বাংলাদেশের উন্নয়ন-২ : ২০৪০ সালে টপ ও মিড পজিশনগুলো ৫ লাখ বিদেশীর দখলে যাবে


36_258698_unbekannt_galley-slaves-of-the-barbary-corsairs

সূত্র : ইন্টারনেট

ঢাকার প্রগতি সরণীতে একটি ফার্নিচারের দোকান আছে যার ম্যানেজার একজন ভারতীয়। একজন বাংলাদেশী না হয়ে কেন একজন ভারতীয় ফার্নিচারের দোকানের ম্যানেজার? জানতে পারিনি। তবে আজ থেকে ১০ বছর আগে বনানীতে অবস্থিত একটি এড এজেন্সিতে একজন ভারতীয় আর্টিস্ট কেন নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল সেই গল্পটা জানি। ওই এড এজেন্সির মালিকদের একজন আমাকে বলেছিলেন কী দুঃখবোধ নিয়েই না তিনি কোলকাতা গিয়ে ইন্টারভিউ নিয়ে তবেই একজন ভারতীয় আর্টিস্টকে বাংলাদেশে নিয়ে এসেছিলেন। ওই ভারতীয় আর্টিস্ট প্রতিষ্ঠানটির বনানী অফিসের একটি রুমে থাকত। তাকে মাসে বেতন দেওয়া হতো বাংলাদেশী টাকায় ২৫ হাজার টাকা। শিল্পাচার্য জয়নাল আবেদীনের চারুকলা ইন্সটিটিউট থেকে পাস করা কেউ কেউ ছিল যারা ওই পদে কাজ করার যোগ্যতা রাখে। কিন্তু তারা কেউ ২৫ হাজার টাকায় কাজ করতে রাজী ছিল না। আর যারা কাজ করতে রাজী হচ্ছিল তারা কাজ করার যোগ্যতা রাখে না।

বাংলাদেশে যেমন প্রচুর বেকার রয়েছে তেমনি কাজ করার যোগ্যতাসম্পন্ন লোকের অভাব যে কতোটা প্রকট সেটা নিয়োগকর্তারা খুব ভালো জানেন। আর যে বাংলাদেশীরা সত্যিই কাজ জানে তাদের রেটটা খুব চড়া। এই সুযোগে গত দুই দশকে নীরবে বাংলাদেশের গার্মেন্টস, এনজিও, ইংরেজি মাধ্যম স্কুল, আইটি প্রতিষ্ঠানসহ কিছু জায়গায় ভারতীয় ও সাদা চামড়ার ইউরোপীয়রা ঢুকে পড়েছে। তাদের সঙ্গে আছে বাদামী চামড়ার শ্রীলংকান আর চাইনিজরা। এই ঢুকে পড়াটা নিয়ে উদ্বেগ হওয়ার যথেষ্ট কারণ থাকলেও আমরা তেমনভাবে চিন্তিত হইনি কারণ অন্তত টপ ও মিড পজিশনগুলোতে বাংলাদেশীদের আধিপত্য ছিল। পরিস্থিতি বলছে আগামীতে টপ ও মিড পজিশনগুলো বিদেশীদের দখলে চলে যাবে। বাংলাদেশে ফিরে আসবে বৃটিশ শাসনকালের পরিস্থিতি।

অন্তত দু’টি কারণে উদ্বিগ্ন হওয়ার মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। প্রথমত, বাংলাদেশের মেধাবী ব্যবস্থাপকরা দলে দলে ডুয়েল সিটিজেনশিপ নিতে শুরু করেছেন। ইতোমধ্যে বাংলাদেশের ওষুধ শিল্প, আইটি, টেলিকম, ব্যাংক ও ফিনানসিয়াল সেক্টর, এনজিও এবং চা শিল্পের টপ ও মিড লেভেলের কয়েক হাজার প্রফেশনাল আমেরিকা, কানাডা, ইউরোপ ও অস্টেলিয়া কিংবা নিউজিল্যান্ডে চলে গিয়েছেন। চলে যাওয়ার পাইপ লাইনে আছেন কয়েক লাখ। এরা মোটামুটিভাবে ২০২০ সালের মধ্যে চলে যাবেন। মুশকিল হলো এদেরকে রিপ্লেস করার মতো পর্যাপ্ত বাংলাদেশী দেশে থাকছে না। ফলে, কোম্পানিগুলো পার্শ্ববতী‍র্ দেশ ভারত থেকে পেশাজীবিদের নিয়ে আসছে। আগামীতে যে সংখ্যা আরো বাড়তে বাধ্য।

