নক্ষত্রের চিরকুট ও ধূসর স্মৃতি


নক্ষত্রের চিরকুট বইয়ের প্রচ্ছদ

নক্ষত্রের চিরকুট বইয়ের প্রচ্ছদ


কবি হামীম ফারুক।

কবি হামীম ফারুক।

একবার আটঘাট বেধে আমি কবিতা বোঝার চেষ্টা করেছিলাম। সময়টা ছিল আশির দশকের শেষভাগে। বন্ধু শামীম আর আমি আবৃত্তি শিখতে ভর্তি হয়েছিলাম। ছুটির দিনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কলা ভবনের নিচতলায় আবৃত্তি শেখানো হতো। কয়েকদিন যাবার পর আমি আগ্রহ হারিয়ে ফেলেছিলাম। কিন্তু শামীম মহা উত্‌সাহে সেখানে যেতে চাইতো। তবে সেটা কবিতার জন্য নয়, সতীর্থ প্রায় সমবয়সী মেয়েটির জন্য। নামটা এখনো মনে আছে। তবে বলছি না।

আগেই বলেছি ছুটির দিনে ক্লাস হতো। সুন্দর সকালে আমরা গিয়েই ক্লাসে ঢুকতাম না। সিড়িতে অপেক্ষা করতাম। মেয়েটি আসতো খোলা চুলে। মেকাপ ছাড়া সকালে গোসল করে আসা ভেজা ভেজা চুলের মেয়েটির স্নিগ্ধতা সকালের পরিবেশকে আরো মোহময় করে তুলত। শামীম তখন এক আধটা কবিতাও লেখে। সিলভিয়া প্লাথ তার প্রিয় কবি। ছবি আঁকে। গুন গুন করে গানও গায়। আমাদের তখন বয়স কতো? ২০ বছর। আমি প্রেমে পড়েছিলাম আরো এক বছর পরে!

বন্ধুদের মধ্যে শামীমই যে একমাত্র কবিতা প্রেমিক ছিল তা কিন্তু নয়। মনে পড়ে টিটোর কথা। স্কুল বন্ধু টিটোর প্রিয় কবি মোহন রায়হান। টিটো আমাকে মোহন রায়হানের একটা কবিতার বই উপহার দিয়েছিল। সেখান থেকে কয়েকটা কবিতা আবৃত্তি করেও শুনিয়েছিল। টিটোর ভরাট গলায় কবিতা শুনতে ভালোই লাগতো। বইটা বুক শেলফের কোথাও আছে। পেলে পরে নামটা বলে দেব!

আমার আরেক কমিউনিস্ট বন্ধু আযমের স্কুল জীবনে প্রিয় কবি ছিল নজরুল আর রবীন্দ্রনাথ। তার পড়ার ঘরের দেয়ালে নজরুল, রবীন্দ্রনাথ ছাড়াও লেনিনের ছবি ছিল। আযম যখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদুল্লাহ হলে থাকে তখন ওর রুমে গেলে নজরুল কিংবা রবীন্দ্রনাথ নয় শোনাতো সুকান্তের কবিতা। হঠাত্‌ই যেন আযমের প্রিয় কবির তালিকায় সুকান্ত যোগ হয়েছে। হয়তো বয়স আঠারো ছিল বলেই, ওই সময়ে ওর প্রিয় কবিতা ছিল-

আঠারো বছর বয়স কী দুঃসহ
স্পর্ধায় নেয় মাথা তোলবার ঝুঁকি,
আঠারো বছর বয়সেই অহরহ
বিরাট দুঃসাহসেরা দেয় যে উঁকি।…..

