আমি চরম সৌভাগ্যবান


imagesএই দেশে আমি চরম সৌভাগ্যবানদের একজন। আমার পূর্বসূরিরা অস্ত্র হাতে যুদ্ধ করে আমার মতো কয়েক কোটি শিশুকে একটি স্বাধীন দেশ উপহার দিয়েছেন। বোধ বুদ্ধি হওয়ার পর থেকেই আমি স্বাধীন দেশের নাগরিক। জন্মের ৩০ মাসের মধ্যে রেডিমেড স্বাধীনতা পেয়েছি। এই স্বাধীনতা পেতে আমাকে অস্ত্র হাতে যুদ্ধ করতে হয়নি। ৭০০ কোটি মানুষের এই পৃথিবীতে কয়জন মানুষ আছে যারা আমার মতো সৌভাগ্যবান?

১৯৭০ সালের নির্বাচনে পরাজিত পশ্চিম পাকিস্তানী নেতা ভূট্টো-ইয়াহিয়া গং ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাতে পূর্ব পাকিস্তানের বিজয়ী নেতা শেখ মুজিবুর রহমানকে আটক করে পশ্চিম পাকিস্তানে নিয়ে যায় এবং পূর্ব পাকিস্তানের নিরস্ত্র মানুষের উপর নৃশংস হামলা চালিয়ে পাইকারি হারে মানুষ খুন করতে শুরু করে। উদ্দেশ্য ছিল পূর্ব পাকিস্তানের জনগণকে ভয় দেখিয়ে ঠাণ্ডা করা। কিন্তু বীর বাঙালির প্রতিরোধের মুখে পশ্চিম পাকিস্তানী শাসকদের উদ্দেশ্য চুরমার হয়ে যায়। দীর্ঘ নয় মাসের লড়াই শেষে পূর্ব পাকিস্তান স্বাধীন বাংলাদেশ হিসেবে বিশ্বের বুকে আত্মপ্রকাশ করেছিল ১৬ ডিসেম্বর। ওই দিন ঢাকার সোরওয়ার্দী উদ্যান যা তখন রেসকোর্স ময়দান নামে পরিচিত ছিল সেখানে পশ্চিম পাকিস্তানের ৯৩ হাজার সৈন্য মিত্র বাহিনীর প্রধান ভারতীয় জেনারেল অরোরার কাছে আত্মসমর্পন করেছিল। উল্লেখ্য যে, প্রতিবেশী দেশ ভারত যুদ্ধের শুরু থেকে ১,৭৮,০০০ মুক্তিবাহিনীর সদস্যকে মাসিক ভাতা প্রদান, প্রায় ১ কোটি শরনাথ‍র্ীকে আশ্রয় দিয়ে, সেক্টর হেডকোয়ার্টার স্থাপনের সুযোগ দিয়ে, এবং সবশেষে ৩ ডিসেম্বর সরাসরি পাকিস্তানের সঙ্গে যুদ্ধে লিপ্ত হয়ে বাংলাদেশকে স্বাধীন করেছিল।

আজ বিজয়ের ৪৫তম বছরে আমি জোর গলায় বলতে পারি আমি অকৃতজ্ঞ নই। প্রতিনিয়ত আমি তাদের কথা স্মরণ করি যারা রক্ত দিয়ে যুদ্ধ করে এই স্বাধীন দেশটা আমাকে উপহার দিয়ে গেছেন। তাদের কাছে আমি চিরঋণী। অত্যন্ত সতর্কতা ও সচেতনভাবে আমি সেই ঋণ শোধ করছি সেই ছোটবেলা থেকে। এই ঋণ শোধে আমার কোন ক্লান্তি নেই। আমাকে কেউ কখনো ঋণের পরিমাণ বলে দেয়নি। রক্তের ঋণ তো মাপাও যাবে না। যেকারণে বুঝি এই ঋণ কখনো শোধ হবে না। আমি শুধু অনবরত আমার সাধ্যের সবটুকু দিয়ে কাজ করে যাচ্ছি। আমি আমার জীবনের গোল সেই ১৯৮৫ সালেই সেট করে নিয়েছি, যখন আমার বয়স ১৬+ বছর। আমার ব্লগে বলে দেওয়া আছে সেই জীবনের গোলের কথাই- অঙ্গীকার শুধু দেশ ও দেশের মানুষের প্রতি।

