‘যে সরকার জনগণকে সব কিছু দিতে পারার মতো বড়, সেই সরকার জনগণের কাছ থেকে সব কিছু কেড়ে নেওয়ার মতোই বড়’


আবারও জেফারসনের কথা ধার করে বলি- রাষ্ট্রের জন্য মানুষ নয়, মানুষের জন্য রাষ্ট্র তৈরি হয়েছে।
গণতান্ত্রিক সমাজে সবাই সবসময় একমত হতে পারেন না। সেটাই গণতন্ত্রের সৌন্দর্য্য। যেকারণে কেউ যখন বলে যে, সরকারের দায়িত্ব হলো জনগণের নিরাপত্তা দেখা। তখন কেউ কেউ বলতেই পারেন যে, সরকার কেন দায়িত্ব নেবে প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের নিরাপত্তার। সে নিজে থেকে সেটা করতে পারে না?

সৌজন্যে- ইন্টারনেট

সৌজন্যে- ইন্টারনেট

কেউ কেউ বলেন, জনগণের নিরাপত্তার দায়িত্ব সরকার কেন নেবে? জনগণ কি শিশু? কারো কারো যুক্তি হলো- সরকার তো আর জনগণের পিতা নয় যে তাদের দায়িত্ব নেবে। অন্যদের যুক্তি হলো জনগণ রাজনীতিবিদদের নির্বাচিত করে সরকার গঠন করতে পাঠায় জনগণের চাহিদা পূরণ করার জন্যই। অতএব এনিয়ে কোন ধরনের বিতর্ক করার সুযোগ নেই। তাদের মতে, জনগণই জন্যই সরকার।

বাংলাদেশের বর্তমান শাসক দল আওয়ামী লীগ সরকারের মন্ত্রীরাও একই কথা বলেন যে, জনগণই সকল ক্ষমতার উৎস। জনগণই তাদেরকে ভোট দিয়ে পাঠিয়েছে জনগণের কল্যাণের জন্য। যদিও শিরোণামের নিরাপত্তা কথাটি কখনো তারা বলেন না। তারা বলেন না যে, জনগণের নিরাপত্তা দেয়ার জন্য জনগণ তাদেরকে নির্বাচিত করেছে।

বাস্তবে অবশ্য আমরা দেখতে পাই যে, নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে সরকার গঠন করা আওয়ামী লীগের এমপিরা মুখে জনগণের কথা বললেও তারা প্রথমত তাদের নিজেদের ব্যবসা বাণিজ্য অক্ষুন্ন রাখতেই বেশি তৎপর। এমনকি তাদের কাছে দলের গুরুত্বও নিজেদের ব্যবসা বাণিজ্যের পর।

অনেকেই বিশ্বাস করেন যে, আওয়ামী লীগের মন্ত্রীসভা ও এমপিদের মধ্যে বেশিরভাগ পেশাগতভাবে ব্যবসায়ী হওয়ার কারণেই এই অবস্থাটি তৈরি হয়েছে। তারা এমপি হওয়াটাকে বিনিয়োগ হিসেবে দেখে থাকেন। ফলে, জনগণের মূল্য তাদের কাছে সবচেয়ে কম।

সেদিন সংবাদপত্রে দেখলাম লক্ষীপুরে আওয়ামী লীগের জেলা সভাপতি পদে প্রার্থী হওয়ার ফরমের দামই লাখ টাকা। আশঙ্কা প্রকাশ করা হচ্ছে যে, আগামীতে এই দাম আরো বাড়বে। উল্লেখ্য যে, এমপি হওয়ার জন্য মনোনয়নপত্র কিনতে হয়েছে ২৫ হাজার টাকায়। সমালোচকরা বলেন যে, সরকার পরিচালনা যারা করবেন তাদের মধ্যে ব্যবসায়ীর সংখ্যা বেশি হলে যা হয় বাংলাদেশের অবস্থা এখন তাই। আওয়ামী লীগের এবারকার সরকারে রেকর্ড সংখ্যক ব্যবসায়ী সংসদ সদস্য যারা রাজনীতিকে বিনিয়োগ হিসেবে দেখেন।

সরকারের লোকজন যখন রাজনীতিকে বিনিয়োগ হিসেবে দেখে তখন জনগণ বিপন্ন থাকে। বাংলাদেশের জনগণের হয়েছে সেই অবস্থা। সরকারের যে দায়িত্ব ও কর্তব্য আছে সেটা যেন সবাই ভুলতে বসেছে। অনাকাঙ্খিত হলেও সত্যি যে, এখনকার তরুণ প্রজন্ম এমনকি বয়স্করাও সরকার বলতে একদল লোক কিংবা একটি দলের কতিপয় নেতাকে মনে করছে। যা হওয়া উচিৎ নয়। একটি দল যখন সরকারের ভূমিকা পালন করেন তখন ওই দেশের সকল নাগরিকের ভালো মন্দ দেখার দায়িত্ব সরকারের। কিন্তু সাম্প্রতিককালে লক্ষ্য করা যাচ্ছে যে, সরকার একটি দলকে ও তাদের নেতৃত্বাধীন জোটকে প্রাধান্য দিচ্ছে। সকল জনগণ বিশেষ করে বিরোধী দলের অন্তর্ভুক্ত বাংলাদেশের নাগরিকগণ তাদের বিবেচনায় নেই।

