বেগুনি-সবুজ-সাদা-সোনালী নারীরা


IWD Color Chartএক.

কয়েক ঘণ্টা পর আরেকটি আন্তর্জাতিক নারী দিবস ফুরাবে। আবার শুরু হবে অপেক্ষার পালা। নারীবাদীরা অপেক্ষা করবে পরের বছরের জন্য। তারা বক্তৃতা রেডি করবে, নতুন বছরের থিম অনুযায়ী। পোশাক নির্বাচন করবে- বেগুনি, সবুজ, সাদা, সোনালীর মধ্যে কোন একটি কিংবা একাধিক রংয়ের কম্বিনেশনে। রংগুলো বাছাই করার কারণ এগুলোই আন্তর্জাতিক নারী দিবসের অফিসিয়াল রং। আগে তিনটি রং ছিল। সোনালী রংটি সাম্প্রতিককালে যোগ হয়েছে। সাদা হলো বিশুদ্ধতা বা পবিত্রতার প্রতীক। বেগুনি হলো ন্যায়বিচার, মর্যাদা, আত্মসম্মান ও সম্ভ্রমের প্রতীক। সবুজ হলো আশা ও নতুন জীবনের প্রকাশক। সোনালী নারীবাদের নতুন ভোরের বার্তা বহন করে।

আজকের মতোই আগামীবছরও এসব রংয়ের কম্বিনেশনে কেউ পরবে শাড়ি। কেউবা সালোয়ার কামিজ। কিংবা শার্ট প্যান্ট। মিলিয়ে গহনা পড়বে। পারফিউম বাছাই করবে। তারপর এবছরের মতোই পত্রিকার গোল টেবিলে যোগ দেবে কিংবা কোন টেলিভিশন চ্যানেলের টক শো’তে অংশ নেবে। পদযাত্রায় অংশ নেবে। পালন করবে আরেকটি নারী দিবস।

দুই.

নারীবাদ আমার কাছে বেশ রহস্যময় একটা ব্যাপার। নারীবাদীরা কোনটাকে নারীর অগ্রগতি বলেন আর কোনটাকে অধোগতি মাঝে মাঝে সেটা বুঝে উঠতে পারি না। কখনো কখনো নারীবাদীদের আমার খুব স্বার্থপর মনে হয়!! যেমন, প্রিন্ট কিংবা ইলেকট্রনিক মিডিয়ার যে সংবাদপত্র কিংবা টেলিভিশন চ্যানেল নারীবাদীদের প্রচার প্রচারণা দেয় সেই সংবাদপত্র কিংবা টেলিভিশন চ্যানেল নারীবাদের সঙ্গে সাংঘর্ষিক বিজ্ঞাপন কিংবা অনুষ্ঠান প্রচার করলেও তথাকথিত নারীবাদীরা সেগুলো নিয়ে টু শব্দটা করেন না।

আবার বড় বড় করপোরেট হাউজ যেগুলো নারীবাদীদের অনুষ্ঠান স্পন্সর করে সেই করপোরেট হাউজের নারীবাদ বিরুদ্ধ কর্মকান্ডের বেলায়ও তথাকথিত নারীবাদীরা মুখে কলুপ এটে রাখেন।

এভাবেই নারীবাদীরা প্রায়শ কোন নীতি নৈতিকতা নয় বরং মুখ চিনে চিনে তাদের প্রতিবাদ জারি করেন। অনেকটা লোক দেখানো বিষয়ের মতোই তাদের সেই প্রতিবাদ ও সংগ্রাম।

এজন্য অবশ্য তাদেরকে দোষ দেওয়া যাবে না। কারণ নারীবাদী বিভিন্ন ধরনের অনুষ্ঠানের আয়োজন করার জন্য যে খরচাপাতি লাগে সেগুলো তো হাওয়া থেকে আসবে না। আবার যারা নিমক দেবে তাদের সঙ্গে তো আর নিমকহারাম করা যাবে না। নারীবাদের চেয়েও নিমকহারাম না করাটা বেশি নৈতিকতাসম্পন্ন মনে করেন অনেকে।

তিন.

