বাংলাদেশের সৌভাগ্য যেভাবে বাধাগ্রস্ত হলো


4111817-xs

সূত্র : ইন্টারনেট

২৫ মার্চ রাতে পূর্ব পাকিস্তানে যে গণহত্যার সূচনা করেছিল ভূট্টো নিয়ন্ত্রিত পশ্চিম পাকিস্তানের শাসক চক্র ১৬ ডিসেম্বর তার অবসান হলো পশ্চিম পাকিস্তানী সেনাবাহিনীর প্রায় এক লাখ সৈন্যের আত্মসমর্পনের মাধ্যমে। পূর্ব পাকিস্তানের জনগ তাদের কাঙ্খিত নতুন দেশ পেল। পৃথিবীর মানচিত্রে নতুন একটি দেশের জন্ম হলো- বাংলাদেশ।

বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার মধ্য দিয়ে সাড়ে সাত কোটি জনগণের ১৫ কোটি হাত তৈরি হয়ে গেলো নতুন বাংলাদেশ গড়ার জন্যে। তবে স্বাধীনতার ডাক দেওয়া নেতাকে ফিরে পেতে বাংলাদেশের জনগণকে অপেক্ষা করতে হয়েছে আরো ২৪ দিন। ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি ঐতিহাসিক ৭ই মার্চের ভাষণের মাধ্যমে স্বাধীনতার ডাক দেওয়া নেতা শেখ মুজিবুর রহমান দেশে ফিরে এলেন। পশ্চিম পাকিস্তানী শাসক চক্র শেখ মুজিবুর রহমানকে ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চের রাতেই আটক করে পশ্চিম পাকিস্তানে নিয়ে গিয়েছিল।

শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৭০ সালের নির্বাচনে জয়ী হওয়ার মাধ্যমে উভয় পাকিস্তানের সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের নেতা হিসেবে পাকিস্তানের দায়িত্বলাভের ম্যান্ডেট পেয়েছিলেন। কিন্তু ভূট্টো নিয়ন্ত্রিত পশ্চিম পাকিস্তানের শাসক চক্র শেখ মুজিবুর রহমানকে দায়িত্ব দিতে টালবাহানা শুরু করে। ২৩ মার্চ পর্যন্ত শেখ মুজিবুর রহমানের সঙ্গে আলোচনার নামে সময় ক্ষেপন করে এবং পশ্চিম পাকিস্তান থেকে সৈন্য ও অস্ত্র এনে পূর্ব পাকিস্তানে জমা করতে থাকে। ২৫ মার্চ রাতে অপারেশন সার্চলাইটের মাধ্যমে পূর্ব পাকিস্তানে রক্তের বন্যা বইয়ে দেয়। উদ্দেশ্য ছিল ভয় দেখিয়ে পূর্ব পাকিস্তানের মানুষকে ঠান্ডা করা। কিন্তু বীর বাঙালি পশ্চিম পাকিস্তানী খুনীদের বিরুদ্ধে যার যা ছিল তাই নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে। আর এই ক্ষেত্রে অগ্রণী ভূমিকা পালন করে পাকিস্তানী সামরিক বাহিনীতে থাকা বাঙালী অফিসার ও জওয়ানরা। তাদের সঙ্গে যোগ দেয় স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া তরুণ-তরুণীরা। পাকিস্তানের চিরশত্রু রাষ্ট্র ভারত স্বাধীনতাকামী বাংলাদেশীদের দিকে বন্ধুত্বের হাত বাড়িয়ে দেয়। প্রথমে অর্থ, অস্ত্র ও প্রশিক্ষণ দিয়ে সাহায্য করে এবং পরবর্তীতে সরাসরি পাকিস্তানের সঙ্গে যুদ্ধে লিপ্ত হওয়ার মাধ্যমে পশ্চিম পাকিস্তানের অর্থনৈতিক শোষণ থেকে মুক্তিকামী পূর্ব পাকিস্তানী জনগণকে স্বাধীন বাংলাদেশ লাভে সহায়তা করে।

তবে পাকিস্তানের সঙ্গে ভারতের যুদ্ধের সূচনা হয়েছিল পশ্চিম পাকিস্তানের বর্ডারে ডিসেম্বরের ৩ তারিখে। ওইদিন ভারতের প্রধানমন্ত্রী শ্রীমতি ইন্দিরা গান্ধী জাতির উদ্দেশ্যে দেওয়া এক রেডিও ভাষণে বলেন, ‘আমি আজকে আপনাদের সামনে এমন এক সময় কথা বলছি যখন দেশ ও জাতি কঠিন বিপদের মুখোমুখি। মাত্র কয়েক ঘণ্টা আগে, ৩ ডিসেম্বর সন্ধ্যা ৫:৩০ মিনিটের দিকে পাকিস্তান আমাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছে……. আজ থেকে বাংলাদেশের যুদ্ধ ভারতের যুদ্ধে পরিণত হলো…………..’।