একজন বাংলাদেশী শ্রমিক যেমন প্রথম সুযোগে দুবাই কিংবা কাতারে আরেকজন স্বদেশীকে নিয়ে যায় ঠিক তেমনি একজন ভারতীয় বাংলাদেশে আরেকজন ভারতীয়কে নিয়ে আসবে সেটাই স্বাভাবিক। দ্বিতীয়ত, লক্ষ্য করা যাচ্ছে অনেক কোম্পানির এইচআর ডিপার্টমেন্টে ভারতীয়রা নিয়োগ পাচ্ছে। সেই সব কোম্পানিতে সঙ্গত কারণেই ভারতীয়দের নিয়োগ পাওয়ার সম্ভাবনা বাড়ছে। ভারতীয়রা সারা পৃথিবীতেই আধিপত্য বিস্তার করছে ম্যানপাওয়ার সরবরাহের ক্ষেত্রে। সেই ধারা থেকে বাংলাদেশ বাদ পড়ার কোন সম্ভাবনা নেই। লক্ষ্য করলে দেখবেন যে, বাংলাদেশে যতোগুলো মালটি ন্যাশনাল কোম্পানি আছে সেগুলোর বাংলাদেশী হেড হলো একজন ভারতীয়। এই ট্রেন্ড সাম্প্রতিককালের। যা আগামীতে আরো জোরদার হবে। বাংলাদেশের গার্মেন্ট ফ্যাক্টরিগুলোর মালিকানা এনআরবি আর এনআরআই-দের হাতে হস্তান্তরের সাথে সাথে পোশাক খাতে বিদেশী অর্ডার যেমন বেড়েছে তেমনি শ্রমিক ছাড়া বাকি পোস্টগুলোতে ভারতীয়দের নিয়োগও বেড়েছে। একথা বিশ্বাস করতেই হবে যে, বাংলাদেশীদের সামনে সুদিন আসছে বিশেষ করে শ্রমিকদের জন্য। বাংলাদেশীরা আগামী ২০৪০ সালের মধ্যে আরো বেশি দক্ষ শ্রমিক হবে। ম্যানুয়াল কাজ করার মতো শ্রমিকদের পর্যাপ্ত সরবরাহ নিশ্চিত করার মতো শিক্ষা দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছে বাংলাদেশে। আপনি র‍্যান্ডমলি বাংলাদেশের ৫০০ প্রাইমারি স্কুলে ১০ হাজার শিক্ষাথী‍র্র উপর গবেষণা করে দেখতে পারেন বাংলা, ইংরেজি ও অঙ্কে তাদের যে জ্ঞান সেটা নিশ্চিতভাবে তাদেরকে পরিণত বয়সে শ্রমিক হিসেবে কাজ করতে বাধ্য করবে। খেয়ে পড়ে বাঁচতে হবে তো? তারা মেনে নিতে বাধ্য হবে তাদের এই ভাগ্যকে। নিয়তির কথা বলে তারা পার করে দেবে তাদের জীবন আর ভাববে একদিন তাদের সন্তানেরা বড় কিছু হবে। হয়তো ২০০ বছর পরে তাদের বংশধররা আবার ফিরে পাবে মিড ও টপ পজিশনগুলো। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি যেভাবে বাংলা বিহার উড়িষ্যায় ঢুকে পড়েছিল সেই একই কায়দায় বাংলাদেশ বিদেশী পেশাজীবিদের দখলে চলে যাবে ২০৪০ সালে। হিস্টিরি রিপিটস বলে একটা কথা আছে। তবে সেটা যে স্বাধীনতার ৭০ বছরের মধ্যে ২০ কোটি মানুষের জীবনে ঘটবে সেটা কী কেউ ভাবতে পেরেছিল?

