মগের মুল্লুকে মামা বাড়ির আবদার


censorshipআমার জন্ম মগের মুল্লুকে। বাগধারা মগের মুল্লুক প্রথম পড়ি ধানমন্ডি বয়েজ স্কুলে। তখনও জানতাম না আমার জন্মস্থান খেপুপাড়া একসময় মগের মুল্লুক ছিল। অনেকে খেপুপাড়াকে কলাপাড়া নামে চেনেন। দুই শক্তিশালী মগ বা জলদসু্যর আস্তানা ছিল এখানে। তাদের একজনের নাম খেপু এবং অন্যজনের নাম কলাউ। তাদের একজনের মুল্লুকের বা রাজত্বের নাম ছিল খেপু পাড়া এবং অন্যজনের কলাউ পাড়া। পরবর্তীতে খেপুপাড়া ও কলাপাড়া নামকরণ হয়।

আন্দারমানিক নদী থেকে বের হয়ে যে খালটি খেপুপাড়া শহরের মধ্য দিয়ে উত্তর দক্ষিণে চলে গেছে সেই খালটিই ছিল দুই মগের মুল্লুকের বিভক্তিরেখা। ব্রিটিশ আমলে এই এলাকার প্রশাসনিক দপ্তর খালের এক পাড় কলাপাড়ায় থাকার কারণে সরকারি কাগজপত্রে উপজেলা কলাপাড়া নামে পরিচিত। একসময় যেকোন এলাকার পরিচিতিতে ডাকঘরের বিশেষ ভূমিকা ছিল। এক্ষেত্রে পোস্টঅফিস বা ডাকঘর খালের অন্য পাড়ে খেপুপাড়ায় অবস্থিত হওয়ায় স্থানীয় লোকজনসহ বেশিরভাগ মানুষের কাছে খেপুপাড়া নামেই পরিচিত। যেভাবেই দেখি না কেন খেপুপাড়া মগের মুল্লুক ছিল।

মগরা হলো দুর্দর্ষ জলদসু্য। ১৬ শতকে মোঘলদের শাসনামলে আরাকান রাজ্য থেকে সমৃদ্ধশালী বাংলাদেশে আস্তানা গড়ে তুলেছিল মগ জলদসু্যরা। মোঘল সুবেদারদের পক্ষে তাদের বিরুদ্ধে লড়াই করার মতো নৌ যোদ্ধা ছিল না। এই সুযোগে মগরা এই দেশের মানুষদের উপর যা খুশি তাই করতে শুরু করে। তখন দেশে কোন ধরনের আইন ছিল সাধারণত মানুষের তা মনে হতো না। ন্যায়বিচার তো দূরের কথা। বিচার চাওয়ার সাহস পর্যন্ত সাধারণ মানুষের ছিল না। মোঘল আমল শেষে সুলতানি আমলেও মগদের অত্যাচার কমেনি। একসময় মগদের অত্যাচারের বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষ সংঘবদ্ধ হতে শুরু করে। প্রায় ১০০ বছর ধরে বিভিন্ন সময়ে মগদের সঙ্গে সাধারণ মানুষের সংঘাত সংঘর্ষ হতে থাকে। এভাবে মগদের শক্তি ধীরে ধীরে কমতে থাকে।

ইতোমধ্যে এই উপমহাদেশে ব্রিটিশ শাসন শুরু হয়ে গেছে। খেপুপাড়ায় ব্রিটিশ মেজিস্ট্রটে যে ঘরটিতে থাকতেন সেটি এখনো ভাঙ্গাচোরা অবস্থায় রয়েছে। উনিশ শতকের শুরুর দিকে মগদের অত্যাচার থেকে খেপুপাড়ার মানুষ মুক্ত হয়েছে। বাংলাদেশের অন্যান্য জায়গায়ও মগদের আধিপত্য কমে যায় সেসময়ে। ব্রিটিশরা ততোদিনে মগদের প্রতিস্থাপন করতে পেরেছে। তবে তাদের কলাকৌশল মগদের চেয়ে ভিন্ন ছিল। তারা কল কারখানা স্থাপন করে পরিশীলিতভাবে লুটপাট করতে শুরু করে। খেপুপাড়ায় রাইসমিল, অয়েলমিল, ম্যাচ ফ্যাক্টরিসহ বিভিন্ন ধরনের কলকারখানা স্থাপিত হতে লাগে।

মগদের মুল্লুকে কোন বিচার ছিল না কিন্তু ব্রিটিশরা আইন কানুন তৈরি করে বিচারের ব্যবস্থা করে। বাংলাদেশের একটি বড় সংখ্যক আইন ব্রিটিশ আমলে প্রণীত। যাই হোক, ব্রিটিশরা লুটপাটের পাশাপাশি এক ধরনের সভ্যতার বিকাশ ঘটাতে থাকে। ব্রিটিশ আমলের পর পাকিস্তান আমল হয়ে বাংলাদেশ আমল শুরু হলেও মগের মুল্লুকের ভয়াবহ অভিজ্ঞতা থেকে এই দেশের মানুষের মুক্তি মিলেনি। বরং বাংলা ব্যাকরণ বইয়ে মগের মুল্লুক বাগধারা স্থান করে নিয়েছে।

