“কোন একটি সভ্য দেশে গিয়ে মরতে চাই”


parliament44-620x330এক.

আমার এক ফেসবুক বন্ধুর সঙ্গে ফেসবুকে কথা হচ্ছিল গতকাল। বয়স কতো হবে? ত্রিশ কিংবা বত্রিশ। জিজ্ঞাসা করেছিলাম- তুমি কেমন আছো?

লিখল- অস্বস্তিতে আছি। কোন একটি সভ্য দেশে গিয়ে মরতে চাই।

লিখলাম- দেশটাকে সভ্য বানালেই তো হয়।

উত্তরে লিখল- একটা প্রজন্মকে পুরো জীবন দিয়ে খাটতে হবে।

আমি লিখলাম- একটা প্রজন্মই তো। ক্ষতি কি?

উত্তরে লিখল- রিস্ক থাকে। বিফল হলে উদ্যোগ জীবন দুই-ই যাবে।

এরপর আমি ব্যস্ত হয়ে গেলাম। কথা আর আগায়নি। কিন্তু কথাটা মনের মধ্যে খচখচ করতে লাগল।

আমি যে বাংলাদেশে জন্মগ্রহণ করেছি তারচেয়ে একটি ভালো বাংলাদেশ আমি আমার সন্তানদের জন্য রেখে যেতে চাই। আমার ফেসবুক বন্ধুর বক্তব্য আমার চাওয়া পূরণের পথে একটা চ্যালেঞ্জ। সেকারণেই তার কথাটা আমার মনের মধ্যে খচ খচ করতে লাগল। স্বপ্নের কাছে কে হারতে চায় বলুন!

আমার মেয়ে বলেছিল এই দেশটাকে ধ্বংস করে নতুন করে শুরু করা না গেলে বাবা তোমার স্বপ্ন পূরণ হবে না। আমার অতোটুকু মেয়ের কথায় আমি চমকে গিয়েছিলাম। কারণ তখন সে সম্ভবত ক্লাস এইটে কিংবা নাইনে পড়ে।

আমি বলি সবাই মিলে লোভ আর মিথ্যা এই দুটোকে হারিয়ে দিতে পারলেই আমি জিতে যাব। আমার কাছে কাজটা কঠিন নয়। একটা সুযোগ আর একটা টিম পেলে দশ বছরেই আমি দেশটাকে স্বপ্নের দেশে পরিণত করে ফেলব। আমার স্বপ্ন পূরণ যে কতোটা কঠিন হবে সেটা বোঝাতেই যেন আমার বন্ধুদের যতো ব্যস্ততা! তারা সমাজের অসঙ্গতিগুলো তুলে ধরে। কেউ কেউ আমাকে পরীক্ষা নেয়। ঘটনা বলে, ধাঁধাঁ জিজ্ঞাসা করে এই পরিস্থিতিতে তুই কি করবি? আমি তাদের সেই পরীক্ষা দেই। নিজের চিন্তাগুলোকে শানিত করি। তাদের সাহায্য কামনা করি।

আমার তরুণ ফেসবুক বন্ধুর সভ্য দেশে গিয়ে মরার কথাটা ভুলতে পারি না। আসলেই কতোটা অসভ্য আমরা সেটা বোঝার চেষ্টা করি। সকাল সকাল কয়েকটা ঘটনা মনে পড়ে গেলো।

দুই.

আমার এক টেলিভিশন জার্নালিজম কোর্সমেট একটা ফেসবুক পোস্ট দিয়েছে। সকালে পোস্টটা পড়ে মনটা খারাপ হয়ে গেলো। পোসে্টর বক্তব্য হলো নষ্ট লিফটের দরজা খুলে এক শিশু পড়ে গিয়ে মারা গিয়েছে। জুমার নামাজের পর ঘটনাটি শেয়ার করলাম একজন কলেজ বন্ধুর সঙ্গে সে বলল, ঘটনাটি সে জানে এবং সে এটাও জানে যে এই ঘটনার বিচার হবে না। কারণ এই দেশে ক্ষমতাশালী, প্রভাবশালী ও অর্থশালী লোকদের বিচার হয় না। এতো অসভ্যতাই।

তিন.

