মিডিয়া জনগণের হতে পারছে না পায়জামার ফিতা ও প্যান্টের জিপারের কারণে


indexএক.
শুনেছি মিডিয়ার এক বরপুত্রের মানিব্যাগে কনডম থাকে জরুরি পরিস্থিতি মোকাবেলা করার জন্য। কারণ তিনি নিজেও জানেন না কখন কে তার কাছে ধরা দেবে। সেকারণে সবসময় এলার্ট থাকেন। মিডিয়ার এই বরপুত্রের কথা আমি শুনেছি। নিজের চোখে তার কান্ডকীর্তি দেখিনি। মিডিয়া পাড়ায় যাতায়াতের কারণে এমন আরো অনেক কথাই শুনি। যেমন, বাংলাদেশ টেলিভিশনে একসময় এক রুমে একজন প্রযোজক বসতেন কিন্তু কোন কোন প্রযোজকের বেপরোয়া নারী প্রীতি বাংলাদেশ টেলিভিশন কতৃ‍র্পক্ষকে বাধ্য করেছিল এক রুমে দুইজন করে প্রযোজক বসাতে। নারীরাও অনেক সময় বেপরোয়া হন। আশির দশকে মগবাজার ও জিগাতলায় কোন কোন নারীর বেপরোয়া ভালোবাসায় সেসময়কার তরুণ সাংবাদিকদের কেউ কেউ ভেসে গিয়েছিল অন্ধকার গলিতে। তবে সবটাই অন্যের কাছ থেকে শোনা তা নয়।

দুই.

লাভ রোডের কোন এক পত্রিকা অফিসে কথা হচ্ছিল এক জাদরেল সাংবাদিকের সঙ্গে। তিনি বলছিলেন, “পরকীয়া হলো বাসার বারান্দার মতো। ঘরের মধ্যে বাতাস কমে এলে বারান্দায় গিয়ে ফ্রেশ বাতাস নিলে যেমন প্রাণ চাঞ্চল্য ফিরে আসে। পরকীয়াও তেমনি সংসারে প্রাণ চাঞ্চল্য ফিরিয়ে আনে।”

কথাগুলো বলে এক ধরনের বিটকেলে হাসি দিলেন সাংবাদিক মহোদয়। এমন সময় তার এক সহকমী‍র্ ঢুকল রুমে। তাকে এটা ওটা দেখিয়ে দিয়ে বললেন, “তুমি আজকে রাতে আমার সঙ্গে ডিনার খেতে যেতে পারবে?”  আমি মেয়েটির দিকে তাকালাম। কতো হবে বয়স? ২৫/২৬? মেয়েটি কিছুই বলছে না। যাচ্ছেও না। তখন সেই ঊর্ধ্বতন সাংবাদিক তার সহকর্মীকে বললেন, “যাও কাজটা আগে শেষ করো। তারপর দেখা যাবে।”

মেয়েটি চলে গেলো। সাংবাদিককে তখন কথায় পেয়ে বসেছে- “পরকীয়ার সবচেয়ে ইন্টারেস্টিং পার্ট হলো পায়জামার ফিতা খোলা। বিয়ে করা বউ নিয়ে হাপিয়ে উঠেছো নো চিন্তা বারান্দায় যাও পায়জামার ফিতা খোলো। দামী বিদেশী মদ খাও। সবশেষে বাসায় ফিরে বউয়ের গাল টিপে আদর করে ঘুমিয়ে পড়ো। সকালে ফ্রেশ হয়ে লিখতে বসো। দেখবে সেরা লেখাটি ওইদিনই লিখতে পারছো!”

কুতকুতে চোখে সামনে বসা আমাদের দু’জনকে একনজর দেখে নিয়ে নিজেই অট্টহাসি দিলেন। ভাবখানা এমন যে, জীবনের সবচেয়ে মজার ফানটা করলেন। আমার মনে হয়েছিল আমি জগতের সবচেয়ে কুত্‌সিত একটা লোককে দেখছি।

তিন.

