা প্রতিশোধ আর প্রতিহিংসার রাজনীতিকে ২০০৬-০৮ সালের বিরতির পর আবার চাঙ্গা করে তোলে। এদিকে অবিশ্বাস আর সন্দেহের রাজনীতির কারণে এক পর্যায়ে আওয়ামী লীগের সঙ্গে জামায়াতের আতাতের অভিযোগ তুলে কাদের মোল্লার যাবজ্জীবনের রায়ের সূত্র ধরে গণজাগরণ মন্ত্র তৈরি হয়। ক্ষণিকের জন্য কেউ কেউ মনে করেছিল গণজাগরণ মঞ্চ প্রতিশোধ আর প্রতিহিংসার রাজনীতিতে গুণগত পরিবর্তন আনবে। তাদের সেই আশায় গুড়ে বালি দিয়ে বাংলাদেশ আবারো ফিরে গেছে প্রতিশোধ আর প্রতিহিংসার রাজনীতিতে। স্বৈরাচার এরশাদকে ইলোপ করে তার স্ত্রী রওশন এরশাদকে দিয়ে ১৪ দলের শরিক দল জাতীয় পার্টিকে বিরোধী দল বানিয়ে আইনসিদ্ধ কিন্তু সুস্পষ্টভাবে নীতিগতভাবে অগ্রহণযোগ্য নির্বাচনের মাধ্যমে দেশ ও দেশের মানুষকে আবারো প্রতিশোধ আর প্রতিহিংসা রাজনীতির মুখোমুখি করা হয়েছে।

পৃথিবীতে এখন আর মানুষ প্রকাশ্যে কাঁচা মাংস খায় না। নগ্ন হয়ে ঘুরে বেড়ায় না। পাথর দিয়ে ঠোকাঠুকি করে আগুণ জ্বালায় না। বাংলাদেশ পৃথিবীরই অংশ। বাংলাদেশের ছেলেমেয়েরা পৃথিবীর সেরা বিশ্ববিদ্যালয়ে লেখাপড়া করে, পৃথিবীর সেরা প্রতিষ্ঠানে কাজ করে। বাংলাদেশ এখন আর বর্বরদের জায়গা থাকতে পারে না। যারা মনে করে অন্য পক্ষকে নিশ্চিহ্ন করে দেবে। তারা আসলে দেশ ও দেশের মানুষের শত্রু। কারণ আওয়ামী লীগের ভোটারের সংখ্যা ৩৪ শতাংশ। বিএনপির ভোটারের সংখ্যা ৩৩ শতাংশ। বাকি থাকে আরো ৩৩ শতাংশ। তারাও মানুষ। আওয়ামী লীগ ও বিএনপির ভোটাররাও মানুষ।

মানুষের বিরুদ্ধে যারাই অবস্থান নিচ্ছে শুধুমাত্র তারাই অমানুষ। মেধাবী ও মানবিক বিবেকবোধসম্পন্ন তরুণদের কাজ হলো অমানুষদের রিপ্লেস করা। নিশ্চয়ই তারা প্রতিশোধ আর প্রতিহিংসার আগুনকে হটিয়ে দিয়ে শান্তির সুবাতাস দিয়ে দেশ ও দেশের মানুষের কল্যাণে কাজ করবে।

পল্লবী। ঢাকা।।
২১ ফেব্রুয়ারি ২০১৫

Advertisements

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s