আযমের কাছে সুকান্তের কবিতা শুনতে শুনতে আমার ভালো লেগে গেলো ছাড়পত্র কবিতাটি-

…….চলে যাব—তবু আজ যতক্ষণ দেহে আছে প্রাণ
প্রাণপণে পৃথিবীর সরাব জঞ্জাল,
এ বিশ্বকে এ শিশুর বাসযোগ্য করে যাব আমি—
নবজাতকের কাছে এ আমার দৃঢ় অঙ্গীকার।

আমি এখনো সেই লড়াইটাই করছি। সেটা পরে কখনো বলা যাবে।

আমরা কবিতা পড়া বন্ধুরা তো বটেই, সেসঙ্গে যখন তখন কবিতা আবৃত্তি না করা স্কুল ও কলেজ বন্ধুরাও দেখতাম কবিতা লেখে। বিদেশী ভাষায় লেখা কবিতা অনুবাদ করে। নিটোল আর টিপুর কথা বলতে হয়। একসময় দেখলাম আমার চারপাশে যখন যারাই থাকছে সবাই কম বেশি কবি। আমার বউ যে স্বভাব কবি সেটা প্রেম করার সময় নয়, টের পেয়েছি বিয়ের অনেক বছর পর এসএমএস এর যুগে!

আমার কবি বন্ধুবান্ধবদের প্রভাব আমার উপরও খানিকটা পড়েছিল। নিউমার্কেটের করিডোরে থাকা কলমের দোকান থেকে কলম আর ফার্মগেটের তোফাজ্জল বুক হাউজ থেকে খাতা কিনে আমিও কবিতা লেখার বৃথা চেষ্টা করেছিলাম কিছুদিন। কিশোর আর তারুণ্যের সন্ধিক্ষণের সেই চেষ্টা রহস্য পত্রিকাসহ অন্যান্য পত্র-পত্রিকায় কবিতা ছাড়া অন্য কিছু ছাপা হতে শুরু করায় আর আগায়নি। লেখার দিন ফুরালেও কবিতা পড়ার ও আবৃত্তি করার ইচ্ছেটা যে একসময় তৈরি হয়েছিল তা তো লেখার শুরুতেই বলেছি। তবে সেটাও খুব বেশিদিন কনটিনিউ করেনি। একসময় আমি বুঝতে পারলাম কবিতা আমার জন্য নয়। কারণ কবিতা আমি বুঝি না। ছন্দও বুঝি না! মিলিয়ে মিলিয়ে শব্দের বুনন কিভাবে তৈরি হয়, সেটা আমার জানা নেই। সবচেয়ে বড় কথা অল্প কথায় প্রকাশিত একটি দৃশ্যকল্প বুঝে নেওয়ার জন্য যে বাড়তি পরিশ্রম করা সেটা আমার ভালো লাগছিল না।

হঠাত্‌ করেই আমি কবিতায় ফিরে এলাম ২০১৪ সালে। কবি হামীম ফারুকের কবিতা পড়ার মধ্য দিয়ে। আমি তাকে চিনি গোলাম ফারুক হামীম নামে। আমার সহকর্মী। ফেসবুকে নিয়মিত কবিতা প্রকাশ করেন। গত বইমেলায় তার বইও বের হয়েছিল। আমি নিয়মিত কবিতা পড়লেও বেশিরভাগ সময় তিনি কি বলতে চান বুঝি না। তবুও পড়ি। নিজের মতো করে বোঝার চেষ্টা করি। লাইক দিয়ে জানিয়ে দেই আমিও পড়েছি। ফোনে কথা হলে কবিতা পড়েছে সেটা বলি। যতোটুকু বুঝি মাঝে মাঝে সেটা নিয়েও কথা বলি। এভাবেই চলছিল। গত ২৩ ফেব্রুয়ারি তার ফেসবুক স্ট্যাটাসে দেখি তার কবিতার প্রথম ই-বুক বের হয়েছে। বইয়ের নাম- নক্ষত্রের চিরকুট। নামটা আমার খুব মনে ধরল। মনে মনে ঠিক করলাম বইটা নিয়ে একটা রিভিউ লিখব! একটা দুইটা কবিতা পড়ে মনে হলো অযথাই ভেবেছি রিভিউ লিখব। ফেসবুকে প্রকাশিত কবিতার দু’চারটা তাও বুঝতাম বইয়ের যে কয়টা পড়লাম দেখি একটাও বুঝিনা। পড়া বাদ দিয়ে দিলাম। বাকি কবিতাও পড়া হয় না। রিভিউও লেখা হয় না। গত সপ্তাহে একটা মোক্ষম সুযোগ পেলাম। একটা লম্বা বাস জার্নি। শাপলা চত্বর থেকে পল্লবী। সবকয়টা কবিতা পড়ে ফেললাম। বেশ কয়েকটা কবিতা ভালো লেগে গেলো। যেমন:

নদী নই, পাখিও নই.
শুধুই মানুষ

বাসা বাঁধি, ফেলে যাই
দু’ একটি মন্ত্র পড়া পালক
ঢেউ বন্দি জলে

মানুষ নই, পাখিও নই
কেবল নদী

মনে হলো শুরুর পৃষ্ঠাগুলো না পড়ে, সেই ম্যাগাজিন পড়ার মতো করে শেষ দিক থেকে পড়তে শুরু করলেই পারতাম। যে কবিতার নামে বইটি নক্ষত্রের চিরকুট সেই কবিতাটিও চমত্‌কার।

……..এভাবে সবগুলো চিরকুট একহাতে
আরেক হাতে
তোমার হাত ধরে
সবগুলো নক্ষত্রের রাত
কাটিয়ে দিতে চাই,

তুমি ফিরিয়ে দিবে না জানি

কবি যে বইয়ে শুধু জাগতিক সম্পর্ক নিয়ে কবিতা লিখেছেন তা কিন্তু নয়। বর্তমান আর অতীত। কাল আর মহাকালের মধ্যেও তিনি কবিতার শব্দের বুননে সম্পর্ক তৈরি করেছেন।

মাটি খুঁড়ে পাওয়া শিলালিপি খুঁজে পাই
আমার গোপন আলমিরায়।
………………
টোকা দিয়ে দেখি, আসলে সব একই গল্প,
ওদের চিরুনীই ছিল কাল আমার পকেটে।

তিনি তার কবিতায় ব্যক্তি মানুষকে উদ্বুদ্ধ করেছেন নিজেকে চেনার জন্য। লিখেছেন- আমরা বুঝলাম এরা কেউ নয়, আমরাই আমাদের গাঢ় রহস্য। আবার মানুষের জীবনের সঙ্গে প্রকৃতির অপূর্ব বন্ধন এবং সেই বন্ধন ছিন্ন হওয়া মানুষের জীবনের গল্পগাথা ফুঁটে উঠেছে তার নদী ও কুয়াশা নামের কবিতায়:

দ্রুত বদলে যায়
নদীর পাশে চির সহনশীল শস্যক্ষেত
মানুষের গল্প-গাঁথা

———————
———————-

সন্ধ্যার কুয়াশার ভেতর
বদলে যায় পেশা, মাছ শিকারের কৌশল

বাদ পড়েনি তার অসহায়ত্ব। একজন উন্নয়নকর্মী হিসেবে বড় কিছু না করতে পারার বেদনা থেকেই যেন কবি হামীম ফারুক লিখেছেন-

‘এ নদী এখন বড় অচেনা ঠ্যাকে,
আমারে লইয়া যাও, মাঝি।’

কিংবা সমকালীন জীবনের অসঙ্গতি দেখে নিজের ভেতরের রাগ ক্ষোভ কিংবা তীব্র কষ্টের অনুভূতি প্রকাশ করতেই যেন তিনি লিখেছেন- ‘লোকালয়ে এসে এখন ঘাস-ফড়িংয়ের চাষবাস করি।’ ইতিহাসের বার বার ফিরে আসাটাকে তিনি দেখতে পেয়েছেন বেশ কয়েকটি কবিতায়। তেমনি একটি কবিতায় তিনি লিখেছেন:

চিরকালীন বন্দোবস্তে মাঠে চরে শকুন
ধানের বদলে রাশি রাশি নীল
‘নাহলে কুঠিবাড়ি তোর শেষ আস্তানা,
বোকা চাষি’