কেউ কেউ মনে করেন যে, নির্বাচন ব্যবস্থায় ঘুষ ও দুর্নীতির প্রাধান্য বাড়ায় এই অবস্থা তৈরি হয়েছে। কারো কারো মতে, স্বল্প সংখ্যক ভোটারের ভোটে নির্বাচিত সরকার হওয়ায় জনগণের দুর্ভোগ।

আমেরিকান গণতান্ত্রিক নেতা জেফারসনের মতে একটি ভালো সরকারের প্রথম ও একমাত্র লক্ষ্য হলো- মানুষের জীবনের নিরাপত্তা দেয়া ও তাদের সুখ স্বাচ্ছন্দ্য দেখা, তাদের অনিষ্ট না করা। কিন্তু বাংলাদেশের জনগণ সেই সুখ স্বাচ্ছন্দ্য পাচ্ছে না। পথে ঘাটে বাসে জনগণের বলতে শোনা যায়, বর্তমান আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন সরকার মানুষের জীবনের নিরাপত্তা ও তাদের সুখ স্বাচ্ছন্দ্য দেয়ার ক্ষেত্রে নিদারুনভাবে ব্যর্থতার পরিচয় দিচ্ছে বললে কম বলা হবে। সেসঙ্গে একথাও বলতে হবে যে, থমাস জেফারসনের বলা দ্বিতীয় বিষয়টি অর্থাৎ জনগণের অনিষ্ট না করার ক্ষেত্রেও তাদের ভূমিকা প্রশ্নবিদ্ধ। এখানে উল্লেখ্য যে, থমাস জেফারসন যা বলেছেন সেটা শুধুমাত্র গণতান্ত্রিক সরকার ব্যবস্থার জন্য প্রযোজ্য। এক্ষেত্রে প্রশ্ন আসতে পারে- বাংলাদেশে কি গণতন্ত্র আছে? যারা এই প্রশ্ন করেন তাদের কাছে আমার প্রশ্ন- কিসের ভিত্তিতে তারা এমন সন্দেহ পোষণ করেন?

কেউ কেউ বলেন, সরকারের দায়িত্ব হলো মানুষের নিরাপত্তা দেয়া এবং অবকাঠামো তৈরি করা। মানুষ নিরাপত্তায় থাকতে পারলে অবকাঠামো ব্যবহার করে দেশের উন্নতিতে ভূমিকা রাখে। এবং নিজেদের জীবনমানেরও উন্নতি ঘটাতে পারে। নিরাপত্তা ও সঠিক অবকাঠামোর ‍উন্নয়ন নাগরিকের সাংবিধানিক অধিকারগুলো প্রতিষ্ঠিত করে। মানুষ তখন সুখে শান্তিতে জীবন যাপন করে। আওয়ামী লীগ সরকারের দাবী হলো তারা জনগণের জন্য কিছু করতে পারছে না বিএনপি ও তার নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোটের কারণে। পৃথিবীর কোন গণতান্ত্রিক দেশে এই ধরনের যুক্তি গ্রহণযোগ্য নয়। কারণ সরকারের দায়িত্বই হলো জনগণের নিরাপত্তা বিধান করা। অপরাধীদের শাস্তি দেয়া। আওয়ামী লীগ সরকার গত ৫০ দিন ধরে যে কাজটি করতে পারেনি সেই কাজের জন্য বিএনপি কিংবা অন্য কাউকে দোষারোপ করার সুযোগ গণতান্ত্রিক সরকার ব্যবস্থায় নেই। আবারও জেফারসনের কথা ধার করে বলি- রাষ্ট্রের জন্য মানুষ নয়, মানুষের জন্য রাষ্ট্র তৈরি হয়েছে।

গণতান্ত্রিক সমাজে সবাই সবসময় একমত হতে পারেন না। সেটাই গণতন্ত্রের সৌন্দর্য্য। যেকারণে কেউ যখন বলে যে, সরকারের দায়িত্ব হলো জনগণের নিরাপত্তা দেখা। তখন কেউ কেউ বলতেই পারেন যে, সরকার কেন দায়িত্ব নেবে প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের নিরাপত্তার। সে নিজে থেকে সেটা করতে পারে না?

আবারো জেফারসন থেকে ধার করে বলি- যে সরকার জনগণকে সব কিছু দিতে পারার মতো বড় সেই সরকার জনগণের কাছ থেকে সব কিছু কেড়ে নেওয়ার মতোই বড়। জেফারসনের কথাটা বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের মুখে আপনি হরহামেশা শুনতে পাবেন, তবে অন্য ভাষায়। তারা বলছে- সরকার চাইলে পারে না এমন কিছু নেই। তার মানে সরকার চাইলে দিতেও পারে। আবার কেড়েও নিতে পারে। গরিবের কাছে সরকার হলো একাধারে বোতলের দৈত্য যে সব এনে দেয় ও অন্যদিকে অত্যাচারী জমিদার যে সব কিছু কেড়ে নেয়।

চলবে……

২৬ ফেব্রুয়ারি ২০১৫
পল্লবী। ঢাকা।।

Advertisements

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s