ব্লগার অভিজিৎ হত্যাকান্ড: বিএনপির রাজনীতিতে হারানো অবস্থান ফিরে পাওয়ার সুবর্ণ সুযোগ


BNP-AL flagব্লগার অভিজিৎ হত্যাকান্ডে রাজনৈতিকভাবে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বিএনপি। জাতিসংঘসহ বিদেশী বন্ধু রাষ্ট্রসমূহের কাছে গত দুই মাসে বিএনপি যে গ্রহণযোগ্যতা অর্জন করতে পেরেছে এবং তাদের কাছ থেকে আন্দোলনের ব্যাপারে যে সমর্থন ও সহযোগিতা আদায় করতে পেরেছে আমেরিকান ব্লগার অভিজিৎ হত্যাকান্ডে তা এখন হারানোর জোগাড় হয়েছে। বিএনপির ইমেজ প্রায় ধ্বসে গেছে। তাতে লাভবান হয়েছে আওয়ামী লীগ। তবে বিএনপি নিজের কারণে নয় বেকায়দায় পড়েছে জোটে থাকা জামায়াতে ইসলামীর কারণে।

তথাকথিত ইসলামী জঙ্গিবাদের সঙ্গে জামায়াতে ইসলামীর সম্পৃক্ততার ব্যাপারে পশ্চিমা নাগরিকদের মধ্যে দৃঢ় বিশ্বাস কাজ করে। ফলে পশ্চিমা শাসকদের কারো কারো সঙ্গে জামায়াতের নেতাদের সুসম্পর্ক থাকলেও ওই দেশগুলোর সাধারণ নাগরিকদের চাপের কারণে পশ্চিমা গণতান্ত্রিক দেশগুলো দল হিসেবে জামায়াতে ইসলামীকে কোন ধরনের ছাড় দিতে পারছে না। আর আওয়ামী লীগের কৌশলী রাজনীতির কারণে বিএনপি জামায়াতকে ছাড়তে পারছে না। আবার জামায়াতে ইসলামী সঙ্গে থাকায় বিএনপির ব্যাপারেও পশ্চিমা দেশগুলো দ্বিধান্বিত। এই রকম একটা ত্রিশঙ্কু অবস্থায় বিএনপির রাজনীতি গত প্রায় ১৫ বছর ধরে খাবি খাচ্ছে, যা সাম্প্রতিক দিনগুলোতে বেড়েছে মাত্র। বিএনপির নিজস্ব রাজনীতির প্রয়োজনেই এখন জামায়াতে ইসলামীকে ছাটাই করে দেয়া দরকার।

রাজনৈতিক দল হিসেবে বিএনপির ব্যাপক জনসমর্থন থাকলেও ক্ষমতার রাজনীতিতে যেখানে ভোটের হিসেব সেখানে বিএনপির অন্তত ১ শতাংশ ভোট কম আছে আওয়ামী লীগের চেয়ে। যদিও ভাসমান প্রায় ২৩ শতাংশ ভোটের বড় অংশ বিএনপির পক্ষে যার প্রমাণ পাওয়া গিয়েছে সর্বশেষ উপজেলা নির্বাচন ও সিটি করপোরেশনগুলোর নির্বাচনে।

এদিকে রাজনৈতিক দল হিসেবে কূটচালের অধিকারী জামায়াতে ইসলামী সবসময়ই বিএনপি ও আওয়ামী লীগের কাধে ভর করে বাংলাদেশের রাজনীতিতে এগোতে চেয়েছে তাদের ৪ শতাংশ ভোট ব্যাংক ও ডেডিকেটেড নির্বাচনী কর্মীদের ব্যবহার করে। এ কারণে ৯১ সালে বিএনপি সরকার গঠন করার পর জামায়াত ইসলামী আওয়ামী লীগের সঙ্গে জোট বেধেছিল নিজেদের স্বাধীনতা বিরোধীতার ভূমিকাকে লঘু করা ও জনগণের কাছে গ্রহণযোগ্য হওয়ার জন্য। তখন আওয়ামী লীগও তাদেরকে কোলে টেনে নিয়েছিল বিএনপিকে কোনঠাসা করতে। জামায়াত ইসলামী এভাবে গণতন্ত্রের গত ২৪ বছরে কখনো আওয়ামী লীগ এবং কখনো বিএনপিকে ব্যবহার করে লাভবান হয়েছে।