এদিকে বাংলাদেশের রাজনীতিতে নারীদের অবস্থান যতো দিন যাচ্ছে আরো মজবুত হচ্ছে। ১৯৯১ সাল থেকে মোটামুটিভাবে দেশ পরিচালনার নেতৃত্ব নারীদের হাতেই ছিল। সম্প্রতি রওশন এরশাদের বিরোধী দলীয় নেতা এবং নারী স্পিকার পাওয়ার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের রাজনীতিতে নারীদের অংশগ্রহনের পরিধি বেড়েছে। নারী নেতৃত্বের এই বিপুল সমারোহ যদিও দেশে নারীদের ভাগ্য বদলে কার্যকর কোন ভূমিকা রাখতে পেরেছে বলে মনে হয় না। দেশে ধর্ষন কিংবা নারীর প্রতি সহিংসতা খুব একটা কমেনি। সংসদে দেওয়া তথ্য অনুযায়ী ২০০৯ সালের ১ জানুয়ারি থেকে ২০১২ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সারাদেশে ৫০ হাজার ৬৯৯টি নারী নির্যাতনের ঘটনা ঘটেছে। এসময়ে ১২ হাজার ৭৫০ জন নারী ধর্ষিত হয়েছেন। এটি আগের সকল রেকর্ডকে ছাড়িয়ে গিয়েছে। সংসদের তথ্য থেকে আরো জানা যায় নারী নির্যাতনের ঘটনায়  গত বছর মাত্র ৯০০ জনের সাজা হয়েছে। অভিযোগ আছে যে, সরকারি দলের তৃণমূল পর্যায়ের নেতাকর্মীরাই বেশিরভাগ ক্ষেত্রে নারী নির্যাতন ও ধর্ষণের সঙ্গে জড়িত ছিল। ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরাও এই ধরনের কর্মকান্ডে ব্যাপকভাবে জড়িত ছিল। উভয়ক্ষেত্রে সরকারের সঙ্গে জড়িত থাকায় প্রশাসন উপযুক্ত ব্যবস্থা নিতে পারেনি। ফলে অপরাধপ্রবণ সরকারি দলের নেতাকর্মীরা অপরাধে জড়াতে উৎসাহিত হয়েছে।

যে দেশে সরকারি হিসেবেই প্রতিদিন ৯ জন নারী ধর্ষিত হয় আর নির্যাতনের শিকার হয় ৩৭ জন সেই দেশে বেগুনি-সবুজ-সাদা-সোনালী কোন কাজে লাগবে? আমাদের দেশে আন্তর্জাতিক নারী দিবস নিছকই আনুষ্ঠানিকতায় পরিণত হয়েছে। একদিকে দিবস পালন। অন্যদিকে দেশের আইন শৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ও বিচার ব্যবস্থার নিস্ক্রিয়তার সুযোগ নিয়ে অপরাধীরা তাদের অপরাধের জাল বিস্তার করে চলেছে। যে দেশের সরকার তাদের দেশের নারীদের মর্যাদা রক্ষায় ব্যর্থ তাদের কোন সাফল্যই গুনতিতে নেওয়ার উপায় আছে কি?

যাই হোক। শেষ হতে চলেছে আরেকটি নারী দিবস।

আমি সবসময় বলি মানুষের অধিকার আদায় করা নিয়ে যদি আমরা আন্দোলন করতে পারতাম তাহলে নারীর জন্য পৃথক দিবসের দরকার হতো না। আসুন, নারীকে মানুষের মর্যাদা দিয়ে ‘মানুষ’ দিবস পালন করি।

৮ মার্চ ২১৫
পল্লবী।। ঢাকা।।

Advertisements

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s