আমাকে কেউ কেউ জিজ্ঞাসা করেন আচ্ছা ঢাকায় যে এতোগুলো নতুন ফাইভ স্টার হোটেল হচ্ছে সেগুলোতে কে থাকবে? কারো কারো ধারণা বাংলাদেশ থাইল্যান্ডের মতো চামড়া বিক্রি করার মাধ্যমে উন্নতির শিখরে উঠার রাস্তা খুঁজবে এই ধরনের ফাইভ স্টার হোটেলগুলোর মাধ্যমে। আমি তাদের সঙ্গে একমত নই। বাংলাদেশ তথাকথিত চামড়া বিক্রির পর্যটন দেশে পরিণত হবে না। আমি মনে করি এই হোটেলগুলোতে একদার আলজেরিয়া, ইরানের মতো সাদা চামড়ার ইউরোপীয় ও বাদামী চামড়ার ভারতীয়রা থাকবে বছর জুড়ে। একজন বিদেশী বছরে ২৩ হাজার পাউন্ডে কিংবা ৩০ হাজার ইউরো কিংবা ১২ লাখ রুপিতে বাংলাদেশে কাজ পেলে কেন নিজ দেশে কষ্ট করবে। (এখানে আমি একজন ব্রিটিশ কিংবা ইউরোপীয়র শুরুর বেতন বললাম মাত্র আর ভারতীয়দের মিড লেভেলের বেতনের কথা বললাম। বাংলাদেশে যারা কাজ করছে তাদের বেতন আরো অনেক বেশি। সেসঙ্গে গাড়ি, ফার্নিশড বাড়ি, ছেলেমেয়েদের পড়ার খরচ, ক্লাবের ফি ইত্যাদি তো আছেই। ) এখানে ওই টাকায় এ+ পাওয়া পিএসসি ও জেএসসি সার্টিফিকেটধারী ক্লিনার কিংবা শোফার পাওয়া যাবে, যা নিজ দেশে পাওয়া যাবে না।

কোনো সন্দেহ নেই ২০৪০ সালে কোটি কোটি বাংলাদেশীদের জীবনে যখন কষ্ট আর দুঃখের বড় বোঝা চেপে বসবে তখন একদল বাংলাদেশী আমেরিকা ও ইউরোপে দাপটের সঙ্গে কাজ করবে। ওখানকার নামী দামী বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করবে। নাসাসহ বড় বড় গবেষণা প্রতিষ্ঠানে কাজ করবে। আর সেইসব প্রচার করবে বাংলাদেশী করপোরেট মিডিয়া এবং সেই প্রচার সুবিধা নিয়ে দুষ্ট রাজনীতিকরা একটি আধুনিক দাস সমাজ ব্যবস্থা টিকিয়ে রাখার প্রয়োজনীয় মসলা পাবে।

যে ভবিষ্যত আমি অনুমান করছি সেটা যদি সত্যি হয় তার দায়ভার আমার প্রজন্মের একজনও এড়াতে পারবেন না। আমাদেরকে এখনই সতর্ক হতে হবে যাতে করে আমরা আমাদের দেশের টপ ও মিড পজিশনগুলো নিজেদের কাছে রাখার পাশাপাশি এমন একটি শিক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তুলতে পারি যাতে করে ২০৪০ সাল নাগাদ আমরা পরিকল্পনার মধ্য দিয়ে বিদেশে অন্তত ১ কোটি দক্ষ মানবসম্পদ রপ্তানি করতে পারি যারা আমাদের দেশে প্রতিমাসে গড়ে ১০০০ ডলার করে বছরে কমপক্ষে ১২ হাজার ডলার পাঠাবে। এভাবে আমরা শুধুমাত্র একটি সুষ্ঠু শিক্ষা পরিকল্পনার মাধ্যমে বছরে প্রায় ১০ লাখ কোটি টাকা বৈদেশিক মুদ্রা আয় করতে পারি। যা একটি টেকসই বাংলাদেশ তৈরিতে ভূমিকা রাখবে। যে দাস বানানোর শিক্ষা ব্যবস্থা সাম্প্রতিককালে তৈরি করা হয়েছে সেটা বন্ধ করাই এখন সবচেয়ে বড় কাজ। তার পরবর্তে বিশ্বের চাহিদা অনুযায়ী একটি মানব সম্পদ গড়ার শিক্ষা ব্যবস্থা চালু করা দরকার।

পল্লবী।। ঢাকা।।

২৮ জুলাই ২০১৫।।

Advertisements

15 thoughts on “বাংলাদেশের উন্নয়ন-২ : ২০৪০ সালে টপ ও মিড পজিশনগুলো ৫ লাখ বিদেশীর দখলে যাবে

    • চিন্তাশীল লেখনি কিন্তু দেশের ভিতরে অনেকেই আছে যারা দেশে থেকে কিছু করতে চাই এবং সেটা একেবারে গ্রাম থেকে। এখানে যারা বিদেশী আছে তার কিন্তু শহরে থেকে কাজ করছে গ্রাম পর্যায়ে যেয়ে কেউ কাজ করছে না। কিন্তু আমরা যারা আছি আমাদের ইচ্ছা আমরা আমাদের গ্রামে কে শহরে পরিণত করব।
      আমাদের গ্রামের রাস্তা গ্রাম থেকে শহরে আসবে না। শহরের রাস্তা আমাদের গ্রামে যাবে।

    • সুমন ভাই ঠিক বলেছেন…। আমিও কোন হোপ দেখিনা……। বিভিন্ন প্রকরিয়ায় ভারতীয় প্রেসক্রিপশন বাস্তবায়ন এর কাজই চলছে……।

  1. its absolutely my personal comment. we as a national character severely lack the true spirit of professionalism. corporate world is inflating in Bangladesh, and business means profit,may it be through carrot or by stick. Nevertheless, the other side of the coin says, the a few professionals that we have, were never been evaluated the way a white or sister skin been. its a vicious cycle. slavery is in our character, may we be at the top, or bottom of an ivory tower. please disregard, if disagree.

