জন্মদিনের উপহার: বাংলাদেশে কমনসেন্সের ঘাটতি রয়েছে


common_sense_1468815এক.

আজ আমার জন্মদিন! এখন গভীর রাত। জন্মদিনের প্রথম প্রহর। একটা কিছু লিখতে ইচ্ছে করছে। কিন্তু কি লিখব? লেখার কথা ভাবতে গিয়ে মনে হলো কমনসেন্স নিয়ে লিখি। আমার বাবাকে সবচেয়ে বেশি বিষাদগ্রস্ত হতে দেখেছি- শাসক শ্রেণীর মানুষের মধ্যে কমনসেন্সের অনুপস্থিতি হতে দেখে। আমার বাবা আমার আদর্শ, যিনি আমাকে সত্য বলা, ওয়াদা রক্ষা করা, আইন পরিবর্তন করতে না পারা পর্যন্ত আইন মেনে চলার মতো ভ্যালুজ শিক্ষা দিয়েছেন আর নিজের জীবনে সেইসব মূল্যবোধ চর্চার মধ্য দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছেন কিভাবে ভ্যালুজ রক্ষা করে চলতে হয়। অন্যদিকে আমার শ্বশুর ইতিহাসের কাহিনী বলতে পছন্দ করতেন। তিনি ইতিহাসের পাতা থেকে শাসকদের দেশপ্রেমের গল্প বলতেন আর এই দেশের শাসকদের মধ্যে কিভাবে আত্মপ্রেম বিকশিত হয়েছে সেই গল্প বলতেন। যাদের মধ্যে দেশপ্রেম থাকে তাদের আপনাআপনি কমনসেন্সও থাকে। আজ আমার জন্মদিনে আমি এই দুই মহান মানুষকে শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করছি। তারা দু’জনেই কমনসেন্সহারা প্রশাসন ও রাজনীতিকদের নিপীড়নমূলক কর্মকান্ডের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছেন এবং তাদের সাধ্যমতো গরিব ও দুঃখী মানুষের পাশে দাড়িয়েছেন। আর বারবার চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছেন এই দেশে কমনসেন্স বিষয়টি কতোটা দুর্লভ। মানুষের মধ্যে সম্প্রীতি তাদের অন্যতম কনসার্ণ ছিল। সেকারণে তারা সারাটা জীবন মানুষের মধ্যে মৈত্রীর ও সহাবস্থানের বন্ধন তৈরিতে ভূমিকা রেখেছেন। তারা তাদের কাজের মধ্য দিয়ে প্রমাণ করেছেন যে, শুধুমাত্র কমনসেন্সের উপযুক্ত প্রয়োগ সমাজের অনেক সমস্যা সমাধান করতে পারে।

দুই.

এক কিশোরকে যখন একজন আইন প্রণেতা মাতাল অবস্থায় গুলি করে তখন তাকে গ্রেফতার করাটাই কমনসেন্স, কারণ একজন মাতাল পুনরায় মাতাল হতে পারে এবং মাতাল হলে আবারো সে বড় ধরনের কোন ঘটনা ঘটাতে পারে। অস্ত্র জব্দ করলেই মাতালের অপরাধ বন্ধ হবার নয়। কারণ সে ছুরি কাচি কিংবা ইট পাথর ছুড়েও মানুষ মারতে পারে। কিংবা প্রশ্নপত্র ফাঁস হওয়ার পরও পরীক্ষা বাতিল না করাটা কমনসেন্সের অনুপস্থিতিরই প্রমাণ। এটি বোঝার জন্য ভারতে প্রায় একই ধরনের ঘটনায় সেই দেশের আদালত পুনরায় পরীক্ষা নেওয়ার আদেশ দিয়েছিল, তা জানার দরকার হয় না যদি কমনসেন্স কাজ করে। নষ্ট গমের তৈরি খাবার খেলে পেট খারাপ করবে সেটা বোঝাটাও কমনসেন্স। আর সেই কমনসেন্স থেকে যারা নষ্ট গম বাংলাদেশে আমদানী করেছে তাদেরকে শাস্তি দেওয়ার কথা। এরকম প্রতিদিনই হাজারো ঘটনা ঘটছে যেখানে কমনসেন্স কাজ করলে ধীরে ধীরে নেতিবাচক ঘটনার সংখ্যা কমিয়ে আনা সম্ভব হতো।

তিন.