শশ্মানে যাত্রার শুরু:নব্য-উপনিবেশ।

পাঠক, তাহলে কি নক্ষত্রের চিরকুটে কবি হামীম ফারুকের সবগুলো কবিতাই রাগ আর ক্ষোভের? অতীতাশ্রয়ী? কিংবা বেদনার? আমার কিন্তু তা মনে হয়নি।যেমন বালুচরে কবিতায় তিনি লিখেছেন- বালুচরের ওপাশে, নিশ্চিত লোকালয়।

তার আশাবাদীতা আমি অন্য আরো কয়েকটি কবিতায় খুঁজে পেয়েছি। এমনকি যেখানে রাগ ও ক্ষোভ আছে সেখানেও কখনো কখনো সূক্ষ্ণভাবে আশার বাণী তিনি শুনিয়েছেন। তার এই কবিতার বইয়ে সমকালীন জীবনের হতাশাও জায়গা করে নিয়েছে। তবে সেটা নিছক হতাশার মতো করে নয়। সেখানেও দে্রাহের সুর শোনা যায়। যেমন তিনি লিখেছেন:

নিলামের হাতুড়ি
সবকিছু পাল্টে দিল

কিংবা তিনি যখন লেখেন-

রাতের নিঃশ্বাসে খরদাহ,
ঋণের বোঝা,

দুপায়ের গোড়ালীর কালচে
রেখায় মৌসুমী ফলনের ভবিষ্যত্‌

কাঁচা-পাকা দাড়ির গুচ্ছ;
পোড়া শরীরে
ঘামে ভেজা স্বপ্ন

তখন তার দেশ ও সমাজ চিন্তাটাই বার বার সামনে চলে আসে। একজন উন্নয়নকর্মী হিসেবে তিনি বাংলাদেশের আনাচে কানাচে ঘুরে বেড়ান। তিনি যেমন সেই দুর্গম চরাঞ্চলে যান ঠিক তেমনি হাওরের মধ্যে মানুষের কষ্টকর জীবনও দেখেন। পাহাড় যেমন তাকে টানে, সমতলের মানুষের মধ্যেকার ভিন্নতাও তাকে ভাবিয়ে তোলে। বস্তিতে ঘুরে বেড়ানোর অভিজ্ঞতা তার যেমন আছে ঠিক তেমনি নদীর বুকে যে জেলে জীবন সেটিও তার দেখা। এসবই তাকে সমৃদ্ধ করেছে। আর তার সেই অভিজ্ঞতারই যেন চিত্রকল্প হলো নক্ষত্রের চিরকুট। দহন-কাল কবিতায় তিনি ফুঁটিয়ে তুলেছেন তার দেখা জীবনের গল্পকে-

১.
যাত্রী নেই; শূন্য বাসে সব্জীর চারা নিয়ে
বসে থাকা, কালো পিচের রাস্তা
গলছে পায়ের নিচে

২.
মাঝ নদীতে ভাগাড়ের ঝাঁকে ঝাঁকে রোদ
থেমে গেছে জলজ যানের শব্দ,
ভোঁদরের ডুব-সাঁতার

৩.
বেগুনী তাপের আঁচে এখন
বৃষ্টি-স্বপ্নের বুনন

আমি আমার এই লেখা শেষ করব তার প্রথম ই-বইয়ের প্রথম কবিতা দূরবীনে থেকে কয়েক লাইন তুলে দিয়ে:

দূরবীনে ঘাটের তোড়জোড়;
আমার অস্থির অপেক্ষা

তীর ঘেঁষে যাওয়া জলজ শকটের দিকে
তাকিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলে চর বালিকা-
‘আহা এরা কত সুখী’

যারা আমার মতোই পুরো বই পড়তে চান তাদেরকে ইন্টারনেটে লগইন করতে হবে নিচের ঠিকানায়:
http://banglar-eboi.com/upload/books/Nakhatarer%20chirkut-%20Hamim.pdf

হ্যাপী রিডিং!

পল্লবী।। ঢাকা।।
১২ মার্চ, ২০১৫

Advertisements

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s