স্বাধীনতার পর থেকেই বাংলাদেশ দফায় দফায় বিশৃঙ্খল ও অরাজকতাময় পরিস্থিতির সম্মুখীন হচ্ছে। আর বার বার ব্যাকরণ বইয়ের সেই বাগধারা মগের মুল্লুকে ফিরে যাচ্ছে। মগের মুল্লুকের সর্বশেষ আলোচিত ঘটনাটি হলো ১৩ বছরের শিশু রাজনের হত্যাকান্ড। একটি স্বাধীন দেশে মগদের উত্‌পাত কতোটা শক্তিশালী হলে পরে এভাবে একটি শিশুকে হত্যা করা যায় এবং সেই হত্যাকান্ডের ভিডিও রেকর্ড ধারণ করা যায়। মানুষের অন্তর এতোটা কঠিন হলো কীভাবে? একদিনে যে নয় সেটা তো বোঝাই যায়। আসলে গত ৪৫ বছর ধরে এই দেশের মানুষ দেখেছে শক্তিশালী ও ক্ষমতাশালী মানুষেরা কিভাবে রাষ্ট্রীয় যন্ত্রকে বশ করে কিংবা সঙ্গে নিয়ে আবার কখনো কখনো রাষ্ট্রীয় যন্ত্র স্বয়ং তার নাগরিকদের জন্য যন্ত্রণা ও বিভীষিকার কারণ হয়েছে।

রাজন হত্যার আগে আমরা দেখেছি ঢাকায় দিনে দুপুরে শাসকদলের ক্যাডারটা অস্ত্র উচিয়ে নিরীহ বিশ্বজিত্‌কে কুপিয়ে হত্যা করেছে। বিশ্বজিতের হত্যার আগে এই ঢাকা শহরে দিন দুপুরে লগি বৈঠা দিয়ে পিটিয়ে মানুষ মারা হয়েছিল। এরশাদের সময় ট্রাক উঠিয়ে দিয়ে দিনে দুপুরে রাজনৈতিক নেতাকে হত্যা করার ঘটনা ঘটেছে। সেটি ছিল আশির দশকের ঘটনা। তার একদশক আগে স্বাধীনতার পরপর দিনে দুপুরে রাস্তায় লাশ দেখা যেতো। ওই সময়ে মাত্র তিন বছরে ৩০ হাজার প্রতিপক্ষ রাজনৈতিক কর্মীকে হত্যা করা হয়েছিল। যার কোন বিচার হয়নি। সেই সময়ে এক পর্যায়ে মানুষ নিজেদের হাতে আইন তুলে নিয়েছিল।

ঢাকার বাইরে জনতার হাতে পিটুনি খেয়ে মারা যাওয়ার ঘটনা যেমন প্রচুর ঘটত। পশ্চিমা কায়দায় জনতা নিজেরা আদালত বসিয়ে গাছে মানুষ ঝুলিয়ে দেওয়ার মতো ঘটনা ঘটতো। যে অরাজকতা স্বাধীনতার পর পর শুরু হয়েছিল সেটা ১৬ শতক থেকে ১৮ শতক জুড়ে মগের মুল্লুকের চেয়ে কোন অংশে কম ছিল না। সেই অরাজকতার উপযুক্ত বিচার না হওয়ায় যে বিচারহীনতার সংস্কৃতি একটি স্বাধীন দেশে শুরু হয়েছিল তার পুনরাবৃত্তি ঘটতে থাকে। এরশাদ তার স্বৈরশাসন টিকিয়ে রাখতে দেশে আধুনিক মগের মুল্লুক কায়েম করেছিল। দীর্ঘ ৯ বছরের স্বৈরশাসন থেকে বাংলাদেশ মুক্তি পেয়েছিল খালেদা-হাসিনার যৌথ আন্দোলনের মাধ্যমে। দেশ প্রবেশ করেছিল একটি গণতান্ত্রিক কাঠামোতে। কিন্তু কয়েক বছরের মধ্যেই সেই শিশু গনতন্ত্রের উপর মগের মুল্লুকের আক্রমণ ঘটেছিল।