ভারত পাকিস্তান যুদ্ধ শুরু হওয়ার ৭ দিন আগে ইয়াহিয়া খান ২৫ নভেম্বর চীন সফরে যাওয়ার প্রাক্কালে সাংবাদিকদের বলেছিলেন, আগামী ১০ দিনের মধ্যে আমি একটা যুদ্ধ শুরু করব।

যখন সত্যি সত্যি ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধ শুরু হলো তখন পাকিস্তান দাবী করল যে, যুদ্ধ তারা নয় শুরু করেছে ভারত। চীনও এই দাবীর প্রতি সমর্থন জানিয়েছিল। কিন্তু ভারত পরিস্কার জানিয়ে দিল যে, যুদ্ধ পাকিস্তানই শুরু করেছে। তারা প্রমাণ হিসেবে এও বলল যে, রেডিও পাকিস্তান থেকে ঘোষণা করা হয়েছে যে ভারতীয় সেনারা সন্ধ্যা ৬:১৫ ঘটিকায় পশ্চিম পাকিস্তানের সীমান্তে আক্রমণ চালায়। চীনের নিউ চায়না নিউজ এজেন্সির প্রচারেও একই সময়ের কথা বলা হয়েছে। অন্যদিকে, ভারতীয় সামরিক বাহিনীর প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী পাকিস্তানের বোমারু বিমানগুলো ৩ ডিসেম্বর সন্ধ্যা ৫:৪৭ ঘটিকায় ভারতের অনেকগুলো বিমানঘাটিতে একসঙ্গে হামলা চালিয়েছিল। জায়গাগুলো হলো- শ্রীনগর, অমৃতসর, পাঠানকোট, আম্বালা, আগ্রা, যোথপুর, ফরিদকোট, অবন্তিপুর, উত্তরলাই, জামনগর ও ফিরোজপুরের কাছের একটি এলাকা। এসময়ে ভারতের প্রধানমন্ত্রী মিসেস ইন্দিরা গান্ধী কোলকাতা সফরে ছিলেন। তিনি দ্রুত দিল্লীতে ফিরে আসেন। এবং কেন্দ্রীয় মন্ত্রী পরিষদের এক জরুরি সভা শেষে রাষ্ট্রপতি ভি ভি গিরি ভারতে জরুরি অবস্থা ঘোষণা করেন। সেখানে তারা ইয়াহিয়া খানের ১০ দিনের মধ্যে ভারত আক্রমণের হুমকির বিষয়টি নিয়েও আলাপ করেন। মন্ত্রী পরিষদকে জানানো হয় যে, ভারতীয় বায়ু সেনারা এমন একটি আক্রমণের আশঙ্কা করায় তারা প্রস্তুত ছিল। যেকারণে পাকিস্তানী বিমান বাহিনীর আক্রমণে ভারতীয় বিমানঘাটিগুলোর তেমন কোন ক্ষতি হয়নি। বরং ভারতীয় বীর যোদ্ধারা ভূমি থেকে আকাশে উক্ষেপণযোগ্য তিনটি মিসাইল ছুড়ে পাকিস্তানের একটি বি-৫৭ বোমারু বিমানকে ঘায়েল করতে পেরেছিল।

খাতাপত্রের হিসেব অনুযায়ী ১৯৭১ এ ভারত পাকিস্তান যুদ্ধ ৩ ডিসেম্বর শুরু হলেও পাকিস্তানের সঙ্গে ভারতের অঘোষিত যুদ্ধ শুরু হয়ে গিয়েছিল ইয়াহিয়া খানের চীন সফরের ৩ দিন আগে, ২২ নভেম্বর। ওই দিন ভারতীয় বায়ু সেনাদের আক্রমণে পাকিস্তান তিনটি স্যাবর জেট হারিয়েছিল। এরপর থেকে প্রতিদিনই পাকিস্তানী বাহিনীর সঙ্গে ভারতীয় সেনা, নৌ ও বায়ু সেনাদের যুদ্ধ হয়েছিল। যুদ্ধে পাকিস্তানী ও ভারতীয় সেনারা মারা গিয়েছিল। ভারতীয় সামরিক বাহিনীর প্রকাশিত তথ্যের ভিত্তিতে দেখা যায় যে ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধে পূর্ব রনাঙ্গন অর্থাত্‌ পূর্ব পাকিস্তান তথা বাংলাদেশের রনাঙ্গনে ১,২৪৬ সেনা মারা গিয়েছে এবং পশ্চিম রনাঙ্গন তথা পশ্চিম পাকিস্তানের বড‍র্ারে মারা গিয়েছে ১,৯৩৬ জন, সবমিলিয়ে ২৪ দিনে ভারতীয় মোট সেনা মরেছে ৩,১৮২ জন।