আমি চরম সৌভাগ্যবান। কারণ আমার বাবা-মা এবং পরবর্তীতে আমার স্ত্রী ও মেয়ে আমার জীবনের লক্ষ্য ও আদর্শকে চূড়ান্তভাবে সমর্থন করেছেন এবং আমাকে উত্‌সাহিত করেই যাচ্ছেন। যে বাবার আদর্শে উজ্জীবিত হয়ে আমি দেশ ও দেশের মানুষের কল্যাণে কাজ করার অঙ্গীকার করতে পেরেছিলাম কিশোর বয়সে তিনি আমাকে ছেড়ে চলে গিয়েছেন ২০০৭ সালের ১০ আগস্ট। আমি নিশ্চিত জানি তিনি জীবনের অন্য পাড় থেকে আমাকে দেখছেন আর আর্শিবাদ করছেন।

আমার চরম সৌভাগ্য যে স্বাধীনতার ৪৫ বছর পরেও যে দেশে ৩৫ ভাগের বেশি মানুষ নিরক্ষর সেই দেশে আমি উচ্চ শিক্ষা গ্রহণের সুযোগ পেয়েছি। আমি এতোটাই সৌভাগ্যবান যে স্বাধীনতার ৪৫ বছর পরেও যে দেশে বস্তিতে বসবাসকারী মানুষের সংখ্যা ক্রমাগতভাবে বাড়ছে সেই দেশে আমাকে কখনো বস্তিতে থাকতে হয়নি। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান বু্যরোর ২০১৪ সালের বস্তি শুমারি অনুযায়ী ১৭ বছরে বস্তির সংখ্যা বেড়েছে ১৫ লাখ। অর্থাত্‌ ১৯৯৭ সাল থেকে গড়ে প্রতিবছর ২ লাখ করে নতুন বস্তি তৈরি হয়েছে। বস্তির সংজ্ঞায় বলা হয়েছে অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ, জরাজীর্ণ বাসস্থান, অনেকে মিলে একই পানির উত্‌স ও টয়লেট ব্যবহারকারী কয়েকটি পরিবার মিলে একসঙ্গে বাস করা।

দেশে চরম দরিদ্র মানুষের সংখ্যাও মোট জনসংখ্যার ১১ শতাংশ। অর্থাত্‌ মাত্র দেড় দুই কোটি মানুষ খাদ্য নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে কিংবা শিক্ষা ও স্বাস্থ্য সুবিধা থেকে বঞ্চিত থাকছে। আমার চরম সৌভাগ্য যে আমাকে কখনো চরম দরিদ্র মানুষের অংশ হতে হয়নি। ১৯৭৪ সালে খাদ্য সরবরাহ ব্যবস্থাপনাগত সমস্যার কারণে দুর্ভিক্ষে যখন সরকারি হিসেবেই ২২ হাজার এবং বেসরকারি হিসেবে ৫ লাখ মানুষ না খেতে পেরে মারা গিয়েছিল সেই সময়েও আমাকে না খেয়ে থাকতে হয়নি। বাংলাদেশ সেই অবস্থা থেকে অনেকদূর এগিয়েছে। দল হিসেবেও আওয়ামী লীগ ১৯৭৪ সালের চেয়ে অনেক ম্যাচিওর হয়েছে। ১৯৭৪ সালের ভুল থেকে তারা শিক্ষা নিয়ে দেশকে এখন মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত করার কাজে অনেকদূর এগিয়েছে। সরকার ২০২১ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত করার লক্ষ্যে কাজ করছে। সেই লক্ষ্যে দেশ এগিয়ে যাচ্ছে। ব্যাংকে কোটিপতি আমানতকারীর সংখ্যা ১৯৭৫ সালে যেখানে ছিল মাত্র ৪৭ জন। সেই সংখ্যা প্রায় ১০০০ হাজার গুণ বেড়েছে। সবচেয়ে বেশি কোটিপতি বেড়েছে গত ৮ বছরে। ১৯৯০ সালে যেখানে দেশে ব্যাংকে কোটি টাকার আমানতকারী ছিল ৯৪৩ জন সেটি ১৯৯৬ সালে বেড়ে হয় ২,৫৯৪ জন। এরপর ২০০১ সালের শেষে কোটিপতি আমানতকারীর সংখ্যা দাঁড়ায় ৫,৭৯৯ জন। ২০০৭ সালের শুরুতে কোটিপতি আমানতকারীর সংখ্যা ছিল ১৪ হাজার ৪৯ জন। যা এক বছরে বেড়ে ২০০৭ সালের শেষে কোটিপতি আমানতকারীর সংখ্যা দাঁড়ায় ১৬ হাজার ৬৩৩ জন। ২০১৫ সালের জুন মাসে মাত্র ৮ বছরে দেশে কোটিপতি আমানতকারীর সংখ্যা প্রায় তিন গুণ বেড়ে হয়েছে ৪৫ হাজার ৬৯৮ জন।

