টাকার স্তুপে লাশের গণ্ধ


এই আহাজারি একটি নিম্ন মধ্যম আয়ের দেশের মানুষের যার আত্মীয় স্বজন জাকাতের কাপড় আনতে গিয়ে পদপিষ্ঠ হয়ে মারা গিয়েছে। দুর্নীতিতে আকণ্ঠ নিমজ্জিত শাসক শ্রেণীকে তিনি অভিশাপ দিচ্ছেন, যাদের দুঃশাসনের অবসান ছাড়া এই আহাজারি বন্ধ হবে না। ছবি: ইন্টারনেট
এই আহাজারি একটি নিম্ন মধ্যম আয়ের দেশের মানুষের যার আত্মীয় স্বজন জাকাতের কাপড় আনতে গিয়ে পদপিষ্ঠ হয়ে মারা গিয়েছে। দুর্নীতিতে আকণ্ঠ নিমজ্জিত শাসক শ্রেণীকে তিনি অভিশাপ দিচ্ছেন, যাদের দুঃশাসনের অবসান ছাড়া এই আহাজারি বন্ধ হবে না।
ছবি: ইন্টারনেট
শাসন ব্যবস্থার প্রতি অনাস্থা থেকেই জাকাতকেন্দ্রিক হত্যাকান্ড চলছে। জাকাতের কাপড় নিতে গিয়ে পদপিষ্ট হয়ে মারা যাওয়ার ঘটনা ঘটেনি এমন একটা বছরের কথা কেউ মনে করতে পারেন? একসময় দেশে পত্র পত্রিকা কম ছিল। তারপরও খুঁজলে দেখা যাবে ঢাকায় কিংবা যশোরে কিংবা সিলেট বা চট্টগ্রামে জাকাতের কাপড় সংগ্রহ করতে গিয়ে মানুষ মরার ঘটনা ছাপা হয়েছে।

দেশ স্বাধীন হওয়ার পর কয়েক বছর পত্রপত্রিকায় এতো বেশি রাজনৈতিক হত্যাকান্ডের খবর ছাপা হতো যে, জাকাতের ‍দু’চারটা মৃত্যুর খবর তেমন কোন প্রভাব ফেলতো না জনমনে। তার উপর তখন খিদের জ্বালায় মানুষ মরার মতো ঘটনাও ঘটছিল। ১৯৭৪ সালে তো না খেতে পেরে সরকারি হিসেবেই ২৭ হাজার মানুষ মারা গিয়েছিল। বেসরকারি হিসেবে কয়েক লাখ। পত্র পত্রিকায় জাকাতের কাপড় সংগ্রহ করতে গিয়ে মৃত্যুর যে খবর আসে সেটা অনেকটা সরকারি হিসেবের মতো ব্যাপার। এর বাইরে আরো অনেক ঘটনা ঘটতে থাকে দেশের আনাচে কানাচে যা পত্রিকায় প্রকাশিত হয় না।

আশির দশক থেকে বাংলাদেশে সরকারি হিসেবে কচ্ছপ গতিতে দারিদ্র্য কমতে শুরু করে যা গত কয়েক বছরে হঠাৎ করেই খরগোশ গতি লাভ করায় বাংলাদেশ অতি সম্প্রতি নিম্ন মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত হয়েছে। দেশের পত্র-পত্রিকায় তো বটেই্ সংসদে ও সভা সেমিনারে এবং টেলিভিশন টক শোতে আত্মতুষ্টির গালগল্প যখন চলছে সেই সময়ে ময়মনসিংহে জাকাতের কাপড় সংগ্রহ করতে গিয়ে অন্তত ২৪ জন নারী ও শিশুর মৃত্যুর খবর রোজার মাসে সারা দেশের বিবেকবান মানুষের অন্তরাত্মাকে কাঁপিয়ে দিয়েছে। কী নিষ্ঠুরতা! টাকার স্তুপে লাশের গন্ধ যেন।