জামায়াত সবসময় চেয়েছে তাদের স্বাধীনতা বিরোধীকারীর ভূমিকাটুকু স্বাধীনতার সপক্ষ শক্তি আওয়ামী লীগের সঙ্গে রাজনৈতিক জোট গঠনের মাধ্যমে মুছে দিতে। কিন্তু রাজনীতির মাঠের ঘাঘু প্লেয়ার আওয়ামী লীগ ১৯৯৬ সালে ক্ষমতায় গিয়ে জামায়াতকে আস্তে করে ছেটে দেয়। বিএনপি তখন ভোটের হিসেব করতে গিয়ে জামায়াতকে তাদের দলে ভীড়তে দিয়ে দীর্ঘমেয়াদে বড় ধরনের রাজনৈতিক বিপর্যয়ের মধ্যে পড়ে যায় যদিও তাৎক্ষণিকভাবে তারা ২০০১ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগকে হারিয়ে ক্ষমতা দখল করতে সক্ষম হয়। অনেক রাজনৈতিক বিশ্লেষক মনে করেন যে, বিএনপি যদি ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ পরিত্যক্ত জামায়াতে ইসলামীকে নিজেদের সঙ্গে না নিয়ে তাদের এককভাবে রাজনীতি করার ধারা অব্যাহত রাখত তাহলে রাজনীতির ময়দানে বিএনপির অবস্থান ধীরে ধীরে অনেকবেশি শক্তিশালী হতো। তারা হয়তো ২০০১ সালে ক্ষমতায় আসতে পারত না। কিন্তু প্রায় কাছাকাছি সংখ্যক সিট নিয়ে একটা শক্তিশালী বিরোধী দল হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে পারত এবং ২০০৬ সালে বিএনপি সংখ্যাগরিষ্ঠ দল হিসেবে সরকার গঠনের মাধ্যমে বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটা পাকাপোক্ত আসন গড়ে তুলতে পারত। জামায়াতে ইসলামীকে তখন আওয়ামী লীগ গিলতে বাধ্য হতো কৌশলগত কারণে। যেটা এখন বিএনপি করছে।

বাংলাদেশের রাজনীতিতে আওয়ামী লীগ যা করে বিএনপি সেই একই কাজ করলেও দেশের জনগণের কাছে বার্তাটা একইভাবে পৌছায় না কারণ আওয়ামী লীগে সাংস্কৃতিক কর্মী, বুদ্ধিজীবি ও সুশীল সমাজের প্রতিনিধি বেশি এবং আওয়ামী লীগের রাজনীতিকরা বেশি অভিজ্ঞ। যেকারণে আমরা দেখতে পাই যে, জামায়াতে ইসলামীকে সঙ্গে নিয়ে রাজনীতি করার পরও আওয়ামী লীগকে যুদ্ধাপরাধীদের আশ্রয় প্রশয়দাতা হিসেবে দেখা হয় না। কিন্তু বিএনপিকে দেখা হয়। যেকারণে আওয়ামী লীগ জামায়াতে ইসলামীকে নিয়ে রাজনীতি করাটাকে কৌশলগত পদক্ষেপ বলে পার পেলেও বিএনপি যে কৌশলগতভাবে সঙ্গে রেখেছে সেটা দেশের তরুণ সমাজ কিংবা বিদেশে নাগরিক সমাজ কিংবা বিদেশী কূটনৈতিকদের বিএনপি বিশ্বাস করাতে পারেনি। অন্যদিকে, জামায়াতে ইসলামী যখন বিএনপির সঙ্গে জোট বেধেছে আওয়ামী লীগ তখন তাদের পূর্বেকার মিত্র জামায়াতে ইসলামীকে জঙ্গি দল হিসেবে বিদেশী নাগরিকদের কাছে পরিচয় করিয়ে দিতে পেরেছে। আর দেশের তরুণ সমাজ তো জানেই যে জামায়াতে ইসলামী স্বাধীনতার বিরোধী দল।

ব্লগার অভিজিৎ হত্যার দায় স্বীকার করেছে ইসলামী জঙ্গি গোষ্ঠী। এদিকে আন্তর্জাতিক মহলে জঙ্গিবাদের সমর্থক হওয়ার ব্যাপারে জামায়াতের বদনাম আছে। একথা এখন সর্ব মহলে উচ্চারিত যে, জামায়াতে ইসলামীর কারণেই বিএনপি মরিয়া হয়ে চেষ্টার পরও আন্তর্জাতিকভাবে সহযোগিতা পাচ্ছে না। আমেরিকান ব্লগার অভিজিৎ মারা যাওয়ার পর এই বিষয়টি আরো প্রকট হবে। বিএনপির কূটনৈতিক তৎপরতা নতুন করে বেকায়দায় পড়ল। ইতোমধ্যে বিশ্বের নামী দামী সব মিডিয়ায় এই হত্যাকান্ডের সঙ্গে জঙ্গিবাদের জড়িত থাকার বিষয়টি তুলে ধরা হয়েছে। জঙ্গিবাদের সঙ্গে জামায়াতে ইসলামীর ইমেজ যুক্ত থাকায় এবং জামায়াতে ইসলামী বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোটভুক্ত হওয়ায় বিএনপি গত কয়েক মাসে আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে যে আন্তর্জাতিক সহানুভূতি আদায় করেছিল সেটা প্রত্যাখ্যাত হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। ফলে, আন্তর্জাতিক চাপ প্রয়োগের মাধ্যমে আওয়ামী লীগকে আলোচনার টেবিলে বসানোর ব্যাপারে বিএনপির যে কূটনৈতিক তৎপরতা সাফল্যের মুখ দেখছিল বলে পত্র-পত্রিকা মারফত জানা যাচ্ছিল সেটা অভিজিৎ হত্যাকান্ডের মাধ্যমে বড় ধরনের হোচট খেলো। এই অবস্থায় ৩৩ শতাংশ ভোট ব্যাংকের অধিকারী বিএনপি যদি রাজনীতিতে তাদের হারানো অবস্থান ফিরে পেতে চায় তাহলে অতি দ্রুত কয়েকটা পদক্ষেপ নিতে পারে:

১. আমেরিকান নাগরিক ব্লগার অভিজিতের হত্যাকান্ডের আন্তর্জাতিক তদন্ত দাবী করা। দোসীদের শাস্তি দাবী করা।

২. সরকারের কাছে দোষীদের খুঁজে বের করে শাস্তির ব্যবস্থা করার দাবী জানানো।

৩.জঙ্গিবাদের অভিযোগে দুষ্ট জামায়াতে ইসলামী-কে জোট থেকে সরিয়ে দেওয়া।

৪. বিবৃতি দিয়ে আন্তর্জাতিক মহলকে জানিয়ে দেওয়া যে জঙ্গিবাদের সঙ্গে বিএনপির কোন সম্পৃক্ততা নেই।

৫. যুদ্ধাপরাধীদের তালিকা তৈরি করে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার ত্বরান্বিত করার দাবী জানানো।

৬. দেশের তরুণ সমাজকে আশ্বস্ত করা যে, তারা ক্ষমতায় গিয়ে নিজ দল তো বটেই আওয়ামী লীগের মধ্যেও লুকিয়ে থাকা (যেমন, একাত্তরের ঘাতক ও দালালরা কে কোথায় বইয়ে তালিকাভুক্ত অভিনেতা শামসুজ্জামান আওয়ামী লীগ রাজনীতিতে যুক্ত এবং তাকে এবছর একুশে পদক দেওয়া হয়েছে) সকল যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করবে।

৭. বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত এবং একাত্তর সালে অস্ত্র হাতে ১১টি সেক্টরে যুদ্ধ করেছে এমন ব্যক্তিদের তালিকা প্রকাশ করে তরুণ সমাজকে জানিয়ে দেওয়া যে, বিএনপি মুক্তিযোদ্ধাদের দল।

বাংলাদেশের সত্যিকারের উন্নয়নের জন্য সত্যিকারের গণতন্ত্র চর্চা হওয়া দরকার যা বর্তমানে অনুপস্থিত কারণ:

১. সর্বশেষ নির্বাচনে একটি জোটভুক্ত দলগুলোর প্রার্থীরা ভাগাভাগি করে নির্বাচন করেছেন।
২. অর্ধেকেরও বেশি ১৫৪টি সিটে ভোটররা ভোট দিতে পারেননি ভাগাভাগির নির্বাচন হওয়ার কারণে সেখানে একাধিক প্রার্থী ছিল না।
৩. দেশের এক তৃতীয়াংশ ভোটের অধিকারী দল বিএনপি নির্বাচনে অংশ নেয়নি।
৪. ভোট পড়ার হার ৩০ শতাংশ থেকে মতান্তরে ৫ শতাংশ।

এই অবস্থায় দেশে একটি রাজনৈতিক সঙ্কট বিরাজ করছে গত প্রায় দুই মাস যাবৎ যার অবসান চায় আমার মতো সকল সাধারণ নাগরিক। রাজনৈতিক সঙ্কট সমাধানে জামায়াতে ইসলামী একটি বড় বাধা। জামায়াতে ইসলামীর কারণে দেশের ৪ কোটি তরুণ ভোটার, যা মোট ভোটারের প্রায় অর্ধেক ও বিদেশী বন্ধু রাষ্ট্র ও উন্নয়ন সহযোগীগণ বিএনপির প্রতি উপযুক্ত সহনুভূতি ও সমর্থন দেখাতে পারছে না। ব্লগার অভিজিতের হত্যাকান্ড বিএনপিকে আরো কোনঠাসা করছে। আওয়ামী লীগকে সুবিধাজনক অবস্থানে নিয়ে গেছে। এই অবস্থায় জামায়াতে ইসলামীকে বিসর্জন দেয়া বিএনপির রাজনীতিতে হারানো অবস্থান ফিরে পাওয়ার এবং দেশের তরুণ ভোটার ও বিদেশী বন্ধু রাষ্ট্রের সহানুভূতি ও সমর্থন লাভের একমাত্র উপায়। এই পদক্ষেপের মাধ্যমে দেশের রাজনীতিতে চলা অচলাবস্থা কাটিয়ে উঠা যেমন সম্ভব হবে তেমনি গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হওয়ার পথ সুগম হবে।

আসুন স্বাধীনতার সপক্ষ শক্তিরা একত্রিত হয়ে জঙ্গিবাদ মোকাবেলা করি। মি. অভিজিৎ রায় হত্যার তীব্র নিন্দা জানাই। এমন হত্যাকান্ড আর যাতে না হয় সে ব্যাপারে উপযুক্ত ব্যবস্থা নিতে সরকারকে বাধ্য করি।

২৮ ফেব্রুয়ারি ২০১৫
পল্লবী।। ঢাকা।।

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

Connecting to %s