কয়েকদিন আগে পাহাড়ে গিয়েছিলাম। খাগড়াছড়ি। সেখান থেকে রাঙ্গামাটি। কথা হয়েছিল কয়েকজনের সঙ্গে। অন্যান্য প্রসঙ্গের সঙ্গে মিডিয়াতে পাবর্ত্য চট্টগ্রাম নিয়ে প্রচারিত বিভিন্ন ইসু্যগুলোও আলোচনায় এসেছিল। আলোচনার এক পর্যায়ে পাহাড বিশেষজ্ঞ দুই মিডিয়া ব্যক্তিত্ব সম্পর্কে একজন মন্তব্য করলেন- মাগিবাজি ছাড়া এদের তো বুদ্ধি খোলে না। দো চোয়ানি (লোকাল মদ) খেয়ে (কুত্‌সিত ইঙ্গিত করে) ওই সব না করলে তো মাথা ঠিক থাকে না।

কাকতালীয়ভাবে এদের দুইজনই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক। একজন প্রবীণ আর অন্যজন নবীন। আমার অবাক হওয়া চোখের দিকে তাকিয়ে একজন কি বুঝলেন জানি না। তিনি আমাকে বললেন- এতো অবাক হবেন না। তবে সবাই মাগিবাজি করে না কিংবা মদও খায় না। বুঝলাম না, তিনি কি আমাকে সাত্বনা দিলেন? আমি ভাবছি মিডিয়া কী তাদের এই কীর্তি কাহিনী জানে? এই বুদ্ধিজীবিরা মিডিয়া ব্যবহার করে যা প্রচার করে সেটা কতোটা নৈর্ব্যক্তিক ও বস্তুনিষ্ঠ আর কতোটা নারীর শরীর আর মদের প্রভাব?

চার.

একবার শুনলাম, এক প্রবীণ বুদ্ধিজীবির সাক্ষাত্‌কার নেওয়ার পর অনুষ্ঠানের উপস্থাপিকাকে আর পাওয়া যাচ্ছিল না। ওদিকে অনুষ্ঠানের পরিচালক ওই উপস্থাপিকাকে নিয়ে দুপুরের খাবার খেতে যাবে ভেবে রেখেছিল। গেলো কই? তাদেরকে পাওয়া গেলো ঢাকার শ্যামলিতে চাইনিজ খাচ্ছে।

আমাকে এই ঘটনাটি বলেছেন এক তরুণ সাংবাদিক। আমি বিষ্মিত হয়ে বললাম, তুমি ঠিক বলছো? সে ততোধিক বিষ্মিত হয়ে বলল, আপনি আমাকে বিশ্বাস করছেন না নবী ভাই?

আমি বলেছিলাম, এটা কি বিশ্বাসযোগ্য? ৮০ বছরের বুড়োর সঙ্গে এভাবে তরুণী কেন যাবে? এরচেয়ে তো পরিচালকই ভালো ছিল।

সাংবাদিকের উত্তর ছিল- এরশাদের সঙ্গে কেন যায়? ওই প্রবীণ বুদ্ধিজীবির ক্ষমতা আপনি জানেন? কতো চ্যানেলে ওই মেয়েকে এরপর দেখা গেছে সেটা জানেন?

পাঁচ.

বন্ধুদের সঙ্গে যখন আড্ডা হয় বিষয়ের কোন লাগাম থাকে না। তো সেদিন এক বন্ধু বলছিল- কে কতো বড় সাংবাদিক সেটা আজকাল মাপা হয় কে কতো মেয়েকে দিয়ে প্যান্টের জিপার খোলাতে পারে। একজন কোনমতেই এটা মানতে রাজী না। তখন বন্ধুর সোজা কথা- বিশ্বাস না করলে তুই গিয়ে দেখ। খবর পড়ার মতো গ্ল্যামারহীন কাজের সুযোগ পেতে ঊর্ধ্বতনের প্যান্টের জিপার খুলতে হয়।

অন্যরা তাকে সমর্থন জানানোয় যিনি মানতে রাজী হচ্ছিলেন না তিনি মেনে নিলেন। আর বললেন, আমি পরীক্ষা করে দেখব।

ছয়.
মিডিয়াতে যারা কাজ করেন তারা তো রক্ত মাংসের মানুষ। নারী প্রীতি, নারীদের সঙ্গে তাদের দৈহিক সম্পর্ক ও পরকীয়া সবই থাকতে পারে। কিন্তু সেই সম্পর্ক যখন তাদের সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়াকে প্রভাবিত করে তখন কী সেটাকে মানা যায় না কি মানা উচিত্‌? কেউ কেউ মনে করেন মিডিয়াতে মানহীন সাংবাদিকদের ভীড়ের প্রধান কারণ দুটো – অর্থ এবং নারী। অপ্রধান কারণ একটি – মদ। অযোগ্যদের অর্থ, নারী ও মদের দাপটে যোগ্য অনেকে মিডিয়া নিয়ন্ত্রনকারীদের কাছে পাত্তা পায় না।

সাত.