বাংলাদেশে ১৯৮২ সালে একটি জাকাত বোর্ড গঠিত হলেও সেটি বেশিরভাগ মানুষের আস্থা অর্জন করতে পারেনি। ৯০ ভাগ মুসলমানের দেশ বাংলাদেশে শুক্রবারে মসজিদে যেমন অনেক নামাজীর ভীড় হয় তেমনি যারা নিয়মিত দান খয়রাত করেন না তারাও জাকাত দেন। এবং বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই জাকাতের যে মূলবাণী সেটা তারা অনুসরণ করেন না মূলত না জানার কারণে। জাকাত বোর্ড মানুষকে জাকাতের মূলবাণী জানাতে ব্যর্থ হয়েছে বলেই বাংলাদেশের কতিপয় বিত্তশালী মানুষ লোকদেখানো জাকাত দিতে গিয়ে মানুষের মৃত্যুর কারণ হয়। পবিত্র কোরান শরিফে সুরা মুজ্জামিল, সুরা ফাতির, সুরা আরাফ এবং সুরা মরিয়মে নামাজ ও জাকাতের কথা একইসঙ্গে বলা হয়েছে। নিজের আত্মার মঙ্গল ও মহান আল্লাহপাকের সন্তুষ্টির জন্য জাকাত দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। লোক দেখানো ও বাহবা কুড়ানোর জন্য নয়। ইসলামে অহংকার করা নিষেধ করা হয়েছে। বাংলাদেশে কতিপয় ধনী লোকদের জাকাত দেয়াটা নিজেদের অর্থবিত্ত লোকজনকে দেখানো ও অহংকার করার একটি উপায়ে পরিণত হয়েছে। সামাজিক স্ট্যাটাস বাড়ানোর ও বাহবা নেওয়ার উপায়। এসবই ইসলামে নিষেধ করা হয়েছে। ইসলামে এমনভাবে জাকাত আদায়ের কথা বলা হয়েছে যাতে করে জাকাত গ্রহণকারী ব্যক্তি অচিরেই নিজে জাকাত দেওয়ার মতো সক্ষমতা অর্জন করতে পারেন। একটা শাড়ি কিংবা লুঙ্গি জাতীয় জাকাত ইসলামে উৎসাহিত করা হয়নি। ইসলামের মূল বাণী থেকে দূরে সরে গিয়ে মাইকিং করে জাকাতের কাপড় ও টাকা বিতরণের যে সংস্কৃতি বাংলাদেশের কতিপয় ধনী ব্যক্তির মধ্যে লক্ষ্য করা যায় তা কয়েকটি বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করে:

১. ধনী মানুষ এই দেশের সমাজে যা খুশি তা করতে পারে। তাদের ব্যাপারে প্রশাসন নীরব থাকে হত্যাকান্ডের মতো ঘটনা না ঘটা পযন্ত।
২. এলাকার নেতৃবৃন্দ যারা ইসলাম গেলো গেলো বলে অন্য অনেক কিছুতে চিৎকার করে ধনী মানুষের জাকাত কান্ড নিয়ে তারা নীরব দর্শক থাকে। এমনকি পদপিষ্ট হয়ে মানুষ মারা যাওয়ার পরও।
৩. ধনী মানুষ সরকারি কোষাগারে এক্ষেত্রে জাকাত বোর্ডে অর্থ দেওয়ার চেয়ে নিজেরা এলাকায় অর্থকড়ি ও শাড়ি লুঙ্গি বিতরণে বেশি উৎসাহী।
৪. ধনী মানুষেরা জাকাত দেয়াটা নাম কামাইয়ের হাতিয়ার বলে বিবেচনা করে থাকে।
৫. ধনী মানুষেরা ক্ষমতাশালী মানুষদের কিনে নিতেও কাপর্ণ্য করে না জাকাতের অব্যবস্থাপনা সামলানোর প্রয়োজনে।

বাংলাদেশে শুধু যে অসম্ভব ধনী মানুষেরা জাকাত দেন তা নয়। বাংলাদেশে কয়েক কোটি মানুষ জাকাত দেন যাদের জাকাতের পরিমাণ কয়েক শ থেকে কয়েক হাজার টাকা। যদিও দেশের প্রতিটি জেলা ও উপজেলায় সরকারি ও বেসরকারি ব্যাংকের মাধ্যমে জাকাত বোর্ড টাকা সংগ্রহের জন্য একাউন্ট খুলে রেখেছে কিন্তু সেখানে কয়েকশ কোটি টাকার জাকাতের অতি ক্ষুদ্র অংশ জমা হয়ে থাকে। কারণ বাংলাদেশের বেশিরভাগ মানুষের মনে সরকারের আর্থিক ব্যবস্থাপনার প্রতি কোন আস্থা নেই। এজন্য কোটি কোটি মানুষকে দোষ দেওয়া যাবে না। কারণ তারা নিয়ত দেখতে পায় এই দেশের শাসন ব্যবস্থার সঙ্গে জড়িত মন্ত্রী, এমপিরা কিভাবে নাক ডুবিয়ে জনগণের পয়সা খেয়ে ফেলে। এরা যে জাকাতের টাকা মেরে খাবে সেটা বলাই বাহুল্য। যে দেশের মন্ত্রীরা মানুষকে পচা গম খাওয়াতে পারে। খাদ্যে ভেজাল দিতে পারে। রাস্তা মেরামতের টাকা গিলে ফেলতে পারে। এক টাকার জিনিস ১০০০ টাকায় কিনে জনগণকে দেউলিয়া বানাতে পারে। সর্বোপরি জাকাত নেওয়ার মতো লাখ লাখ নারী ও শিশুকে অভুক্ত রেখে কিংবা পোষাকবিহীন রেখে ঘোষণা দিতে পারে দেশ নিম্ন মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত হয়েছে সেই শাসন ব্যবস্থায় জনগণের পদপিষ্ট হয়ে মারা যাওয়াটা ট্রাজেডি না শাসন ব্যবস্থার ব্যর্থতায় হত্যাকান্ড সেটা ভেবে দেখার বিষয়।

১০ জুলাই ২০১৫।।
পল্লবী।। ঢাকা।।

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

Connecting to %s