ইন্দিরা গান্ধী তার রেডিও ভাষণে ভারতীয় জনগণকে একটি দীর্ঘ মেয়াদী যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত থাকতে বললেও সেই যুদ্ধ একমাসও টেকেনি। পাকিস্তানী সেনারা পরাজয় মেনে আত্মসমর্পন করেছিল ভারতীয় জেনারেল অরোরার কাছে ১৬ ডিসেম্বর। সেদিন বাংলাদেশ বিজয় পেয়েছিল। এভাবেই ২৫ মার্চে শুরু হওয়া গণহত্যার অবসান ঘটেছিল।

তবে বাংলাদেশের বড় একটা ক্ষতি হয়ে গেল বিজয় লাভের দু’দিন আগে ১৪ ডিসেম্বর। অত্যন্ত সুপরিকল্পিতভাবে জাতিকে মেধাশূণ্য করার লক্ষ্যে কয়েক হাজার পেশাজীবিকে হত্যা করা হয়। ফলে, বাংলাদেশ স্বাধীনতা লাভের পর দেশ পরিচালনার ক্ষেত্রে আওয়ামী লীগ সরকার পাকিস্তান আমলের বাঙালী সিএসপি অফিসারদের দ্বারস্থ হয়েছিল যাদের বেশিরভাগ ১৯৭১ সালে যুদ্ধের পুরো সময়টা পশ্চিম পাকিস্তানের সরকারের অনুগত ছিল। মড়ার উপর খাড়ার ঘায়ের মতো তৃতীয় যে ঘটনাটি বাংলাদেশের স্বাধীনতাকে অর্থবহ করার ক্ষেত্রে বাধাগ্রস্ত করেছে সেটা হলো যুদ্ধ শেষে স্বাধীন বাংলাদেশে আওয়ামী লীগের নেতা কর্মীদের লাগামহীন কর্মকান্ড ও দুর্নীতি। এই ধরনের পরিস্থিতি একটি সদ্য স্বাধীন দেশে আদর্শ নিয়ে যুদ্ধে যাওয়া তরুণদের মধ্যে হতাশা ছড়িয়ে দেয়। তারা দেশ গড়ার কাজে অংশ না নিয়ে কিংবা নিতে না পেরে নীরবে অনেকটা অভিমান করে দেশ ত্যাগ করতে শুরু করে।

আমেরিকা ও ইউরোপে প্রথম প্রজন্মের যে মেধাবী বাংলাদেশীরা রয়েছেন তাদের বেশিরভাগ স্বাধীনতা যুদ্ধে অস্ত্র হাতে যুদ্ধ করেছেন এবং যুদ্ধ শেষে স্বাধীন বাংলাদেশে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার চরম অবক্ষয় দেখে এক ধরনের হতাশা থেকে ১৯৭২ ও ১৯৭৩ সালে বিদেশ পাড়ি দিয়েছেন আর দেশে ফিরে আসেননি। তাদের সেই চলে যাওয়ার মিছিলে নতুন নতুন মুখ যুক্ত থাকে আরো অনেক বছর ধরে।

উল্লেখিত তিনটি কারণে বাংলাদেশের সৌভাগ্য স্বাধীনতার শুরুতেই বাধাগ্রস্ত হয়েছিল, সেই ধকল বাংলাদেশ এখনো ভালোভাবে সামলে উঠতে পারেনি। বিজয়ের এই মাসে আমাদেরকে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় ফিরে যাওয়ার অঙ্গীকার করতে হবে। এই দেশের সেই বীর তরুণ যারা বিদেশে চলে গিয়েছেন হতাশা থেকে তাদেরকে ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নিতে হবে। তাদের কাছ থেকে এই প্রজন্মের জানার ও শেখার আছে অনেক কিছু। বিশেষ করে স্বাধীনতা যুদ্ধের সঠিক ইতিহাস রচনায় তাদের কথা শোনার দরকার আছে।

পল্লবী।। ঢাকা।।

১৯ ডিসেম্বর ২০১৫

 

 

 

Advertisements

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s