বাংলাদেশের উন্নয়নে মিডিয়ার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। এই দেশের মানুষের উপর এককভাবে মিডিয়ার প্রভাব অন্য যেকোন কিছুর চেয়ে বেশি। এতো শক্তিশালী যে মিডিয়া সেই মিডিয়াতে যদি ক্রমশ পায়জামার ফিতা খোলার, পকেটে কনডম রাখা এবং প্যান্টের জিপার খুলতে আগ্রহীদের সংখ্যা বেড়ে যায় দেশটা তো রসাতলে চলে যেতে পারে। কারণ এই ধরনের লোকেরা তাদের দায়িত্বের প্রতি আন্তরিক নয়। তারা মিডিয়ার যে মূল ভূমিকা রাষ্ট্রের চতুর্থ স্তম্ভ হিসেবে ওয়াচডগের সেটা পালনে দক্ষতার পরিচয় দিতে পারেন না নিজেদের চারিত্রিক দুর্বলতার কারণে। তারা তাদের প্রতি অপি‍র্ত দায়িত্ব ও কর্তব্যকে মদের বোতলে, টাকার কাছে কিংবা নারী শরীরে বিলিয়ে দেন কখনো নিজের সুখের জন্য কখনো অন্যের অঙ্গুলি হেলেনে। এভাবেই তারা তাদের উপর জনগণের যে আস্থা ও বিশ্বাস তা ভাঙ্গেন এবং ভাঙ্গতেই থাকেন। এক চক্করে পড়েছে যে মিডিয়া সেই চক্কর থেকে তাকে বের করে আনাটা এখন বড় একটা চ্যালেঞ্জ। এই চ্যালেঞ্জে জয়ী হওয়া ছাড়া রাষ্ট্র কোমর সোজা করে দাড়াতে পারবে না।

আট.

মিডিয়ার বেশিরভাগ মানুষই ভালো। মিডিয়াতে এমন লোকও আছে যাদেরকে কেনা যায় না। তারা সবসময় বস্তুনিষ্ঠ ও সত্‌ সাংবাদিকতা দিয়ে জনগণের সেবা করতে তত্‌পর থাকেন। কিন্তু প্রায় সময়ই তারা পেরে উঠেন না। গুটিকয়েক রাজনীতিকের জন্য যেমন পুরো রাজনীতিই তার ক্রেডিবিলিটি হারাচ্ছে ঠিক একই অবস্থা মিডিয়াতে। গুটিকয়েকের দাপটে আর ভুল পদক্ষেপে সত্‌, নিষ্ঠাবান ও নীতিপরায়নরা কোনঠাসা হয়ে পড়ছেন সংখ্যায় বেশি হওয়ার পরও। আমি এই লেখার মধ্য দিয়ে তাদের কঠোর পরিশ্রমকে শ্রদ্ধা জানাই। শত প্রতিকূলতার মধ্যেও নিজ পেশার প্রতি তাদের যে দায়িত্বশীলতা ও আন্তরিকতা সেজন্য তাদেরকে স্যালুট করি। তাদের এই পরিশ্রম ও লড়াই একদিন অবশ্যই স্বীকৃতি পাবে। তারাই মিডিয়াতে আলোর মশাল জ্বালিয়ে রেখেছেন। আমরা আশা করব তারা মিডিয়া ছেড়ে চলে যাবেন না। বরং মিডিয়াকে তার স্বস্থানে থাকতে সহায়তা করার মাধ্যমে জনগণের মুখপাত্র হিসেবে মিডিয়ার যে অবস্থান সেটা সমুন্নত রাখবেন। তাদের প্রতি শ্রদ্ধা ও সংহতি জানাই।

পল্লবী। ঢাকা।
৩ অক্টোবর ২০১৫

Advertisements

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s