নিজেকে আমার অনেক সৌভাগ্যবান মনে হয়। গত ৮ বছরে দেশের অন্তত ৪০০ সিনেমাহল বন্ধ হয়ে যাওয়ার পরও আমি হলে গিয়ে সিনেমা দেখতে পারি। কিন্তু খাগড়াছড়ির মানুষের সিনেমা দেখার কোন উপায় নেই। কিংবা রাজশাহীর চারটি হলের তিনটি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় সেখানের মানুষেরও সিনেমা দেখার সুযোগ সীমিত হয়ে পড়েছে। আমি চরম সৌভাগ্যবান যে আমার শৈশব ও কৈশোর শিল্প সংস্কৃতির এতোটা দৈন্য দশায় কাটেনি। স্কুলের সাড়ে তিনবছর আমাকে খেপুপাড়ায় থাকতে হয়েছিল। ক্লাস সেভেন থেকে টেন পর্যন্ত সেই সময়টাতে আমি শিশু সংগঠন খেলাঘরের সঙ্গে যুক্ত ছিলাম। নাচ, গান, কবিতা আবৃত্তি, নাটক, বই পড়া সবই সেখানে ছিল। তখন প্রতিটি উপজেলায় একটি করে সরকারি পাঠাগার ছিল। সেই সবের কিছুই এখন নেই। ওই বয়সে আমরা স্বপ্ন দেখতাম একটি উন্নত বাংলাদেশের। এখনকার ছেলেমেয়েদের জিজ্ঞাসা করলে তারা বলে যে, তারা স্বপ্ন দেখে অনেক টাকা পয়সার। তাদের সামনে আদর্শ হলো শেয়ার বাজার থেকে টাকা কামানো কিংবা ব্যাংক থেকে টাকা নিয়ে সেটা ফেরত না দেওয়া। আমাদের কাছে রাজনীতি ছিল আদর্শ। তাদের কাছে রাজনীতি হলো অর্থ কামাইয়ের উপায়। বিনিয়োগ। আমি সৌভাগ্যবান যে, আমার শৈশব কিংবা কৈশোর মিথ্যা অহংকার আর মিথ্যা চেতনায় আক্রান্ত হয়নি। চারপাশে মাইকে, টেলিভিশনের টক শোতে কিংবা বক্তৃতা বিবৃতিতে মিথ্যা শুনে আমাদেরকে বড় হতে হয়নি।