মিরপুর এগারো থেকে দশ নাম্বার গোল চক্কর পর্যন্ত প্রচন্ড যানজট ৩০ থেকে ৬০ মিনিটে পার হওয়ার পর প্রায়ই দেখা যায় শ্যাওড়াপাড়া পর্যন্ত রাস্তায় কোন যানজট নেই। তাহলে গোলচক্করে কেন এতো যানজট? একই অবস্থা ঢাকা শহরের আরো কয়েকটি ট্রাফিক সিগনালে। আরো কয়েকটি রাস্তাতে। কেন? কারণ রাস্তায় গণপরিবহন চালকেরা কমনসেন্স ব্যবহার না করে এক ধরনের স্বৈরাচারের ভূমিকা পালন করে যেখানে ট্রাফিক পুলিশরা অনেকসময় গণপরিবহণ চালকদের বন্ধুর ভূমিকায় অবতীর্ণ হন। আমার প্রায়ই মনে হয় নাগরিক যন্ত্রণার অন্যতম প্রধান কারণ কমনসেন্সের অভাব। যত্র-তত্র রাস্তা পারাপার। ওভারটেকিং করা ও করতে গেলে অন্যের বাধা দেওয়া থেকেও যানজট তৈরি হচ্ছে। যার প্রায় পুরোটাই কমনসেন্সের অভাব থেকে।

চার.

কমনসেন্স হলো আপনি যে কাজ জানেন না সেটা করবেন না। অন্য কেউ না জেনে আপনাকে করতে বললে তাকে বিনীতভাবে জানিয়ে দেবেন যে, আপনি কাজটি জানেন না। আজকে আমার অফিসের এক সাপোর্ট স্টাফের দাত নিয়ে খোচাখুচি করল এক লোক যার প্যাডে লেখা তিনি এল. এফ. এ ডাক্তার। ঢাকার শাহজাদপুরের ওই ডাক্তারের ভয়ানক কান্ডের পর অফিসে যখন স্টাফ এলো আমি তাকে দ্রুতই পাঠিয়ে দিলাম পিজি হাসপাতালের দন্ত বিভাগে। তার উপযুক্ত চিকিত্‌সা এখন হবে। এই ঘটনায় আমার খুবই মন খারাপ হলো। আমাদের অফিসের সাপোর্ট স্টাফ না হয় সরল বিশ্বাসে তার কাছে চিকিত্‌সার জন্য গিয়েছিল। কিন্তু ওই লোক যার দাঁতের চিকিত্‌সা দেওয়ার কোন জ্ঞান নেই কিভাবে এক্স রে করিয়ে দাঁত নিয়ে খোঁচাখুচি করে এবং সবমিলিয়ে ১২০০ টাকা নেয়?

পাঁচ.