  2. যুগের সাথে সাথে মির-জাফরের রুপ এবং টেকনিক চেঞ্জ হচ্ছে তো….!! যাইহোক সেই ব্যাপারে কথা বলা ঠিক না ।
    আমাদের জেনারেশনের কাছে এই সমস্যা সমূহ অনেকটাই প্রাকৃতিক, যাকে বলে “কঠিন বাস্তবতা” – সুতরাং আমাদের ধারনা – মেনে নিতে আমরা বাধ্য । বাধ্য বৈকি – “পাবলিক পরিক্ষা”র ফল বাম্পার হবে, কি হবেনা সেটা যখন নিয়ন্ত্রনের উপর নির্ভর করে , বাধ্য না হয়ে কি উপায় ?

  3. ১৯৮৮ সালে প্রতিষ্টিত একটি প্রতিষ্টান যেখানে আজ ও পর্যন্ত বেতন হয় নি এবং সেই প্রতিষ্টানে পড়ে আসা একজন ছাত্র আমি। সময়ের কালক্রমে আমি আজ সামান্য কিছু আয় করলেও আমার প্রতিষ্টানের শিক্ষকরা আয় করতে পারে না। আজ ও তারা গাধার মতন পরিশ্রম করে যাচ্ছে। এবং ভাবে কবে মাদ্রাসাটা সরকারি আওতাভুক্ত হবে এবং আমাদের বকেয়া বেতন না হউক বর্তমান বেতন হলেই চলবে কিন্তু প্রতিষ্টান টা আজ প্রায় মৃত আর তার ই হাল ধরার জন্য চেষ্টা করছি। ইচ্ছা আছে এই প্রতিষ্টানটা একটা স্বাত্তীয়শাসিত প্রতিষ্টান করে তুল এবং সেই লক্ষে কাজ করে চলি একা একা। কার ও সাহায্য আশা করলে ও পাই না। তার উপর আজ এই আর্টিকেল টা ছিল ফেসবুকে টক অফ দ্যা ডে।

    স্বপ্ন দেখি প্রতিষ্টান টা তে বিদেশী ছাত্র ও আসবে পড়তে এবং সেটা হবে আমার গ্রামে। কারণ আমি সেই যে পরিবর্তণ চাই। রাস্তা আমার দিকে আসবে আমি রাস্তার দিকে যাব না। খুব বেশী হলে ভাঙ্গা প্রতিষ্টান কে জোড়া লাগাতে ২০৫০ সাল পর্যন্ত লাগবে তাতে কি যাই আসে। মাত্র ২৪ বছর বয়স পার করছি। ইনশাল্লা্হ সৃষ্টিকর্তা আমাকে সেই দিন পর্যন্ত বাঁচিয়ে রাখবেন।

  4. Dual citizenship due to lack/uncertainty of growth in carrier. Plus corporate culture of firing people creating uncertain future. It can only be reduced by creating more mid level jobs and better environment for entrepreneurs. Plus govt. should impose quota for Bangladeshi national in mid/top management.

  5. “যে দাস বানানোর শিক্ষা ব্যবস্থা সাম্প্রতিককালে তৈরি করা হয়েছে সেটা বন্ধ করাই এখন সবচেয়ে বড় কাজ। তার পরবর্তে বিশ্বের চাহিদা অনুযায়ী একটি মানব সম্পদ গড়ার শিক্ষা ব্যবস্থা চালু করা দরকার” The difference between the ‘das’ and ‘human resource’ shoulh be cleared. Since, the so called human modern human resource are the slave/das of the modern market. The are creating demand and ensuring the supply mechanism. They are callous about the social responsibility and the patriotism.

  6. খুবই বাস্তব সম্মত কথা। কোন জাতিকে ধ্বংস করতে চাইলে তার শিক্ষা ব্যবস্থা ধ্বংস কর… এই নীতিতে দেশ এগোচ্ছে… দেশপ্রেমিক শিক্ষিত নাগরিকরা এগিয়ে না আসলে পরিস্থিতি যে আসলেই ভয়ানকরূপ ধারণ করবে.. তা বলার অপেক্ষা রাখে না।

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s