আমার সৌভাগ্যের তালিকাটা আরো অনেক দীর্ঘ। এই তালিকা তৈরিতে যারা অবদান রেখেছেন তাদের সবার প্রতি কৃতজ্ঞতা জানাই। তবে এই সৌভাগ্য শুধু আমার হওয়ার কথা ছিল না। এই সৌভাগ্য এই দেশের প্রতিটি মানুষের হওয়ার কথা ছিল। পাকিস্তান রাষ্ট্র কাঠামোর মধ্যে পশ্চিম পাকিস্তানী শাসকদের দ্বারা আমরা পূর্ব পাকিস্তানের নাগরিকগণ শোষিত হচ্ছিলাম বলেই পশ্চিম পাকিস্তানী রাজনীতিক ও রাজনৈতিক দলকে প্রত্যাখান করেছিল পূর্ব পাকিস্তানের মানুষ। তারা পাকিস্তান শাসন করার ম্যান্ডেট দিয়েছিল শেখ মুজিবুর রহমানকে। যা মেনে নিতে পারেনি ভূট্টো ও ইয়াহিয়া গং। আগেই বলেছি যে, তারা গণহত্যা চালিয়ে দমনের পথ বেছে নিয়েছিল যা শেষ পর্যন্ত স্বাধীন বাংলাদেশের জন্ম দিয়েছিল। অর্থনৈতিক ও সামাজিক শোষণমুক্ত হওয়ার স্বপ্ন দেখেছিল পূর্ব পাকিস্তানের জনগণ। যার ফলশ্রুতিতে বাংলাদেশের জন্ম। স্বাধীনতার ৪৫ বছরে বাংলাদেশের মধ্যেই অর্থনৈতিক ও সামাজিক শোষণের চিত্রটি প্রকট থেকে প্রকটতর হচ্ছে। এই দেশে এখন একজন শেখ মুজিব নেই এই কথা বলার। পাকিস্তানের রাষ্ট্র কাঠামোতে যেমন শোষিত আর শোষকের বিরুদ্ধে কণ্ঠ উচ্চকিত করেছিলেন শেখ মুজিবুর রহমান এবং মেনে নিতে পারেনি শাসক গোষ্ঠী। তারই প্রতিধ্বনি বাংলাদেশ রাষ্ট্র কাঠামোতে ঘটলেও একজন শেখ মুজিবুর রহমানের অনুপস্থিতিতে সবাই আপাত দৃশ্যমান শান্তিতে আছে। ৩০ লাখ শহীদ প্রাণ কি শান্তিতে আছে?

আজকে বিজয়ের দিনে আমি স্মরণ করছি সেই সব শহীদকে যারা প্রাণ দিয়ে আমাকে একটি স্বাধীন দেশের নাগরিক করে গেছেন। আমি মহান আল্লাহতায়ালার কাছে তাদের রুহের মাগফেরাত কামনা করি। তিনি নিশ্চয়ই মহান ও সর্বজ্ঞ। যারা স্বাধীনতা যুদ্ধে প্রাণ দিয়েছেন তারা একটি ক্ষুধামুক্ত, শোষণমুক্ত, সবার জন্য বাসস্থান, চিকিত্‌সা ও শিক্ষার ব্যবস্থাসহ একটি সোনার বাংলাদেশ রেখে গিয়েছেন। তাদের সেই স্বপ্ন পূরণের দায়িত্ব ছিল যারা বেঁচে ছিলেন এবং দেশের হাল ধরেছিলেন। স্বাধীনতা যুদ্ধে যারা অস্ত্র হাতে যুদ্ধ করেছিলেন তাদের বেশিরভাগের বয়স ছিল ১৮ থেকে ৩৫ বছর। এদের মধ্যে যারা শিক্ষার্থী ছিলেন তারা যুদ্ধ শেষে আবার লেখাপড়ায় ফিরে গেছেন। অনেকে আবার স্বাধীনতা পরবর্তী দুয়েক বছরের মধ্যে বিদেশে পাড়ি জমিয়েছেন। সেটি ভিন্ন আলোচনা।

পল্লবী।। ঢাকা।।
১৬ ডিসেম্বর ২০১৫

Advertisements

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s