সাধারণ মানুষের উপর রাষ্ট্র ও প্রশাসনের দায়িত্বজ্ঞানহীন কাজের প্রতিফলন একসময় ব্যক্তি ও সমাজের মানুষের কান্ডজ্ঞানহীন কাজে বিস্তার লাভ করে। এটা বোঝার জন্য কমনসেন্সই যথেষ্ট। এই দেশের মানুষ আজ থেকে নয় রাষ্ট্র ও প্রশাসন যন্ত্র দ্বারা নিপীড়িত হচ্ছে কয়েক’শ বছর ধরে। ব্রিটিশরা যখন এই দেশের মানুষের উপর নিপীড়ন নির্যাতন করেছে সেই সময়ে জমিদাররা সেই নিপীড়ন নির্যাতনকে কয়েক গুণ বাড়িয়ে দিয়েছিল নিজেদের খেয়াল খুশি চরিতার্থ করতে। জমিদার বাড়ির সীমানা শুরু হলে জুতা স্যান্ডেল খুলে হাতে নিয়ে সীমানা পার হওয়ার ঘটনা নিকট অতীতের। কমনসেন্স বলে, জমিদার বাড়ির সীমানার বাইরের রাস্তায় অন্যের পায়ে জুতা থাকা না থাকায় জমিদারের কি আসে যায়? কিন্তু এই দেশের জমিদাররা কখনোই কমনসেন্স ধারণ করতেন না। কমনসেন্সের ঘাটতি তাদের মধ্যে দৃশ্যমান ছিল। কমনসেন্সের ঘাটতি পূরণের কোন ব্যবস্থা আজো আবিষ্কৃত হয়নি। হলে এখনকার জমিদার মানসিকতার শাসক ও প্রশাসকদের উপর সেই ব্যবস্থা প্রয়োগ করা যেতো। যারা মনে করে দেশটা তাদের বাপ দাদার।

ছয়.

কমনসেন্সের যে ঘাটতি সেটা কীভাবে পূরণ করা যায় সেটিই এখন বড় প্রশ্ন। বাংলাদেশে কমনসেন্স কেন লোপ পায়, বিশেষ করে শাসন ব্যবস্থাপনায় সে ব্যাপারটা বিস্তারিত গবেষণার দাবী রাখে। হয়তো এই দেশে লোভ থেকেই কমনসেন্স কমতে শুরু করেছিল যার বিস্তার এখন এতোটাই যে এখন আর লোভ কিংবা অন্য কোন কিছুর আশ্রয় দরকার হচ্ছে না কমনসেন্সের ঘাটতি নিজেই এখন স্বয়ংসম্পূর্ণ। দীর্ঘ অনেক বছরের যে নেতিবাচক চর্চা সেখান থেকে মুক্তি পেতে বাংলাদেশের মানুষকে অনেক বেশি আত্মসচেতন হতে হবে। নিজের ভেতরে কমনসেন্স বাড়িয়ে তুলতে হবে এবং অন্যের মধ্যে ছড়িয়ে দিতে হবে। কোন মানুষ যদি কমনসেন্স দিয়ে বুঝতে পারে কোন একটি কাজ করা তার জন্য সম্ভব না তাহলে তার আত্মসচেতনতা বোধ থেকে ওই কাজটি যে সে পারে না সেটা বলতে হবে। এটা বলতে পারলে তার কমনসেন্স জয়ী হবে। যেমন, ধরা যাক কোন মন্ত্রী কিংবা সচিব তাদের কমনসেন্স দিয়ে বুঝতে পারলেন যে, তিনি যা করছেন সেটা আসলে গোয়ার গোবিন্দের কাজের মতো হচ্ছে যা তাদের পদমর্যাদার মানুষের করা মানায় না। তখন তারা ওই কাজটি করা থেকে বিরত হবেন। এবং কোন কারণে যদি দেখেন যে, তার দ্বারা বিরত থাকা সম্ভব হচ্ছে না তখন তারা পদত্যাগ করবেন সেটাই হলো কমনসেন্স। এভাবে ব্যক্তি পর্যায়ে কমনসেন্সের প্রয়োগের মাধ্যমে একসময় রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশ কমনসেন্সের ঘাটতি কাটিয়ে উঠতে পারবে জন্মদিনে এটাই আমার প্রত্যাশা। দেশের মানুষ ভালো থাকুক, সুস্থ থাকুক ও সুন্দর থাকুক এবং সুখী হোক। আমাকে যারা জন্মদিনের শুভেচ্ছা জানাচ্ছেন তাদেরকে এই লেখাটা উত্‌সর্গ করছি। আপনারা ভালো থাকুন। সুস্থ থাকুন।

পল্লবী।। ঢাকা।।

১১ অক্টোবর, ২০১৫

রাত ১:০০ থেকে ২:০০ টা

Advertisements

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s