সেদিন আমার এক কলেজবন্ধু আমাকে একটা ধঁাধাঁ দিল। বলল এই পরিস্থিতিতে তুই কি করবি? ধাঁধাঁটা হলো- একজন পুলিশ কমিশনার তার অধীনস্থ কয়েকজন ডেপুটি কমিশনারকে পৃথকভাবে ডেকে প্রতিমাসে একটা নির্দিষ্ট অঙ্কের অর্থ দাবী করলেন। কেউ কেউ সেই দাবী পুরণ করার জন্য তার অধীনস্থ থানাগুলোর ওসিদের ডেকে একটা নির্দিষ্ট অঙ্কের অর্থ দাবী করলেন। তবে সেই অর্থের পরিমাণ কমিশনারের দাবীকৃত অর্থের চেয়ে বেশি। ওসি সাহেবরা স্ব স্ব থানায় গিয়ে ডিসি সাহেবদের দাবীকৃত টাকা সংগ্রহের নামে কয়েকগুণ বেশি টাকা তুলতে শুরু করলেন। কোন কোন ওসি সংগ্রহকৃত অর্থ থেকে একটা অঙ্ক সরাসরি এলাকার এমপি এবং পুলিশ কমিশনারকে সরাসরি পৌঁছাতে লাগলেন। পুলিশ কমিশনার দেখলেন তার ডেপুটি যে টাকা দেয় তারচেয়ে ওসি সাহেব বেশি দেয়। ফলে ডেপুটির গুরুত্ব কমে গেলো, ওই ওসি সাহেবের গুরুত্ব বেড়ে গেলো। আগে যে ওসি সাহেব ডেপুটি কমিশনারকে দেখলে ভয়ে তটস্থ থাকত, সে এখন আর তাকে ভয় পায় না। এমপি সাহেবের কাছেও ওসি সাহেবের গুরুত্ব বেড়ে গেছে। ওসি সাহেবের ক্ষমতায়ন হয়েছে নিয়মতান্ত্রিকভাবে নয়; উপরওয়ালাদের সুনজরে থাকার কারণে।

বন্ধু আমার এইটুকু বলে থামল। বলল, কি ধাধাটা আরো জটিল করব নাকি এখানে থামব?

আমি বললাম, যথেষ্ট জটিল ধাঁধাঁ দিয়েছিস। আরো জটিল করতে চাইলে কর। যতো কঠিন হবে সেটা খোলা ততো সহজ। কথাটা বলে বন্ধুর দিকে তাকিয়ে রহস্যময় হাসি দিলাম। বন্ধু আমার মুচকি হাসি দিয়ে বলল- থাক এটাই সমাধান কর। ধর তুই আইজিপি। কি করবি?

আমি বললাম- এটা আইজিপি-কে দিয়ে সমাধান হবে না। এজন্য প্রধানমন্ত্রী হওয়া লাগবে। বন্ধু আমার অফিসে এসেছিল। মাগরিবের আজান হওয়ায় আমি তাকে বললাম- এখানে ২৩টা পরীক্ষার খাতা আছে। ক্লাস টু এর শিশুদের। এগুলো দেখতে থাক। আমি নামাজটা পড়ে নেই।

চার.

নামাজ পড়ে ফিরে ফেরার পর বন্ধু বলল-এতো দেখি কয়েকজন নিজের নামটাও শুদ্ধ বানানে লিখতে পারেনি।

ঠিকই দেখেছিস।

তো?

এটাই দোস্ত এখনকার শিক্ষার অবস্থা। আমি যখন সরকারি বেসরকারি স্কুলে যাই। শিশুদের সাথে কথা বলি। আমি অস্থির হয়ে পড়ি। আমার এই সন্তানদের জন্য আমি আমার পাওয়া বাংলাদেশের চেয়ে একটা ভালো বাংলাদেশ রেখে যেতে চাই। কিন্তু তারা সেই বাংলাদেশকে টেকাতে পারবে তো?

তুই এই অবস্থাকে কিভাবে বদলাবি? আমার বন্ধুর প্রশ্ন।

ড্রাইভিং সিটে বসতে হবে। ওটাই একমাত্র সমাধান। দেশের সকল সমস্যার সমাধান ৩০০ মানুষের হাতে। ওই ৩০০ মানুষকে ‘মানুষ’ হতে হবে। লোভহীন মানুষ। মিথ্যাহীন মানুষ।

পাঁচ.

আমি জানি এই দেশ যখন লোভ ও মিথ্যামুক্ত হবে এবং লোভী ও মিথ্যাবাদীর বিচার হবে তখন আমার কোন তরুণ বন্ধু বলবে না- অস্বস্তিতে আছি। কোন একটি সভ্য দেশে গিয়ে মরতে চাই।
পল্লবী, ঢাকা

২ অক্টোবর ২০১৫

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

Connecting to %s