ব্রিটিশরা চলে গিয়েছে কিন্তু দেশ বিভক্তি থেমে যায়নি। বরং বেড়েছে। সেই সুযোগে দেশে মগ জলদসু্যদের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য নিয়ে রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ আবির্ভূত হয়েছে। যাদের কাছে জনগণ মুখ্য নয়। মুখ্য হলো নিজেদের ক্ষমতায় যাওয়া এবং টিকে থাকা। এই নিজেরা হলো সেই খেপু ও কলাউ মগ এবং তাদের বংশধরগণ। যারা দলবদ্ধ হয়ে নিরীহ মানুষের উপর নিপীড়ন ও নির্যাতন করে। জনগণের সম্পদকে জোর জবরদস্তি করে ভোগ দখল করে। কেড়ে নেয়। আইন ও বিচার ব্যবস্থাকে নিজেদের প্রয়োজন অনুযায়ী প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করার ব্যবস্থা নেয়। এদের একটাই পরিচয়- দসু্য। এরা নিঃসন্দেহে জলদসু্য নয়। বায়ু কিংবা সড়ক দসু্য নয়। এরা তারচেয়েও বেশি কিছু। এদের বিস্তার বায়ু-মাটি-পানি সবত্র‍র্ই। এদের কাছে ৫৬ হাজার বর্গমাইল হলো নিজেদের সম্পত্তি আর জনগণ হলো “কিছুই না”। এরা স্বাধীন এই ভূখন্ডের সবকিছুর মালিকানা দাবী করে থাকে। এরা জনগণের মালিকানাকে অস্বীকার করে। এদের কাছে এদের বাড়াবাড়ি মামা বাড়ির আবদার মনে হলেও এরা মনে করে স্বাধীন এই দেশের মালিকানা শুধুমাত্র তাদের।

এদের এক পক্ষ বাস পুড়িয়ে দিলে অন্যপক্ষ মানুষ পুড়িয়ে দেয়। এক পক্ষ খাম্বা বানিয়ে টাকা পয়সা লুট করলে অন্যপক্ষ ব্যাংকের ভোল্টই খালি করে দেয়। এটা এমন এক ইদুর দৌড় যে, এক মুদি দোকানদার রাষ্ট্রের ব্যাংক থেকে সাড়ে চার হাজার কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েও শান্তিতে ঘুমাতে পারে। অন্যদিকে সামান্য কয়েক হাজার টাকা চুরির জন্য পিটিয়ে মানুষ মারা হয়। অভুক্ত শিশু সামান্য রুটি চুরির দায়ে হাত ঝলসে যন্ত্রনায় কাতরায়। অন্যদিকে, একটি মাত্র সরকারি ব্যাংক থেকে ৬০০০ কোটি টাকারও বেশি ঋণ নিয়ে পরিশোধ না করার আবদার তোলে কতিপয় মানুষ। এমন সরকারি ব্যাংকের সংখ্যা কম নয়।

শিক্ষা ব্যবস্থাকে এমনভাবে বলাত্‌কার করা হয়েছে যে বাংলাদেশের ভবিষ্যত্‌ অন্ধকারাচ্ছন্ন হওয়ার সম্ভাবনা প্রবল। এখন যারা স্কুলে পড়ে আজ থেকে ৪০ বছর পরে তারাই দেশ চালাবে যখন এখনকার রথি মহারথিরা কেউই বেঁচে থাকবেন না। সেই বাংলাদেশে এখনকার শিশু সন্তানেরা ভারত ও ইওরোপের দাসত্বের শিকার হয়ে বেঁচে থাকবে। দেশের সকল উত্‌পাদনশীল প্রতিষ্ঠানের পরিচালনা পদগুলোতে বিদেশীরা থাকবে। দুয়েকক্ষেত্রে অনিবাসী বাংলাদেশীরা থাকবে। আর এখনকার বলাত্‌কারের শিকার শিক্ষা ব্যবস্থার মধ্য দিয়ে সার্টিফিকেটধারীরা তাদের শ্রম বিক্রি করবে ম্যানুয়াল কাজের মাধ্যমে। সেই সমাজে রাজন হত্যাকারীদের পরিচয় হবে বিদেশী প্রভুদের মোসাহেবের। কী ব্রিটিশ আমলের ইতিহাস পড়ছেন বলে মনে হচ্ছে। ঘটনা কিন্তু সেদিকেই যাচ্ছে।

আপনার আমার নির্লিপ্ততা একদল উচ্চাভিলাষি নরখাদকের জন্ম দিচ্ছে এই জনপদে যারা শুধুমাত্র নিজেদের প্রাণী মনে করে অন্যদের মনে করে পশু। যদিও ঘটনাটি উল্টো। কিন্তু তাদেরকে সেই বিষয়টা বোঝাতে হবে। সেই সূর্যের আলো হাতে কোন মানুষটি এগিয়ে আসবেন। সেটি কি আপনি? আমি? না কি অন্য কেউ?

প্রাণতুন।। গুলশান-১।। ঢাকা।।

১৪ জুলাই ২০১৫।।

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

Connecting to %s