একজন দায়িত্বজ্ঞানহীন কবির “বেশ্যা” হওয়ার গল্প এবং ………….


poem_tree_allবেশ্যা শব্দটাতে আমার আপত্তি আছে। কারণ এই শব্দটার মধ্যে এক ধরনের হীনমন্যতা লুকিয়ে আছে। মানুষকে ছোট করার প্রবণতা আছে। একজন মানুষ যখন পেশাদার যৌনকর্মী হয় তখন সেখানে একটা গল্প থাকে। সেই গল্পটা বেশিরভাগ সময় করুণ কাহিনী। সেকারণে যখন নব্বইয়ের দশকে বাংলাদেশে সেক্স ওয়ার্কার বা যৌনকর্মী শব্দটা এনজিওরা চালু করল অন্য অনেকের সঙ্গে আমিও এই শব্দটাই ব্যবহার করছি। তবে এই লেখায় আমি “বেশ্যা” শব্দটা ব্যবহার করেছি ইচ্ছাকৃতভাবে। কেন? সেটা এই লেখার পাঠকমাত্রই বুঝতে পারবেন। যাই হোক, সেক্স ওয়ার্কার শব্দটা প্রথম ব্যবহার করা হয়েছিল ১৯৭৮ সালে তবে এটি জনপ্রিয়তা পায় ১৯৮৭ সালে Sex Work: Writings By Women In The Sex Industry বইটি প্রকাশের মাধ্যমে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাসহ আন্তর্জাতিক সংস্থাসমূহ সেক্স ওয়ার্কার শব্দটাই ব্যবহার করছে।

এই লেখার একটি পটভূমি আছে। কয়েকদিন আগে একটি অনলাইন পত্রিকায় একজন কবির সাক্ষাতকার ছাপা হয়েছিল। যে কবির মাত্র একটা বই বের হলেও তার কবিতা অত্যন্ত দাপটের সঙ্গে এই দেশের মানুষের কাছে পৌঁছেছে গত পাঁচ দশক ধরে। মানুষ তাকে গ্রহণ করেছে আন্তরিকভাবে। অত্যন্ত জনপ্রিয় এই কবি তার দেওয়া সাক্ষাতকারে এমন কিছু কথা বলেছেন যেটা তিনি প্রকাশ্যে বলতে পারেন না এবং বললেও সেটা পত্রিকা ছাপাতে পারে না। কিন্তু পত্রিকা সেটা ছাপিয়েছে। আমি জানি না পত্রিকা এটা ছাপানোর আগে কবির অনুমতি নিয়েছে কি না? তবে যেহেতু লেখাটা প্রকাশের পর এখনো প্রত্যাহার করা হয়নি কিংবা কবির দিক থেকে কোন প্রতিবাদ আসেনি ধরে নিতে পারি যে, এই লেখা ছাপানোর ব্যাপারে কবির সম্মতি ছিল।

লেখাটা পড়ার পর আমি স্তম্ভিত হয়েছি। আমার শুধু মনে হয়েছে কী করে সম্ভব? এমন একটা লেখা কেন প্রকাশ করা হলো। কি মেসেজ দিতে চাওয়া হচ্ছে এই লেখা দ্বারা। অনলাইন পত্রিকাটির সম্পাদকের এই ধরনের লেখা প্রকাশের পূর্ব ইতিহাস থাকায় এটাও মনে হয়েছে যে, হয়তো বাজারে কাটতি না থাকায় বিতর্ক তৈরির মাধ্যমে জনপ্রিয় হওয়ার চেষ্টা করছে। কিন্তু সব কিছুরই তো সীমা থাকা উচিত্‌। এই লেখা প্রকাশ সীমা ছাড়িয়ে যাওয়ার মতো ব্যাপার। কারণ এর একটা সুদূর প্রসারী নেতিবাচক প্রভাব থাকবে সমাজ ও রাষ্ট্রের উপর। শস্তা জনপ্রিয়তার লোভে পড়ে অনলাইন পত্রিকাটি যা করেছে তার ফলাফল ভোগ করতে হবে সমাজকে, যা কখনোই কাম্য হতে পারে না। আর কবি তিনি তার সকল দায়িত্ববোধকে যেন পায়ে ঠেলে দিয়েছেন। ষাটের দশকে তার কবিতা যেমন রাজনৈতিক অঙ্গনকে সমৃদ্ধ করেছিল তিনি বৃদ্ধ বয়সে এসে যেন সবকিছুকে ভেঙ্গে ফেলতে চাচ্ছেন। তিনি সাক্ষাতকারে “ন্যাংটো” হয়ে বললেন,  “আমার কিন্তু মেয়ের অভাব ছিলো না। কবিতার কারণেও ছিলো, শারীরিক সৌন্দর্যর কারণেও ছিলো।”

আমার ভাবতে কষ্ট হয় কথাগুলো একজন কবির। অত্যন্ত জনপ্রিয় এই কবি নিজের “বেশ্যা” হওয়া সম্পর্কে বলছেন- “কিছু উচ্চবিত্ত ঘরের মহিলা থাকে যারা এক্সট্রা মেরিটাল কিছু সম্পর্ক রাখে। সেটা যে কারণেই হোক। এবং সেটা তারা করে একটু সেলিব্রেটি যারা তাদের সঙ্গে। যেমন নামকড়া খেলোয়াড়, কবি, নির্মাতা, অভিনেতা এদের সঙ্গে। আমিও এ উপায়ে টাকা উপার্জন করেছি বেশ কয়েক বছর।” নিজের এই ধরনের বক্তব্যের সমর্থনে তিনি যুক্তিও দাঁড় করিয়েছেন- “এগুলো কাজ এখন অনেকেই করে। কিন্তু কেউ বলতে পারে না। আমিই হয়তো বলতে পারতাম না যদি আজকে আমার স্ত্রী সন্তান থাকতো। “

এটি একজন কবির কথা হতে পারে না। সমাজের প্রতি একজন কবির দায়বদ্ধতা আছে। তিনি সেই দায়বদ্ধতাকে অস্বীকার করতে পারেন না। বিশেষ করে যখন তিনি নিজেই দাবী করেন যে, “এই বই এখন হুমায়ূনের বইয়ের জনপ্রিয়তাকেও ছাড়িয়ে গেছে।”

এতো জনপ্রিয় যে কবি সেই কবি সমাজ ও দেশের কথা ভাববে না। না কি একবার ভেবেছিল সেই ষাটের দশকে এখন আর না ভাবলেও হবে। আমাদেরকে বুঝতে হবে আমরা যা খুশি তা মিডিয়াতে বলতে পারি না কিংবা করতে পারি না। ইচ্ছে হলেই চার রাস্তার মোড়ে ন্যাংটো হয়ে দাঁড়িয়ে থাকাটা আধুনিকতা নয়।

পল্লবী।। ঢাকা।।

১৫ অক্টোরব ২০১৫

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

Connecting to %s